Alexa

সংখ্যালঘুর সমানাধিকার ও সম্মানের শিক্ষা দেয় ইসলাম

সংখ্যালঘুর সমানাধিকার ও সম্মানের শিক্ষা দেয় ইসলাম

ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত সংখ্যালঘুর মানবাধিকারের দাবিতে সোচ্চার বিশ্ব সম্প্রদায় আইনগত ও সামরিক-বেসামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেও বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত মানবতার আহাজারি থামাতে পারছে না। বরং ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার সংরক্ষণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থাকার পরেও মুসলিমরাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। ‘ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার’ সম্পর্কে ঐতিহাসিক পর্যালোচনা: পর্ব- ২

সামান্যতম সংখ্যালঘু উৎপীড়নের আশঙ্কাকা এড়ানোর জন্য মুসলমানের পক্ষে জিম্মির জমি ক্রয় করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল যে- ইমাম, খলিফা, সুলতান বা সাধারণ মুসলমান, কেউই জিম্মিকে তার সম্পত্তি থেকে বেদখল করতে পারবে না। আইনের চোখে মুসলমান আর জিম্মি ছিল সম্পূর্ণ সমান।

খলিফা হজরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘তাদের রক্ত আর আমাদের রক্ত একই রকম।’ সমস্ত আধুনিক সরকার, এমন কি সবচেয়ে সভ্য সরকারগুলোও সমানাধিকার ও সংখ্যালঘু নীতির রক্ষার্থে ইসলাম ও এর ভিত্তিতে পরিচালিত শাসনকে তাদের আদর্শ করতে পারে। কারণ, তখন অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হত না। ইসলামের আইন এই যে, কোনো মুসলমান একজন জিম্মিকে হত্যা করলে তার যা শাস্তি, জিম্মি কোনো মুসলমানকে হত্যা করলে তারও সেই একই শাস্তি।

প্রসঙ্গত খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর আমলের একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। বকর ইবনে ওয়াইল নামে জনৈক মুসলমান হাইরূত নামে একজন খ্রিস্টানকে হত্যা করে। বিচার শেষে খলিফা আদেশ দেন, ‘হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের হাতে সমর্পণ করা হোক।’ অপরাধীকে হাইরূতের উত্তরাধিকারী হোনাইনের হাতে সমর্পণ করা হলে বদলা হিসাবে হোনাইন তাকে হত্যা করে।

পরবর্তীতে প্রসিদ্ধ হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (রহ.)-এর সময়েও অনুরূপ একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। নবী করিম (সা.), তার সাহাবি (রা.) এবং পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের (রহ.) কর্ম ও আচরণের মধ্যে অমুসলমান ও সংখ্যালঘুদের প্রতি সমানাধিকার ও সম্মানজনক বিধানের শিক্ষাই লক্ষ্য করা যায়।

অমুসলমান ও সংখ্যলঘুদের প্রতি সহনশীল ও উদার ব্যবহারের উজ্জ্বল আরেক প্রমাণ হল, অমুসলমান ও সংখ্যলঘু জিম্মিগণ মুসলমানদের অসিয়তনামার নির্বাহক নিযুক্ত হতে পারতেন। তারা মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তা বা রেক্টর নিযুক্ত হতে পারতেন। আর ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের প্রয়োজন না থাকলে ধর্মস্বত্বে তত্ত্বাবধায়কের পদ পূরণ করতে পারতেন এবং কোনো সুযোগ্য বা গুণবাণ অমুসলমান মারা গেলে মুসলমানরা দলেবলে তার শেষকৃত্যে উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণ করতেন। ইসলামের অধীনে প্রতিষ্ঠিত এমন অধিকার, মর্যাদা ও সম্মানের উদার উদাহরণ পৃথিবীর অন্য ধর্ম ও আদর্শের শাসনে শুধু বিরলই নয়; অকল্পনীয়ও বটে।

যদিও ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে সুস্পষ্ট কারণবশতঃ অমুসলমানদেরকে সামরিক নেতৃত্বে দেওয়া হয়নি; তথাপি অন্যান্য উচ্চবেতনযুক্ত ও দায়িত্বপূর্ণ পদে তারা মুসলমানদের সঙ্গে সম-অধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ লাভ করতেন। এই সমতা কেবল নীতিরই ব্যাপার থাকেনি; বাস্তবায়িতও হয়েছিল। কারণ ইসলামের সূচনাকালেই হিজরি প্রথম শতকে দেখতে পাওয়া যায় যে, খ্রিস্টান-ইহুদি-ম্যাজিয়ানরা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিযুক্ত হয়েছেন। প্রাথমিক শাসকগণ প্রজাদের মধ্যে কোনোরূপ ধর্মভিত্তিক পার্থক্য স্বীকার করেননি। আর পরবর্তী শাসকগণও অতি যত্ন সহকারে অগ্রণীদের উদাহরণ অনুসরণ করেছেন।

মোদ্দা কথায়, ইসলামী দেশগুলোতে যদি অমুসলমান-সংখ্যালঘুদের আচরণের সঙ্গে ইউরোপীয় সরকারগুলোর অধীনে অখ্রিস্টানদের প্রতি ব্যবহারের তুলনা করা হয়, তবে সকল বিবেচনায় সমানাধিকার, মানবতা আর মহত্ত্বের পাল্লা ইসলামের দিকেই ঝুঁকবে। আরবের বাইরেও ইসলামী শাসন বা মুসলিম প্রশাসনে অভিন্ন সমানাধিকারের বিবরণ দেখা যায় অমুসলমানদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে।

দিল্লি¬র মুঘল সম্রাটদের অধীনে অমুসলিম হিন্দুরা সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হতেন; প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিযুক্ত হতেন; সম্রাটের মন্ত্রী পরিষদ ও পরামর্শ সভায় সদস্যরূপে অন্তর্ভূক্ত হতেন। সুলতানী আমলের বাংলায় অমুসলমান হিন্দুরা ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-ধর্ম প্রসারে রাষ্ট্রীয় পূর্ণ সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে নবজন্ম লাভ করেন। রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে তাদের অবাধ বিচরণ বর্তমানকালের তথাকথিক সমানাধিকারের প্রবক্তাদের কাছেও ভাবনাতীত বিষয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

আজকে, এই একবিংশ শতাব্দীতেও কেউই জোর গলায় বলতে পারবে না যে, ইউরোপ-আমেরিকার পশ্চিমা আদর্শের অধীনস্থ মিশ্র জাতি ও ধর্ম বিশিষ্ট দেশগুলোতে বিশ্বাস, ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল, সংস্কৃতি ও বংশের ভিত্তিতে কোনো পার্থক্য নেই!

প্রসঙ্গত ইসলামে রাষ্ট্র ব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্রষ্টা মানুষের মধ্যে যেসব গুণাবলী দেখতে চান সেগুলোর প্রচলন, প্রতিপালন ও বিকাশ এবং তিনি যেগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করেন সেগুলোতে বাধা দেওয়া ও দূর করা। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক প্রশাসনের হাতিয়ারে পরিণত হবে না এবং কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইচ্ছাপূরণের মাধ্যম হবে না। ইসলামে রাষ্ট্র কাঠামোয় ব্যক্তি ও রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে ঐশী বিধান অনুযায়ী ধার্মিকতা, নৈতিক উৎকর্ষতা, সৌন্দর্য, সচ্চরিত্রতা, সফলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মৃদ্ধির আদর্শ-স্থানীয় গুণসমূহ অর্জনের প্রয়াস চালাবে এবং একইসঙ্গে সকল ধরনের অন্যায়, অসভ্যতা, দুর্নীতি, ভ্রান্তি, অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। মানবতা ও মানব কল্যাণের জন্য হঠকারিতামুক্ত টেকসই আর স্থায়ী পরিকল্পনা ও কার্যক্রম ইসলামী ব্যবস্থার প্রধান অবলম্বন।

প্রকৃতিগতভাবে মানুষ স্বাধীনরূপে জন্মগ্রহণ করে এবং নিজের খুশি অনুযায়ী বেপরোয়াভাবে যা কিছু ইচ্ছা করতে চায়। দার্শনিক নিৎসরে মতে- ‘একটি শিশুকে জন্মের পর পরই যদি মানুষের তত্ত্বাবধান ছাড়া জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সে যদি জীবজন্তুর মাধ্যমে লালিত-পালিত হয়, তাহলে সে তার বাকী জীবন জন্তুর মতোই আচরণ করবে। তাকে দেখতে অন্যান্য মানুষের মতো মনে হলেও সে কখনোই মানবিক আচরণ, গুণাবলী ও মর্যাদাবোধ পাবে না। সে কেবলমাত্র একটি সামাজিক ব্যবস্থায় অন্য মানুষের সঙ্গে মিশেই তার মানবিক সম্ভাবনা ও সুযোগকে বিকশিত ও বাস্তবায়িত করতে পারবে।’

নিৎসের বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান কালের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হলে দেখা যাবে, এখনও চরম শাস্তি বলতে কাউকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ করা উল্লেখযোগ্য। এটাই ভয়ঙ্কর শাস্তি হিসাবে যথেষ্ট, যদি কাউকে কারারুদ্ধ করা হয়, নিঃসঙ্গভাবে আটকে রাখা হয়, এমনকি বিলাস বহুল অবস্থাতে। নিঃসঙ্গভাবে থাকার আরেকটি প্রতিফলন হচ্ছে কবরের ভীতি।

ইসলাম সম্মিলিত সামাজিক জীবন ও মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। যে জীবন ও সমাজে থাকবে সম্প্রীতি, শান্তি ও ন্যায়বিচার। এ সব শর্ত মানুষকে তার শারীরিক অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে এবং পরকালের পরবর্তী জীবন সম্পর্কে প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে হজ, নামাজ, জাকাত, জিহাদ, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ইত্যাদি ইবাদত বা প্রার্থণা ব্যক্তিগত হলেও চূড়ান্ত বিচারে সুন্দর মানুষের বিকাশের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুন্দর করার কাজ হিসাবেই চিহ্নিত এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে সহায়তা করারই নামান্তর। ব্যক্তিবর্গের মন ও মানসিকতা এমন হলে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সমানাধিকারের দায়িত্ববোধ জাগ্রত ও প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য। এভাবেই নিজের, অন্য মানুষের ও সমাজের প্রতি কর্তব্যের ভিত্তিতে ইসলাম মানুষের জন্য সার্বজনীন মানবাধিকারের রূপরেখা প্রণয়ন করেছে এবং তা সকল পরিস্থিতিতে অনুসরণ করতে হবে। এ সকল অধিকার ও দায়িত্ববোধ মুসলমান ও অমুসলমান; সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু সকলের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য।

আরও পড়ুন: পর্ব-১: ইসলামে বর্ণবাদ ও বর্ণবৈষম্য বলে কিছু নেই

আপনার মতামত লিখুন :