না ফেরার দেশে প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ



ড. মহীবুল আজিজ, অতিথি লেখক
প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ

প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ

  • Font increase
  • Font Decrease

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়ের সহকর্মী প্রফেসর ড. আনোয়ার সাঈদ একটু আগেই জানালেন, বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যে সাতটায় চট্টগামের ইম্পেরিয়্যাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সমাজসেবী, বিদ্যোৎসাহী, প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। তিনি স্বনামেই খ্যাত যদিও তাঁর পারিবারিক পটভূমিটি এতদঞ্চলেই শুধু নয়, দেশব্যাপী বিশেষ পরিচিত।

তাঁর পিতা শহিদ নূতন চন্দ্র সিংহের অসাধারণ শিক্ষাব্রত, সমাজসেবা এবং মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় আত্মদানের কথা সর্বজনবিদিত। পিতা নূতন সিংহের উত্তরাধিকারটি সগর্বে এতকাল বয়ে এসেছিলেন তিনি। নূতন সিংহ প্রতিষ্ঠিত কুণ্ডেশ্বরী বিদ্যামন্দির, কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় এবং আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের সুযোগ্য পরিচালনা তাঁরই নেতৃত্বে হয়ে আসছিল। পিতার সমাজকর্মকে আরও সুপরিসর ও বহুমাত্রিক করে গড়ে তুলবার পেছনে তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

তাঁর সর্বাগ্রজ চিত্ত সিংহ ছিলেন বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক। তার উপন্যাস ‘ঋতুপুত্র’ ‘জতুগৃহ’ ‘ঈশ্বর পাটনী’ ‘বারোমাস্যা’ ‘বেহুলা’ বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি কবিতা, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ, গান ইত্যাদিও রচনা করেছিলেন।

তাঁর মধ্যমাগ্রজ সত্য সিংহও আপন কর্মে খ্যাত। সমাজসেবার মাধ্যমে চট্টগ্রামে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন তিনিও। পিতা নূতন সিংহের পবিত্র স্মৃতির স্মরণে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শহীদ নূতন সিংহ স্মৃতি সংসদ।

বিভিন্ন সময়ে কুণ্ডেশ্বরী বিদ্যামন্দিরের আঙ্গিনায় আয়োজন করা হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়, শহিদ নূতন সিংহের জন্ম ও শহীদ-দিবসের অনুষ্ঠানগুলোর কথা। প্রতিটি অনুষ্ঠানে দেশের মনন ও মনীষাবাহী, মেধাবী ব্যক্তিত্বকে সম্মান প্রদর্শনের এক বিরল নজীর স্থাপন করেছে স্মৃতি সংসদ।

বলাবাহুল্য এসবকিছুর পেছনে ছিল প্রফুল্ল সিংহের একনিষ্ঠ ত্যাগ ও সাংগঠনিকতা। তাঁর এলাকার ঘরে-ঘরে আমরা শুনেছি প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহের পরোপকারিতা এবং তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক সামাজিক তৎপরতার কাহিনি। দরিদ্র-সুবিধাঞ্চিত-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত শিক্ষাসহায়ক বৃত্তি ও প্রণোদনা দিয়ে ঘরে ঘরে শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলবার অধ্যবসায়ে নিয়োজিত ছিলেন তিনি।

তাঁর মৃত্যুতে এসব কর্মকাণ্ড একটা বড় রকমের ধাক্কা খেলো। আমাদের আশা, তাঁর সন্তান এবং তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতার স্বাক্ষর উত্তর-প্রজন্মের সদস্যরা নিশ্চয়ই তাঁর অনুপ্রেরণাকে পথের সঞ্চয় মেনে এগিয়ে যাবেন সামনে।

যখনই কুণ্ডেশ্বরী গিয়েছি তখনই পেয়েছি তাঁর সান্নিধ্য। কাজে ব্যস্ত থাকলেও হাসিমুখে সময় দিয়েছেন। পিতার স্মৃতিচারণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন। ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছেন তাঁর পিতা শহিদ নূতন চন্দ্র সিংহের স্মৃতিবিজড়িত নানা অনুষঙ্গ।

সকলের প্রিয় প্রফুল্ল বাবু আর নেই, একথা মানতে খুবই কষ্ট হয়। ভাবতেই পারছি না, আমরা দলবেঁধে সবাই চলেছি কুণ্ডেশ্বরীতে, আর গেটের সামনে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে, প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ। তীব্র রোদে ঘেমে নেয়ে একাকার হলেও আমাদের স্বাগত জানাতে মুখের হাসিটি তিনি বিসর্জন দেন না। আর কোনদিন বলবেন না তিনি, আসুন, আপনারা, ভেতরে আসুন।