কোভিড-১৯: টিকা দেওয়ার ঝুঁকি এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া



ড. মো. একরামুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষ অদূর ভবিষ্যতে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি টিকা নেওয়ার আশা করছেন। প্রাথমিকভাবে ভ্যাকসিনগুলি নিরাপদ হওয়ায় বেশ কয়েকটি দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ভ্যাকসিন প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছেন। কিন্তু  অনেক  লোক এখনও দ্বিধাগ্রস্ত । কারণ তারা যেমন সংক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চান, তেমনি টিকার সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়াকেও ভয় পাচ্ছেন। সাধারণ টিকা দেওয়ার পরে প্রথম তিন দিনে নির্দিষ্ট কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া যেমন ইনজেকশন সাইটের চারদিকে লালভাব, ফোলাভাব বা ব্যথা, ক্লান্তি, জ্বর, মাথা ব্যথা এবং ব্যথাজনিত প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক। সাধারণ ভ্যাকসিনের এই প্রতিক্রিয়াগুলি সাধারণত হালকা এবং কয়েক দিন পরেই নিরাময় হয়।আসলে ভ্যাকসিন যে কাজ করছে এই লক্ষণগুলো তারই প্রমাণ। কোভিড-১৯ এ যে ভ্যাকসিনগুলি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে তারমধ্যে  বায়োএনটেক-ফাইজার, মডার্না, অক্সফোর্ড -অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং রাশিয়ান স্পুটনিক-ভি উল্লেখযোগ্য। ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সি (ইএমএ), ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন(এফডিএ) এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লুএইচও) এর মতে, সামগ্রিকভাবে অনুমোদিত এই ভ্যাকসিনগুলি নিরাপদ। যদিও সাধারণ টিকার প্রতিক্রিয়া ছাড়াও, কোভিড-১৯ এর টিকা দেওয়ার পরে কিছু মানুষের গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া যেমন অ্যালার্জিক শক দেখা গিয়েছে।এই ধরণের প্রতিক্রিয়ায় শ্বাস প্রশ্বাস বা  হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে এগুলি বিরল ঘটনা। সব মানুষের ক্ষেত্রে ঘটবে এমনটি নয়। এই ভ্যাকসিনগুলি mRNA/ভেক্টর ভ্যাকসিন হওয়ায় প্রতিষ্ঠিত ভ্যাকসিনগুলির চেয়ে পৃথক এবং দ্রুত প্রয়োগ করার  সিদ্ধান্ত নেওয়ার  ফলে মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে।

জার্মান এবং আমেরিকার বায়োএনটেক-ফাইজার টিকা (BNT162b2 vaccine) অনুমোদনের সময় কোন গুরুতর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। শুধুমাত্র বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে ক্লান্তি এবং মাথা ব্যথার মতো সাধারণ টিকা দেওয়ার প্রতিক্রিয়াগুলি ঘটে। কিন্তু দু'জন ব্রিটিশ ও একজন মার্কিন নাগরিককে ইঞ্জেকশন দেওয়ার সাথে সাথে গুরুতর এলার্জি প্রতিক্রিয়া ঘটে এবং ত্বকের লালচেভাব ও শ্বাসকষ্টের সাথে এনাফিল্যাকটিক শকের মত গুরুতর লক্ষণ  প্রকাশ পায়।

আমেরিকায় তৈরি মডার্না ভ্যাকসিন  (mRNA-1273 vaccine)  বায়োএনটেক / ফাইজারের অনুরূপ পদ্ধতিতে তৈরি। ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীরা ভ্যাকসিনটি ভালভাবে সহ্য করে এবং সাধারণ টিকার মতো প্রতিক্রিয়াগুলি হালকা এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে এটাতেও কিছু মানুষের অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছি এবং খুব অল্প সংখ্যকের  ফেসিয়াল নার্ভ প্যারালাইসিস হয়। তবে এই প্রতিক্রিয়াগুলি আসলে ভ্যাকসিনের মূল উপাদান mRNA  সাথে সম্পর্কিত কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ধারনা করা হচ্ছে যে, mRNA এর বাহক হিসাবে ব্যবহৃত লিপিড ন্যানো পার্টিকেলগুলি এর জন্য দায়ী হতে পারে যা পরবর্তীতে মেটাবলিক প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে বেরিয়ে  যায়।

ব্রিটিশ-সুইডিশ সংস্থার অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন সেপ্টেম্বরে ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলাকালীন এক ব্যক্তির মেরুদণ্ডে প্রদাহ হওয়ার ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাৎক্ষণিকভাবে টিকা দেয়া বন্ধ করা হয় এবং  বিশেষজ্ঞদের একটি স্বতন্ত্র প্যানেল নির্ধারণ করে তাদের দেওয়া তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয় যে মেরুদণ্ডের প্রদাহ সম্ভবত টিকা দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত নয়। অন্যান্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সাধারণ টিকা দেওয়ার মতই তবে বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে কম এবং মৃদু ছিল।

রাশিয়ান স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিন ২০২০ সালের আগস্টের প্রথম দিকে, চূড়ান্ত পর্যায়ের ট্রায়াল শেষ হওয়ার পূর্বেই টিকা দেওয়া শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা এটি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা সত্ত্বেও শুধু রাশিয়াতেই নয়, বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা সহ আরও অনেক দেশে ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাশিয়ায় এখন পর্যন্ত আট লাখেরও বেশি লোককে টিকা দেওয়া হয়েছে।।রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রী জানিয়েছেন, মাথা ব্যথা বা জ্বরের মত প্রতিক্রিয়াগুলো এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে। স্পুটনিক-ভি টিকার মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কোন খবর না থাকলেও রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০৪০ জন রাশিয়ান ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীর উপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে তাদের  ৫২% অপর্যাপ্ত তথ্যের কারণে স্পুটনিক-ভি টিকা  গ্রহণ করবে না।

COVID-19 ভ্যাকসিনগুলির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে এখনও কিছুই জানা যায়নি। এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত সমস্ত ঝুঁকি এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়াগুলি কেবল গত মাসগুলির ফলাফলের স্ন্যাপশট। রবার্ট কোচ ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিনেশন কমিটির সদস্য ক্রিশ্চিয়ান বোগদান বলেছেন, প্রতিটি টিকা অনুমোদনের সিদ্ধান্তটি সর্বদা ঝুঁকি ও উপকারের মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করে করা হয়।  তিনি জার্মান প্রেস এজেন্সিকে বলেন,  কোন বয়স্ক ব্যক্তির যদি করোনার সংক্রমণ থেকে মারা যাওয়ার ২০% সম্ভাবনা থাকে সেক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার মারাত্মক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হওয়ার ঝুঁকি ৫০ হাজার  গুণ কম। সুতরাং আমি এই ঝুঁকি গ্রহণ করে টিকা নেব।

শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এই ভ্যাকসিন নিরাপদ কিনা তা নির্ধারণের জন্য বর্তমানে অপর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। বোগদান আরও বলেন বাচ্চাদের এই টিকা দেওয়া উচিত নয়। কোভিড -১৯ থেকে তাদের মারা যাওয়ার ঝুঁকি শূন্যের কাছাকাছি। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ানো মহিলাদেরও সতর্কতা হিসাবে টিকা নেওয়া উচিত নয়। তবে ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) একটি সুপারিশে গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের mRNA ভ্যাকসিন দেওয়ার বিষয়টি নিষেধ করা হয়নি।

এখন পর্যন্ত বিরল এবং গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তথ্যের অভাব রয়েছে বিশেষ করে অ্যালার্জি আক্রান্ত ব্যক্তিদের। এই ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি কেবলমাত্র বহু লোককে টিকা দেওয়ার পরে এবং দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পরে স্পষ্ট হয়। সুতরাং একটি ঝুঁকি রয়েই গেছে এবং এটি কতটা ক্ষতিকর তা আগামী মাস এবং বছরগুলিতে জানা যাবে।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় বাংলাদেশও। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার টিকা এবং ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকাও বাংলাদেশ নেবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। করোনাভাইরাস যাতে ব্যাপকহারে ছড়াতে না পারে, সেজন্য সরকারের নেওয়া নানা সচেতনতামূলক পদক্ষেপ জনগণকে সুরক্ষা দিয়েছে। ভ্যকসিন প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কোভিড-১৯ চিরতরে নির্মুল হবে, এই আশা আমাদের সবার।

লেখক- . মো. একরামুল ইসলাম, প্রফেসর, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, e-mail: [email protected], মোবাইল-01735959327