পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃতচারী অর্থনীতিবিদ



ড. মতিউর রহমান
পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃততচারী অর্থনীতিবিদ

পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃততচারী অর্থনীতিবিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি  বেশকিছু মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করেন। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘পদ্মাসেতু নির্মাণ’ প্রকল্প। এটি বাংলাদেশিদের জন্য একটি স্বপ্ন হিসেবে চিত্রিত বা রূপায়িত হয়েছিল। আর এই স্বপ্নের রূপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফলে এবং তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক যখন ২৯ জুন ২০১২ সালে পদ্মাসেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে এবং অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও সরে দাঁড়ায় তখন ওই বছরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নিমার্ণের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় মনোভাবের বাস্তব রূপায়নই আজকের স্বপ্নের পদ্মাসেতু। আমদের মত আমজনতার এটা জানা নেই যে, তিনি কিসের ভিত্তিতে, কোন ভরসায় এরকম একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন।

তবে এই ঘটনার পরপরই আমরা দেখতে পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর মানবিক উন্নয়ন দর্শনের একজন নিঃস্বার্থ ছাত্র ও স্বনামধন্য গবেষক অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত পদ্মাসেতু নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও প্রায়োগিক একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন যা ওইসময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। বৃহৎ গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ”। গবেষণাপত্রটি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কর্তৃক আয়োজিত “নিজ অর্থে পদ্মাসেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসেবে ১৯ জুলাই ২০১২ সালে ড. আবুল বারকাত কর্তৃক পঠিত হয়। ওই গবেষণাপত্রেই তিনি উল্লেখ করেন “বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল অনৈতিক ও মহা অন্যায় তবে তা বাংলাদেশের জন্য এক মহা আশীর্বাদ (blessing  in disguise)। ১৯৭২-৭৩ এর বাংলাদেশ অর্থনীতি আর ২০১২-র অর্থনীতি এক কথা নয়। এখন আমাদের অর্থনীতি অনেক গুণ বেশি শক্তিশালী; জনগণ অনেকগুণ বেশি আত্মশক্তি-আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। পদ্মা সেতু নির্মাণে জনগণ এখন অনেকগুণ বেশি ত্যাগ স্বীকারে সর্বাত্মক প্রস্তুত। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি ও তা সুসংহতকরণের এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।”

২০১২ সালের ওই গবেষণাপত্রে তিনি দেখান যে “ চার বছরেই পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব এবং এর জন্য ব্যয় হবে আনুমানিক ২৪,০০০ কোটি টাকা। আর ঠিক একই সময়ে অর্থাৎ ৪ বছর সময়কালে ১৪টি বিভিন্ন উৎস থেকে সম্ভাব্য অর্থ সংস্থান হতে পারে ৯৮,৮২৫ কোটি টাকা সেহেতু পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ পরিকল্পিতভাবে এমুহূর্তেই শুরু করা সম্ভব। অর্থ সংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দিতে হবে সুদ বিহীন উৎসসমূহে― যেসব উৎস থেকে সম্ভাব্য আহরণ হতে পারে মোট ৪৯,১৫০ কোটি টাকা অর্থাৎ ২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ।”

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “সেই সাথে জোর দিতে হবে নিজস্ব অর্থায়নের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ সংশ্লিষ্ট খাতসমূহে; এ ক্ষেত্রে করণীয় হবে নিম্নরূপ: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা; প্রবাসীদের প্রেরিত হুন্ডিকৃত অর্থ উত্তরোত্তর অধিক হারে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা; পদ্মা সেতু বন্ড (৮ থেকে ৩০ বছর মেয়াদী), সার্বভৌম বন্ড ও পদ্মা সেতু আইপিওতে প্রবাসী-বিদেশিদের বিনিয়োগে আগ্রহী করা; টাকার অঙ্কের উদ্বৃত্ত অর্থ (৪ বছরে মোট ৭৪,২২৫ কোটি টাকা) উৎপাদনশীল বিনিয়োগ করে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করা।”

তিনি বলেন, “করণীয় বিষয়াদির মধ্যে গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে: (১) ৩টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন। সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ও বাস্তবায়ন সমন্বয়কারী কমিটি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পদ্মা সেতু ইনটিগ্রিটি কমিটি, আর সাথে থাকবে অর্থায়ন-অর্থসংস্থান কমিটি এবং কারিগরী-প্রযুক্তি কমিটি, (২) “পদ্মা সেতু পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী” গঠন করে তার মাধ্যমে বাজারে আইপিও ছাড়া, (৩) পদ্মা সেতুসহ বৃহৎ অবকাঠামোর জন্য নির্মাণ সামগ্রী (যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল) উৎপাদন নিমিত্ত শিল্প স্থাপনে পদক্ষেপ নেয়া, (৪) সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের (দেশে-বিদেশে অবস্থানরত) হালনাগাদ তালিকা প্রণয়ন ও সংরক্ষণসহ জরুরিভিত্তিতে এবং নিয়মিত তাদের পরামর্শ গ্রহণের জন্য জীবন্ত-রিয়েল টাইম ওয়েব সাইট চালু রাখা, (৫) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ÒFriends of Padma Bridge, Bangladesh” চেতনায় উদ্বুদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলা, (৬) গণ অবহিতকরণ কার্যক্রমসহ সংশ্লিষ্ট প্রচার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।”

হিসেবপত্তর করে তিনি আরো দেখান যে “পদ্মা সেতু নির্মাণের ৩০ বছরের মধ্যেই নির্মাণ ব্যয় উঠে আসবে; ১০ম বছর থেকে যেহেতু ঘাটতি থাকবে না সেহেতু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পদ্মা সেতুর জন্য আর বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন হবে না; সেতু চালু হবার ৪০-তম বছরে নিট ক্যাশ ফ্লো ১০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আর ১০০তম বর্ষে তা ছাড়িয়ে যাবে ২,০০,০০০ কোটি টাকা; উন্নত কানেকটিভিটি সমগ্র অর্থনীতির (শুধু দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের নয়) চেহারা আমূল পাল্টে দেবে। সুতরাং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বিনির্মাণ-বিষয়টি হতে পারে উন্নয়ন আন্দোলনের (development as movement) বিশ্ব নন্দিত মডেল Made in Bangladesh”।

বাঙালির অহংকার ও গর্ব―স্বপ্নের পদ্মাসেতুর শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আজ ২৫ জুন। এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে উতসবের আমেজ। ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংক পুরোপুরি উদ্দেশ্যমূলকভাবে পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি যখন বাতিল ঘোষণা করল, যার ফলে বিশ্বব্যাপী দেশ-জাতি-সরকারের ভাবমূর্তির অপরিসীম ক্ষতি হলো; আর অন্যদিকে, সামনে ২০১৪ সালের নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন―ঠিক এ ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব” শীর্ষক গভীর গবেষণালব্ধ লিখিত দলিল নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি,‘গণমানুষের অর্থনীতিবিদ’ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। আর সামগ্রিকভাবে প্রতিকূল এক জটিল অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কালক্ষেপণ না করে ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে “নিজ অর্থে পদ্মা সেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনার আয়োজন করে।

উক্ত জাতীয় সেমিনারে অধ্যাপক আবুল বারকাত “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ” শিরোনামে তার সৃজনশীল ও বাস্তবধর্মী গবেষণাকর্ম উত্থাপন করেন। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ যে সম্ভব এ দেশে এ কথা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্লাটফর্মে তিনিই প্রথম নৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রায়োগিক যুক্তি দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণপূর্বক উত্থাপন করেন।

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ছাড়া কেউ তখন বিস্তারিত হিসেবপত্তরসহ উল্লেখ করেননি যে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব। একমাত্র তিনিই উল্লেখ করেছেন, বিশ্বব্যাংক ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে বলে ঋণ চুক্তি বাতিল করে। এটিই ছিল বিশ্বব্যাংকের সাথে একমাত্র মেগা প্রকল্পের চুক্তি। যা চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাতিল করা হয়। কারণটি ছিল খুবই সোজা―মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আর ক্ষমতায় দেখতে চাইনি। এটি তাদের দ্বারা গতানুগতিক চর্চা করা ''Regime Change'' ফর্মূলা।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পদ্মাসেতু এ দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবার ক্ষেত্রে ও জাতীয় একতা বৃদ্ধিতে এই সেতু মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। এক্ষেত্রে ড. বারকাত কর্তৃক “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্যের শ্রেষ্ঠ সুযোগ”, গবেষণা কর্মটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। 

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা ও গবেষণায় নীরবে, নিভৃতে ড. বারকাত যে অবদান রেখেছেন ও রেখে যাচ্ছেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ পর্যন্ত তিনি যত গবেষণাকর্ম করেছেন সেসবের কয়েকটি মাইলফলক বা দিকনির্দেশক হিসেবে যেমন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হয়েছে তেমনি এদেশের উন্নয়নে তথা নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন শীর্ষক গবেষণাটিও ড. বারকাতের একটি দিকনির্দেশক ও মাইলফলক গবেষণা।

২০১২ সালে গবেষিত ও প্রকাশিত ড. আবুল বারকাতের ওই গবেষণা পুস্তিকাটি একটি নতুন সংযোজিত অধ্যায়সহ ২০২১ সালে গ্রন্থাকারে দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির শিরোনাম “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ‒ ২০১২ সালে গবেষণায় প্রমাণিত‒ ২০২১ সালে দৃশ্যমান বাস্তবতা”। গ্রন্থটির দ্বিতীয় প্রকাশ সম্পর্কে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তৎকালীন কার্যনির্বাহক কমিটি যে ভূমিকা-বক্তব্য প্রদান করেছেন তা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করি। “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব” দেশ ও জাতির গৌরবান্বিত উন্নয়ন-প্রগতিতে অধ্যাপক আবুল বারকাতের এই দিকনির্দেশক গবেষণাকর্মটির জন্য পুরো জাতি দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”

পরিশেষে বলা যায় আবুল বারকাত হলেন সেই অর্থনীতিবিদ যিনি সর্বদা দেশের ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন; তাদের কথা বলেন, তাদের উন্নয়নে কাজ করেন। সেজন্য তিনি গণমানুষের অর্থনীতিবিদ হিসেবেও খ্যাত। তিনি অন্তরে ধারণ করে আছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বির্নিমাণের স্বপ্ন। নিজ অর্থে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা নিয়ে তিনি নীরবে, নিভৃতে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গবেষণা করে যে তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন সেসময় তেমনটি আর কেউ করেছিল বলে জানা নেই। তাঁর সুগভীর ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে তিনি এদেশে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, আলোকিত ও শোভন সমাজ বির্নিমাণে কাজ করে যাচ্ছেন।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, আমাদের আত্মমর্যাদা



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে’, মন্তব্যের আলোচনা থামেনি এখনও। এবার নতুন এবং আরও স্পর্শকাতর বক্তব্য এসেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের কাছ থেকে। সরাসরি বলেছেন তিনি, ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমনটাই বলেছেন তিনি। তার এই বক্তব্যে দেশবাসী স্বভাবত ক্ষুব্ধ হবে, রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আসবে, বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন রকমের আলোচনা-সমালোচনা হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “আমি ভারতে গিয়ে বলেছি, শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। শেখ হাসিনা আমাদের আদর্শ। তাকে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমাদের দেশ উন্নয়নের দিকে যাবে এবং সত্যিকারের সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক একটা দেশ হবে। ...শেখ হাসিনা আছেন বলে ভারতের যথেষ্ট মঙ্গল হচ্ছে। বর্ডারে অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না। আটাশ লাখ লোক আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর ভারতে বেড়াতে যায়, ভারতের কয়েক লাখ লোক আমাদের দেশে কাজ করে। ...শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা দরকার, আমি ভারতবর্ষের সরকারকে সেটা করতে অনুরোধ করেছি।” বক্তব্যটি প্রায় প্রত্যেকটি গণমাধ্যমে এসেছে।

মন্ত্রী যেখানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সেটা দল ও সরকারের নীতিনির্ধারণী গোপন কোন বৈঠক ছিল না। প্রকাশ্য অনুষ্ঠান। এমন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে এমন তিতা সত্য প্রকাশে দল ও সরকার যে বিব্রত হবে তা সন্দেহ নেই। এমনিতেই দেশে আছে ভারতবিরোধী নগ্ন প্রচারণা। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের কথাটি সর্বজনবিদিত। আছে সরকারে ভারতের হস্তক্ষেপ বিষয়ক অপ্রমাণিত প্রচারণাও। এই প্রচারণা চলমান থাকাকালে মন্ত্রীর বক্তব্যে প্রচারণাকে শক্ত ভিত্তি দেবে নিশ্চিত।

মন্ত্রীদের বিদেশ সফরের পর সাধারণত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায় না। কী ধরনের আলোচনা, দ্বিপাক্ষিক অনিষ্পন্ন নানা বিষয়ে কতটুকু অগ্রগতি সে খবরও জানা যায় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। যেটুকু আসে সেটা নানা অনুষ্ঠানে অথবা অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে। ওটা যথেষ্ট না হলেও এটাই মেনে নিয়েছি আমরা। এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্রে আমরা জানতে পারল সবশেষ বৈঠকে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতবর্ষের সরকারকে অনুরোধ করার কথাটাই। মন্ত্রী সবশেষ যখন ভারত সফর করছিলেন তখন সিলেট ভাসছিল বানের জলে। ওই সফর শেষ করে তিনি দেশে ফিরেছিলেন এবং এরপর বন্যার্তদের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকের আর কিছু না জানলেও এবার আমরা ‘সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতকে অনুরোধের’ যে কথাটা আমরা জানলাম সেটা আর যাই হোক দেশবাসীর জন্যে সম্মানের নয়। একই সঙ্গে সরকারের জন্যেও বিব্রতকর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোজাসাপ্টা কথাগুলো বলে তোপের মুখে পড়েছেন। ব্যক্তিগত ক্রোধের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন ঠিক, কিন্তু এরমাধ্যমে তিনি কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দীনতা সামনে আনলেন না? এজন্যে তিনি ধন্যবাদ পেতেই পারেন। হতে পারে তিনি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছেন, বেকায়দায় পড়তে যাচ্ছেন নিজেও; তবু এর মাধ্যমে দেশবাসী অন্তত জানল কোন পথে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি! এমন নতজানু বক্তব্যের কারণে এতবড় দায়িত্বে থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে নানা আলোচনা হতে পারে, কিন্তু এটা নিশ্চয়ই তার ব্যক্তিগত অবস্থান নয়; এটাই কি সরকারের অবস্থান নয়? সরকার যদি এমন পররাষ্ট্রনীতির পথ ধরে এগোয় তবে আমাদের প্রতিবাদের দরকার আছে। আমরা প্রতিবাদ করি।

এ কে আব্দুল মোমেন আগেও একবার বলেছিলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো।’ সম্পর্কের গভীরতা বুঝাতে বক্তব্যের অন্তর্গত ভাব ধরতে অক্ষম অনেকেই সে সময় সমালোচনা করেছিল, এখনও করেন। এনিয়ে আলোচনা নয়। তবে কোথায় কী বলতে হবে এটা বুঝা উচিত রাজনীতিক, বিশেষত মন্ত্রীদের। রাজনীতির মাঠ ও জনগণ উচ্চাঙ্গ সংগীতের শ্রোতা নয় যে অন্তর্গত ভাব ধরতে বসবে। এই মাঠ সবসময়ই উত্তপ্ত এবং অপেক্ষায় অন্যের বক্তব্যের ফাঁকফোকর ধরতে। মন্ত্রী কেন তাদের সুযোগ দিচ্ছেন? এরইমধ্যে সপ্তাহ পেরোয়নি আগের মন্তব্যের রেশ কাটতে যেখানে তিনি বলেছিলেন ‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে’।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ছিলেন তিনি সিলেট-১ আসনে। এই আসনে আওয়ামী লীগ দলের কোন রাজনীতিককে মনোনয়ন দেয় না। নির্বাচনে জিততে রাজনীতির বাইরের মানুষদেরও মনোনয়ন দিয়ে আসছে। ওখানে আবুল মাল আবদুল মুহিতের উত্তরসূরি খুঁজতে দুইবছর আগে দীর্ঘদিন কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করা এ কে আব্দুল মোমেনকে আমেরিকা থেকে নিয়ে আসা হয়। এই সময়ে তিনি নানা নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশেছেন নানা সভা-সমাবেশের মাধ্যমে। নির্বাচনের সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের এক কলোনিতে এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে নির্বাচন যারাই করছে তারা প্রত্যেকেই যোগ্য। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী (বিএনপির মনোনীত প্রার্থী) তিনিও যোগ্য, আমিও যোগ্য। তবে তার চাইতে আমি বেশি যোগ্য’। তার ওই বক্তব্যে অনেকেই নানা কথা বলছিল সত্য, কিন্তু এটা ছিল সারল্যের প্রকাশের সঙ্গে অন্যকে ছোট না করে না দেখার বড় ভাবনাও। সচেতন মানুষমাত্র এমন বক্তব্য পছন্দ করবে ঠিক, কিন্তু রাজনীতির মাঠ...সে ভিন্ন গল্প!

এসব ‘সরল বিশ্বাসে’ বলা কথা জানি। জানি তিনি তার ক্ষেত্রে সৎ ও পরিশ্রমী। তবু বারবার খেই হারিয়ে ফেলছেন। কারণ একটাই রাজনীতি না করা, রাজনীতির নানামুখী চরিত্রের খবর না জানা, না রাখা। পিতামহের কাল থেকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উচ্চশ্রেণির তারা, যাদের সুযোগ ছিল না মানুষের ভাষা রপ্তের, মানুষের নানামুখী চিন্তার সঙ্গে ছিল না পরিচিতি। তাই সব কথা হড়হড় করে বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে। তার অগ্রজ প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজে যা ভেবেছেন সেটাই সরাসরি বলে দিয়ে একাধিকবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন, কিন্তু দিনশেষে তিনি সফল জীবনের অধিকারী, তিনি সফল অর্থমন্ত্রী ছিলেন বলে পার পেয়ে গেছেন। কিন্তু এ কে আব্দুল মোমেনের সফল হতে ঢের বাকি। এখনই তাই সব কথা বলা প্রকাশ্যে বলা উচিত নয় তার। জায়গা বুঝে কথা বলতে পারাটাও বিশেষ যোগ্যতা! এখানে এখনও সফল নন তিনি।

‘ভারতকে অনুরোধ করেছি শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে’; পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সরকারপক্ষ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সত্য, তবে দেশের নাগরিক অন্তত এই বক্তব্যে বুঝতে পারছে দিন-দিন আমরা আত্মমর্যাদা হারাতে বসেছি। আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, দেশের অর্থায়নে আমরা পদ্মাসেতুর মতো মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি, এছাড়াও বৈশ্বিক নানা সূচকে আছে বাংলাদেশের নানা অগ্রগতি। কিন্তু এই অগ্রগতির বিপরীতে আত্মমর্যাদার এই অধোগতি আমরা মেনে নিতে পারছি না। টিকিয়ে রাখতে প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপের আবদারের বিষয়ে তাই সরকারের সুস্পষ্ট বক্তব্য আশা করি। এটা আত্মমর্যাদার প্রশ্ন, ছোটখাটো কোন বিষয় নয়!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের ওপর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে সম্প্রতি জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী, টাঙ্গাইল জেলার টাঙ্গাইল সদর, ঘাটাইল, মধুপুর, ও দেলদুয়ার উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে যাই। উপজেলাগুলোর প্রত্যন্ত অঞ্চলে জাতীয় পর্যায়ের দুটি বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক বাস্তবায়িত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির কয়েকটি সমিতির অনেক সদস্যের সাথে আলোচনা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে সাম্প্রতিককালে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও ওঠে আসে।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের সকলেই নারী সদস্য এবং প্রত্যেকেই বিবাহিত। তাদের অনেকেরই ছোট ছোট ছেলে মেয়ে রয়েছে। তাদের বেশিরভাগেরই অল্প কিছু চাষাবাদের জমি আছে, কেউ কেউ গরু, ছাগল পালন করেন। আবার অনেকেরই স্বামী বা ছেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত। অনেকেই ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালান। অনেকেই রিকশা বা ভ্যান চালান। আবার কেউ কেউ স্রেফ দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে শ্রমিকের কাজ করেন। তাদের গড় মাসিক আয় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ হাজার টাকার মধ্যে।

আকলিমা বেগম এর বয়স আনুমানিক ৪০ বছর (জাতীয় পরিচয় পত্র থাকা সত্ত্বেও এখনও গ্রামের অনেক মহিলা তাদের প্রকৃত বয়স বলতে পারে না)। সে একটি সমিতির সদস্য। এই সমিতিতে সে প্রতি সপ্তাহে ৫০ টাকা করে সঞ্চয় করত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। তার স্বামী একজন দিন মজুর। দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে সে গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থদের জমিতে কৃষি শ্রমিকের কাজ করে। এতে তার মাসে প্রায় ১২,০০০ হাজার টাকা আয় হয়। আকলিমা বেগমের এক ছেলে ও এক মেয়ে । ছেলে গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র আর মেয়ে ৫ম শ্রেণিতে লেখা পড়া করে।

এ বছর আকলিমা বেগম সমিতি থেকে ২০,০০০ টাকা লোন গ্রহণ করেছেন। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় লোনের টাকা সে কি কাজে ব্যবহার করেছে। সে জানাই সংসারের খরচ মেটানোর জন্য সে এই ঋণ নিয়েছে। কারণ আগে যে টাকা তার স্বামী আয় করত তা দিয়ে কোন প্রকারে তার সংসার চলে যেত। কিন্তু গত কয়েক মাস যাবত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে তার পক্ষে সংসার চালানো ও ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া শেখানো অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

সে আরো জানাই আগে তারা তিন বেলায় পেট ভরে খেতে পারত কিন্তু চালের দাম বেড়ে যাওয়াতে ভাত খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। আগে সপ্তাহে দুই দিন সে তার ছেলে মেয়েকে মাছ ও ডিম খাওয়াতে পারত কিন্তু এখন সে তাও খাওয়াতে পারে না। শাক-সবজি ও সপ্তাহে একদিন মাছ দিয়ে তারা ভাত খেয়ে থাকে। এভাবে অনেক কিছুতেই সংসারের খরচ কমাতে হয়েছে তাকে। আকলিমার মতো আরো অনেকেরই অবস্থা একই রকম।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এই সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান করোনা মহামারি, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, ইত্যাদি কারণে সারা বিশ্বে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের সাধারণ মানুষের এখন নাভিশ্বাস অবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্নভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ ও সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন।

তারা বলছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে, নির্দ্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলি মাংস, মাছ এবং ডিম খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছে এবং আয়ের সাথে ব্যয়ের সংগতি রক্ষায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কম খরচ করার পরিকল্পনা করছে। বিভিন্ন পণ্যের দাম আগে থেকেই বেশি ছিল এবং জ্বালানি তেলের দামের সর্বশেষ রেকর্ড বৃদ্ধি সেটিকে আরও উপরে ঠেলে দিয়েছে এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্যের যোগান ঠিক রাখতে রীতিমত হিমসিম খেতে হচ্ছে। নিন্ম আয়ের লোকদের জন্য প্রোটিনের প্রধান উৎস ডিম যার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ।

পরিসংখ্যান দেখায় যে গত বছর (২০২১) নভেম্বর থেকে জ্বালানির দাম কয়েক দফায় ৭৫ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডলারের ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত আট মাসে কমপক্ষে ৪০ ভাগ বেড়েছে। প্রধান প্রধান খাদ্যদ্রব্য যেমন চাল, ডাল, আটা, তেল, মাছ, মাংস, শাক, সবজী , কাঁচা মরিচ ছাড়াও গৃহস্থালীর বিভিন্ন পণ্যের দামও বেড়েছে। যদিও নিন্ম ও নির্দ্দিষ্ট আয়ের আয়ের লোকেরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তাৎক্ষণিক শিকার, মধ্যম আয়ের লোকেরাও এর প্রভাব তীব্রভাবেই অনুভব করছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আয়ের সাথে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেড়ে যায়, তখন স্বল্প ও সীমিত আয়ের লোকেরা প্রথমে শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ কমিয়ে দেয়। তারা মাংস, মাছ, ফল এবং দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা বন্ধ করে এবং চাল ও আলু সহ শর্করা জাতীয় খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশে একটি অপুষ্টিজনিত প্রজন্ম তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি ১ কোটি ৭০ লাখ বিবাহিত নারী অপুষ্টির শিকার। অন্যদিকে অপর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে দেশে তীব্রতম অপুষ্টিতে (সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন বা এসএএম) ভুগছে দেশের অনেক শিশু। বিশেষ করে গত এক বছরে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির এ তীব্রতম মাত্রার প্রকোপ বেড়েছে অনেক বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে এতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যাও।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা নিতে আসা তীব্রতম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় ৭২ শতাংশেরও বেশি। সুতরাং সাম্প্রতিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নারী ও শিশুদের অপুষ্টির মাত্রা যে আরো বাড়িয়ে দিবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর অপুষ্টিতে ভোগা জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা যে কম হয় তা আমরা সবাই জানি।

একথা সত্য যে করোনা মহামারি, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ, জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছে। এছাড়াও আমদানি ও রফতানির ভারসাম্য নষ্ট হওয়া ও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসায় বৈদেশিক মুদ্রার বিশেষ করে ডলার রির্জাভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে জ্বালানীর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে এলাকাভিত্তিক বিদ্যুতের লোডশেডিং দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে খাদ্য , শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি সেক্টরে এর প্রভাব পড়েছে। এই সুযোগে অনেক অসৎ ব্যবসায়ী নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে জনজীবনকে দূর্বিষহ করে তুলছে। জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। সুতরাং এ বিষয়ে সরকারকে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন স্বল্প ও নির্দ্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই ক্রমবর্ধমান চাপ যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব রোধ করা প্রয়োজন। বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যাংকগুলোকে গ্রাম পর্যায়ে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে। যাতে করে সাধারণ মানুষ তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে।

সর্বোপরি, অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পণ্যের বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।

সরকারকে প্রতিটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। বর্তমানে আইন অনুযায়ী দোকানে দোকানে পণ্যের মূল্য তালিকা টানানো বাধ্যতামূলক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই আইন প্রয়োগের ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিয়ে থাকে। এছাড়া দেশের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার আয়ত্বে আসবে।

তবে শুধু সরকার নয়, সাধারণ মানুষকেও দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধের জন্য সামাজিকভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অসৎ ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমগুলোকে অসৎ ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এভাবে সরকার, বিরোধীদল, গণমাধ্যম, জনগণ ও ব্যবসায়ী সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এটাই আজ দেশের সাধারণ মানুষের একান্ত প্রত্যাশা।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

 

;

স্মরণেরই নয় কেবল, মুজিব চর্চারও



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' বইগুলোর পাঠকমাত্রই জানে তার জবানিতে জীবনের কিয়দংশ। বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন বলে কিছুটা গ্রন্থিত, যেখানে ছিল এক সৎ লেখকের প্রকাশ। বাকিদের যারা লিখেছেন তাদের কেউ কেউ সত্য বয়ানের চেষ্টা করেছেন, অনেকেই অন্য কিছু। এই অন্যকিছুর চেষ্টা অথবা অপচেষ্টায় ছিলেন তারা নিজেদের সৎ ইতিহাসকথক অথবা লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি, অন্তত এই ক্ষেত্রে। সততাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াদের যথারীতি আক্রোশ বিদ্যমান, যা মূলত 'পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ কেন' শীর্ষক প্রশ্ন থেকেই উদ্ভূত।

১৯২০ থেকে ১৯৭৫; বঙ্গবন্ধু বেঁচেছিলেন ৫৪ বছর ৫ মাস। মাত্র সাড়ে ৫৪ বছরের জীবনে কেবল জেলখানাতেই কেটেছে তার ৪ হাজার ৬৮২ দিন। ৫৪ বছর দীর্ঘজীবন নয়, কিন্তু এরমধ্যে পৌনে তেরো বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়ে দেওয়া ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এ সময়ের মধ্যে ছিল ব্রিটিশ শাসনে সাত দিন, বাকিটা পাকিস্তানের শোষণের সময়। কারাগারে যাওয়ার কারণ বাঙালির স্বাধিকার, স্বাধীনতা আর মুক্তি। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করে দেওয়ার অদম্য বাসনা ছিল তার, তাই জীবনের সোনালী সময়ের সবটুকুই বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি দেশের জন্যে।

শেখ মুজিব জন্মেছিলেন ব্রিটিশ শোষণের কালে। তার কারাজীবনের প্রথম বছরটা ছিল ১৯৩৮, যখন তিনি স্কুলছাত্র। 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে উল্লিখিত আছে কারাগমনের সে ইতিহাস। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সে ঘটনার বয়ান আছে সে বইয়ে। কারাগমনের আগ মুহূর্তে যখন তার বাড়িতে পুলিশ যায় তখন পুলিশের উপস্থিতি তথ্য জেনেও পালিয়ে যাননি। গ্রেফতারি পরোয়ানা নিজে দেখে পুলিশের সঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। গ্রেফতার মুজিব পুলিশ কর্মকর্তার ধমকানো সত্ত্বেও ভড়কে না গিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন।

'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে বিষয়টি এসেছে এভাবে--"...কোর্ট দারোগার রুমের পাশেই কোর্ট হাজত। আমাকে দেখে বলেন, 'মজিবর খুব ভয়ানক ছেলে। ছোরা মেরেছিল রমাপদকে। কিছুতেই জামিন দেওয়া যেতে পারে না'। আমি বললাম, 'বাজে কথা বলবেন না, ভালো হবে না'। যারা দারোগা সাহেবের সামনে বসেছিলেন, তাদের বললেন, 'দেখ ছেলের সাহস'। আমাকে অন্য সকলে কথা বলতে নিষেধ করল। পরে শুনলাম, আমার নামে এজাহার দিয়েছে এই কথা বলে যে, আমি ছোরা দিয়ে হত্যা করার জন্য আঘাত করেছি। তার অবস্থা ভয়ানক খারাপ, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে রমাপদের সাথে আমার মারামারি হয় একটা লাঠি দিয়ে, ও আমাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে চেষ্টা করলে আমিও লাঠি দিয়ে প্রত্যাঘাত করি। যার জন্য ওর মাথা ফেটে যায়। [অসমাপ্ত আত্মজীবনী] এই ঘটনা বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গোপালগঞ্জ সফরকে কেন্দ্র করে যেখানে কংগ্রেস লোকজন বাধা দেওয়ার চেষ্টায় ছিল, এবং শেখ মুজিব ছিলেন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠক। মুজিবের নেতৃত্বগুণের প্রকাশ সেই স্কুলজীবন থেকেই, এবং সে নেতৃত্বগুণের কারণে অন্যায় না করা স্বত্ত্বেও তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে সরাসরি 'না' করেছেন ব্রিটিশদের পোশাকি বাহিনীকে ভয় না করেই।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি জেলে গেছেন ১৮ বার। তার মধ্যে দুই-দুইবার হাজারের বেশি দিন টানা জেলখানায় কাটিয়েছেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারির পর বঙ্গবন্ধুকে একটানা ১১৫৩ দিন কারাগারে আটকে রাখা হয়, বছরের হিসাবে যা তিন বছরেরও বেশি। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টানা ১০২১ দিন কারাগারে কাটান তিনি। এছাড়াও আছে টানা একবছর, দুইবছরসহ নানা মেয়াদের কারাবাস।

মাত্র ৫৪ বছরের জীবনের এক-চতুর্থাংশ সময় যদি কারো কারাগারে কাটে তবে বাকি থাকে কী? এই প্রায় সংক্ষিপ্ত জীবনের মাঝেও আছে আবার শৈশব-কৈশোরকাল; পরিণত বয়সের যেটুকু বাকি থাকে সেখানে কি স্মরণীয়-বরণীয় হওয়ার সুযোগ থাকে? স্বাভাবিক কিছু হলে উত্তর হয়তো কঠিন, কিন্তু শেখ মুজিব বলেই সম্ভব হয়েছে তা! হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব, অদম্য নেতৃত্বগুণে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটা জাতিরাষ্ট্র। পেয়েছেন অমরত্ব।

মানুষের জন্যে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে দিয়ে আত্মদানের অমর ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। বারবার কারাগারে গেছেন, নির্যাতন সয়েছেন, পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকিতে রেখে দেশের মানুষের স্বাধিকার, স্বাধীনতা আর মুক্তির কথা বলে গেছেন। মৃত্যুর মুখে পড়েছেন দুইবার, তবু লক্ষ্যচ্যুত হননি। 'দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ' ছিল তার আজন্ম পণ, আর সেই পণ পূরণ করতে পেরেছিলেন তিনি।

আত্মোৎসর্গের ইতিহাস রচনা করলেও তিনি বিশ্বাসঘাতকেরা গুলি চালিয়েছে তার বুকে। মুজিবের ত্যাগে-ঘামে জন্ম দেওয়া বাংলাদেশ থেকে তাকে ও তার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে তারা। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট কিছু বিপথগামী সেনা অফিসার শেখ মুজিব নামের বাঙালির মহানায়ককে গুলিতে হত্যা করে। হত্যা করে ঢাকায় থাকা তার পরিবারের সকল সদস্যকে।

সাড়ে চার হাজারেরও বেশিদিন কারাগারে রেখে, দুই-দুইবার হত্যার প্রস্তুতি নিয়েও যাকে হত্যা করতে পারেনি পাকিস্তানিরা সেই মুজিবকে, সেই বঙ্গবন্ধুকে, বাঙালি জাতির পিতাকে তারই গড়া বাংলাদেশে হত্যা করেছে বাংলাদেশবিরোধী শ্বাপদেরা; এরচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা, এরচেয়ে বড় কলঙ্ক আর কী হতে পারে! বাঙালির জীবনে পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট কলঙ্কের দিন, শোকের দিন, লজ্জায় অবনত-মস্তকের দিন।

বঙ্গবন্ধুর শারীরিক প্রস্থানের সাতচল্লিশ পেরিয়েছে। তবে তিনি আছেন এখনও বাঙালির হৃদয়ে, বাংলাদেশের মানচিত্রে। তার দৈহিক মৃত্যুতে আদর্শের মৃত্যু হয়নি। পনেরো আগস্ট দিনটি কেবল স্মরণের নয়, দিনটি মুজিব-চর্চার শপথের দিনও।

সাংবাদিক, কলাম লেখক

;

টাকা জালকারী চক্রকে ঠেকান



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কিছুদিন আগে একজন আইনজীবীর সহকারী জাল টাকা সরবরাহের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি জালটাকা তৈরির কাজেও নেমে পড়েছিলেন। জানা গেছে, তিনি একজন জাল টাকার আসামির জামিনের জন্য কাজ করছিলেন। পরে সেই আসামির নিকট থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেই জাল টাকা তৈরির কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও ব্যাংকার সমন্বয়ে একদল জাল টাকা তৈরিকারী চক্র গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন -তিনি প্রতিমাসে ৬০ লাখ জাল টাকা বিক্রি করার জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের জাল টাকা তৈরি ও সরবরাহ কাজে এক বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে। এ কাজে সমাজের হোমরা-চোমড়া, মাদক ব্যবসায়ী, দামি মানুষ হিসেবে পরিচিত অথচ ভয়ংকর অপরাধী জড়িত রয়েছেন। কিছু মহিলা খুব সন্তর্পণে তাদের সঙ্গে জাল টাকা ছড়িয়ে দেবার কাজ করে থাকে। এ কাজে পুলিশ সদস্য, ব্যাংক কর্মকর্তা (প্রথম আলো ২৮.০৭.২০২২) ও সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা জড়িত থাকায় সন্দেহ করার অবকাশ খুব কম থাকে। আর এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে জাল টাকা তৈরি সরবরাহের কাজগুলো খুব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।

একসময় সাদা কাগজে জাল টাকা ছাপানো হতো। এখন ‘ওয়াশ নোট’ বেশি প্রচলিত। কারণ ওয়াশ নোটে সাইজ নিয়ে সমস্যা হয় না এবং সুতা, জলছাপ ইত্যাদি নতুন করে দিতে হয় না। এছাড়া ওয়াশ নোটের মূল কাগজ শুকানো হলে শক্তই থেকে যায়। সাধারণত: একশত টাকার নোটকে ঘষে ধুয়ে তার ওপর কালার প্রিন্টে পাঁচশত টাকার ছাপ দিয়ে এই নকল ওয়াস নোট তৈরি করা হয়।

কোন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবকে সামনে রেখে জাল টাকা তৈরি ও বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার মহোৎসব শুরু হয়। ঈদের মার্কেট, পশুর হাট, স্টেডিয়ামে খেলা, পাইকারি বাজার ইত্যাদিতে নকল টাকা ছড়িয়ে দেওয়া হয। ভীড়ের সময় তৎপরতা অবলম্বন করা এই চক্রের লক্ষ্য। এসময় তারা একজোট হয়ে ভীড় ঠেলে ব্যস্ত মানুষের মধ্যে আরও বেশি তাড়াহুড়ো করে সমস্যা তৈরি করে ফেলে। এভাবে সময়ের কৌশলকে কাজে লাগিয়ে জাল টাকা প্রদান করে দ্রুত সটকে পড়ে। তারা একটি আসল টাকার বান্ডিলের মধ্যে অনেকগুলো নকল টাকা ঢুকিয়ে মক্কেলকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। কেউ প্রতিবাদ করলে চক্রের সদস্যরা উপযাচক হয়ে সেটা মিটমাট করার উদ্যোগ নেয় এবং অবস্থা বেগতিক হলে দ্রুত সটকে পড়ে।

টাকা ছাড়াও রুপি, ডলার ও নানা বিদেশি নোট জাল করা হয়ে থাকে। সীমান্ত জেলা ও সীমান্ত হাটে এগুলোর ডিলার থাকে। সেখানে জাল টাকার চলাচল বেশি। জাল টাকা তৈরির উপাদানগুলো খুবই সহজলভ্য। একটি ল্যপটপ বা সাধারণ কম্পিউটার, রঙিন প্রিন্টার, লেমিনেটেড মেশিন, টাকা তৈরির ডাইস, ফয়েল পেপার, কোটিং গাম, সিল্কি কাগজ, স্ক্যানার, সুতা ইত্যাদি জাল নোট তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

জাল টাকা যত অভিজ্ঞ কারিগর দ্বারা তৈরি করা হোন না কেন সেগুলোতে নানা ধরনের খুঁত থাকে। তাই একটু চেষ্টা করলেই আসল ও নকল টাকার মধ্যে পার্থক্য সূচিত করা যায়। জাল নোট চেনার বড় উপায় হলো- এগুলা অসমতল ও এর রং দ্রুত পরিবর্তন হয়। নিরাপত্তা সুতা মোটা। কয়েকবার হাত বদল করলে নিরাপত্তা সুতা বেশি স্পষ্ট দেখা যায়। ওয়াশ নোট ছাড়া অন্যান্য নকল টাকায় এর জলছাপ, অন্ধদের জন্য বিন্দু ও সুইপ ইত্যাদি থাকে না। বাজারের কেনা কাগজের তৈরি জাল টাকা নরম হয়। এসব টাকায় ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখলে ক্ষুদ্র লুকানো লেখা, নিরাপত্তা সুতা, ছাপানো সীমানায় হেরফের দেখা যায়। জাল টাকা কেন তৈরি হয়? এটা একটা জটিল প্রশ্ন। সমাজে নানা অবক্ষয়ের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তরুণদের বেকারত্ব, অভাব, হতাশা ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে দিয়ে অনৈতিক কাজ করিয়ে থাকে এক শ্রেণির অবৈধভাবে বিত্তশালী হওয়া মানুষ। যারা মাদক ব্যবসার পাশাপাশি সব ধরনের অনৈতিক কাজকে বিকশিত করে তোলে। আমাদের দেশে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্য কম নয়।

তারা অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দিনরাত অপতৎপরতার মাধ্যমে নিত্যনতুন ঘৃণ্য মেকানিজম নিয়ে ওৎ পেতে থাকে। এরা পর্নোগ্রাফি, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম পণ্যসংকট তৈরি করে ও মাদক ব্যবসাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের অবৈধ মাদক ব্যবসায় আঘাত আসলেই সমাজে অন্যান্য অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে যায়। এগুলোর পাশাপাশি তাদের সীমাহীন লোভ-লালসার ব্যপ্তি সকল অপরাধকে নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে উসকে দেয়। এই উসকানির মধ্যে ধরা পড়ে যান বিভিন্ন পেশার সরকারি সেবাদানকারী কর্মচারী ও কর্মকর্তাবৃন্দ। যার কয়েকটি উদাহরণ এই প্রবন্ধের প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।

এর প্রধান কারণ হলো- আমাদের সমাজে একটি অবৈধ সুবিধাভোগী শ্রেণির দ্রুত বিকাশ ঘটানো। যাদের কাজ হচ্ছে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে আরও বেশি দুর্নীতি করা। তারা ব্যাপকহারে চুরি, ঘুষ, জালিয়াতি ইত্যাদিতে অভ্যস্ত। এদের ছদ্মাবরণে জাতি বিভ্রান্ত। তাদের নৈতিক বোধ ও পারস্পরিক সহানুভূতি নেই। এবং তাদের কোন ধর্মীয় শিল্ড নেই। সবকিছুকে নিয়ে মাখামাখি করে চলতে গিয়ে তারা সমাজের সাধারণ মানুষের নূন্যতম অধিকারগুলো হরণ করে নিজেরে উদর পূর্তি করতে সিদ্ধহস্ত।

তাই এদের প্রভাবে আমাদের সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যাগুলোর ব্যপ্তি না কমে দিন দিন আরও বেড়ে যাচ্ছে। শুধু গুটিকয়েক পুলিশ দিয়ে সাধারণ মামলা ঠুকে যেগুলো ঠেকানো যায় না। কারণ, এসব জাল টাকার হোতারা জানে আসল টাকা দিয়ে জাল টাকার মামলা কিভাবে মিটমাট করা যায। সেসব মিটমাটকারী চক্র সম্পর্কে তারা বেশ জানে। এজন্যও তাদের নির্দিষ্ট বাজেট রয়েছে। এনিয়ে তারা চক্রের সদস্যদেরকে আগাম আশ্বস্ত করে থাকে। তাই পুলিশি তৎপরতায় তাদের হৃৎকম্প হয় না, ভয়ও পায় না।

জালটাকা আমাদের অর্থনীতির জন্য অভিশাপ। এটা দেশ ধ্বংসকারী তৎপরতা। এই ঘৃণ্য তৎপরতাকে দ্রুত বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে বেশি তৎপর হতে হবে। এর জন্য দরকার কঠিন কমিটমেন্ট বা আত্ম প্রতিশ্রুতি।

মাদকব্যবসা ও জালটাকা পরস্পরের অন্তরঙ্গ বন্ধু। যারা মাদকব্যবসা, মুদ্রাপাচার, চোরাচালান ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত তারা জাল টাকার চক্রের সাথেও জড়িত। জাল টাকার নির্মাতা ও মালিকদের ঠেকাতে হলে মাদকের আগমন ও বিপণন ঠেকাতে হবে কঠোরভাবে। কৌশলে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দিয়ে মাদকের ব্যবহার বিস্তৃতকারীদেরকে ঠেকাতে না পারলে জাল টাকা তৈরির মতো অপরাধ বাড়তেই থাকবে। জাল টাকার হোতারা বেশ ক্ষমতাধর হওয়ায় বহাল তবিয়তে সবার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। তারা দারিদ্রকে উপহাস করে, অট্টহাসি দেয় কারো কোন বড় সমস্যা দেখলে।

এই দুর্বৃত্তায়নের চক্র সাধু সেজে জাল টাকা তৈরি, সরবরাহ ও বাজারে ছড়িয়ে দেবার কাজ করে যাচ্ছে। চক্রকে উৎখাত করতে না পারলে উন্নয়নের গতিকে আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের দেশে জাল টাকার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ খুবই দুর্বল। সরকারিভাবে জাল টাকা নির্ণয়ের জন্য গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি যথেষ্ট আধুনিক ও পর্যাপ্ত নয়।

আমাদের খাদ্যে ভেজাল, পণ্যে ভেজাল এবং টাকাও ভেজাল। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। টাকা জালকারীরা নতুন কোন অনুষঙ্গ নয। এরা অতি পুরাতন চক্র। এদের গডফাদাররা অতি শক্তিশালী। তাই একবার নয়- বার বার ধরা পড়েও বার বার বের হয়ে এসে এরা আবারও পুরাতন অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সেটা শক্তিশালী চক্রের কারণে। তাই দেরি না করে দেশের সার্বিক কল্যাণে গতি ফেরাতে টাকা জালকারী চক্রকে জোর প্রচেষ্টায় ঠেকাতে হবে।

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

;