ছয়দিন ধরে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলো একদিনে ফিরবে?



হাসান হামিদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আগামীকাল ঈদ। ঈদকে সামনে রেখে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর থেকে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে গত পনেরো জুলাই থেকেই। ঈদ মানে আনন্দ এ কথা সর্বজন বিদিত। তবু আমাদের এই বাংলাদেশে প্রতিবার ঈদের আনন্দের সাথে বেদনা যুক্ত হয়। আমরা দেখি, প্রতি বছরই ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ব্যথার সুর বাজতে থাকে। এর অবসান আর হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয় না। এবার তো করোনা সংক্রমণের কারণে লকডাউন ছিল। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, যে মানুষগুলো ছয় দিন ধরে বাড়ি যাচ্ছে ঈদ করতে, তারা কীভাবে ঈদের পর একদিনে ফিরবেন। আচ্ছা, ধরলাম অনেকেই ফিরবেন না। তবে অনেকের কর্মস্থলে অফিস বন্ধ থাকলেও হোম অফিস বা এ জাতীয় ব্যবস্থাপনায় কাজকর্ম চলে। কিংবা লকডাউনেও অনেক অনলাইন সার্ভিস চালু থাকে। তারা সবাই ঈদের পর কর্মের জায়গাটিতে ফিরতে চাইবেন। ভাবনা হলো, এত লোক কিভাবে আসবেন এই অল্প সময়ে?

আমাদের দেশে লোক বেশি। ব্যবস্থাপনা ঠিক মত করবে সেই সদিচ্ছাও অনেকের থাকে না। আর এমনিতেও ঈদের আগে যানবাহনের টিকিট সংকট, সড়ক ও লঞ্চ দুর্ঘটনা, ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়া, সড়কের দুর্দশাসহ নানা কারণে জনদুর্ভোগ চরমে ওঠে। এই সবই নরমাল সময়ের সাধারণ হয়ে উঠা ভোগান্তি। গত বছর থেকে এগুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার প্রকোপ। এই প্রকোপের মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গ্রামে ঈদ করতে ছুটছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। তবে যাত্রাপথ নিষ্কণ্টক না হওয়ায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। পত্রিকায় পড়ে জানলাম, মহাসড়কগুলোয় যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়া, গাড়ি বিকল হওয়া, দুর্ঘটনা, ভাঙাচোরা সড়কে গাড়ির গতি কমে যাওয়াসহ অন্যান্য কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ঈদে জনদুর্ভোগ কোনোমতেই কাম্য নয়। কিন্তু এর থেকে মুক্তির উপায় কে খুঁজবে?

করোনা সংক্রমণ মৃত্যুর হার গত বছরের চেয়ে এবার অনেক বেশি। উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, মানুষের সচেতনতা এবার গত বারের তুলনায় কম। বীর দর্পে তারা করোনা ছড়াচ্ছেন। করোনাকে কিছুই মনে করি না ভাব নিলেই মনে করছেন, এখানেই জীবনের সফলতা। তাদের আমার এই ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতে যারা দিনকে রাত করে একজনকে বাঁচাতে আকুল ভাবে কাঁদছেন, পরিশ্রম করে চলেছেন সেসব দৃশ্য দেখাতে ইচ্ছে করে। একজন বাবাকে বাঁচাতে সন্তানরা, একজন সন্তানকে বাঁচাতে বাবা-মা, ভাইকে বাঁচাতে বোন যে আহাজারি করছেন তা আমরা দেখি না। আমরা মানতে চাই না, এই যে আজকের এই অবস্থা এর জন্য দায়ী আসলে আমরাই।

ঈদযাত্রার ছবি প্রকাশ হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যেম। লাখ লাখ ঘরমুখো অনেক মানুষের মুখেই মাস্ক নেই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বললে অন্যরা হাসাহাসি করে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক শিক্ষক বন্ধু বললেন, গ্রামে তিনি মাস্ক পরতে পারেন না। তবুও পরার চেষ্টা করেন। তাকে মাস্ক পরা দেখলে অনেকেই হাসাহাসি করে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে আমাদের কপালে যে আগামীতে বেদনা লেপ্টে যাবে তা প্রায় সুনিশ্চিত! আমরা ঈদ করতে গাদাগাদি করে বাড়ি যাচ্ছি। আর তাতে করোনা সংক্রমণের হার যে ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে, তা ভাবছি না। অথচ দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সরকার কঠোর লকডাউনের পথ বেছে নিয়েছিল। আজকে সব ভেস্তে গেছে। আমরা দেখলাম, সরকার কড়া লকডাউন দিল। এরপর টানা দুই সপ্তাহ চলল সেই লকডাউন। ঈদকে কেন্দ্র করে পনেরো জুলাই থেকে শিথিল করা হয় কঠোর বিধিনিষেধ। ঈদ করতে মানুষ এবার ছুটতে শুরু করল গ্রামের দিকে। কত সংখ্যক মানুষ? সিম ব্যবহারকারীর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পর্যালোচনায় জানতে পেরেছি, পনেরো জুলাই একদিনই প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। গতকাল পর্যন্ত শৈথিল্যের প্রথম পাঁচদিনে রাজধানী ছেড়েছে অর্ধকোটি মানুষ। এই ধারাবাহিকতা যদি বজায় থাকলে আজও ঢাকা ছাড়তে পারে আরো বারো-তেরো লাখ। আর তেইশ জুলাই থেকে আন্তঃজেলা পরিবহন যোগাযোগ বন্ধ হবে বলে জানি। পাশাপাশি আবারো চালু হবে কঠোর বিধিনিষেধ। ঘরমুখো মানুষ এবার ঢাকা ছাড়ার জন্য ছয়দিন পেলেও ঈদের পর ফেরার জন্য সময় পাচ্ছে মোটে একদিন। এবার ভোগান্তিটা কেমন হতে পারে?

গণমাধ্যমকে পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষকে কর্মস্থলে ফিরতে মাত্র একদিন সময় দেয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই যৌক্তিক হয়নি। ঘরমুখো মানুষ ঢাকা ফেরার জন্য একদিনে সবাই একযোগে রওনা দিলে ভয়াবহ জনদুর্ভোগের পাশাপাশি কভিডের সংক্রমণ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঠিক তাই। এটাই কিন্তু হবে। অতিরিক্ত চাপে বাড়বে দুর্ঘটনা, বেড়ে যাবে সংক্রমণ। তাহলে আমরা বিগত দুই সপ্তাহ ব্যাপক ক্ষতি স্বীকার করে কঠোর বিধিনিষেধ কেন মানলাম? এই প্রশ্নের উত্তর নেই!

অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, বেশির ভাগ মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে পরিবার-পরিজন নিয়ে। এদের অনেকেই আপাতত পরিবারকে ঢাকায় আনতে চাইবে না। অতীতেও ঈদের ছুটিতে আমরা এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করেছি। করোনার কারণে ফেরার সুযোগ মাত্র একদিন থাকায় এ প্রবণতা আরো বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু তাদের অনেকেই আবার ফিরতেও চাইবেন। আর যারা গ্রামে থাকবেন, তারা তো স্বাস্থ্যবিধি খুব একটা মেনে চলবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি যেন কটোর ভাবে মানুষ মানতে বাধ্য হয়, এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে।  আর এ বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের বিধিনিষেধ  সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে। তবে যে যাই বলি, আমাদের স্বীকার করতেই হবে, বর্তমানে দেশে করোনা পরিস্থিতি যে রূপ ধারণ করেছে, তাতে অনেক কিছুই শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। তা না হলে দেশে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে, যা মোটেই কাম্য নয়। আসুন, সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানি, নিজেকে বা অন্যকে সুরক্ষা করে দেশকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচাই। সবাইকে ঈদ মোবারক।

লেখক- কবি ও গবেষক