একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একজন ভাইস চ্যান্সেলর



প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের দেশে পাবালিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) পদটি অতীব গুরুত্বপূণ। কারন একজন ভিসির ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা, আদর্শ, সততা ছাড়াও তার ইচ্ছা, মেজাজ, মর্জি, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কিছু নির্ভর করে। বিধিসম্মত না হলেও ভিসিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক কিছুই করে থাকেন। তাছাড়া প্রচলিত নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিসিদের প্রভূত ক্ষমতা দেয়া আছে। সেই সুযোগে অনেক ভিসিই বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ইচ্ছা তা করে বেড়াচ্ছেন। কোনো জবাবদিহিতা নেই। আছে শুধু অভিযোগ আর অভিযোগ। অভিযোগের প্রেক্ষিতে কিছুক্ষেত্রে তদন্ত কমিটিও হয় কিন্ত কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয় না। তাই ভিসিরা বরাবরই এসব অভিযোগ বা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট খুব একটা আমলে নেন না।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী উপাচার্য প্রফেসর আব্দুস সোবহানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সারাদেশে ব্যপক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। দেশের সকল পত্র-পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়ার শিরোনাম এখন রাবির বিদায়ী উপাচার্য প্রফেসর আব্দুস সোবহান। একজন উপাচার্য কতটা স্বেচ্ছাচারী হতে পারেন তা রাবি’র উপাচার্যের মেয়াদের শেষ দিনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট প্রতিয়ান হয়েছে। বিগত দিনেও এই উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছিল। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা ছিল যেন রাবি’তে কোন ধরণের নিয়োগ না দেয়া হয়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেও শিক্ষক কর্মকর্তাদের একাংশ উপাচার্যের বিভিন্ন দূর্নীতির বিরুদ্ধে সবর্দা সোচ্চার ছিল। অথচ সবকিছু উপেক্ষা করে, প্রচলিত আইনকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চরম স্বেচ্ছাচারিতা দেখিয়েছেন রাবি’র সদ্য বিদায়ী উপাচার্য। দেশের ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমন কাজ করলে সত্যিই অবাক হতে হয়। উল্লেখ্য যে, রাবি’তে উপাচার্য হিসেবে প্রফেসর আব্দুস সোবহানের মেয়াদের শেষ কর্মদিবস ছিল গত ৬ মে। মেয়াদের শেষ দিনে বিভিন্ন পদে (৯ জন শিক্ষক, ২৩ জন কর্মকর্তা, ৮৫ জন নিন্মমান সহকারী এবং ২৪ জন কর্মচারী) তিনি ১৪১ জনকে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করেন এবং নিয়োগাদেশ জারি করেই পুলিশ প্রহরায় ক্যাম্পাস ছাড়েন। ক্যাম্পাসে নিয়োগ পাওয়া-না পাওয়াকে কেন্দ্র করে ওইদিন মারামারির ঘটনাও ঘটে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, রাবি’তে সবধরনের নিয়োগে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেন উপাচার্য বিদায়ের শেষ মুহূর্তে এসে এতগুলো জনবল নিয়োগ দিলেন? উনি কি এসব নিয়োগ প্রদানে বাধ্য ছিলেন? নাকি এখানে বড় অংকের অর্থের লেনদেন হয়েছে? তাছাড়া এতসব লোকবল নিয়োগ দিয়ে উনি কি বেটাগিরি দেখিয়ে গেলেন? কেন উনি জেনে শুনে রাবির মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে দাঁড় করিয়ে গেলেন? কেন উনি উপাচার্য পদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করলেন? এতসব কেন’র উত্তর এখন কে দিবে? এভাবেই কি উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ইচ্ছা তা করে বেড়াবেন? আর কত? দেশের উচ্চশিক্ষা কি এভাবেই দিনে দিনে নীচের দিকে নামতে থাকবে? উপাচার্যের বদনামের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর কত ছোট হবে?

বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের অনেককেই একইভাবে স্বেচ্ছাচারী হতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, উপাচার্যরা কেন স্বেচ্ছাচারিতা করেন? প্রচলিত নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে উপাচার্যদের ক্ষমতা প্রভুত। উপাচার্যরা দ্বায়িত্ব পাওয়ার পর তার নিজ পছন্দমতো আজ্ঞাবহ লোক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সকল স্তর সাজিয়ে নেন। ফলে সৎ, যোগ্য ও ভালো লোকজন ইচ্ছে করলেও উপাচার্যদের কাছে ভিড়তে পারেন না। উপাচার্যদের চারদিকে রাজনৈতিক লেবাসধারী সুবিধাভোগী চাটুকারদের ভিড়ে খুব কম উপাচার্যই আছেন যারা অপেক্ষাকৃত সৎ লোকজন দিয়ে প্রশাসন পরিচালনা করতে পারেন। কারণ চাটুকারদের বলয় ভেদ করে উপাচার্যদের কাজ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পরে। উপাচার্যদের আজ্ঞাবহ লোকজনের (শিক্ষক, কর্মকর্তা/কর্মচারী) চাটুকারিতার কারণে অনেক সময় উপাচার্যরা চরম স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেন এবং নিজেকে প্রচন্ড ক্ষমতাশালী মনে করতে থাকেন। আর এভাবেই উপাচার্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, শৃংখলা, নিয়ম-কানুন সংক্রান্ত অনেক ক্ষতি হয়ে যায় যা উপাচার্যরা বুঝতেই চান না। একজন স্বেচ্ছাচারী উপাচার্যের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রতিবাদী কণ্ঠ ধীরে ধীরে কোনঠাসা হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ আন্দোলন বা বিরোধিতা করলেও সেগুলোতে খুব একটা কাজ হয় না। রাবি’র উপাচার্যও এরকম ভাবেই স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেন এবং নিজেকে খুব ক্ষমতাধর মনে করতে থাকেন।। তাছাড়া দ্বিতীয়বারের মতো উপাচার্য হওয়ার কারণে প্রফেসর আব্দুস সোবহান খুব বেশী আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন। কারণ, ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্বে থাকার সময়ও অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল।  সে সময় নিয়মের বাইরে গিয়ে কয়েকশ শিক্ষক কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। তাছাড়া প্রশাসনিক নানা অনিয়মের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। নানা অনিয়ম থাকার পরও ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বারের মতো উপাচার্য পদে নিয়োগ পান তিনি এবং একই ভাবে নানা প্রশাসনিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। যোগ্যতা শিথিল করে মেয়ে ও জামাতাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে গত বছর তার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে জমা পড়ে যার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর দফতর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অভিযোগসমূহ তদন্তে ইউজিসি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরিতাপের বিষয় হলো তদন্ত কমিটি হলেও উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি ফলে তিনি বহাল তবিয়তে তার সকল কর্মকাণ্ড করে গেছেন।

রাবির বিদায়ী উপাচার্য প্রফেসর আব্দুস সোবহান ইচ্ছে করলেই মন্ত্রণালয়ের দোহাই দিয়ে এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে পারতেন। উনি যাদেরকে নিয়োগ দিয়ে গেছেন যদি তাদের নিয়োগ শেষ পযর্ন্ত বাতিল হয়ে যায় (যেহেতু শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এই নিয়োগ অবৈধ) তাহলে নিঃসন্দেহে এতগুলো লোককে তিনি বিশাল অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে গেলেন। ছাত্রলীগের দোহাই দিয়ে এরকম একটা নিয়োগকে তিনি কতটুকু হালাল করতে পারেন এটাই এখন দেখার বিষয়। মূলত তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে কুরুক্ষেত্রে পরিণত করে গেলেন। তিনি যতই ক্ষমতাধর হোন না কেন একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এরকম স্বেচ্ছাচারিতা তিনি কোনোভাবেই করতে পারেন না। ওনার কারণে উপাচার্য পদটির যথাযথ সম্মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এককথায় ওনার সার্বিক কর্মকাণ্ড শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কেই ছোট করেনি দেশের উচ্চশিক্ষা খাতকে সংকটের মধ্যে ফেলেছে।

লেখক: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক ফেলো শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালেয়শিয়া, মালেয়শিয়া