শুভ জন্মদিন প্রিয় চট্টগ্রাম ভার্সিটি

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
নান্দনিক চবি ক্যাম্পাস, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

নান্দনিক চবি ক্যাম্পাস, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের তৃতীয় শিক্ষাঙ্গন ও আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। এ বছর চবি স্পর্শ করেছে গতিশীল পথচলার ৫৪ বছর। শুভ জন্মদিন প্রিয় চবি।

৫৩ বছর পেরিয়ে ২০১৯ সালের হিসাবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৭,৮৩৯ শিক্ষার্থী এবং ৮৭২ জন শিক্ষক আছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণ ও অধ্যাপনা করেছেন, যার মধ্যে ১ জন নোবেল বিজয়ী এবং একাধিক একুশে পদক ও অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ধন্য শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক, বারোজন শিক্ষার্থী সহ তিন জন কর্মকর্তা শহিদ হন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের কর্মচারী মোহাম্মদ হোসেনকে বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হয়। তিনি গণবাহিনী (সেক্টর-১)-এর অধীনে নৌ-কমান্ডো হিসাবে যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে জিরো পয়েন্ট চত্বরে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ স্মরণ।

মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এবং ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

২০১৬ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা।

বিশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চট্টগ্রাম বিভাগে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় চট্টগ্রামের অধিবাসীগণ স্থানীয়ভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অনুভব করেন । এ লক্ষ্যে ১৯৪০ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সর্বভারতীয় সম্মেলনে মওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামবাদী সভাপতির ভাষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ নির্মাণের কথা উপস্থাপন করেন এবং একই লক্ষ্যে তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য ভূমি ক্রয় করেন। দুই বছর পর, ১৯৪২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নূর আহমদ বঙ্গীয় আইন পরিষদে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপন করেন। এইসব গণদাবির প্রতি ব্রিটিশ দখলদার সরকার কর্ণপাত করেনি।

ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তানের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৬০-১৯৬৫) প্রণয়নকালে চট্টগ্রামে একটি ‘বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণের স্থান হিসেবে শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত চট্টগ্রাম সরকারি কলেজকে সম্ভাব্য ক্যাম্পাস হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬২ সালে, তৎকালীন জনশিক্ষা বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার একটি প্রাথমিক খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে এবং একই বছর রাজনীতিবিদগণ নির্বাচনী প্রচারণায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাধারণ প্রতিশ্রুতি দেন।

এদিকে ১৯৬১ সালের ৭ মে চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের উদ্যোগে স্থানীয় মুসলিম হলে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রধান অতিথির ভাষণে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত প্রকাশ করেন এবং তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। পরে ১৯৬২ সালে ৩০ ডিসেম্বর, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ’ নামে আরেকটি পরিষদ গঠিত হয়। এই সকল সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও স্মারকলিপি প্রদান, পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি, সেমিনার অনুষ্ঠিত হতে থাকে। সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৯৬২ সালের ৯ ডিসেম্বর লালদিঘী ময়দানে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৩ সালের ৮ জানুয়ারি, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়।

এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের বদলে বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালীতে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হলেও ১৯৬৩ সালের ১২ ডিসেম্বর পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়টি কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৬৪ সালের ৯ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের বৈঠকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মঞ্জুর করা হয়।

আরও পড়ুন: চবির জন্মদিন: যেখানে ট্রেন আসে কাশবন ছুঁয়ে

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর এম ওসমান গণিকে চেয়ারম্যান এবং ডক্টর কুদরাত-এ-খুদা, ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এম ফেরদৌস খান ও ডক্টর মফিজউদ্দীন আহমদকে সদস্য নির্বাচিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্থান নির্বাচন কমিশন’ গঠিত হয়। এই কমিশন সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে হাটহাজারী উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের জঙ্গল পশ্চিম-পট্টি মৌজার নির্জন পাহাড়ি ভূমিকে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান হিসেবে সুপারিশ করে।

১৯৬৪ সালের ১৭-১৯ জুলাই পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের সভায় ‘স্থান নির্বাচন কমিশন’-এর সুপারিশের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং এর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করা হয়। ১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

১৯৬৫ সালের ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান মল্লিককে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প-পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি চট্টগ্রাম শহরের নাসিরাবাদের ৩নং সড়কের ‘কাকাসান’ নামের একটি ভবনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের অফিস স্থাপন করেন। ১৯৬৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর এক সরকারি প্রজ্ঞাপন বলে তৎকালীন পাকিস্তান শিক্ষা পরিদপ্তরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প অফিসে বদলি করা হয়। স্থপতি মাজহারুল ইসলামের ‘বাস্তকলা’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়।

প্রাথমিকভাবে ১টি দ্বিতল প্রশাসনিক ভবন, বিভাগীয় অফিস, শ্রেণিকক্ষ ও গ্রন্থাগারে জন্য একতলা ভবন তৈরি করার পাশাপাশি শিক্ষক ও ছাত্রদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার (১৪ মাইল) উত্তরে ২,১০০ একর (৮৫০ হেক্টর) একর পাহাড়ি এবং সমতল ভূমির উপর বর্তমানে বিকাশ লাভ করেছে। লাইব্রেরি, জাদুঘর, আবাসিক হল, ক্যাফে, খোলা চত্বর, বিভিন্ন স্থাপনা, স্মারক ও শিল্পকর্মে উদ্ভাসিত ক্যাম্পাসের সবুজের সমাবেশে জাগে প্রাণের স্পন্দন। প্রকৃতি ঘেরা পার্বত্য জনপদে শাটল ট্রেন আসে তারুণ্যের হুঁইসেল বাজিয়ে। বাংলাদেশে তো বটেই, বিশ্বের অন্যতম নান্দনিক ক্যাম্পাসের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি, গর্ব ও ঐতিহ্য সর্বজনবিদিত।

আপনার মতামত লিখুন :