কবি এবং চলচ্চিত্রকার



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (১৯৪৪-২০২১)

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (১৯৪৪-২০২১)

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৮ সালে ‘দূরত্ব’ ছবি দিয়ে পথচলা শুরু বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে (১৯৪৪-২০২১) ঢাকায় দেখেছিলাম কোনও এক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে। তাঁর কবিতাও পড়েছি। কবি ও চলচ্চিত্রকারের ‘বাঘ বাহাদুর’ (১৯৮৯), ‘তাহাদের কথা’ (১৯৯২), ‘চরাচর’ (১৯৯৩), ‘উত্তরা’ (২০০০) দেখেছি। 'তাহাদের কথা' এখনও মনে গেঁথে আছে। তাঁর কবিতার মতোই ছবিগুলোও চিত্রময়তায় আচ্ছন্ন করেছে। যেন সিনেমার মধ্যে ঢুকে পড়লে কাব্যময়তায় হারিয়ে যাচ্ছি। দর্শকদের অবাক করেছে তাঁর সিনেমার অদ্ভুত সব দৃশ্য। পরিচালক বলতেন, 'এইসব আসলে তাঁরই ছেলেবেলার স্মৃতি থেকে  সংগ্রহ করে আনা দৃশ্য।'

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় জন্ম হলেও বুদ্ধদেব দেশভাগের পর তাঁর মামাদের সঙ্গে উঠে এসেছিলেন দক্ষিণ কলকাতার হাজরা রোডে। তখনও সেখানে গরুর গাড়ি চলত। সকালে ফিরিওয়ালার হাঁকে ঘুম ভাঙত মানুষের। পরে এইসব দৃশ্যই বারবার উঠে এসেছে তাঁর সিনেমায়। কবিতাতেও। 'গভীর আড়ালে', 'কফিন কিম্বা স্যুটকেস' সবই তো সেই দৃশ্যকল্পের রচনা। একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন,

"বুড়ো ঘোড়া জানলার পাট খুলে / ঘরের ভেতর উঁকি মারে, দ্যাখে / তার মাদী ঘোড়া কাদা হয়ে গ্যাছে / কাল ঘুমে।"

তিনি বলতেন, 'ছবি আঁকতে পারেন না বলেই কবিতায় বা সিনেমায় দৃশ্য তৈরি করেন।' আর এই সমস্ত দৃশ্যই একেবারে তাঁর নিজস্ব। সবই যে তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতি।

জন্মস্থান দক্ষিণ পুরুলিয়ার আনারা গ্রামের দৃশ্যাবলীও তাঁকে আবৃত করে রেখেছে জীবনভর। সেখানকার রেলের কোয়ার্টারে বাবা ছিলেন ডাক্তার। এরপর বাবার কাজের সূত্রে ঘুরতে হয়েছে নানা জায়গায়। খড়গপুর থেকে বিন্ধ্যপর্বতের মনীন্দ্রগড় পর্যন্ত দেখেছেন শৈশবের চোখ দিয়েই। লক্ষ করেছেন ভৌগলিক দূরত্ব কীভাবে মানুষের জীবন, ভাষা, সংস্কৃতির পার্থক্য ঘটিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রে সেই রূপান্তরকে দৃশ্যায়িত করেছেন কাব্যিক ব্যাঞ্জনায়।আমাদের অতি কাছের অথচ অচেনা সব দৃশ্যকে এক অদ্ভুত কায়দায় সিনেমার পর্দায় তুলে আনতে পারতেন তিনি।

সিনেমার সঙ্গে যোগাযোগ কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময়। অর্থনীতির ছাত্র হয়েও তখন প্রায়ই পৌঁছে যেতেন ‘কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি’-তে। সেখানে তখন চাঁদের হাট। ঋত্বিক, সত্যজিৎ, মৃণালদের নিয়মিত যাওয়া আসা। সেখানে বসেই দেখেছেন লুই ব্যুনুয়েল বা বার্গম্যানের সিনেমাও। ব্যুনয়েলের চিত্রকল্প ও রূপক নির্মাণ গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল তাঁকে।

সারা জীবনে চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য পেয়েছেন অসংখ্য সম্মান। দ্বিতীয় ছবি ‘বাঘ বাহাদুর’-ই জাতীয় পুরস্কারের আসরে সেরা চলচ্চিত্রের শিরোপা তুলে নেয়। ‘উত্তরা’ও ‘স্বপ্নের দিন’-এর জন্য পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান। পাশাপাশি দেশবিদেশের নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ভেনিস, বার্লিন, লোকার্নোর মতো চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স অ্যান্ড সায়েন্স বা অস্কারের বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের বিশেষ তথ্যপঞ্জিতেও নথিভুক্ত হয়েছে তাঁর জীবন।

কিন্তু বিদেশের মাটিতে যতটা সম্মান পেয়েছেন, বাঙালি দর্শকের কাছে সেভাবে পৌঁছয়নি তাঁর সিনেমা। তার জন্য অবশ্য আক্ষেপ করেননি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। ২০১৯ সালে ‘উড়োজাহাজ’ সিনেমাটি অবশ্য কলকাতার বেশ কিছু প্রেক্ষাগৃহে জায়গা পায়। হয়তো কোনোদিন পুরনো রিল খুঁজে বাঙালি দর্শক আবারও ফিরে দেখবেন তাঁর সিনেমা।

শুধুই চলচ্চিত্র পরিচালক নন। পাশাপাশি লিখেছেন অসংখ্য কবিতাও। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, ভাস্কর চক্রবর্তীর হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে গদ্য-কবিতার একটা নতুন যুগ শুরু হয়েছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, 'তাঁর কবিতা পড়ে অনেকেই বলেছেন বুদ্ধদেব নতুন ধারার কবিতা লেখে বটে। কিন্তু যখন সিনেমা বানাতে শুরু করলেন, তখনই এসে পড়ল ঋত্বিক ঘটক বা সত্যজিৎ রায়ের তুলনা।' যদিও নির্মাণশৈলী থেকে কাহিনি নির্মাণ, সবকিছুতেই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। অগ্রজদের প্রভাব যে পড়েনি তা নয়। কিন্তু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সবসময় চেয়েছেন, তাঁর সিনেমার ভাষা হবে সম্পূর্ণ নিজস্ব, তাঁর কবিতার মতোই।

এক সাক্ষাৎকারে বুদ্ধদেব বলেছিলেন, 'আমি প্রেমে ডুবে থাকা এক মানুষ।' দাবি করেছিলেন, 'প্রকৃত শিল্পের কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না।' তাঁর নির্মিত ছবিতে সেই চিরকালীন শিল্পকে কাল-কালান্তরের দর্শকরা খুঁজে পাবেন। কবিতায় পাবেন প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এক কবিকেও।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মৃত্যুতে ফরাসি ভাষাবিদ, বিদগ্ধ অধ্যাপক চিন্ময় গুহ সংক্ষিপ্ততম, শোকজর্জর উক্তি করেছেন। সেটাই মর্মরিত হচ্ছে, 'ছবিতে কবিতা লিখেছিলেন। আত্মবিক্রয় করেন নি।'