লোভ ক্ষোভ জিহ্বা সামলান



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
লোভ ক্ষোভ জিহ্বা সামলান

লোভ ক্ষোভ জিহ্বা সামলান

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কটু কথার আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণে দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই সময়ে মানুষ হাটে-বাজারে, আলাপ-আলোচনায়, গণমাধ্যমের অনলাইন-অফলাইনে বড় বড় পদবিধারী মানুষের কটুক্তি শুনতে শুনতে লজ্জা, ক্ষোভ, দুঃখ-কষ্ট পেয়ে নাজেহাল হয়ে পড়েছে। অপরদিকে মহামারি, মারামারি, সংঘাতে অপমৃত্যু, সড়ক-নৌ দুর্ঘটনা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সব মিলিয়ে এক চরম ক্রান্তিকাল চলছে চারদিকে।

গত একমাসে চট্টগ্রামে নর্দমা ও খালের মধ্যে মানুষের ছুঁড়ে ফেলা ময়লার ভাগাড়ে পড়ে গিয়ে ডুবে অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছে চার জন হতভাগ্য মানুষের। পাঁচলাইশে নর্দমার ময়লায় ডুবে শিশু কামালের মৃত্যু, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর মৃত্যু, পথচারীর মৃত্যু মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। লাইন্সেবিহীন বহিরাগত চালকরা চালায় ঢাকার সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি। দিনের বেলা রাজপথে ময়লা ও পঁচা দুর্গন্ধযুক্ত পানি ফেলতে ফেলতে চলে ময়লার গাড়ি। মাটি, বালু ফেলতে ফেলতে দিন দুপুরে চলে ভাঙ্গা-চোরা নির্মাণ কাজের ট্রাক। মাদকতায় ভরা ঢুলু চোখে রঙিন স্বপ্ন দেখতে দেখতে চালায় ওরা ভারী ময়লা ও বালু-মাটির ট্রাক। দেশের প্রায় সকল সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে একই অবস্থা। ওদের গাড়িগুলো গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে দিনের বেলা রাস্তায় জন সমাগমের মধ্যে ধাঁ ধাঁ করে ছুটে চলে। ময়লার গন্ধে সেগুলোর চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে না কোন ট্রাফিক। কারণ, ওরা সরকারি গাড়ি চালায়। সেগুলো ধরলে ট্রাফিকদের কোন লাভ-ক্ষতি মেলে না। তাহলে দরকার কি সেসব অবৈধ ট্রাক চালকদের লাইসেন্স চেক করার?

চট্টগ্রামে নর্দমার ময়লায় ডুবে বার বার মৃত্যু ঘটছে কার অবহেলায়? চব্বিশ ঘণ্টা পর শিশু কামালের লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে বহুদুরের এক শিক বাধাঁ ব্যারিকেডের মাথায়। বিশাল নর্দমায়  কে ময়লা ফেলে আর কে সেটা নিয়মিত পরিস্কার করার দায়িত্ব পালন করার কথা সেগুলো সম্পর্কে কেউ কোন কিছু বলে না, ঠিকমত লিখেও না। তাদেরকে কাজে ফাঁকি দেয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা দূরে থাক জিজ্ঞাসাবাদ করারও প্রয়োজন মনে করেন না কর্তৃপক্ষ। ফলে বার বার একই দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে। সিটি কর্পোরেশনের এত লোকবল, এত সুপারভাইজার, এত অফিসার তবুও নর্দমা কেন পলিব্যাগে ভর্তি, কেন সেগুলো আবর্জনা দিয়ে ভরাট হয়ে বন্ধ থাকে তা জনগণ জানতে চায়। ওরা মাস ফুরালেই বেতন নেয় কিন্তু ঠিকমত কাজ করে না কেন? শুধু শ্রমিক ইউনিয়নবাজি করা এবং নিজেদের গাড়ি-বাড়ি বাড়ানোর কাজে বসদের সাথে প্রতিযোগিতা করাই যেন তাদের নিত্যদিনের ভাবনা। জনসেবার এই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কাজে অবহেলার জন্য শাস্তি হওয়া দরকার সংশ্লিষ্ট সবার। এরা সবাই নিজেদের রং বদলায়। নতুন সরকার  এলেই নতুন রং ধারণ করে কাজে ফাঁকি দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই এদেরকে শাস্তি দেবার কে আছে? সবসময় ওরাই তো সরকার!

ড্রেনের পানিতে ডুবে মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি শুধু দুঃখজনকই নয়, এটা চরম মর্মান্তিক। নর্দমাগুলো অগভীর, কিন্তু এত আবর্জনাময় ও দুর্গন্ধযুক্ত যে ডুবুরিরা ২৪ ঘণ্টা চেষ্টা করেও একজন ডুবন্ত শিশুর লাশ খুঁজে পায় না। একটি দুর্ঘটনা ঘটলে সবার টনক নড়ে। তখন তারা  একে অপরকে দোষারোপ করে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে সময় পার করে দেয়। দুর্ঘটনায় বিপদ ঘটলে লাগামছাড়াভাবে পরস্পরকে দোষারোপ করা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা কিছু কিছু দলবাজ টিভিতে আরো বেশি করে চোখে পড়ে। তারা তাদের বিশেষ নির্বাচিত লোকদেরকে কথা বলতে নিয়মিত ডাকে।

চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি ড্রেনে এত যে ময়লা পানি জমে আছে তা বোঝাই যায় না। সেখানে কাদার মধ্যে ডুবুরি নেমে ভারী গাদের মধ্যে কীভাবে কারো লাশ খুঁজে পাবে? ড্রেনগুলোর স্লাব নেই, ঢাকনা নেই। বড় বড় ক্যানেলগুলোর দু’পাশে খোলা। সেখানে কোন বেড়াও নেই। বেড়া না থাকায় শিশু কামাল ও তার বন্ধু ময়লার উপর ভাসতে থাকা পুরাতন খেলনা কুড়াতে চেয়েছিল। তারা ভাবেনি সেখানে গভীর ময়লা কাদায় ডুবে গিয়ে তার মৃত্যু আছে। এই দোষ ও অন্যায়টা কার? কে দায়ী এই অবুঝ শিশুর মৃত্যুর জন্য?

এসব উন্মুক্ত নালার ময়লা মৃত্যুকূপ হয়ে আছে কার অবহেলায়? সিটি কর্পোরেশনের কর্তা ব্যক্তি এই দায় এড়াতে পারেন না। দেশের অর্থনৈতিক রাজধানীতে এত বড় নর্দমার জন্য কোন সেফটি বা নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই কেন তা আজ এক বড় প্রশ্ন। সিটি কর্পোরেশনের পিওনের বহুতল বাড়ি, বিলাসি গাড়ির কথা সংবাদে জানা যায়। সেখানকার কর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সবকথা জানা যায় না। শুধু জানা যায় অবহেলায় ড্রেন ভর্তি ময়লা আবর্জনার মধ্যে পড়ে মানুষের ঘন ঘন মৃত্যুর কথা। একটু বৃষ্টি হলেই সেগুলো উপচে রাস্তায় ময়লা পানি ঢুকে হঠাৎ বন্যা শুরু হয়। চলে জলজট, যানজট ও জনভোগান্তি। এগুলো থেকে ছড়ায় নানা রোগ ব্যাধি। যে শহরের নালার ময়লা পানি সরানো যায় না সে শহরে দ্বিতল রাস্তা নির্মাণ করার আদৌ কি কোন প্রয়োজন আছে? ময়লার ভাগাড়ের উপর দ্বিতল রাস্তা কার স্বার্থে তৈরী করা হচ্ছে? ভাগাড়ের গন্ধ সার্বিক পরিবেশের উপর কি কোন ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে পারছে? নাকি জনস্বাস্থ্য উপেক্ষা করে শুধু কাড়ি কাড়ি অর্থের অপচয় করা হচ্ছে। এভাবে কিছু লোভী মানুষের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে আমাদের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা।

লোভ শুধু ঠিকাদারি কাজে নয়। মাদকের ভোক্তা ও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই জীবনবিনাশী পাপকাজ। বাংলাদেশ এখন মাদকদ্রব্যের বড় বাজার, ছোট-বড় মাদক ভোক্তাদের বড় দেশ! দেশে এত ইয়াবা, ক্রিস্টাল, খাট, ফেনসিডিল, ভদ্কা, শ্যাম্পেনের ক্রেতা কি দরিদ্র মানুষ? টিভিতে অবৈধ মাদক বিয়ারের কমার্শিয়াল চলে ভিন্ন আঙ্গিকে। তা দেখে কি মাদকসেবীরা চাঁদে জমি কিনতে চায় না? বিত্তশালী ও ক্ষমতাধরদের ছত্রছায়ায় মাদকের অবৈধ ব্যবসার বিকিকিনি চলে। সিংহভাগ ব্যয়বহুল মাদকের ভোক্তা ওরা ও ওদের সাঙ্গ-পাঙ্গ ও দোসররা। তা না হলে একজন মন্ত্রীকে দেশের মানুষ সাইকোপ্যাথ বলে সম্বোধন করতে দ্বিধা করবে কেন? একজনের মন্ত্রিত্ব চলে যাবার সাথে সাথে সাঙ্গ-পাঙ্গ দুধের মাছিরা দ্রুত গা ঢাকা দেবে কেন?

অতি লোভ থেকে অতি ক্ষোভেরও জন্ম নেয়। তাইতো তিনি অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে একজন খ্যাতিমান নায়িকাকে তার সাথে খারাপ কাজে শরীক হতে সরাসারি আহবান করতে কুণ্ঠিত হননি। এরাই আজ আমাদের নেতা। এরাই আইন প্রণয়ন করেন, দেশ চালান। এ ধরণের আরো কতজন যে অগোচরে রয়েছেন তার হিসেব কি কেউ রাখেন?

বিনা ভোটে ক্ষমতা লাভ করা যায়-এই উদাহরণ তৈরী হবার ফলে ইউপি নির্বাচন নিয়ে তৈরী হয়েছে আমরা-আমরা মারামারি, কাটাকাটি, খুনাখুনি। ভোটের কড়াকড়ি না থাকায় টাকা ও পেশী দিয়ে সবাই নেতা হতে আগ্রহী। গণতান্ত্রিক উপায়ে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা বিরাজ থাকলে দেশে এমনটি কখনো ঘটতো বলে মনে হয় না।

অতি সহজেই নেতা হবার ক্রমাগত লোভ থেকে মানুষের মধ্যে রাগ, হিংসা, ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, শুধু নমিনেশন পেলেই যদি ক্ষমতার মালিক হওয়া যায় তাহলে সেই নমিনেশন পাবার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ না হওয়াটাই বোকামি। ইউপি নির্বাচনে স্মরণকালের সহিংস ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা এই সত্যটাকেই প্রকাশ করে মাত্র।

আরেকটি জিনিষ শুরু হয়েছে এক অপরের নামে বিষোদগার ও কুৎসা রটানো। এর প্রধান বাহক আজ ইন্টারনেট ও ডিজিটাল গণমাধ্যম। আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোর দলকানা রোগ অতি বেশি। কারণ সেগুলোর সিংহভাগের জন্ম হয়েছে ব্যাঙের ছাতার মত। বেশিরভাগ গণমাধ্যম গজিয়ে উঠেছে ব্যক্তি মালিকানাধীন দলপ্রীতিকে পুঁজি করে। তাই তারা সব সময় সত্যটা প্রকাশ করতে গিয়ে ভয়ে তটস্থ থাকে। ফলে এটা এক ধরনের পক্ষপাতিত্ত্বের জন্ম দিয়ে জনগণকে প্রতারণা করে। তবে সবাই নয়। কেউ কেউ দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে সত্য প্রকাশে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদেরকে সাধুবাদ জানাই।

জ্ঞানী মানুষ যারা শুধু তারাই জানেন ক্ষমতার বাহাদুরি চিরকাল থাকে না। মাতালরা সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়ে শুধু হম্বিতম্বি ও আস্ফালন করে দিন কাটায়। প্রবাদে আছে, “বিধি দিয়া ধন বুঝে মন, কেড়ে নিতে কতক্ষণ?” তবুও এক শ্রেণির মানুষ ক্ষমতার দম্ভে রাতকানা রোগ ভুগতে থাকে। মাতাল হয়ে দ্বিগ্বিদ্বিগ জ্ঞান হারিয়ে সাধারণ মানুষকে পিঁপড়াও মনে করে না। কেউ কেউ মাতাল হয়ে  ট্রাক দিয়ে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষকে পিষে মেরে ফেলে। আবার কেউ কেউ দলকানার দম্ভে অপরের অধিকার কেড়ে নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠে গান গায়, নাচ করে, মাদক ও নারী ভোগে মত্ত হবার জেরে জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আবোল-তাবোল কথা বলে নিমিষেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আর সেটা হারাবেই তো। যা কষ্ট করে অর্জিত তা হারানো এত সহজ নয়। যা বিনা কষ্টে বা ‘ফাও’অর্জিত হয় তা তাসের ঘরের মত নিমিষেই উড়ে যেতে পারে। এটাই নিয়তির নিয়ম। তাই উন্নাসিক সবাইকে সবক্ষেত্রে অতিলোভ, ক্ষোভ ও নিজ নিজ জিহ্বা সামলানোর জন্য জোর চেষ্টা করা জরুরি।

লেখক সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক ডীন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। E-mail: [email protected]

‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রবীন্দ্রনাথ কোনদিন আমাকে কল করেননি!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম ভাঙলো একা একাই।

একটু ঘেমে গিয়েছি।

চোখ খুলে একবার মনে হলো, নিজের ঘরটাকেও চিনতে পারছি না।

মোবাইলটা বাজছে। সম্ভবত: এ কারনেই ঘুম ভেঙেছে।

- হ্যালো, কে? (ঘুম এখনো কাটেনি আমার কন্ঠে)

- আমি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর। তুমি এক সময় আমার কবিতা পড়েছো।

- ও, কি চাই? আমি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কাজে জড়িত নই।

- আমার ভ্যাকসিন লাগবে না, বাবা।

("বাবা" বলায় একটু ঘুম কাটিয়ে কথা বলা চেষ্টা করলাম। কারন রোগীদেরকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন আমার সার্জারীর গুরু)

- ও, কেন ফোন দিয়েছেন, কেউ কি অসুস্থ?

- হ্যাঁ অসুস্থ। সেটা বলতেই ফোন দেওয়া।

- জ্বী, বলুন। আমি শুনছি।

- বৈদ্য রাজীব, তোমার সমাজের একদল পুরুষ খুব অসুস্থ।

- আচ্ছা কাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেবেন, দেখে দেবো।

- পারবে তো দেখে দিতে? আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। তোমরা কবিতা পড়া ছেড়ে দিলে কেন?

- কবিতা পড়া ছাড়িনি তো।

- মিথ্যা কথা। তোমরা এখন কবিতা পড়ো না। আগের পড়া কবিতাগুলো কোটেশন অভ্র দিয়ে লিখে ফেইসবুকে পোস্ট করো। শেয়ার করো। ব্লগে লেখো। কিন্তু কবিতা আর পড়ো না।

- ও, তাহলে বোধহয় ভালো লাগে না। আপনি লেখেন এখনো?

- না। লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা-গল্প কিছুই লিখি না

- কেন?

- তোমাদের সমাজে নিরুপমা, কেটি, বিনোদিনী, গোড়া কিংবা হৈমন্তী এরা আজো কেউ ভালো নেই। অপু সেদিনও ওরা বাবার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে নি, আজো একজন মেয়ে লাঞ্ছিত হলে তোমরা প্রতিবাদ করো না। তোমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মেয়েদের সম্ভ্রমহানি হয়। তোমরা প্রতিবাদ করো না।

- নাহ। প্রতিবাদ তো করি।

- দৌড়ে গিয়ে ফেইসবুকে বসে টিপাটিপি শুরু করলে তাকে কি প্রতিবাদ বলে? প্রোফাইল পিকচার টা কালো রঙের করে দিলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়? গান্ধী - মুজিবরা এই শিখিয়েছিলো তোমাদের?

- না, আমরা বীরের জাতি, আমরা অন্যায় সহ্য করি না।

- এজন্যই আমি গল্প-কবিতা লেখা ছেড়েছি।

- মানে?

- নিজেকে বীরের জাতি ভেবেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু তোমাদের নির্বুদ্ধিতায় আমারই লেখা নারী চরিত্ররা আমাকে অপমান করে। আমারই লেখা ধর্মান্ধ চরিত্র গুলো আমাকে দেখে হাসে।

- পহেলা বৈশাখের কথা বলছেন? নাকি বাউলের চুল কেটে দেওয়া? নাকি মৌলবাদীদের ফতোয়া? আমি বুঝতে পারছি না।

- কুষ্টিয়ায় ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ গেছি বহুবার। এমন বাংলাদেশ আমরা রেখে আসিনি। হানাদার নেই যে দেশে, সে দেশে আমাদের কন্যাদের ধর্ষণ করে কারা? কেন আজো আমার দেশের বাতাস একজন অত্যাচারিত মেয়ের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে, বলতে পারো?

- আপনি রাজনৈতিক কথা বলছেন।

- "মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে... পার হয়ে আসিলাম... আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়, আমার পুরানো নাম, ..ফিরিবার পথ নাহি"

- থামেন, মাঝরাতে কবিতা ভালো লাগছে না

- থামলাম, কিন্তু মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের চিকিতসা শুরু করো বৈদ্য।

- সে দায় কি আমার একার নাকি?

- দায় আমাদের সবার। হৈমন্তীর গা থেকে কাপড় খুলে নেওয়া হলে, ওর আগে তোমার সমাজ ল্যাংটা হবে, তুমি ল্যাংটা হবে - সাদা পাঞ্জাবী পড়ে শরীরের কালো লুকানো যায়, মনের কালি না। তাই সমাজের চিকিৎসা করার দায় বৈদ্য-বণিক-শিক্ষক-ছাত্র-সাহিত্যিক-ব্লগার সবার!

- কি করবো?

- তোমার যতোটুকু করার আছে।

- যদি আমার ক্ষতি হয়?

- তোমার ঘরের সামনে তোমারই প্রেয়সীর কাপড় ধরে টানা হলো। এর থেকে আর কি ক্ষতিই বা হতে পারে। এটা তো ১৯৭১ না। নাকি তোমরা মনে করো, মরে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার গুলো, তোমাদের শরীরে আবার জন্ম নিয়েছে?

- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলেন?

- আমার লেখা গানটাকে এবার ছেড়ে দাও। ওটা নিয়েও তোমাদের জাতের রশি ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এক মালাউন কবির গান দিয়ে কেন তোমরা দেশের সব শুভ কাজ শুরু করবে?

- আমার ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে হসপিটালে যাবো

- বেশ, বাঙ্গালী। জাতি হিসেবে তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঘুমিয়ে থাকো। ঠিক যেমন করে আমার নোবেলটি চুরি গেলো, তোমার-তোমাদের প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও নিঃশব্দে চুরি গেছে তা তোমরা জানো না।

- আচ্ছা আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন, হ্যালো... ... শুনছেন...

- টু... টু... ... টুট...টু

আমি ঘুমিয়ে গেলাম, অনেক গভীর সে ঘুম...

আমার সামনে আমার সমাজের মেয়েরা আক্রান্ত হলেও ভাঙে না সেই ঘুম...

আমার সামনে রেল স্টেশনে কয়েকজন মিলে একজন নারীর কাপড় ধরে টানলেও ভাঙে না সেই ঘুম। যে দেশে হানাদার নেই, চরিত্রহীন জমিদার নেই, তারপরো মেয়েদের সম্ভ্রম হানি হলে ভাঙে না সেই ঘুম... সেই ঘুম পাচ্ছে আমার...

পুনশ্চ:

আজ নারী দিবস না। এটা নারী দিবসের লেখা না। যে দেশে বাঁধাহীন ভাবে পথে ঘাটে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে, এটা সেই 'প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া' মানুষের দেশের জন্য লেখা। ভাগ্যিস আমরা সেই দেশে থাকি না!

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

'স্টকহোম সিনড্রোম' নাকি আবহমান প্রতিবাদহীন নারী নির্যাতন?



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৩ সালে সুইডেনে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সে বছর ২৩ শে আগস্টের সকালবেলা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে একটা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ডাকাত দল অনেক জনকেই ব্যাংকের মধ্যে জিম্মী করে রাখেন এবং সেটা টানা ৬ দিন ধরে। তাদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ছিলেনই।

ছয় দিন পর পুলিশ যখন ডাকাত দলের উপরে অ্যাকশনে যায়, তখন ব্যাংকে জিম্মী থাকা মানুষগুলো উলটো ডাকাতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে পরেন।

যারা আটকে রাখলো, তাদের প্রতিই এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরী হলো! এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয় যখন অপহৃত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আবেদন জানিয়েছিলেন অপহৃত ব্যক্তিরা। এই ঘটনা তখন ঘটা করে রেডিওতে প্রচার পেয়েছিলো।

এই ঘটনা থেকেই "স্টকহোম সিনড্রোম" কথাটার জন্ম। আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটে।

দেখা যায়, একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলেন, এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে হত্যা চেষ্টাও করলেন। পরবর্তীতে স্ত্রীর বাপ-ভাই যখন তার স্বামীর নামে মামলা করলো, স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিলেন যে, এই অত্যাচার তার স্বামী করেন নাই বা তার স্বামী একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ।

এটাকেও 'স্টকহোম সিনড্রোম' বলা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত হতে হতে অত্যাচারকারীর প্রতি এক সময় একটি অসুস্থ আবেগ বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার জন্ম হয়।

অত্যাচার সহ্য করে হলেও তাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই একটি জনপদে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনগুলো আলো বা বিচারের মুখ দেখে না।

২০০২ সালে মাত্র স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। তাকে প্রায় ২ বছর পরে অপহরণকারীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ণ ছিলো। তদন্তে দেখা যায়, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো!

২০২২ সালে একটি জেলার একটি লোকারণ্য রেলস্টেশনে একজন নারী অন্য একজন নারীর উপরে আক্রমনাত্নক হয়ে ওঠেন। প্রথন নারীর অভিযোগ এই যে, দ্বিতীয় নারী একটি স্লিভলেস পোশাক পরিধান করেছেন যা মোটেও সেই দেশে কোন ফৌজদারী বা দেওয়ানী অপরাধ না।

কিন্তু সারা জীবন একটি মহলের দ্বারা শাসিত ও পদদলিত হয়ে থাকতে থাকতে প্রথম নারী তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন। পোশাকের মতো একটি সাধারণ নাগরিক 'অধিকার' তার কাছে অনৈতিক, বেমানান ও অসামাজিক মনে হচ্ছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অসুস্থ অংশের এই নোংরা শোষণের প্রতি তার গভীর আবেগ ও ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। তাই সেই দিন একজন নারী হয়েও অন্য একজন নারীকে আক্রমণ করতে, শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করতে এবং দ্বিতীয় নারীর গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও তার খারাপ লাগছিলো না। অথচ 'স্বল্প' পোশাক পরিধান নিয়েই তার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি নিজেই আবার অন্য নারীটির পোশাক ছিঁড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই কাজে তিনি সেই সমাজের গুটিকয়েক পুরুষের সাহায্য নিচ্ছেন!

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয় না। মানসিক দৈন্যতার এই স্তরে যেতে কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

অত্যাচারকারীর প্রতি এই স্নেহ বা আবেগ অনেক সময় বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি এ সময় কেউ উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাকেও আক্রমণ করে বসতে পারেন স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি। অবশ্য ক্রিমিনোলজিস্টরা অনেকে স্টকহোম সিনড্রোমে বিশ্বাস করে না।

যাই হোক, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত একটি অন্যায় দেখছেন, অথচ সেই অন্যায়ে আপনি কোন বাঁধা দিচ্ছেন না। বরং সেই অন্যায় আপনার ভালো লাগছে, মজা লাগছে। সেই অন্যায়কে আপনি যত্নে এবং খুব গর্বে লালন করছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন -

এরকম উদাহরণ এই দেশে কি খুব বেশি অপ্রতুল?

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

জেট ফুয়েল প্রাইস, সরু আলোর পথটাকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনঝিন পায়ে নুপুরের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীণ পদ্মা অয়েল কোম্পানী।

বাংলাদেশ এভিয়েশনের যাত্রা শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন জনগন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকে আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বৃহদাংশই বহন করছে বিদেশী বিমান সংস্থাগুলো।

নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারনে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহ প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সরকারী বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রমুখ।

কোভিডকালীন সময়  ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছিলো প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫ বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল প্রাইসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। যে রেকর্ড একটি খাতকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সকল বিদেশি এয়ারলাইন্স এর সাথে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার উপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্স চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দর সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইন্স- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেস্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের উর্ধ্বগতির সাথে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারনে এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার বছর ঘোরার আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। যার ফলে বাংলাদেশ এভিয়েশন ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিলো সাথে বেসরকারী বিনিয়োগে নিরোৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিলো এভিয়েশন খাতে।

কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইন্সগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলো এভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার উপর বর্তায়।

এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে।

সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সাথে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সকল ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সকল শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলে সেই দিকে সচেতন হলে এভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে।

জেট ফুয়েল প্রাইস সহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমূখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।    

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;