পাওলো কোয়েলহোর ‘মাকতুব’



শেখ বিবি কাউছার
পাওলো কোয়েলহোর ‘মাকতুব’

পাওলো কোয়েলহোর ‘মাকতুব’

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা যাই করি না কেন আমাদের প্রতিটি কাজে যেন ভালো মানুষের প্রতিচ্ছবি থাকে। কারণ উচ্চ শিক্ষিত হলাম কিন্তু ভালো ও সৎ মানুষ হতে পারলাম না তাহলে তো সব শিক্ষা নিমেষেই বৃথা।

তাই একজন পরিপূর্ণ ভালো মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন একজন সদগুরুর। গুরুর আধুনিক শব্দ ‘মেন্টর’ও বলা যায়। বিশ্ববিখ্যাত ব্রাজিলিয় লেখক পাওলো কোয়েলহোর ‘মাকতুব’ গ্রন্থটি এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।

‘মাকতুব’ শব্দটির অর্থ 'যা লেখা হয়েছে'। অর্থাৎ ভাগ্য। এর মাধ্যমে কেউ কেউ এমনও বুঝতে পারেন যে, আল্লাহ সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন, ফলে বান্দার কিছুই করার নেই। বাস্তবতা কিন্তু তা নয়। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে একটি বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন, যা অন্য প্রাণীদের দেন নি। সেটি হলো ভালো-মন্দের বিচার করার ক্ষমতা। তবে, অজ্ঞতাবশত অধিকাংশ মানুষ কোনো কিছুর জন্য অন্ধভাবে ভাগ্যকে দোষারোপ করে। কিন্তু এ কথা মনে রাখা উচিত যে, আমরা কতবার হোঁচট খেয়েছি সেটি বড় কথা নয়, আমরা কতবার উঠে দাঁড়িয়েছি এবং তারপর কতবার এগিয়ে চলেছি, সেটাই বড় কথা। আর এই প্রচেষ্টার উপরও আমাদের ভাগ্য বহুলাংশে নির্ধারিত হয়। সৃষ্টিকর্তা ভাগ্য লিখেছেন আমাদের জন্মের সাথে সাথেই। কিন্তু কেউ যদি তার মেধা, শ্রম, সততা দিয়ে ভাগ্য ফেরাতে চান তাহলে সৃষ্টিকর্তা তাঁকে অবশ্যই সাহায্য করেন।

এইসব বিষয়ে 'মাকতুব’ বইটির গল্পগুলো অত্যন্ত ছোট কিন্তু গোছানো। প্রতিটি গল্পই নিয়ে যাবে একটি ভাবনার জগতে। পড়তে পড়তে চিন্তামগ্ন হতেই হবে। কোনো কোনো গল্প মনে ব্যাকুলতা সৃষ্টি করতে পারে। আবার কোনো গল্প চমকিত করে তুলবে নতুন কিছু ধারণা পাওয়ার আনন্দে। পাওলো কোয়েলহোর বিশ্বখ্যাত ‘দ্য আলকেমিস্ট’ বইটির মতো এই বইটিতেও রয়েছে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া। বইটির গল্পগুলো মূলত গুরু-শিষ্যের কথোপকথনের মাধ্যমেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তারমধ্যে কয়েকটি কোয়েলহোর নিজস্ব সৃষ্টি। বাকিগুলো সারা পৃথিবীর গল্প ভান্ডার, লোককাহিনী থেকে সংগ্রহ করা।

গল্পে গুরু যেন তার শিষ্যকে প্রকৃতির মাঝেই শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। যেমন-

শিষ্য তার গুরুকে বলছেন, 'আমি দিনের বেশির ভাগ ব্যয় করি এমন সব চিন্তা করে, যেগুলো করা উচিত নয়, এমন সব করে, এমন সব জিনিস কামনা করি বা পরিকল্পনা করি যেগুলো করা উচিত নয়।'

তারপর গুরু শিষ্যকে তার বাড়ির পেছনে থাকা বনে নিয়ে গেলেন বেড়াতে। চলতে চলতে তিনি একটি গাছ দেখিয়ে শিষ্যকে জিজ্ঞেস করেন, সে গাছটি চেনে কিনা। শিষ্য জবাব দিলেন চেনে। এটি ছিল একটি বিষাক্ত গাছ। তাই শিষ্য গুরুকে বললেন, ‘এর পাতা যে কাউকে মেরে ফেলতে পারে।’ গুরু তখন বললেন, 'কিন্তু যে এই পাতার দিকে কেবল তাকায়, তাকে সে হত্যা করতে পারে না।'

অর্থাৎ গুরু এখানে শিষ্যকে বোঝাতে চাইলে যে, ‘একইভাবে নেতিবাচক আকাঙ্ক্ষাগুলো কোনোই ক্ষতি করতে পারে না, যদি তুমি তোমাকে বশীভূত করতে না দাও সেগুলোকে।'

এই গল্পের মধ্যে লেখকের বার্তাটি হলো, কোনো মানুষই ষড়রিপুর (কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, হিংসা, মাংস) ঊর্ধ্বে নেই। কিন্তু এখানে একজন সদগুরুর কাজ হলো তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমে শিষ্যকে ষড়রিপু থেকে বের করে স্রষ্টামুখী করে তোলা। গুরুর মানে হলো, পিতামাতা, শিক্ষক, বন্ধু, প্রেমিক। তিনি পিতামাতার মতো আদর, স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা, শিক্ষকের মতো শিক্ষাদান, বন্ধুর মতো বন্ধুসুলভ আচরণ, প্রেমিকের মতো প্রেম বিলিয়ে অকাতরে জ্ঞান ও করুণার মাধ্যমে পরিপূর্ণ মানবে পরিণত করেন। আর শিষ্যের কাজ হলো ভক্তি, বিশ্বাস, বিনয় ও আদবের সাথে গুরুকে অনুসরণ করা। তাই শুধু একাডেমি বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই ভালো মানুষ হওয়া যায় না, ভালো মানুষ হতে হলে সদগুরুর সান্নিধ্য লাগে। বইটিতে তেমনই কিছু শিক্ষণীয় গল্পে এসব আধ্যাত্মের আস্বাদ পাওয়া যায়।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, 'সাহসিকতার সাথে তোমার পথে লড়াই করো, অন্যদের সমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে স্থবিরে পরিণত করার সুযোগ দেবে না।' গুরু শিষ্যকে বলছেন। আসলেই গুরু মানে, যিনি অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। যেমন বলেন, 'ঈশ্বর কখনো তোমার মাথায় প্রবেশ করবেন না। তিনি যে দরজা ব্যবহার করেন, সেটি হলো তোমার হৃদয়।' এভাবে গুরু প্রতিনিয়ত শিখিয়ে যাচ্ছেন শিষ্যকে। কখনো প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে আবার কখনো বিভিন্ন উপমা ব্যবহার করে।

সৃষ্টির মাঝে সেরা হলো মানুষ। তাই মানুষের মনের ভেতর বিরাজ করেন সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ দেখতে পাই পবিত্র আল কোরআনুল কারিমায়। আল্লাহ বলেন, 'আমি তোমার শাহারগের (মূল ধমনি) নিকটেই আছি।' আরও বলা হয়েছে, 'আমি তোমার নফসের সঙ্গেই মিশে আছি।' পবিত্র হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া,সাল্লাম বলেছেন, 'মোমিনের হৃদয়ে আল্লাহ আরশ, যে নিজেকে চিনেছে, সে প্রভুকে চিনেছে।'

তাই আমাদের অন্তর বা হৃদয়কে পবিত্র রাখতে হলে সদগুরুবাদী দীক্ষা প্রয়োজন। কারণ মহান সৃষ্টিকর্তা পবিত্র। আর যে অন্তর বা হৃদয় পবিত্র সেখানেই কেবল মহান পবিত্রসত্তা অধিষ্ঠিত হতে পারেন।

'লেখো! লেখার মাধ্যমেই তুমি ঈশ্বর ও অন্যদের আরো কাছাকাছি হতে পারবে, তুমি যদি দুনিয়ায় তোমার ভূমিকা আরো ভালোভাবে জানতে চাও, তবে লেখো। তোমার আত্মাকে লেখায় নিয়োজিত করো, এমনকি কেউ যদি তোমার লেখা নাও পড়ে, তবুও লেখো। কাগজ-কলম জাদুর মতো কাজ করে। এগুলো যন্ত্রণা দূর করে, স্বপ্নকে সত্য করে, হারিয়ে যাওয়া আমাকে জাগিয়ে তোলে। কথার আছে শক্তি।' বইটির প্রেরণাদায়ক শক্তি এসব উক্তিতে নিগিত।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি উক্ত কথাগুলো যারা লেখালেখির সাথে যুক্ত তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে আসবে। এই বইয়েই গুরু আরে বলেন, 'কথা হল শক্তি। কথাই বিশ্বকে বদলে দেয়। মানুষকেও বদলে দেয়।'

আমি যদি ইতিবাচক কথা প্রকাশ করি, তবে তা আরো বেশি ইতিবাচক শক্তিকে আকৃষ্ট করব। যারা সত্যি আমার কল্যাণ চায়, তারা খুশি হবে। আর যারা কল্যাণ চায় না, তাদের কাছে যদি ইতিবাচক কথা প্রকাশ করি, তারা কেবল হিংসাই প্রকাশ করবে। এজন্য গুরু বলেন, 'তবে ভয় পেয়ো না। যারা শুনতে চায় তাদেরকে তোমার জীবনের ভালো ভালো বিষয় বলো। তোমার সুখের বিরাট প্রয়োজন রয়েছে বিশ্বের আত্মার।'

ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে গুরু বলেন, 'আমাদের সবার প্রয়োজন ভালোবাসার। কারণ এটি মানব প্রকৃতির অংশবিশেষ। খাওয়া, পান করা ও ঘুমানোর মতো এটি।' গুরু বুঝাতে চেয়েছেন, ভালোবাসা ছাড়া একাকী সুন্দর সূর্যাস্ত দেখাও তখন গুরুত্বহীন মনে হয়। কারণ পাশে এমন কেউ নেই যার সাথে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।'

এজন্য গল্পের ছলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, 'একাকিত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকো। এটি সবচেয়ে বিপদজ্জনক মাদকের মতোই আসক্তি সৃষ্টিকারী। সূর্যাস্ত যদি তোমার মধ্যে আর কোনো অনুভূতি সৃষ্টি না করে, তবে বিনীত হও, ভালোবাসার সন্ধান করো। আর জেনে রাখো, অন্যান্য আধ্যাত্মিক আশীর্বাদের মতো একে যত তুমি দিতে আগ্রহী থাকবে, বিনিময়ে তত বেশি পাবে।'

আরও বলা হয়েছে জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে। আপনি যদি জীবিত থাকেন, তবে আপনাকে হাত দোলাতে হবে, চারপাশে ঝাঁপ দিতে হবে, গোলমাল করতে হবে, হাসতে হবে, লোকজনের সাথে কথা বলতে হবে । কারণ, জীবন হলো মৃত্যুর ঠিক বিপরীত। মৃত লোক চিরদিন একই অবস্থায় থাকে। কিন্তু আপনি যদি খুবই শান্ত থাকেন, তবে বুঝতে হবে আপনি জীবিত নন। মানুষ কর্মের মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকে, সে কর্ম হয় সৎকর্ম। এ কারণেই গুরুবাদীরা মনে করেন কর্মগুণেই মানুষ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। তাই গুরুবাদী শিক্ষাটাও কর্মভিত্তিক।

পাওলো কোয়েলহোর এই বইটি পড়তে পড়তে তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বই ‘আলকেমিস্ট’ কথা মনে করিয়ে দিবে পাঠকে। সাথে সদগুরুর প্রয়োজনটিও অনুভব করবেন পাঠক। গুরুত্বপূর্ণ বইটির অনুবাদক মোহাম্মদ হাসান শরীফ আর প্রকাশক অন্যধারা। তিনি অত্যন্ত সহজ, সরল ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন 'মাকতুব'-এর কথাগুলি। যা চমৎকার একটি বিষয়ে পাঠকে পড়ার আগ্রহ জাগাতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে।

শেখ বিবি কাউছার, প্রভাষক, নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম।

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;