Barta24

রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

English

শহর কলকাতার উত্থানপর্ব

১৬৯৯ সালে প্রেসিডেন্সি হয় কলকাতা

১৬৯৯ সালে প্রেসিডেন্সি হয় কলকাতা
কলকাতাকে ১৬৯৯ সালে প্রেসিডেন্সি ঘোষণা করা হয়/ ছবি: সংগৃহীত
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

সুতানুটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটি ক্রয়ের খবর লন্ডনে কোম্পানির সদর দফতরে পৌঁছালে কোম্পানির বড় কর্তারাও নড়েচড়ে বসেন। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বাংলা অঞ্চলে কোম্পানির এইসব সাফল্যকে ছোটভাবে না দেখে কোম্পানি পৃষ্ঠপোষকতা করে। এ লক্ষ্যে তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে কলকাতাকে কেন্দ্র করে একটি প্রশাসনিক কাঠামোও সাজিয়ে ফেলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তদুপরি ১৬৯৯ সালে কোম্পানির সর্বোচ্চ পরিষদ ‘কোর্ট অব ডিরেক্টরস’ কলকাতাকে আলাদা প্রশাসনিক ইউনিট তথা ‘প্রেসিডেন্সি’ ঘোষণা করে সেখানে নিম্নরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়:

“Calcutta should be advanced to the dignity of a presidency that the President should draw a salary of Rs. 200/- per month with an additional gratuity of Rs. 100/- that he should be assisted by a Council of 4 members; of whom the first should be the Accountant, and the second the Warehouse Keeper, the third the Marine Purser; and the fourth the Receiver of the Revenues.”

১৭০০ সালের ২৬ মে কলকাতায় কোম্পানির প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে নিযুক্ত হন স্যার চার্লস আয়ার। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, জব চার্নকের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি কলকাতা তথা বাংলায় কোম্পানির স্বার্থ সংরক্ষণ ও বিকাশে বিশেষ তৎপরতা প্রদর্শন করেন। তবে তিনি ১৬৯৯ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে যান এবং পুনরায় ১৭০০ সালে ফিরে এসে প্রেসিডেন্ট হন। স্বাস্থ্যভঙ্গের কারণে সাত মাস পরেই তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান।

চার্লস আয়ার চলে গেলে প্রেসিডেন্ট পদে কলকাতায় তার স্থলাভিষিক্ত হন জন বেয়ার্ড। এভাবেই কলকাতাকে ঘিরে চলতে থাকে ইংরেজেদের শক্তি সঞ্চয় ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ধারা। পরবর্তী কোম্পানির প্রশাসকগণ জব চার্নকের স্বপ্নকে তিলে তিলে গড়ে তুলতে থাকেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মাদ্রাস থেকে এসে স্যার জন গোল্ডসবরো ১৬৯৩ সালে যে স্থানটি দুর্গ নির্মাণের উপযুক্ত বলে স্থির করেছিলেন, তা ডিহি কলকাতার মধ্যে অবস্থিত। সেই সময় কলকাতা ইত্যাদি গ্রাম সাধারণভাবে সুতানুটি বলেই পরিচিত ছিল। তখনও কলকাতা নামটি কাগজেপত্রে বা লোকমুখে প্রতিষ্ঠা পায়নি।

১৬৯৩ সালে শুরু হয়ে ১৬৯৮ সালে দুর্গটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। ১৬৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর ‘কোর্ট অব ডিরেক্টরস’ এক পত্রে দুর্গের নাম ‘ফোর্ট উইলিয়াম’ রাখার নির্দেশ দেয়। চিঠিতে আরও বলা হয় যে, “We approved of the fortification, you have made, and wish you to strengthen it by degrees as you can without any public offence to the Country or the great men.”

প্রাথমিক অবস্থাতেই দুর্গের মধ্যে একটি ভালো হাসপাতাল, সৈন্যদের বাসস্থান প্রভৃতি নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়। কোম্পানির অনুদানে এবং ইংরেজ কোম্পানির সদস্য ও খ্রিস্টান জনসাধারণের চাঁদায় একটি গির্জাও নির্মাণ করা হয়। ‘সেন্ট অ্যান’ নামে গির্জাটি নামাঙ্কিত হয়। ৯ মে ১৭০৯ সালে বিশপ অ্যান্ডারসন এটির উদ্বোধন করেন।

বলা নিষ্প্রয়োজন যে, কোম্পানি মুখে যাই বলুক না কেন, দুর্গ, হাসপাতাল, সেনাবাস, গির্জা ইত্যাদির মাধ্যমে শুধু ব্যবসা নয়, শুরু থেকেই তারা কলকাতাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন মতলব নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। আর্থ-সামাজিক ক্ষমতা দৃঢ়করণের পাশাপাশি সামরিক শক্তিও সঞ্চয় করছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যা চূড়ান্ত সাফল্য পায় অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হাসিলের মাধ্যমে।

আরও পড়ুন: জব চার্নকের কলকাতা

আরও পড়ুন: সুতানুটি থেকে কলকাতা

আপনার মতামত লিখুন :

শুভ জন্মদিন, মিস্টার ফিফটি

শুভ জন্মদিন, মিস্টার ফিফটি
তাঁর মাঠে নামা মানেই ছিল পঞ্চাশোর্ধ্ব স্কোরের নিশ্চয়তা

এদেশের ক্রিকেটের সোনালি অতীতে নির্ভরতার অন্যতম প্রতীক কাজী হাবিবুল বাশার সুমন আজ পা রাখলেন ৪৭ বছর বয়সে। ১৯৭২ সালের এই দিনে কুষ্টিয়ার নাগকান্দায় জন্ম নেওয়া এই ডানহাতি টাইগার গ্রেটের হাত ধরেই বহু গৌরবময় অর্জনের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। গুরু ডেভ হোয়াটমোরের সাথে অধিনায়ক বাশারের দারুণ যুগলবন্দীতে অর্জিত হয়েছে অনেক মাইলফলক।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে বাশারের আবির্ভাব ১৯৮৯ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ দলে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে। ছোটদের এশিয়া কাপের সেই আসরে আরো ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী, অজয় জাদেজা, মারভান আত্তাপাতু ও মঈন খান। এর আগে ও পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হয়ে ধারাবাহিক সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে জাতীয় দলে ডাক পান ১৯৯৫ সালে—এবার ‘বড়দের’ এশিয়া কাপে। সেবার শারজাহতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে অভিষেকও হয় তাঁর।

তবে শুরুতেই ইনজুরি হানা দেয় তাঁর ক্যারিয়ারে। পুরো ফিটনেস ফিরে না পাওয়া হাবিবুল বাদ পড়েন ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির দল থেকে। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় তরুণ টাইগার বাহিনী। তবে সেবছরের এশিয়া কাপেই দলে ফিরে আসেন বাশার। কিন্তু বিধি বাম—ইনজুরি পরবর্তী ধারাবাহিক ব্যর্থতার মাশুল হিসেবে হাবিবুল বাশার জায়গা হারান ১৯৯৯ আইসিসি বিশ্বকাপ দলে। তবে হাল ছাড়েননি বাশার, এডি বারলোর সাহচার্যে কঠোর পরিশ্রম আর ব্যাটিং টেকনিক নিয়ে বিস্তর গবেষণায় বিশ্বকাপের পরই ফিরে আসেন দলে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ধারাবাহিক হতে শুরু করেন দ্রুতই। ২০০০ সালের শুরুতে বেশ কয়েকটি ম্যাচে অনবদ্য ব্যাটিংয়ে নজর কাড়েন সবার। এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট ম্যাচ। চোখ বন্ধ করে যেটা বাশারের নিজেরও প্রথম টেস্ট হওয়ার কথা, ঠিক তখনই বেঁকে বসেন নির্বাচকেরা। আকস্মিকভাবে সেই প্রথম টেস্টের দলে ঠাঁই হয়নি বাশারের। তবে তাঁর ব্যাটের ধারাবাহিক সাফল্য কথা বলেছে তাঁর পক্ষে। ফর্মে থাকা পুরোপুরি ফিট একজনকে বাদ দেওয়ার এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি গণমাধ্যমের নিন্দার মুখে পড়া নির্বাচকেরা বাধ্য হয়ে ফের ঘোষণা করেন হাবিবুলসহ নতুন দল। ভারতের বিপক্ষে নিজের ও দেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচে দুর্দান্ত এক ফিফটিতে হাবিবুল যেন সে সিদ্ধান্তের যথার্থতাই প্রমাণ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566050114840.jpg
◤ টেস্টের আঙিনায় বাংলাদেশের অভিষেকে প্রথম ফিফটি করেন হাবিবুল বাশার ◢


সেই পারফর্মেন্সের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বাশারকে। ক্রিজে দ্রুতই থিতু হওয়ার সক্ষমতায় অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকলেও অর্ধশতকের ইনিংসগুলোকে শতকে রূপান্তরের ধারাবাহিক ব্যর্থতা তাঁকে তাড়া করেছে ক্যারিয়ারজুড়েই। সব সংস্করণ মিলিয়ে নামের পাশে ২৪টি হাফ সেঞ্চুরি থাকলেও সেঞ্চুরির সংখ্যা তাই মাত্র ৩, যার প্রতিটিই আবার টেস্ট ফরম্যাটে। মজার তথ্য—তাঁর খেলা টেস্ট ম্যাচের সংখ্যাও ঠিক ৫০, যেখানে ইনিংস সংখ্যা আবার ঠিক ৯৯! একের পর এক ফিফটিতে পাকাপাকিভাবেই তাই পেয়ে যান মিস্টার ফিফটি ডাকনামটি। দলের ত্রাণকর্তা হয়ে সেট হয়ে যেতেন দ্রুতই, মাঠে নামা মানেই ছিল পঞ্চাশোর্ধ্ব স্কোরের নিশ্চয়তা। টেস্টে তাই বাংলাদেশের হয়ে ত্রিশোর্ধ্ব গড়ের অধিকারীদের তালিকায় তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমের পরপরই রয়েছেন হাবিবুল বাশার সুমন।

প্রথাগত টেস্ট ব্যাটিংয়ের জন্য মানানসই প্রায় সব স্ট্রোকের নিদর্শন পাওয়া যেত মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের ভক্ত বাশারের ইনিংসগুলোয়। তাঁর ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ রানই এসেছে মিডউইকেট বরাবর খেলা নান্দনিক ড্রাইভ শটে। অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশিবার আউট হয়েছেন হুক শট চেষ্টা করতে গিয়ে। ভারতের বিপক্ষে সেই অভিষেক টেস্টের আগে বাশার একরকম প্রতিশ্রুতিই দেন যে এই হুকের নেশা দ্রুতই ত্যাগ করবেন। বলা বাহুল্য, ৭১ ও ৩০ রানের ইনিংস দুটি খেলার পথে ঠিকই দু-দুবার সফলতার সাথে হুকের লক্ষ্যে ব্যাট চালিয়েছেন নাছোড়বান্দা হাবিবুল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566050277732.jpg
◤ প্রায় সব স্ট্রোকের নিদর্শন পাওয়া যেত বাশারের ইনিংসগুলোয় ◢


কারো কারো মতে, বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়কও তিনি। যদিও পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে এগিয়ে আছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা, তবু সময় ও পরিস্থিতির বিচারে অধিনায়ক হাবিবুলের অবদান অনস্বীকার্য। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে দলের অধিনায়কত্ব লাভ করার পরপরই বাশার ব্যাট হাতে হয়ে ওঠেন দুর্ধর্ষ। তৎকালীন টাইগার কোচ ডেভ হোয়াটমোরকে নিয়ে হাবিবুল শুরু করেন দলের ব্যাটিং মেরুদণ্ডের পুনর্গঠন। এছাড়া শূন্য অভিজ্ঞতার তরুণদের সাথে খালেদ মাসুদ পাইলট, খালেদ মাহমুদ, মোহাম্মদ রফিকদের মতো অভিজ্ঞদের দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ এক মেলবন্ধন সৃষ্টি করেন তিনি। নিজের স্মরণীয় ইনিংসটিরও দেখা পান অধিনায়ক হবার বছরেই। সেন্ট লুসিয়ায় নিজের তৃতীয় ও সর্বশেষ সেঞ্চুরিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিশ্চিত করেন দারুণ এক ড্র। ১১৩ রানের সেই কাব্যিক ইনিংস ছিল তাঁর ক্যারিয়ার-সেরা স্কোর।

তবে বাংলাদেশের অনেক ‘প্রথম’-এর সাক্ষী হাবিবুলের হাত ধরে সেরা সাফল্য আসে ঠিক তার পরের বছরই। ২০০৫ সালে সফরকারী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ দল দেখা পায় প্রথম টেস্ট ম্যাচ ও সিরিজ জয়ের। শুধু তাই নয়, সেবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়টিও ছিল দেশের ইতিহাসে প্রথম। সব মিলিয়ে মোট ১৮টি টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন হাবিবুল বাশার, চারটি ড্রয়ের পাশে যেখানে জয় শুধু সেই একটিই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566050398915.jpg
◤ দেশের প্রথম টেস্ট ও সিরিজ জয়ের উদযাপন 


সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও অধিনায়ক হিসেবে দারুণ সফল ছিলেন হাবিবুল। মোট ৬৯টি ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন তিনি, আর জয়লাভ করেন ২৯টি ম্যাচে। জিম্বাবুয়ে বা কেনিয়ার মতো দুর্বল প্রতিপক্ষদের অনায়াসে হারাতে থাকা বাংলাদেশ তাঁর অধিনায়কত্বেই ‘জায়ান্ট কিলার’-এর তকমা পায়। প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের বছর অর্থাৎ ২০০৫ সালের জুনে কার্ডিফে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর অনির্বচনীয় স্বাদ লাভ করে টাইগাররা।

পরবর্তীতে ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে পা রাখেন হাবিবুল, যেটি ২০১৫-এর আগ পর্যন্ত ছিল দেশের শ্রেষ্ঠতম বিশ্বকাপ আসর। সেবার ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত জয়ে বাংলাদেশ দল প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করে সুপার এইট পর্ব। ১৩.১২ গড়ে সর্বোচ্চ ৩২ রান করে ব্যক্তিগতভাবে চরম ব্যর্থ হাবিবুল অধিনায়কত্ব পালন করেছেন যথাযথভাবেই। তবে ব্যাটসম্যান বাশারের সেই অধঃপতনের ধারা বজায় থাকে পরবর্তী সিরিজগুলোতেও। বিশ্বকাপের পরপরই ভারতের বিপক্ষে সিরিজ হেরে নিজে থেকেই ইস্তফা দেন ওয়ানডে অধিনায়কত্ব। ব্যাটিংয়ে আরেকটু মনোযোগী হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন ওয়ানডে দলের অংশ হিসেবে, ছাড়তে চাননি টেস্ট ক্রিকেটও। ১৯ ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি ছুঁতে না পারার ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের প্রথম টেস্টের পরই জায়গা হারান দলে। এমন নড়বড়ে অবস্থায় বোর্ড বাতিল করে তাঁর টেস্ট অধিনায়কত্ব, দুই সংস্করণেই সেই জায়গায় আসেন মোহাম্মদ আশরাফুল। এর পরপরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান দেশের ক্রিকেটের হার না মানা এক নাবিক হাবিবুল। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566050500823.jpg
◤ তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ দেখা পায় প্রথম টেস্ট ম্যাচ ও সিরিজ জয়ের ◢


২০০৮ সালে নিষিদ্ধ ও স্বীকৃতিহীন তৎকালীন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগ—আইসিএলের দ্বিতীয় আসরে দেশের মোট ১৩ জন খেলোয়াড় নিয়ে যোগ দেন হাবিবুল। ঢাকা ওয়ারিয়র্স নামের দলটিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, লাভ করেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ব্যবধানের জয়। তবে এই আইসিএলে খেলার বিদ্রোহী সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানায়নি বিসিবি। সব ধরনের ক্রিকেট থেকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হন বাশারসহ ঢাকা ওয়ারিয়র্সের সব সদস্য। পরে তা প্রত্যাহার করা হলেও ঘরোয়া ক্রিকেটসহ সব ফরম্যাট থেকেই ২০০৯ সালে নিজেকে গুটিয়ে নেন বাশার। ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করা দুই পুত্রসন্তানের জনক হাবিবুল বাশার সুমন বর্তমানে যুক্ত আছেন বিসিবির অন্যতম নির্বাচক ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের পরামর্শক হিসেবে।

বাংলাদেশ দলকে নিয়েও যে বাজি ধরা যায়, তাঁর হাত ধরেই সেটা জেনেছে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। হাঁটি হাঁটি পায়ের অনেক স্মরণীয় বিজয় উল্লাসের উপলক্ষ এনে দেওয়া মিস্টার ডিপেন্ডেবল হাবিবুল বাশারের প্রতি রইলো জন্মদিনের শুভেচ্ছা!

বাংলা ব্যান্ড ও রক সংগীতের প্রাণপুরুষ আইয়ুব বাচ্চু

বাংলা ব্যান্ড ও রক সংগীতের প্রাণপুরুষ আইয়ুব বাচ্চু
শুভ জন্মদিন আইয়ুব বাচ্চু!

‘চলো বদলে যাই বলে’ ডাক দিয়ে সংগীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে ঝড় তুলেছেন তিনি। ‘হাসতে দেখো, গাইতে দেখো’ বলে গান গেয়ে মিশে গিয়েছেন শ্রোতাদের নিত্য-আবেগের সাথে। ‘রুপালি গিটার’-এর জাদুকর তিনি। বাংলাদেশের ব্যান্ড ও রক সংগীতাঙ্গনের অন্যতম প্রবাদপুরুষ। তিনি আইয়ুব বাচ্চু। গত বছরের ১৮ অক্টোবর ‘ঘুমভাঙা শহর’ ছেড়ে অন্যভুবনে পাড়ি জমানো এই কিংবদন্তির ৫৭তম জন্মদিন আজ।

আইয়ুব বাচ্চুর বেড়ে ওঠা ও সংগীতের হাতেখড়ি চট্টগ্রামে। ১৯৭৬ সালে কলেজ জীবনে ‘আগলি বয়েজ’ নামে ব্যান্ড গঠনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল তাঁর সংগীত-জীবন। ১৯৭৭ সালে যোগদান করেন ফিলিংস (বর্তমানে ‘নগর বাউল’) ব্যান্ডে। ব্যান্ডটির সাথে কাজ করেছিলেন ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। একই বছরে জনপ্রিয় রক ব্যান্ড সোলসে প্রধান গিটারবাদক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। সোলসের সাথে থাকার সময় ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সুপার সোলস (১৯৮২), কলেজের করিডোরে (১৯৮৫), মানুষ মাটির কাছাকাছি (১৯৮৭) এবং ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট (১৯৮৮) এই চারটি অ্যালবামে কাজ করেছিলেন। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/16/1565950779278.jpg
◤ বাচ্চু যখন ছিলেন আরেক কিংবদন্তি ব্যান্ড ‘সোলস’-এর সাথে (দ্বিতীয় সারিতে, ডান থেকে দ্বিতীয়) ◢


তবে, আইয়ুব বাচ্চুর লক্ষ্য ছিল নিজে উদ্যোগী হয়ে বড় কিছু করা। সে কারণে ১৯৯১ সালে আরো তিনজন ব্যান্ড মেম্বার নিয়ে গঠন করেন নিজের ব্যান্ড এলআরবি (লিটল রিভার ব্যান্ড)। পরে অবশ্য সংক্ষিপ্ত রূপ ঠিক রেখে বদলে ফেলা হয় নামের পূর্ণাঙ্গ অর্থ। হয়ে যায় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’ (এলআরবি)। এই ব্যান্ড থেকে জন্ম হয়েছে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গানের। ১৯৯২-তে ‘এলআরবি-১’ ও এলআরবি-২’ নাম দিয়েই তারা বের করে সেলফড টাইটেল অ্যালবাম। বাংলাদেশে প্রথম সেলফ টাইটেটেলড অ্যালবাম বের করে এলআরবিই। আরো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একসাথে ডাবল অ্যালবাম রিলিজ দেওয়ার প্রথম উদাহরণও এটি। এরপরে, সেই বছরই ব্যান্ডের তৃতীয় অ্যালবাম ‘সুখ’ মুক্তি পায়। এই অ্যালবামের ‘চলো বদলে যাই’ গানটি পরিণত হয়েছিল বাংলা ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় গানগুলোর একটিতে, যা আজও ঘুরেফেরে সংগীতপ্রেমীদের মুখে মুখে।

এছাড়াও, ব্যান্ডটি উপহার দিয়েছে ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘রুপালি গিটার’, ‘গতকাল রাতে’, ‘পেনশন’, ‘হকার,’ ‘বাংলাদেশ’-এর মতো অসংখ্য শ্রোতানন্দিত গান। এরপরে আইয়ুব বাচ্চুর নেতৃত্বে ব্যান্ড থেকে বের হয় ‘স্বপ্ন’, ‘মন চাইলে মন পাবে’সহ আরো বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় অ্যালবাম। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবরে পরলোকে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি জড়িত ছিলেন তাঁর এই প্রাণপ্রিয় ব্যান্ডটির সাথেই। বাংলা হার্ড রক ঘরানার গান তরুণ প্রজন্মের মাঝে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে আইয়ুব বাচ্চুর এলআরবির এই অ্যালবামগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/16/1565950935258.jpg
◤ বাংলা হার্ড রক সংগীতে প্রাণসঞ্চার করেছিল আইয়ব বাচ্চুর নিজ হাতে গড়া ব্যান্ড এলআরবি ◢


ব্যান্ডদল সফলভাবে পরিচালনা ও এক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা ছাড়াও একক ক্যারিয়ারেও তিনি ছিলেন দারুণ সফল। তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’ বের হয়েছিল ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ময়না’ বের হয়েছিল ১৯৮৮-তে। মোটামুটি জনপ্রিয়তা প্রায় অ্যালবামগুলো। এরপর, তাঁর তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’ বের হয় ১৯৯৫-তে। রীতিমতো বাজার মাত করে দেয় অ্যালবামটি! শিরোনাম গান ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’ ছড়িয়ে পড়ে সবার মুখে মুখে। জনপ্রিয়তা পায় এই অ্যালবামের ‘অবাক হৃদয়’, ‘বহুদূর যেতে হবে’, ‘আমার একটা নির্ঘুম রাত’সহ অন্যান্য গানও। বিভিন্ন মিক্সড অ্যালবামেও তিনি উপহার দিয়েছেন ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো,’ ‘তারা ভরা রাতে,’ ‘কেউ সুখী নয়’-এর মতো অসম্ভব জনপ্রিয় গান। ২০০৭ সালে দেশের প্রথম বাদ্যযন্ত্রগত অ্যালবাম ‘সাউন্ড অফ সাইলেন্স’ প্রকাশ করেন তিনি।

শুধু যে একজন ভোকাল বা কণ্ঠশিল্প হিসেবেই তাঁর জনপ্রিয়তা ও ভূমিকা উল্লেখযোগ্য, এমনটি নয়। গিটার হাতেও তিনি ছিলেন সত্যিকার এক জাদুকর। হার্ডরক সংগীতের তালে তালে তাঁর দ্রুতলয়ের গিটার বাদনের স্টাইল অনুপ্রাণিত করেছে পুরো একটি প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিশীল গিটারিস্টদের। ‘দ্য টপ টেনস’ তাকে বাংলাদেশের ‘শ্রেষ্ঠ ১০ জন গিটারবাদক’-এর তালিকায় রেখেছিল ২য় স্থানে (১ম স্থানটি ‘ওয়ারফেজ’-এর ইব্রাহীম আহমেদ কমলের)।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/16/1565951023494.jpg
◤ বাচ্চুর তুমুল জনপ্রিয় ‘কষ্ট’ অ্যালবামের ফ্ল্যাপ 


রক ও ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি হলেও, তিনি আসলে ছিলেন বহুমাত্রিক একজন শিল্পী। গান গেয়েছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের জন্যও। আম্মাজান ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘আম্মাজান, আম্মজান’, লুটতরাজ ছবিতে ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, সাগরিকা ছবিতে ‘সাগরিকা’সহ অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্যেও।

এলআরবির সাথে মিলে তিনি জিতেছেন ছয়টি মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার এবং একটি সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস। ২০০৪ সালে বাচসাস পুরস্কার জিতেছিলেন সেরা পুরুষ ভোকাল বিভাগে। ২০১৭ সালে জিতেছেন টেলে সিনে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে আইয়ব বাচ্চু ছিলেন সুখী একজন মানুষ। বাচ্চু তার বান্ধবী ফেরদৌস চন্দনাকে বিয়ে করেছিলেন ১৯৯১ সালের ৩১ জানুয়ারিতে। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে দুই সন্তান তাঁদের ঘরে। ছয় বছর ধরে ফুসফুসে পানি জমার অসুস্থতায় ভোগার পর ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাসায় মারা যান আইয়ুব বাচ্চু।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/16/1565951073794.jpg
◤ ব্যান্ড সংগীতের অন্য দুই কিংবদন্তী জেমস ও হাসানের সাথে আইয়ুব বাচ্চু ◢


মাত্র ৫৬ বছয় বয়সে তিনি মারা যান, যেটাকে অনেকেই বলতে পারেন আকাল মৃত্যু। তবে, বাংলা ব্যান্ড ও রক সংগীতে তাঁর মতো বিশাল অবদান রেখেছেন, এমন মানুষ আরেকটাও খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই নিজের কাজের মাধ্যমেই আইয়ুব বাচ্চু ভক্ত, শ্রোতা ও সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে টিকে থাকবেন চিরকাল। কোনো এক ‘মায়াবী সন্ধ্যায়’ বা ‘তারা ভরা রাতে’ অনুরণিত হতে থাকবে ‘এবি-দ্য বস’-এর গান বা গিটারের সুর রকগানপ্রেমী ও ভবিষ্যত প্রজন্মের সংগীতকারদের মনে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র