ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের বন্যা

সেন্ট্রাল ডেস্ক, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

  • Font increase
  • Font Decrease

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তিন পার্বত্য জেলায় বন্যা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে অনেক এলাকা। অনেক জায়গায় প্রবল বর্ষণ অব্যাহত আছে। এতে বাড়ছে স্থানীয় জলাশয়গুলোর পানি। এর মধ্যে শনিবার (১৩ জুলাই) পাহাড় ধসে মারা গেছেন ছয়জন। সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে পার্বত্যাঞ্চল। 

বান্দরবান

বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বান্দরবানে। গত পাঁচ দিন ধরে জেলটি সারাদেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। ১৯৯৭ সালের পর বিগত ২২ বছরেও এমন বন্যা দেখেননি বলে দাবি স্থানীয়দের।

বন্যার পানিতে প্লাবিত এখন পর্যটনের শহর বান্দরবান পৌরসভার চারপাশ। শনিবার (১৩ জুলাই) দিনব্যাপী ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। ফলে সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী নদীর পানির সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাবন।

Flood

বন্যা কবলিত রয়েছে ৩৩টি ইউনিয়ন এবং দু’টি পৌরসভায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ। দুপুরের পর থেকে জেলা শহরে নতুন করে প্লাবিত হয় নোয়াপাড়া, জজকোর্ট এলাকা, ফায়ারসার্ভিস এলাকা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট এলাকা, বনবিভাগ এলাকা, ক্যাচিংঘাটা, হিলবার্ড এলাকা, হাফেজঘোনা, বালাঘাটা, কালাঘাটা, বাজার এলাকা ও সেনানিবাস এলাকা।

বান্দরবান-কেরানীহাট প্রধান সড়কের বাজালিয়া, দস্তিদারহাট এবং বরদুয়ারা তিনটি পয়েন্টে প্লাবিত সড়কে বন্যার পানি আরো কয়েকফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ড, কলেজরোড, সার্কিটহাউজ রোড, বালাঘাটা রোড, কালাঘাটা রোড, চিম্বুকরোড, কালেক্টরেড স্কুল রোড, আলফারুক ইনষ্টিটিউটরোড, পৌরসভার অভ্যন্তরিন সবগুলো সড়ক বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে বন্যা ও পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে বান্দরবানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাইক্লোন সেন্টারে খোলা হয়েছে ১৩১টি আশ্রয় কেন্দ্র। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এগুলোতে অবস্থান নিয়েছে শতশত পরিবার। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে এখনো কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি। শুধু আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে খিচুরি ও খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

Flood

বান্দরবান পৌরসভার মেয়র মো. ইসলাম বেবী বলেন, পৌর এলাকার নয়টি ওয়ার্ডের মানুষ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বান্দরবান শহরটি বন্যার পানিতে ভাসবে। দূর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নয়টি ওয়ার্ডের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে খিচুরি ও খাবার পানি এবং শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।

জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করছে বান্দরবানে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে প্রশাসনের। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে গুদামে। বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যাও আরও পাঁচটি বাড়িয়ে ১৩১টি করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হবে। জেলা প্রশাসনে খোলা হয়েছে সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম।

রাঙামাটি

টানা আট দিনের অব্যাহত বর্ষণের ফলে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। শনিবারের (১৩ জুলাই) এ ঘটনায় মারা গেছেন দুইজন। নিহতরা হলেন- অতুল বড়ুয়া ও সুজয় মং মারমা।

এ নিয়ে এক সপ্তাহে রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় মোট ছয় জনের মৃত্যু হলো।

কাপ্তাই হ্রদ ও কর্ণফূলী নদীর পানি বাড়ছে হু হু করে। তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। এরই মধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।

Flood

কাপ্তাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফ আহম্মেদ রাসেল ও চন্দ্রঘোনা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আশরাফ উদ্দিন জানান, পুরো রাঙামাটিতে দুই শতাধিক অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে প্রশাসন। সব উপজেলায় অন্তত ১৫ হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, কর্ণফুলী নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে উঠে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে রাঙামাটির সঙ্গে রাজস্থলী ও বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। কাপ্তাইয়ের ব্যঙছড়িতেও রাস্তার ওপর পাহাড় ধসে পড়ে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

অপরদিকে রাঙামাটির কুতুকছড়ির খামারবাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বর্তমানে বেহাল দশা। ইতোমধ্যেই এই রাঙামাটির সব সড়কে ভারী যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে নোটিশ দিয়েছে সড়ক বিভাগ।

Flood

বর্ষণের ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বেড়ে অবনতি ঘটেছে বাঘাইছড়ি, লংগদু ও বরকল উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি। বাঘাইছড়িতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন অন্তত দেড় হাজার মানুষ। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদ।

এদিকে নতুন করে দুর্ভোগে পড়েছেন রাঙামাটির বরকল উপজেলার নিন্মাঞ্চলের হাজারো মানুষ। গত দুইদিন ধরে অধিক হারে পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে আসতে থাকায় শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

ভুষনছড়া ইউনিয়নের অনেক রাস্তাঘাট ভেঙ্গে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে প্রাণ হারান ১২০ জন। পরের বছর মারা যান ১১ জন। এ বছর এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে দুই জনের।

Flood

এ ধরনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসনে প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করে। কিন্তু আজও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হয়নি।

খাগড়াছড়ি

বর্ষণ কিছুটা কমেছে খাগড়াছড়িতে। তবে চেঙ্গী, মাঈনী ও ফেনী নদীর পানি কমতে থাকায় বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বহু স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েভেছ, ঝুঁকিতে রয়েছে অসংখ্য স্থাপনা।

গত কয়েক দিনে দিঘীনালার মাঈনী, রামগড়ের ফেনী, পানছড়ি ও খাগড়ছড়ির চেঙ্গী নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানছড়ি উপজেলার দুধুকছড়া ফুট ব্রীজ, উপজেলার চেংগী ইউপি কার্যালয় নদীর গর্ভে বিলীন হতে বসেছে। বন্ধ হয়ে গেছে উপজেলার মুনিপুর-তারাবন সড়ক যোগাযোগ।

Flood

মাঈনী নদীর ভাঙ্গনে দিঘীনালার চোংড়াছড়ি, মেরুং, বোয়ালখালীর হাসিনশরপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। খাগড়ছড়িতে চেঙ্গী নদীর ভাঙনে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের রাবার কারখানা, পৌর বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়াও পাহাড়ের বিভিন্ন ছোট বড় ছড়া ও খালের ভাঙনও দেখা দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: কাপ্তাইয়ে পাহাড় ধসে নিহত ২

আরও পড়ুন: দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা

আপনার মতামত লিখুন :