হেমন্তের বিষন্ন কবি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

২২ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে, জীবনানন্দ দাশ হেমন্তের এমনই এক বিষন্ন দিনে চলে গিয়েছিলেন। বেদনার কাব্যভাষায় সঞ্চারিত করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের।

ধানসিঁড়ি নদীর জনপদ বরিশালে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ সালে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম তিনি।

একই বছর জন্ম নিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ। তার প্রথম কাব্যে নজরুলের প্রভাব থাকলেও দ্বিতীয় কাব্য থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন মৌলিক ও ভিন্ন পথের অনুসন্ধানী। ক্রমেই তিনি লাভ করেন জনপ্রিয়তা। ১৯৯৯ সালে তার জন্মশতবার্ষিকী পেরিয়ে এখনও তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবিদের একজন।

তাকে বলা হয় রূপসী বাংলার কবি। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ ও রূপকথা-পুরাণের জগৎ জীবনানন্দের কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়তায়। অনেকে তাকে বলেন, 'নির্জনতম কবি'। তাকে ডাকা হয় ‘শুদ্ধতম কবি’ এবং 'হেমন্তের বিষন্ন' কবি অভিধায়।

সমালোচকগণ, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি বলে মনে করেন। জীবনানন্দের বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলনে পুরস্কৃত (১৯৫৩) হয়। ১৯৫৫ সালে শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থটি ভারত সরকারের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করে। তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মাঝে রয়েছে 'রূপসী বাংলা', 'বনলতা সেন', 'মহাপৃথিবী', 'বেলা অবেলা কালবেলা' ইত্যাদি।

জীবনানন্দ দাশ প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ২১টি উপন্যাস এবং ১২৬টি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন যার একটিও তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। জনপ্রিয় হয়েও তিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে  দিনাতিপাত করেছেন।

কলকাতার রাজপথে ট্রামের ধাতব তলায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সময় জীবনানন্দ দাশ তার বিশাল কাব্যভাণ্ডারের সঙ্গে সঙ্গে রেখে গেছেন করুণ জীবনের পুঞ্জিভূত বেদনা আর প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস। তার কবিতায় গুঞ্জরিত হয় সেই বিষাদের ধ্বনিমালা:

'যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়/যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে-ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে/যখন চড়াই পাখি কাঁঠালীচাপাঁর নীড়ে ঠোটঁ আছে গুজে/যখন হলুদ পাতা মিশিতেছে খয়েরী পাতায়/যখন পুকুরে হাঁস সোঁদা জলে শিশিরের গন্ধ শুধু পায়/শামুক গুগলিগুলো পড়ে আছে শ্যাওলার মলিন সবুজে-।'