ঢাকাই ফুটবলের সেকালের উন্মাদনা



সাইফুল মিল্টন, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ফুটবলই ছিল ‘প্রথম প্রেম’

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ফুটবলই ছিল ‘প্রথম প্রেম’

  • Font increase
  • Font Decrease

নব্বইয়ের দশকের মধ্যবর্তী কোনো সময়ের কথা। আমরা থাকতাম পূর্ব বাসাবোর পাটোয়ারী গলিতে। মহল্লার বড়ভাইদের নেতৃত্ব বিশাল প্যান্ডেল টানানো হয়েছে। উপলক্ষ ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ফুটবলে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের শিরোপা জয়ে সমর্থকগোষ্ঠীর খাওয়া দাওয়া। আমার আবাহনীর লোগো খচিত নীল রঙের একটা টিশার্ট ছিল। এই টিশার্টের বদৌলতে আমি এলাকার আবাহনী সমর্থকগোষ্ঠীর কমিটির কনিষ্ঠতম সদস্য। তাই সেদিন আমার ব্যস্ততা ছিল দেখার মতো।

ক্রিকেট দাপুটে ক্রীড়াঙ্গনের এ যুগে কোনো তরুণের কাছে হয়তো উপরের ঘটনাটা কল্পনামিশ্রিত কোনো গল্পের শুরু বলে মনে হবে। কারণ আজ দেশীয় খেলাধুলায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা প্রায় শূন্যের কোঠায়। অথচ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ফুটবলই নাকি ছিল ‘প্রথম প্রেম’। আজকে আমরা ঘরোয়া ফুটবলের সেই স্বর্ণযুগের উন্মাদনা নিয়েই কিছুক্ষণ আলাপ করব।

আবাহনী গ্যালারি-মোহামেডান গ্যালারি : আশি-নব্বইয়ের দশকে ঢাকার ঘরোয়া ফুটবল হতো ঢাকা স্টেডিয়াম (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) ও মিরপুর-২ নং জাতীয় স্টেডিয়ামে (বর্তমান শেরেবাংলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম)। সেখানে ছিল দেশের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডানের সমর্থকদের জন্য পৃথক গ্যালারি। দুই দলের সমর্থকরা ব্যানার ফেস্টুন পতাকাসহ নিজ নিজ গ্যালারিতে অবস্থান নিত। গ্যালারি থেকে দুই দলের সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি গগনবিদারী চিৎকারে প্রতিটি আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ হয়ে উঠত প্রাণবন্ত। কোনো একটা দলের সমর্থকের ভুল করে অন্য দলের গ্যালারিতে ঢুকে পড়ে ধরা পড়লে জুটত উপহাস ও তিরস্কার। এভাবে প্রতিটি আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ ছিল উত্তেজনার পারদে ঠাসা।

ব্রাদার্স আইলো : ঘরোয়া ফুটবলে তৃতীয় শক্তি ছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন। গোপীবাগের এই দলটি ২০০৩-২০০৪ মৌসুমের আগে কখনো লিগ শিরোপা জিততে না পারলেও শিরোপা-প্রত্যাশী আবাহনী বা মোহামেডানের জন্য ছিল আতঙ্কের নাম। ব্রাদার্সের সাথে পয়েন্ট না খোয়ানোই ছিল শীর্ষ দুই দলের লক্ষ্য। তবে বৃষ্টির সাথে ব্রাদার্সের খেলার একটি যোগসূত্র জনশ্রুতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সেটি হচ্ছে, বৃষ্টি আসলে আবাহনী বা মোহামেডান যেই আসুক ব্রাদার্সের কাছে তার পরাজয় অনিবার্য। এজন্যই বৃষ্টিস্নাত দিনে ব্রাদার্সের সাথে বড় দুই দলের কারো খেলা থাকলে বিপক্ষ গ্যালারি থেকে ‘ব্রাদার্স আইলো’, ‘ব্রাদার্স আইলো’ ধ্বনি শোনা যেত।

মহসিন না কানন : আবাহনী ক্রীড়াচক্রের গোলরক্ষক ছিলেন মোঃ মহসিন আর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের গোলরক্ষক ছিলেন সাইদ হাসান কানন। কানন ঢাকার ফুটবলে সংগঠক হিসাবে সরব থাকলেও, মহসিন দীর্ঘদিন কানাডায় প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। সেসময় বড় দুই দলের এই তারকা গোলরক্ষকের মধ্যে সবসময় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চলত। দুইজনই দীর্ঘদিন জাতীয় দলের গোলবার আগলানোর দায়িত্ব পালন করেছেন।

মোনেম মুন্নার রেকর্ড পারিশ্রমিক : বাংলাদেশ ক্রিকেটের সুপারস্টার সাকিব আল হাসান তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আজকের তরুণ প্রজন্ম হয়তো দেখেনি ৯০ দশকের ফুটবল সুপারস্টার সুদর্শন ও অকালপ্রয়াত ফুটবলার মোনেম মুন্নার খেলা। আবাহনী ও জাতীয় দলের একসময়ের অটোম্যাটিক চয়েস এই ডিফেন্ডার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশের লিগেই খেলেছেন। আবাহনীর ঘরের ছেলে মুন্নাকে দলে ভিড়াবার জন্য এক দলবদলে মোহামেডান অনেক চেষ্টা করেছিল। স্টেডিয়াম পাড়ায় কানাঘুষা শুরু হল, মুন্না বোধহয় এবার আবাহনী ছেড়ে শত্রু শিবিরেই ঘাঁটি বানাচ্ছেন। অবশেষে সে সময়ের রেকর্ড পারিশ্রমিক ১৮ লক্ষ টাকায় আবাহনী মুন্নাকে রেখে দেয়। পরের দিন একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল, “মুন্না আবাহনীতেই, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে”। মুন্নার কথা আসলেই বলতে হবে মোহামেডানের তারকা ডিফেন্ডার কায়সার হামিদের কথা। জাতীয় দলের দীর্ঘদেহী এই সাবেক ডিফেন্ডারের রক্ষণ কাজের পাশাপাশি কর্নার থেকে হেড করে গোল করারও দক্ষতা ছিল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/31/1564579187026.jpg

◤ মোনেম মুন্না ┇কায়সার হামিদ ◢

 

বাংলাদেশের ম্যারাডোনা সাব্বির ও গোলমেশিন আসলাম : আশি ও নব্বই দশকে বিশ্বফুটবল ছিল আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর দিয়াগো ম্যারাডোনাময়। দেশে দেশে এসময় আক্রমণভাগের কুশলী খেলোয়াড়দের নাম দেয়া হতো ম্যারাডোনা। বাংলাদেশেও কিন্তু একসময় একজন ম্যারাডোনা ছিল। তিনি জাতীয় দল ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাবেক মিডফিল্ডার রুম্মন বিল ওয়ালি সাব্বির। মধ্যমাঠের এই সৃষ্টিশীল ফুটবলারের ক্রীড়াশৈলি এখনো সেসময়ের ঘরোয়া ফুটবল অনুরাগীদের চোখে লেগে আছে। তবে ইনজুরির জন্য এই মেধাবী খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার সময়ের অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়। মোহামেডানের সাব্বিরের বিপরীতে ছিল আবাহনীর স্ট্রাইকার নন্দিত ফুটবলার শেখ মোহম্মদ আসলাম। ডিবক্সের মধ্যে হেড করার সুযোগ পেলে আসলামের গোল অনেকটাই অনিবার্য ছিল। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে ইরান ও দঃ কোরিয়ার বিরুদ্ধে আসলামের দুটি গোল এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে। দুটি গোলেই এসিস্ট করেছিলেন বাংলাদেশের ম্যারাডোনা সাব্বির।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/31/1564579319241.jpg

◤ সাব্বির┇আসলামের বিদায় মুহূর্ত ◢

 

ঢাকাই ফুটবলের বিদেশিরা : সেসময় ঘরোয়া ফুটবলের অনেক মানসম্মত বিদেশিরা খেলে গেছেন যারা আমদের ফুটবলকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। মোহামেডানের চিমা ও এমেকার কথা নিশ্চই ফুটবলমোদীদের মনে আছে, এই দলে আরো উল্লেখযোগ্য ফরেন রিক্রুট ছিল ইরানের নালজাকের ও নাসির হেজাজি, রাশিয়ান রহিমভ, কুজনেসভ, আন্দ্রে কাজাকভ প্রমুখ। নব্বই দশকের আবাহনীর রাশিয়ান প্লে মেকার ঝুকভকে দেশের ফুটবলবোদ্ধারা দেশীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা বিদেশি খেলোয়াড় মানেন। আবাহনীর অন্যান্য ফরেন রিক্রুটের মধ্যে রাশিয়ান স্ট্রাইকার পলিনকভ ও উজবেক মিডফিল্ডার ভ্লাদিমির, শ্রীলঙ্কান পাকির আলী ও প্রেমলাল, ইরাকি নজর আলী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

সবশেষে বলি, দর্শক ও ক্রীড়ামোদীরাই কোনো একটি খেলার প্রাণ। সমর্থকদের উন্মাদনা না থাকলে সে খেলাটি কিন্তু উৎকর্ষতা পায় না। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ফুটবলের সেই স্বর্ণযুগের সূর্য আজ অস্তমিত প্রায়। দেশের ক্রীড়ামোদীদের প্রথম প্রেম ফুটবল আবার প্রাণ ফিরে পাবে, আবারও ফুটবল স্টেডিয়াম কানায় কানায় পরিপূর্ণ হবে এটাই কামনা।

ট্যাক্সি চালকের অনর্গল ইংরেজি বলার দক্ষতা!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এই সংবাদটি পড়তে হলে আপনাকে ভুলে যেতে হবে শুধু শিক্ষিতরাই সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারেন! কারণ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায় এক ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীর সাথে অনর্গল ইংরজিতে কথা বলছেন।

ঘটনাটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রে ঘটেছে। দেশটির গণমাধ্যম এনডিতিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

এনডিটিভি বলছে, ওই ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীদের সাথে ইংরেজি কথা বলার পাশাপাশি কিভাবে আরও দক্ষ হওয়া যায় সে বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।

মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে ধারণ করা ভিডিওটি ভূষণ নামে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী শেয়ার করেছেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, "এমন ঘটনা দেখে আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পরে তার সাথে কথা বলার সময় কিছুটা তোতলা হয়েছিলাম। তার ইংরেজিতে সাবলীলতা দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।"

পরে তার সাথে এ নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ হলো।

ট্যাক্সি চালক বলেন, ইংরেজি শেখা থাকলে আপনি লন্ডন এবং প্যারিসের মতো উন্নত দেশে যেতে পারবেন। এটা বিশ্বব্যাপী ভাষা। এ কারণে ইংরেজি শেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিডিওটিতে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "তার কথা বলার ধরণ ডক্টর এপিজে আবদুল কালামের মতো শোনাচ্ছেন"।

অপর একজন লিখেছেন, "১৬ বছরের শিক্ষার পর তার ইংরেজি আমার চেয়ে অনেক ভালো।"

;

‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার মেঘনা নদীর দেখা মেলে চুনা নদীতে



মৃত্যুঞ্জয় রায়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সাতক্ষীরা
ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

  • Font increase
  • Font Decrease

মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।

আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।

গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকাল বেলা।

দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।

বাঁশবাগানে আধখানা চাঁদ
থাকবে ঝুলে একা।


ঝোপে ঝাড়ে বাতির মতো
জোনাক যাবে দেখা।

ধানের গন্ধ আনবে ডেকে
আমার ছেলেবেলা।

বসবে আবার দুচোখে জুড়ে
প্রজাপতির মেলা।

হঠাৎ আমি চমকে উঠি
হলদে পাখির ডাকে।

ইচ্ছে করে ছুটে বেড়াই
মেঘনা নদীর বাঁকে।

শত যুগের ঘন আঁধার
গাঁয়ে আজো আছে।

সেই আঁধারে মানুষগুলো
লড়াই করে বাঁচে।

মনে আমার ঝলসে ওঠে
একাত্তরের কথা,

পাখির ডানায় লিখেছিলাম-
প্রিয় স্বাধীনতা।

কবি শামসুর রাহমানের প্রিয় স্বাধীনতা কবিতার লাইনের সঙ্গে মিল রেখে বলতে হয়-

শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে থাকা মানুষগুলোর কথা।
চুনা নদী পাড়ি দেবো, ডিঙ্গি নৌকা দিয়া।

আবার আমি যাবো আমার উপকূলের গাঁয়ে।
কাজের জন্য ছুটে বেড়াই, চুনা নদীর বাঁকে।

বনে বাঘ, জলে কুমির আর ডাঙ্গায় লোনা পানির ক্ষত।
সেই চরের মানুষগুলো, এখনো লড়াই করে বাঁচে।

বর্ষাকালের দুপুর বেলা। আকাশে কালো মেঘ খেলা করছে! নদীতে পানি ঢেউ খেলছে! ভেসে আসছে, গেট থেকে জল আসার শব্দ। নদীর এপার ওপার হচ্ছেন ডিঙা নৌকা দিয়ে পাড়ে থাকা মানুষগুলো। ছুটে চলেছেন নারী-পুরুষ একে একে চুনা নদীর তীরে কাজের সন্ধানে। সন্ধ্যা হলেই দেখা মেলে বাড়ি ফেরার তাড়া। রাতের আঁধারে পশুপাখি, জীবজন্তু, পোকামাকড়ের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচেন এই চুনা নদীর পাড়ের মানুষগুলো।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে বসবাস নিত্যসংগ্রামী মানুষদের, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম


এখানকার মানুষজন লড়াই সংগ্রাম করে এখনো টিকে আছেন। টিকে থেকে তাদের রোজ কাজের সন্ধানে অবিরাম ছুটে চলতে হয়। বর্তমানে ভাঙাগড়ার জীবনে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যত নিয়ে বসবাস করছেন তারা। শ্যামনগর উপজেলার কলবাড়ি এলাকায় অবস্থিত চুনা নদীর চরটি। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারানো ২০-২৫টি জেলে পরিবারের ঠাঁই হয়েছে এখানে। বছরের পর বছর এই চরকে আগলে বসবাস করলেও সব সময় লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের।

তাদের একজন ৩৫ বছর বয়েসি রমেশ চন্দ্র মণ্ডল। দুর্যোগে সহায়-সম্পদ হারিয়ে আশ্রয় নেন চরের এক কোণে। সেখানে মাটির ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস তার। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও ভর করে থাকতে হয়, স্ত্রীর ওপর। তার কষ্টের বিনিময়ে জোটে তাদের একমুঠো ভাত। স্ত্রী একাই লড়াই সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তাদের নিয়ে এই চরে।

বনে পশুপাখির, জলে কুমির আর স্থলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে এভাবে তাদের জীবন প্রবহমান। তাদের জীবন চলার পথে নেই কোনো বিরাম। সংগ্রাম করে টিকে থাকেন সবাই। একে একে সব কিছু হারিয়েও এখানো টিকে থাকতে হয় তাদের।

রমেশের মতো একই অবস্থা ষাটোর্ধ্ব ফকির বিশ্বাসের। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও পেটের দায়ে কাজ করতে হয় তাকে। একবেলা কাজ করলে অপর বেলা কাটে অসুস্থতায়!

ফকির বিশ্বাস বার্তা২৪কমকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারিয়ে এই চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আশ্রয়ের দুই যুগ লড়াই সংগ্রাম করে টিকে থাকলেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। বরং প্রতিবছর ছোটবড় দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছি। লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে বারংবার!

জীবন কাটে যুদ্ধ করে, ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় পেতে...চুনা নদীর তীরের মানুষের জীবন, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম

চুনা নদীর চরে মাছের পোনা গুনতে দেখা যায় নমিতা রাণী রায়কে। নমিতা রাণী রায় বার্তা২৪.কমকে বলেন, স্বামী-সন্তান নিয়ে সবসময় চিন্তার ভেতরে থাকতে হয় আমাকে। নদীতে কুমির আর বনে বাঘের আতঙ্ক! তারপর ডাঙায় লোনা পানির ক্ষত। লবণাক্ততায় ভরা জীবনকাল। তারপর চরটি নদীর ধারে হওয়াতে একটু জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বসতবাড়ি। এই লড়াই-সংগ্রাম করেই বেঁচে আছি সেই প্রথম থেকে। মাছের পোনা বিক্রি করে চলে আমাদের সংসার। আমরা সবাই এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে টিকে আছি।

নমিতা রাণী রায় বলেন, যখন বসতবাড়ি নদীর পানিতে তলিয়ে যায়, তখন স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ওই সময় অনেক কষ্টে চর এলাকার সবার দিন কাটে। শিশু সন্তানদের সবসময় নজরে রাখতে হয়। অন্যথায় নদীতে পড়ে গিয়ে ঘটতে পারে ছোট-বড় দুর্ঘটনা!

নিত্যদিনের লড়াই-সংগ্রাম

লড়াই সংগ্রামের শেষ নেই উপকূলে থাকা মানুষজনের। সর্বশেষ, ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর আঘাতে নদীর জোয়ারের জলে তলিয়ে যায় তাদের বসতঘর। ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ বলে কথা না! যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জোয়ারের পানিতে তাদের বসতঘর তলিয়ে যায়। তখন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না তাদের। এমনও অনেক সময় গেছে যে, দিনের পর দিন উনুনে আগুন দিতে পারেননি তারা। ওই সময় শুকনো খাবার খেয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। এমনও দিন গেছে, যেদিন তাদের শুধুমাত্র পানি পান করে বেঁচে থাকার জন্য লড়তে হয়েছে।

ঘরছোঁয়া জলের বানের দিকে তাকিয়ে থাকেন চুনা নদীর তীরের মানুষজন আর ভাবেন আর কত সংগ্রাম, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়,বার্তা২৪.কম

সত্যি, তাদের ভাষ্যের সঙ্গে বড়ই মিল কবি শামসুর রাহমানের ‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার! ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাটা একটা বড় প্রশ্নেরই বটে! জঙ্গল, বন্যা, নদীভাঙনের সঙ্গে অবিরাম সংগ্রাম করে টিকে থাকা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আর অভাবে চরের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন। তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁধ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসসহ ঘূর্ণিঝড়। প্রতিবছর এসব দুর্যোগে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তারা। আবারও লড়াই-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার তাগিদে ঘুরেও দাঁড়ান তারা।

;

ব্রহ্মপুত্রের বানভাসি নারীদের দুঃখগাথা!



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

  • Font increase
  • Font Decrease

'খ্যাতা-কাপড় সইগ ভিজি গেইছে, পাক-সাকও (রান্না-বান্না) করতে পারি না। আমাদের দেখার মতো মানুষ নাই। স্বামীর জ্বর আসছে, ওষুধ ও নাই। বাচ্চা গুল্যাক সারাক্ষণ পাহারা দেওয়া নাগে। জ্বর নাগি আছে। যে ঘরত থাকি স্যাটে গরু ছাগলও থাকে। সারাদিন গরু ছাগলের ময়লা পরিষ্কার করতেই যায়। এই বানের পানিতও হামার বইসনা(অবসর) নাই’- কথাগুলো বলছিলেন রাবেয়া বেগম।

তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে। ১২ দিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গবাদিপশু রাখার উঁচু টিলায়।

অপরিচ্ছন্ন এই পরিবেশে শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন রাবেয়া বেগমের মেয়ে শাহানাজ বেগম।

শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন শাহানাজ বেগম, ছবি- বার্তা২৪.কম

শাহানাজ বেগম বলছিলেন, 'হামার তো কষ্ট! সংসার হামরা বান হইলেও সামলাই, খরা হইলেও সামলাই। নিজে কম খাইলেও বাচ্চাদের জন্য রান্না করতে হয়। বাচ্চাদের দেখাশোনা, গরু-ছাগলের দেখাশোনা করতে দিন কাটে। রাইতে পানি বাড়ে কি না দেখার জন্যে জাগি থাকা নাগে। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

শুধু এই দুই নারী-ই নন, কুড়িগ্রামের বানভাসি পরিবারগুলোর নারীদের চিত্র একই।

বন্যাকালীন কর্মহীন হয়ে পড়েন পুরুষেরা। দিনের অধিকাংশ সময় কেউ বাজারে কেউ বা নৌকায় বসে শুয়ে সময় কাটান। কিন্তু এই সংকট মুহূর্তে নারীদের ব্যস্ততা আরো বাড়ে এবং সংসারের কাজ করার প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে চর পার্বতীপুরে ৩০টির মতো পরিবারের বাস। সেখানের প্রায় সব বাড়িই পানির নিচে। সেখানে গেলে ওই চরের বাসিন্দা সামিনা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যায় ঘরের ভেতর একটি মাচার ওপরে।

দুপুর ২টায় দিনের প্রথম রান্না করছেন তিনি। বাইরে নৌকায় বসে সন্তানেরা অপেক্ষা করছেন কখন রান্না শেষ হবে!

সামিনা বেগম বলছিলেন, রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই, ছবি- বার্তা২৪.কম

সামিনা বেগম বলছিলেন, ‘রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই। খালি ভাত আন্দি নুন দিয়া খামো। স্বামীর কাম বন্ধ। তরকারি কেনার ট্যাকাও নাই। হামাক কি কাঈও কিছু দিব্যার নয়’!

একই চরের রেজিয়া বেগম নৌকায় বসে স্বামীর বাজার থেকে ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন। খাবার পানিও বাজার করে আনলে তবেই রান্না হবে।

রেজিয়া বেগম বলেন, সকালে পন্তা খাইছি। স্বামী ২শ টাকা নিয়া হাটে গেইছে। কী যে আনে! নিয়া আইসলে রান্না হবে। বাচ্চার অসুখ, সারাক্ষণ পাহারা দিয়্যা রাখতে হয়। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদন বলছে, রোববার (৭ জুলাই) বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার ৬০১ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত। সরকারি হিসাবেই প্লাবিত এলাকায় ৯৭ হাজার ৭৫০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। শনিবার থেকে রোববার পর্যন্ত একদিনের ব্যবধানে পানিবন্দি মানুষ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার।

এদিকে, পানিবন্দি মানুষের খাদ্যকষ্ট লাঘবে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। রোববার পর্যন্ত জেলার দুর্গত মানুষদের জন্য ৩৮৭ মেট্রিক টন চাল এবং ১৮ হাজার ৯৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘ধরলা ও দুধকুমারের পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেছে। সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের দিকে আমরা নজর দিয়েছি। মানুষের কষ্ট লাঘব করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, জেলায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে দুধকুমার ও ধরলা নদীও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

রোববার (৭ জুলাই) দুপুরে দেওয়া বার্তায় পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

তবে আগামী ৭২ ঘণ্টা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাসহ সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।

;

বিশ্ব চকলেট দিবস ২০২৪: চকলেটের ইতিহাস এবং প্রভাব



ড. মতিউর রহমান
ছবি: সংগৃহীত,  ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক চকোলেট দিবস

ছবি: সংগৃহীত, ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক চকোলেট দিবস

  • Font increase
  • Font Decrease

চকলেটের প্রতি মানুষের আকর্ষণ ও ভালোবাসা বহু প্রাচীন এবং বিস্তৃত। প্রাচীন মায়া সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের বিখ্যাত চকোলেটারিয়ার পর্যন্ত চকলেটের একটি সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময় ইতিহাস রয়েছে। চকলেট শুধুমাত্র স্বাদের কারণে নয়; এর ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ।

৭ জুলাই বিশ্ব চকলেট দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। এটি সেই দিনটির স্মৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যেদিন চকলেট প্রথম ইউরোপে এসেছিল। এই দিবসটি চকলেটপ্রেমীদের জন্য তাদের প্রিয় মিষ্টান্ন উপভোগ করার এবং এর ইতিহাস ও গুরুত্ব সম্পর্কে আরো জানার একটি সুযোগ।

চকলেটের উৎপত্তি প্রাচীন মেসোআমেরিকায়, যেখানে মায়ান এবং অ্যাজটেকরা কোকোগাছ থেকে চকলেট তৈরি করতেন। তারা কোকোবীজকে পিষে পানীয় তৈরি করতেন, যা বেশ তিতা ছিল এবং প্রায়ই মশলা দিয়ে মেশানো হতো। মায়ানরা চকলেটকে দেবতাদের উপহার হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং এটি ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো।

ইউরোপে চকলেট ধনী এবং রাজপরিবারের জন্য একটি বিলাসবহুল পানীয় হয়ে ওঠে, ছবি- সংগৃহীত


অ্যাজটেকরা কোকো বীজকে মুদ্রার মতো মূল্যবান বিবেচনা করতেন এবং এটি ধনী ও অভিজাতদের পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

১৫০০ শতকের শুরুর দিকে স্প্যানিশরা আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করার সময় চকলেটের সন্ধান পান। তারা চকলেটকে ইউরোপে নিয়ে আসেন এবং সেখানে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রাথমিকভাবে, চকলেট পানীয় হিসেবেই ব্যবহৃত হতো এবং এর তিতা স্বাদ মধু বা চিনি দিয়ে মিষ্টি করা হতো। ইউরোপে চকলেট ধনী এবং রাজপরিবারের জন্য একটি বিলাসবহুল পানীয় হয়ে ওঠে এবং এটি ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে চকলেটের উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হয়। ১৮২৮ সালে কোকো প্রেস আবিষ্কার করে কোকো বাটার এবং কোকো পাউডারকে পৃথক করা সম্ভব হয়, যা শক্ত চকলেট তৈরির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। ১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি ফ্রাই অ্যান্ড সন্স প্রথমবারের মতো খাওয়ার উপযোগী চকলেট বার তৈরি করে। এরপর থেকে, চকলেটের জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এটি বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন এবং স্ন্যাকসের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে।

১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি ফ্রাই অ্যান্ড সন্স প্রথমবারের মতো খাওয়ার উপযোগী চকলেট বার তৈরি করে, ছবি- সংগৃহীত


চকলেটের বিভিন্ন প্রকার এবং প্রস্তুত প্রণালী রয়েছে, যা বিভিন্ন স্বাদ এবং ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত।

ডার্ক চকলেট উচ্চ কোকো কনটেন্ট এবং কম চিনি দিয়ে তৈরি হয়, যার ফলে এটি একটি তিক্ত স্বাদ পায়। এতে সাধারণত ৫০ শতাংশ থেকে ৯৯ শতাংশ কোকো সলিডস থাকে। ডার্ক চকলেটের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণাবলী রয়েছে এবং এটি হার্টের স্বাস্থ্য, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং মেজাজ উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

মিল্ক চকলেট ডার্ক চকলেটের তুলনায় মিষ্টি এবং ক্রিমি। এটি কোকো সলিডস, কোকো বাটার, চিনি এবং দুধ বা দুধের পাউডার দিয়ে তৈরি হয়। মিল্ক চকলেটের সাধারণত ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ কোকো সলিডস থাকে এবং এটি বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন এবং স্ন্যাকসের জন্য জনপ্রিয় উপাদান।

হোয়াইট চকলেট কোকো সলিডস ছাড়া শুধুমাত্র কোকো বাটার, চিনি এবং দুধ বা দুধের পাউডার দিয়ে তৈরি হয়। এর ফলে এটি একটি মিষ্টি এবং ক্রিমি স্বাদ পায় এবং এটি সাধারণত ডার্ক এবং মিল্ক চকলেটের তুলনায় কম তিতা হয়।

যদিও হোয়াইট চকলেটের কোনো কোকো সলিডস নেই। এটি বিভিন্ন মিষ্টান্ন এবং বেকড পণ্যের জন্য একটি জনপ্রিয় উপাদান।

ডার্ক চকলেটের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফ্ল্যাভোনয়েডস হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। এটি রক্তচাপ কমাতে, রক্ত প্রবাহ উন্নত করতে এবং হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়মিত ডার্ক চকলেট গ্রহণ হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।

চকলেট মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। চকলেটের মধ্যে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং ক্যাফেইন মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি করতে এবং মানসিক সক্রিয়তা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়মিত চকলেট গ্রহণ বয়সজনিত মস্তিষ্কের অবক্ষয় কমাতে সহায়ক হতে পারে।

চকলেট মেজাজ উন্নত করতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। চকলেটের মধ্যে থাকা থিওব্রোমাইন এবং ফেনাইলএথাইলামিন মস্তিষ্কের সুখানুভূতি সৃষ্টিকারী হরমোনের উত্পাদন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে এবং হতাশা ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

চকলেটশিল্প একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে; বিশেষ করে কোকো উৎপাদনকারী দেশগুলির জন্য। কোকো চাষ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যকলাপ।

কোকোগাছ প্রধানত পশ্চিম আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশে চাষ করা হয়। আইভরি কোস্ট, ঘানা এবং ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম কোকো উৎপাদক দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। কোকো চাষ প্রায় ৫০ লাখ কৃষক এবং তাদের পরিবারকে জীবিকা-নির্বাহের সুযোগ প্রদান করে।

চকলেটশিল্প একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য কার্যকলাপ এবং এটি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শিল্প, ছবি- সংগৃহীত


চকলেটশিল্প একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য কার্যকলাপ এবং এটি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শিল্প। কোকো উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ এবং চকলেট উৎপাদন এবং বিপণনের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ মানুষ এই শিল্পে কাজ করেন।

চকলেটশিল্পের অর্থনৈতিক প্রভাব কোকো উৎপাদক দেশগুলির জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গঠন করে।

চকলেটের একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে, যা বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য এবং রীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশ্বজুড়ে চকলেট উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে চকলেটপ্রেমীরা একত্রিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের চকলেট উপভোগ করেন। এই উৎসবগুলি চকলেটশিল্পের উদ্ভাবন এবং নতুন পণ্যগুলি প্রদর্শনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে।

বিভিন্ন দেশে চকলেটের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ঐতিহ্য এবং রীতিনীতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সুইজারল্যান্ড এবং বেলজিয়াম চকলেট তৈরির জন্য বিখ্যাত এবং তাদের নিজস্ব বিশেষ ধরনের চকলেট রয়েছে। মেক্সিকোতে চকলেট প্রাচীন ঐতিহ্য এবং উৎসবের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

চকলেটের মিষ্টি স্বাদ এবং আকর্ষণীয় বুনন সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

একসময় বিদেশি মিষ্টান্ন হিসেবে পরিচিত এই খাদ্যবস্তুটি এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সহজলভ্য এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চকলেটের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন কারণ। যেমন, বৈশ্বিকরণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং তরুণ প্রজন্মের পছন্দের পরিবর্তন।

চকলেটের প্রাথমিক প্রচলন বাংলাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে শুরু হলেও, তা ছিল সীমিত পরিসরে এবং মূলত ধনী ও অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বৈশ্বিকরণের ফলে বাংলাদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের চকলেট সহজলভ্য হয়েছে, ছবি- সংগৃহীত


স্বাধীনতার পর, বিশেষত ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে, বাংলাদেশের অর্থনীতি উম্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির কারণে চকলেটের আমদানি বাড়তে থাকে। তখন থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের চকলেট দেশের বাজারে প্রবেশ করতে শুরু করে।

প্রথমদিকে চকলেটের বেশিরভাগই আমদানি করা হলেও, ধীরে ধীরে বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে চকলেট উৎপাদন শুরু হয়। স্থানীয় চকলেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের বাজার তৈরি করতে শুরু করে এবং বিভিন্ন ধরনের চকলেট বাজারে আনে।

তাদের মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান উচ্চমানের চকলেট উৎপাদন করতে সক্ষম হয় এবং তারা দেশের মানুষের মধ্যে চকলেটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিলাসী খাদ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। শহুরে এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং তাদের খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা চকলেটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

বৈশ্বিকরণের ফলে বাংলাদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের চকলেট সহজলভ্য হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিদেশি ব্র্যান্ডের চকলেটের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এগুলি শুধুমাত্র সুস্বাদুই নয়, উপহারের জন্যও জনপ্রিয়।

বাংলাদেশি সমাজে খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। উৎসব এবং বিশেষ অনুষ্ঠানে চকলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। যেমন- ঈদ, জন্মদিন এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে চকলেটের উপস্থিতি প্রায় আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। এটি শুধু একটি মিষ্টান্নই নয়, বরং সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকমানের প্রতীকও হয়ে উঠেছে।

চকলেটের মধ্যে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানগুলি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা প্রদান করতে পারে। যেমন- হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করা। তবে, অতিরিক্ত চকলেট গ্রহণ ওজন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। সে কারণে পরিমিত মাত্রায় গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের স্থানীয় চকলেটশিল্প ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। স্থানীয় চকলেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং দেশের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনছে। এছাড়া, চকলেট আমদানি এবং বিক্রয় দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও সহায়ক।

চকলেটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। চকলেট এখন শুধুমাত্র খাদ্যই নয়, এটি ‘বন্ধুত্ব’ এবং ‘আন্তরিকতার প্রতীক’ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। চকলেট উপহার দেওয়া এবং গ্রহণ করা একটি সাধারণ সামাজিক রীতি হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশি সমাজে চকলেটের প্রচলন এবং জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিকরণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারণে চকলেট এখন দেশের মানুষের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। স্থানীয় চকলেটশিল্পের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের উপস্থিতি চকলেটের চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। চকলেট শুধু একটি মিষ্টান্নই নয়, এটি এখন একটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক, যা মানুষের জীবনে আনন্দ এবং সুখ এনে দেয়।

বিশ্ব চকলেট দিবস-২০২৪ চকলেটের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যগুণ এবং অর্থনৈতিক প্রভাবকে উদযাপন করার একটি দুর্দান্ত সুযোগ প্রদান করে। চকলেট একটি প্রিয় মিষ্টান্ন, যা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।

এই বিশেষ দিনটি চকলেটপ্রেমীদের জন্য তাদের প্রিয় মিষ্টান্ন উপভোগ করার এবং এর ইতিহাস ও গুরুত্ব সম্পর্কে আরো জানার একটি উপলক্ষ। চকলেটের বৈচিত্র্যময় ইতিহাস এবং প্রভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এটি শুধুমাত্র একটি মিষ্টান্নই নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পদ, যা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী, মেইল: matiurrahman588@gmail.com

;