শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এই 'নিউ-নরমাল' পরিস্থিতি



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

স্কুল-কলেজ খুলে গেলো। খুলে দেওয়া প্রয়োজন ছিলো। এতো দীর্ঘ সময়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা জাতিগত স্থবিরতার দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলো। সামাজিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক বহু কারনেই এই স্কুল খুলে দেওয়াটা আমি সমর্থন করি।

সমর্থন করি, আবার শঙ্কিতও হই। কারণ বিশ্বের বহু উন্নত দেশ এই স্কুল খুলে দেওয়ার পরে নতুন করে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির মুখে পড়েছিলো (যেমন: আমেরিকা)। এটা অনেকটা নিজের হাতে ইচ্ছে করে একটা করোনা ওয়েভ শুরু করার মতোই ঘটনা। ফলে, আবার বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো এই অন-ক্যাম্পাস শিক্ষাদান। নতুন করে দিতে হয়েছিলো লকডাউনও।

তারমানে স্কুল আবার বন্ধ হবে কি-না, সেটাও কিন্তু আমাদেরই হাতে। আবার লকডাউন এর কালো মেঘে আমাদের বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে কি-না, সেটাও আমাদের হাতেই।

একটা কথা বলি, আমরা যখন স্কুল-কলেজে পড়েছি, কখনো দেখিনি স্কুলে বা কলেজের টয়লেটে সাবান থাকতো। হ্যাঁ, থাকতো না।

বৈশ্বিক মহামারীর এই সময়ে ‘এমনটা’ হবার আর সুযোগ নেই। সাবান/হ্যান্ডওয়াশ-স্যানিটাইজার থাকতেই হবে। দায়িত্ব নিতে হবে স্কুলকে, অভিভাবককে, শিক্ষককে, আমাকে-আপনাকে। বহুদেশে বহু সংস্থার বহু গাইডলাইন আছে এই বিষয়ক। সময় করে সেগুলো দেখে নিতে পারেন।

আমি শুধু সোজা বাংলায় আমাদের কী করণীয়, সেটা বলে দিতে চাই।

‘১০টি কথা, ৩টি কথা ও ২টি কথা’। স্কুল প্রশাসন এবং শিক্ষকদের বলতে চাই:

১। ৩ ফুট দূরে দূরে চেয়ার-টেবিল গুলো রাখবেন।

২। ক্লাসের ফাঁকে বাচ্চারা যেন জটলা করতে না পারে, সেটা কাউকে দিয়ে মনিটরিং করাবেন।

৩। টয়লেটে যেন পর্যাপ্ত অবশ্যই সাবান/হ্যান্ডওয়াশ থাকে সেটা নিশ্চিত করবেন।

৪। ক্লাসরুম গুলোতে অন্তঃত একটা করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বোতল-স্প্রে যেন থাকে।

৫। ছুটির সময় সবাই যেন একসাথে জটলা করে না বের হয় বা বের হয়ে জটলা করে দাঁড়িয়ে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করবেন।

৬। ক্লাসে ঢোকার আগে শিক্ষকরা হাত ধুয়ে বা স্যানিটাইজ করে প্রবেশ করবেন। প্রয়োজনে এই প্রক্রিয়াটা শিক্ষার্থীদের সামনেই করবেন। এতে তারা শিখবে। প্রয়োজনে প্রতিটি ক্লাস রুমের পেছনে একটি করে বেসিন বসান।

৭। প্রতিদিনের ক্লাস শেষ হবার পরে ক্লাসরুম গুলো জীবাণুনাশক ফিউমিগেশন করুন এবং রুমগুলো বন্ধ করার আগে কিছু সময় খোলা রেখে দিন।

৮। ক্লাস রুমের দরজা-জানালা ক্লাস চলাকালীন অবশ্যই খোলা থাকবে এবং প্রচুর আলো বাতাসের ব্যবস্থা যেন থাকে, সেটা নিশ্চিত করবেন।

৯। কেউ অসুস্থ বোধ করলে (শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী) তাকে দ্রুত আইসোলেট করুন (মানে, একটি পৃথক রুমে বিশ্রাম নেবার ব্যবস্থা করুন এবং পরে তাকে বাসায়/হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করুন।)

১০। সরকার বা স্কুল কর্তৃপক্ষের এ সকল কিছু বাস্তবায়নের ফান্ড নাও থাকতে পারে। কোভিডকালীন এই বিশেষ ব্যবস্থাগুলোর জন্য ফান্ড গঠন করুন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে ফান্ড নিন। অভিভাবকদের উপর চাপ না বাড়িয়ে ধনাঢ্য মহল, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা, সেচ্ছাসেবী সংগঠন, ব্যবসায়ীদের নেতৃস্থানীয় সংগঠন কিংবা গণমাধ্যম- সকলের কাছ থেকে অর্থ-সাহায্য নিন এবং খরচে স্বচ্ছতা রাখুন।

সন্তান যার, তাকে বলতে চাই:

১। আপনার সন্তানকে মাস্ক পরানোর অভ্যাসটা বানাবেন। কাজটা সহজ হবে না। ছোটরা অনেকেই প্রথম প্রথম পরতে চাইবে না। তাদেরকে বোঝাবেন, দেখাবেন, শেখাবেন। সার্জিক্যাল মাস্কে অনেকের সমস্যা হতে পারে, নাক-মুখ চুলকাতে পারে। সেক্ষেত্রে কাপড়ের মাস্ক পরাবেন। কিভাবে পরবে, কখন খুলবে, এগুলো ভালো মতো বুঝিয়ে দেবেন। বার বার বোঝাবেন।

২। কীভাবে হাঁচি দিতে হবে, কীভাবে কাশি দিতে হবে, শরীর খারাপ লাগলে কি করতে হবে, এগুলো আপনার সন্তানদের শিখিয়ে দিন।

৩। প্রতিটি ক্লাস শেষ করার পরে আপনার সন্তান যেন একবারের জন্য হলেও সাবান/হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ২০ সেকেন্ড সময় ধরে হাত ধুয়ে নেয়। হাত মোছার জন্য একটা ছোট্ট তোয়ালে/রুমাল তার ব্যাগে যেন থাকে যাতে অন্য কারোটা সে ভুলেও ব্যবহার না করে।

স্কুলের শিক্ষার্থীদের বলতে চাই:

১। কোন অবস্থাতেই নাকে-মুখে বা মাস্কে হাত দেওয়া যাবে না।

২। কেউ অসুস্থ বোধ করলে তার সাথে দুর্ব্যবহার করা যাবে না।

স্কুলে এই ধরণের বিধি-নিষেধ থাকবে, এটা আমরা কোনদিন ভাবিনি। আণুবীক্ষনিক কোন ভাইরাস পৃথিবীকে এভাবে নাড়া দিয়ে যাবে, সেটাও আমরা কোনদিন ভাবিনি।

স্কুলগুলো আবার বন্ধ হয়ে যাক, এমনটা যদি আমরা না চাই, তবে এই অস্বাভাবিক বিধি-নিষেধ গুলো আমাদের মেনে চলতেই হবে। সময়টাই তো স্বাভাবিক না। তাই এই ‘নিউ-নরমাল’ নিয়েই আপাতত চলতে হবে।

আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্কুলের সকলের জন্য শুভকামনা।

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক কলামিস্ট