তেলজাত ফসল ‘পেরিলা’ চাষে সাফল্যের হাতছানি



শেকৃবি করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশে তেলজাত ফসল ‘পেরিলা’ চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক। ফলে বাণিজ্যিকভাবে ‘সাউ পেরিলা-১’ চাষে উৎসাহ দেখিয়েছে কয়েকটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘লাল-তীর’কে এর বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা অধিকাংশই আমদানি নির্ভর। প্রতি বছরের চাহিদা ৫১ দশমিক ২৭ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে প্রায় ৪৬ দশমিক ২১ লাখ মেট্রিক টন তেল আমদানি করা হয়। বাকিটা দেশে উৎপাদন করা হয়ে থাকে।

গবেষকরা আশা করছেন, দেশে নতুন ভোজ্য তেল সাউ-পেরিলার চাষ সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন আসবে। এটি বাংলাদেশের তেল বাজারের আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশেই কমাতে সক্ষম হবে।

`সাউ-পেরিলা’ বাংলাদেশে উচ্চ ফলনশীল ও পুষ্টি সমৃদ্ধ আবহাওয়ায় অভিযোজন সম্পন্ন নতুন এক তেলজাত ফসলের নাম। বাংলাদেশ বাদে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া তথা দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন, নেপাল, ভিয়েতনাম এবং ভারতের কিছু অঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে পেরিলা চাষ হয়ে আসছে। এটি Lamiaceae (Mint Crop) পরিবারের ফসল। বৈজ্ঞানিক নাম Perilla frutescens। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এ ফসলের সফল অভিযোজন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক।

দেশে তেলজাত ফসল ‘পেরিলা’ চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক

জানা গেছে, শরীরের জন্য উপকারি এ তেলে নেই কোনো ক্ষতিকারক ইউরিক এসিড। তাছাড়াও দেশীয় পদ্ধতিতেও আহরণ করা যাবে তেল। মানের দিক থেকে উচ্চতর হওয়াই আমদানি করা বিভিন্ন উচ্চমূল্যের তেলের বিপরীতে দেশে উৎপাদিত তেলটির প্রাধান্যই বেশি থাকবে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের।

এ বছরই বাণিজ্যকভাবে বড় পরিসরে চাষাবাদ শুরু হতে যাচ্ছে দেশে অভিযোজিত নতুন এ সম্ভাবনাময় তেলজাত ফসল সাউ পেরিলা-১। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ তেলটি দেশের তেলের ঘাটতি কমিয়ে আনার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে যথেষ্ঠ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

জানা গেছে, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ. এম. এম. তারিক হোসেন ২০০৭ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগ্রহ করা জাতটি নিয়ে দেশে গবেষণা শুরু করেন। খরিপ-২ মৌসুমে অভিযোজিত ফসলটি সম্পর্কে তিনি বার্তা২৪.কম’কে বলেন, ‘ফসলটি থেকে আমরা লিনোলিনিক এসিড সমৃদ্ধ তেল আহরণ করতে পারবো। যা সাধারণ তেলের চেয়ে বেশি উপকারি এবং বাজার মূল্যও বেশি। কৃষক নিজেই বীজ উৎপাদন করে সংরক্ষণ ও পরবর্তীতে চাষ করতে পারবেন। এছাড়াও তেল আহরণও করতে পারবেন স্বাভাবিকভাবে। এতে কৃষকরা একটু বেশি লাভবান হবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই তেলজাত ফসলের চাষ সম্প্রসারণের জন্য ইতোমধ্যে এক সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম, কৃষি সংগঠক রেজাউল করিম সিদ্দিকের উপস্থিতিতে দেশের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘লাল তীর’কে সাউ পেরিলা-১ এর বীজ বিতরণ করা হয়েছে।’

পরীক্ষামূলক চাষ করা ১৩টি অঞ্চলের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলার আকাবা নার্সারির পরিচালক ডা. রুহুল আমিন বার্তা২৪.কম’কে বলেন, ‘পুরোপুরি জৈব উপায়ে চাষে কোনও কীটনাশক ব্যাবহার করার প্রয়োজন হয়নি। বিঘা প্রতি ছয় হাজার চারা চাষ করা যায়। কিন্তু আমি এর অর্ধেক চাষে প্রায় ২০০ কেজি বীজ পেয়েছি। উৎপাদন খরচ অন্য সকল তেলবীজের মতই। তবে রোগবালাই না হওয়াই কীটনাশক খরচ নেই বললেই চলে।’’

সাউ পেরিলা-১ গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম মজুমদার বলেন, ‘সাধারণত ভোজ্য তেল ফসল রবি মৌসুমে চাষ হয়। সম্প্রতি লাল তীরকে বীজ বিতরণ করা হয়েছে। আকিজ গ্রুপ-ও এ নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে। আশা করছি দ্রুত দেশে বাণিজ্যিক ভাবে সাউ পেরিলা-১ এর চাষাবাদ শুরু হতে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বীজে ২৫ শতাংশের বেশ আমিষ থাকে। ফলে তেল আহরণের পর তা থেকে পাওয়া খৈল গবাদিপশুর জন্য পুষ্টিকর খাবার বা জৈব সার হিসেবেও ব্যাবহার করা যাবে। ৭০-৭৫ দিনের এই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। হেক্টর প্রতি সর্বোচ্চ ১.৫ টন পরিমান বীজ সংগ্রহ করা যাবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন বাণিজ্যিকভাবে চাষে যেমন আমদানিকৃত তেলের পরিমান কমে যাবে তেমনি সাউ পেরিলা-১ দেশের অর্থনীতিতেও আনতে পারে আমূল পরিবর্তন।’