নারী! আমি তো সবই পারি



সায়েম খান
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

পৃথিবীতে মানুষের মাঝে আসল দ্বন্দ্ব শুরু হয় কর্তৃত্ববাদ নিয়ে। কে কাকে শাসন করবে অথবা কে কাকে শোষণ করবে। আমরা যদি কর্তৃত্ববাদের কথাই বলি, তাহলে খুব প্রাচীন ইতিহাস থেকে দেখতে পারি নারীর কর্তৃত্ববাদের প্রথা শুরু হয়েছিল সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে। আদিম সভ্যতার পরিবার গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে নারীদের অনবদ্য অবদান। সেই সব পরিবার ছিল নারীশাষিত। নারীদের সিদ্ধান্ত প্রাধান্য বিস্তার করতো পরিবারে। সভ্যতার ক্রমবিকাশে আদিম সভ্যতার সেই নারী তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার  ধারাবাহিকতা নানা পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়ে তৈরি হয় এক নতুন সমাজব্যবস্থা যাকে আমরা বলি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। পুরুষের তন্ত্রে-মন্ত্রে ও পেশি শক্তির বলে দ্রোহের শিকার হতে থাকে নারী। ভূলুণ্ঠিত   করা হয় নারীর সকল অধিকার। চার দেয়ালে আবদ্ধ নারীর পৃথিবী হতে থাকে সংকীর্ণ। নারীর জীবনবোধ মানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এক বাধ্যগত চরিত্র। নারী বঞ্চিত হতে থাকল শিক্ষা থেকে, বৈষয়িক সম্পদ থেকে।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যযুগে নারীরা প্রবঞ্চনার শিকার হয় সবচাইতে বেশি। মধ্যযুগীয় কায়দায় নারী হয়ে যায় ভোগ বিলাস ও বিনোদনের উপাদান। এরই ক্রমবর্ধমান ধারায়, নারীর জন্য মধ্যযুগের নব্য পেশা হিসেবে দাঁড়ায় পতিতাবৃত্তি। তারপর ধর্মের ধোয়া তুলে নারীর জন্য  শুরু হয় সতীদাহ প্রথা। প্রেম ও পাপের অদ্ভুত মিশেলে গড়ে ওঠে মধ্যযুগীয় নারী চরিত্র। পুরুষ তার পাপের আস্তরণ দিয়ে যে নারীকে পাপী করে গড়ে তোলে, আবার সেই নারীকেই আগুনে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে তাকে বানায় সতী। সমাজের এই অদ্ভুত কুসংস্কারাচ্ছন্ন রূপের প্রভাব বিস্তার করে নারী মনে। শুরু হয় নারীমুক্তির সংগ্রামের জয়গান। জেন্ডার ইকুয়ালিটি আর ফেমিনিজমের ধারা প্রবর্তনের আন্দোলন শুরু হয় আঠারশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। নারী চায় অবারিত শান্তি, তার মনের মাঝেও বাস করে বেঁচে থাকার উদাত্ত বাসনা। আকাশের বিশালতার মাঝে তাকিয়ে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার অধিকার তারও আছে। শক্তি ও ভক্তির প্রচ্ছন্ন ছায়া হয়ে নারীর বিচরণ হয় স্বর্গে ও মর্ত্যে। পৃথিবীর প্রধানতম ধর্ম গ্রন্থ গুলিতে নারীকে তুলে ধরা হয়েছে উচ্চমার্গে। পূজনীয় এ নারীর শোচনীয় হার পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা মেনে নিলেও, মেনে নেয়নি প্রকৃতি।

আজ ৮ মার্চ। বিশ্ব নারী দিবস। নারীর কল্যাণময়তায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় মূলত: পালিত হয় এই দিবসটি৷ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে নারীর মাঝে আজ নেই কোন মধ্যযুগীয় সংকীর্ণতা। নারী আজ অবারিত। মধ্য গগন থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ কিংবা গমন করার ক্ষমতা ও জ্ঞান রাখে নারী। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নারী হয় উল্লাসিত। আর তাই নারীত্বের পূর্ণতা নারী খুঁজে পায় তার মাতৃত্বে। সৃষ্টির রহস্যের উৎস হিসেবে বিধাতা বিবেচনা করেন নারীকে।

সুসংহত হয়ে বেঁচে থাকার পূর্ণতা নিয়ে নারী চায় পুরুষের সঙ্গী হয়ে থাকতে। আমরা অধিকাংশ পুরুষেরা হয়তো নারীর সেই চাওয়াটুকুই বুঝতে চাইনা। আত্মকেন্দ্রিকতার ছাঁচে গড়ে ওঠা পুরুষের মনে তখন আওড়ায় নারী বুঝি যায় উশৃঙ্খলতায়। আর এখান থেকে শুরু হয় নারী-পুরুষের বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা। ভোগবাদী, পুঁজিবাদী কিংবা সাম্যবাদী যেকোনো সমাজ ব্যবস্থায় আমরা নারীকে দেখেছি পুরুষের বিলাসী পণ্য হতে, হতে দেখেছি সেবাদাসী হতে। আধুনিক সমাজ সংস্কারের নিমিত্তে এই ভাবনা থেকে বিরত থাকা উচিত। নারীকে অবদমিত করে পুরুষের বীরোচিত জীবন কখনো রচিত হয় না। বরঞ্চ পুরুষের বীরত্ব গাথায় নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে নারী। 

ধর্মের নানা অনুকূলেও নারীর অবস্থান সুউচ্চে। ঋগ্বেদে নারী শক্তিকে মহাবিশ্বের সারমর্ম হিসাবে ঘোষণা করেছে। তেমনি পবিত্র কোরআনে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও মুল্যায়ন সম্পর্কে সুরা নিসা সহ অন্যান্য সুরার বহু আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীর যেকোন ধর্মে নারীকে নিয়ে বিশ্লেষণ করলে আমরা কিছু বেসিক বিষয় জানতে পারি। তা হলো, একটি সুশৃঙ্খল ও উদারপন্থী নারী অধিকারের কথা, যেখানে নারীর কোন মর্যাদাহানি, অসম্মান ও অবমুল্যায়ন হবেনা।

ঈশ্বরের এক বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি নারী। তাই নারীর সুপ্ত শক্তি দিয়ে সে জয় করে পুরুষ, পৃথিবী ও প্রকৃতি। নারীর অবয়বে সেই শক্তির প্রকাশ থাকে উহ্য। এর প্রকৃত উদাহরণ পাওয়া যায় নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের “এ ডলস হাউজ” নাটকের নোরা চরিত্রে। যা কিনা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার নারীর শেকল ভাঙ্গার গানে পরিণত হয়েছিল। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী আজ সর্বাংসহা। নারী চাইলেই সবই পারে। তাইতো বলা হয়

‘নারী! আমি তো সবই পারি। “

লেখক ও কলামিস্ট

ছাত্র-শক্তিকে অগ্রাহ্যে হলো যে ক্ষতি



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কোটা বিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের শুরুর দিকে এটাকে পাত্তা দেয়নি সরকার। দাবিদাওয়া কিংবা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো আন্দোলনকে শুরুর দিকে সচরাচর পাত্তা দেয় না আওয়ামী লীগ সরকার। টানা চার মেয়াদে ক্ষমতাসীন থাকার নানা সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনের মুখে পড়েছে তারা, কিন্তু কোনো আন্দোলনকেই শুরুর দিকে পাত্তা দেয়নি তারা। বিভিন্ন ভাবে আন্দোলন বানচালের চেষ্টা চালিয়ে এরপর শক্তি প্রয়োগে সে সব আন্দোলনকে স্তব্ধ কর দিয়ে এসেছে। কোটা নিয়ে শিক্ষার্থী আন্দোলনও এক পর্যায়ে এই ধারাবাহিকতার মধ্যে পড়েছিল।

প্রথমে ছাত্রলীগকে দিয়ে আন্দোলন দমাতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়েছে। ছাত্রলীগই মার খেয়েছে, ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমাতে গিয়ে এটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়েছে। পুলিশের লাঠি-বন্দুকে ভয় না পেয়ে বরং দুর্দমনীয় সাহসে পেতে দিয়েছে বুক। পুলিশ গুলি করেছে, তবু সরেনি পুনর্বার গুলির শঙ্কা থাকলেও। ফের গুলি করেছে পুলিশ। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ এভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে। তার প্রাণ বলিদান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মনোবল ভেঙে দেয়নি। উপরন্তু এক মৃত্যুতে মরণের সমূহ ভয় কেটে গেছে অন্য সবার। বন্দুক-লাঠি-বেয়নেট-টিয়ার গ্যাস তখন হয়ে গেছে মামুলি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও শক্তি প্রয়োগের দিকে গেছে সরকার। বিজিবি নামিয়েছে। পরে সেনাবাহিনী।

দাপ্তরিক আদেশে বন্ধ করেছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ক্যাম্পাস থেকে কৌশলে এবং জোর করে বের করে দিয়েছে শিক্ষার্থীদের। কিন্তু তবু আন্দোলন থামেনি। বরং ক্যাম্পাসের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়েছে সাধারণ মানুষও। অনেকেই রাস্তায় নেমেছে। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পড়েছে পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনী।

ছাত্র-শক্তির এই তুমুল রূপের সামনে আওয়ামী লীগ এবারই প্রথম পড়েনি। ২০১৮ সালের পর পর দুইটা আন্দোলনের মুখে পড়ে তখনো পিছু হটেছিল। কোটা বিরোধী আন্দোলনে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে একই বছরের অপর এক আন্দোলনেও বিজয়ী হয়েছিল শিক্ষার্থীরা। লক্ষণীয় যে, এবারের কোটা আন্দোলন শুরু করেছিল যারা তাদের হাত ধরেই গড়ে ওঠেছিল সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলন। তখন তারা ছিল মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এবার তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের।

কোটা বাতিলের এবারের যে আন্দোলন এবং যে দাবি তাতে সরকারের দ্বিমত ছিল না। বরং সরকারের জারি করা ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল করেছিল হাইকোর্ট, এবং পরিপত্র বাতিলের কারণে ফিরে এসেছিল কোটা ব্যবস্থা। যদিও সরকার ছয় বছর আগে আন্দোলনের মুখে বাতিল করেছিল কোটা, তবে হাইকোর্টের ভিন্ন রায় এবং অব্যবহিত পরও সরকার ছিল কোটা বাতিলের পক্ষেই। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল তার প্রমাণ। এরপর শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে প্রথম দিকে পাত্তা দেয়নি। ফলে আপিল পর্যন্ত থেমে থেকেছিল বিষয়টি। শুনানি এগিয়ে আনতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কোন উদ্যোগের দেখা মেলেনি। তবে যখনই আন্দোলন ক্রমে বড় হতে থাকল, তখন হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দিলেন আপিল বিভাগ, এবং পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্যে এক মাসের অপেক্ষার জন্যে রেখে দেওয়া হলো। এরপর পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল, তখন আপিল এগিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়, এবং সর্বশেষ ফুল কোর্ট শুনানিতে আসল চূড়ান্ত রায়। আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে ৭ শতাংশ কোটা রেখে রায় দেন আদালত।

চূড়ান্ত রায়ের আগে সরকারের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিদের অগ্রাধিকারের প্রসঙ্গ আসায়, আন্দোলনকারীরা ভাবল, এই বুঝি কোটা ফিরে এলো। যেখানে দেশে রাজাকারের কোন তালিকাই নাই সেখানে রাজাকারের নাতিপুতির প্রসঙ্গ এনে যে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। কোটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছিল তা হচ্ছে ৩০ শতাংশের মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এই সুযোগে অনেকেই একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানের সুযোগ ছাড়ল না। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলল। মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক সুযোগসুবিধা পেয়ে থাকেন, চাকরি ক্ষেত্রে তাদের সন্তান ও নাতিপুতিরা কেন বিশেষ সুবিধা পাবে, এই প্রশ্ন তুলল।

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও সরকার বিষয়টিকে ইগোর লড়াই হিসেবে দেখল বলেই কিনা ক্ষীণ স্বরে হলে কোটা ফিরিয়ে আনার একটা আওয়াজ ওঠল। বিষয়টি যদিও আনুষ্ঠানিক ছিল না, তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্যে সন্দেহ দানা বাঁধল। ফলে কোটা ফিরে আসার যে ইঙ্গিত, তাতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠল শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ সরকার হালকাভাবে দেখল, এবং ভাবল ছাত্রলীগ আর পুলিশকে দিয়ে নস্যাৎ করে দেওয়া যাবে এটা। তাদের এই অভিসন্ধি ফুটে ওঠল ওবায়দুল কাদেরের নানা বক্তৃতায়। তিনি আন্দোলনকারীদের বিষয়টি ছাত্রলীগ দেখবে বলে যে কথা উচ্চারণ করেছেন, সেটা ক্ষোভের সঞ্চার করেছে আন্দোলনকারীদের মাঝে। এরপর তিনি বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলার কথা জানিয়ে ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দেন দলীয় নেতাদের। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াত ঢুকে গেছে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ছাত্র-শক্তিকে অগ্রাহ্য করে তার বক্তব্য ও নির্দেশনা আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।

ছাত্র-শক্তিকে অগ্রাহ্য করার বিষয়টি এসেছে মূলত সরকারবিরোধী আন্দোলনকে মোকাবেলা করার সাম্প্রতিক ইতিহাস। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার বিএনপি-জামায়াতসহ সকল সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে অগ্রাহ্য করে, তাদের বর্জন সত্ত্বেও নির্বাচন করেছিল। ওই নির্বাচনের আগে আমেরিকা-ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিদেশি অনেক শক্তি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও শেষ পর্যন্ত সরকার নির্বাচন করে এবং ফের সরকার গঠন করে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবেলা করে সরকারের এই পথ চলায় তাদের মধ্যে অহংবোধ জেগে ওঠায়, কোন শক্তিকেই পাত্তা না দেওয়ার একটা মানসিকতা গড়ে ওঠেছে। এই মানসিকতা কাল হয়েছে শিক্ষার্থী আন্দোলনকেও একইভাবে দেখার মধ্য দিয়ে।

সরকার ভেবেছিল নির্বাহী আদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও ক্যাম্পাস খালি করে দিয়ে পুলিশি ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদেরও দমিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার কারণে আন্দোলন ক্যাম্পাস থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। রাস্তায় নেমে আসে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র অভ্যুত্থানে।

যদিও আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাতে থাকেনি, তবে যথাসময়ে এর সমাধান করলে বিপুল প্রাণের অপচয় আর সরকারি-বেসরকারি সম্পদহানির ঘটনা ঘটত না, দেশ অর্থনৈতিকসহ নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। যে অনিয়ন্ত্রিত, অস্থির এবং অস্বাভাবিক অবস্থা চলছে দেশে, সেটা এমন নাও হতে পারত সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে।

টানা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ কাউকেই পাত্তা দেয় না বলে যে অভিযোগ, এবারের শিক্ষার্থী আন্দোলনের সময়ে আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে যে সঠিক নির্দেশনার দরকার ছিল সে নির্দেশনা দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। যার খেসারত দিতে হলো দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এবং রাষ্ট্রকে। সাধারণ এক শিক্ষার্থীকে আন্দোলনের এমন ভয়াল রূপে এখন আঙুল তোলা হচ্ছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির দিকে। নাশকতায় তারা জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু এই আন্দোলনকে সেই পর্যায়ে নিয়ে আসার পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের দায়কে কি অস্বীকার করা যাবে? আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এখন দায়-চাপানোর রাজনীতিতে মনোযোগী হওয়ায় একদিকে যেমন সাংগঠনিক দুরবস্থাকে আড়াল করা হচ্ছে, অন্যদিকে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার বিষয়টিও।

শিক্ষার্থীরা যতই বিক্ষুব্ধ হোক, তারা অন্তত নাশকতায় জড়াবে না। কেপিআই ভুক্ত এলাকায় আগুন দেবে না, মেট্রোরেলের ক্ষতি করতে যাবে না, টেলিভিশন ভবনে হামলা করবে না, রাতভর সংঘর্ষে জড়াবে না, কারাগারে হামলা করে অস্ত্রাগার লুট করে বন্দি ছিনতাই করবে না; এসবে অন্য কেউ থাকবেই। এদেরকে প্রতিরোধ করতে পারেনি সরকার; না রাজনৈতিক ভাবে, না প্রশাসনিক ভাবে। এই ব্যর্থতার দায় তারা অস্বীকার করলেও এটা অস্বীকারের বিষয় নয়। এখন রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সামনে আসছে, সরকারই এখানে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ দেখানো হচ্ছে। এতে কি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে না বিপুল প্রাণের অপচয়? অথচ রাষ্ট্রীয় সম্পদের হেফাজতের দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি দায়িত্বও তাদের নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এই আন্দোলন এবং আন্দোলনের একটা পর্যায়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রমাণ করে ছাত্র-শক্তিকে অগ্রাহ্য করা উচিত হয়নি। তবে আশঙ্কা হচ্ছে, সরকার না আবার এটাকে এই ভাবতে বসে—শেষ পর্যন্ত আমরা হারিনি! আওয়াজ ওঠতে শুরু করেছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন কথাটা। এবার অন্যরা বলতে শুরু করলে শক্তির খেলায় হার-জিতের প্রসঙ্গ নির্ণয় ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে!

;

তকমা, ক্ষোভ অভিমান ও নিষ্ঠুরতার হোলি



-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
তকমা, ক্ষোবাভিমান ও নিষ্ঠুরতার হোলি

তকমা, ক্ষোবাভিমান ও নিষ্ঠুরতার হোলি

  • Font increase
  • Font Decrease

কোটা সংস্কার নিয়ে ১ জুলাই ২০২৪ ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে প্রথম শুরু হয় প্রতিবাদ। এটা কোন দলীয় বা রাজনৈতিক কর্মসুচি ছিল না, এখনও নয়। দলমত নির্বিশেষে এটা সকল শিক্ষার্থীর আন্দোলন। তাই এ সপ্তাহ না পেরুতেই এর সমর্থন ও জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে গেছে। কিন্তু একে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক তকমা দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ তকমা এসেছে উচ্চ পর্যায় থেকে রাজাকারের ‘নাতিপুতি’ নামক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে। এটাকে কোমলমাতি শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারেনি। তারা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতিপুতি অথবা মুত্তিযোদ্ধা পরিবারের হওয়ায় তাদের অন্তরকে ক্ষোভের আগুনে উদ্দীপ্ত করে তুলেছে। তারা এই তকমাকে মিথ্যা অপবাদ ও চরম অপমানজনক হিসেবে ধরে নেয়ায় এটা তাদের আন্দেলনে ভস্মে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে চারদিকে।

এটাকে মনের অভিমানে তারা নিজেদেরেকে রাজাকার বলে যখন ব্যঙ্গ করে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ মুরু করেছে তখনও তাদের অভিমানকে কেউ পাত্তা দেয়নি। বরং উল্টো তাদেরকে আরো বেশী করে রাজাকারের ‘নাতিপুতি’ অপবাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টায় মেতে উঠে এক শ্রেণির সুবিদাবাদী নেতা। কারো যৌক্তিক প্রশ্ন বা কোনকিছুর উপর সঠিক যুক্তি দিতে অপারগ হলে বিভিন্ন অপবাদ দেয় অথবা কথার ফাঁকে রাজাকার হিসেবে গালি দিয়ে দেয়। অনেকে কথায় কথায় একজন শিশু-কিশোরকেও এমন টিজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে হিন্দু ছাত্রকেও স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, শিবির হিসেবে ট্যাগ দিয়ে চাঁদা আদায় করতে দেখা গেছে। এমন ঘটনা বেশ কবছর ধরে পত্রিকায় লক্ষ্যণীয় হচ্ছিল।

এসব ভুঁইফোড় নেতাদের দম্ভ, উন্নসিকতা, হম্বিতম্বি তখন দেখার মতো ছিল। তাদের কথাগুলো সাড়ম্বরে প্রচারিত হয়ে আন্দোলনকারীদের অন্তরকে আরো বেশী বিষিয়ে তোলে। ফলে এসব মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে না পেরে তারা সরকারী ছাত্ররাজনীতি থেকে পদত্যাগ করে ফেসবুকে স্টাটাস দিয়ে দলে দলে আরো বেশী কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠে।

তাদের এই দু:খ, কষ্ট, অভিমানকে সরকারী মহলের কেউই পাত্তা দেননি। বরং বিভিন্ন উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে সরকারী ছাত্রসংগঠন থেকে আরো দূরে ঠেলে দিয়েছেন। এ থেকে ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। তাদেরকে লুফে নিয়ে এটাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের ব্যানারে ছড়িয়ে দেয় সারা দেশে, সারা পৃথিবীতে। তাদের সমর্থক বেড়ে লক্ষ কোটি জনতায় পরিণত হয়ে পড়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী এসকল নিরীহ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় সাফল্য হলো- খুব দ্রুতগতিতে জনপ্রিয়তা অর্জন লাভ করা। তারা দেশের অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলের সমর্থন লাভ করতে থাকে এবং এর সাথে অভিভাবক, সাধারণ মানুষ তাদের জন্য দরদী হয়ে উঠে। ফলে তারা অসীম সাহসী ও জেদী হয়ে উঠে এবং তাদের দাবী আদায়ে অনড় থাকে।

দেশের কর্ণধারগণ তাদেরকে অনেকটা দূরে ঠেলে দেয়ায় তারা মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট স্মারকলিপি দিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা শুরু করে। সেখানে কিছুটা আশ্বাস পেলেও তা তৎক্ষণিকভাবে কোন সুফল বয়ে আনেনি। ফলে আন্দোলন আরো গতিপ্রাপ্ত হয়ে নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করে।

অপরদিকে কোটা আন্দোলনকারীদেরকে দমন করার জন্য ‘শুধু ছাত্রলীগ’বা একটি ছাত্রসংগঠনই যথেষ্ট এমন মন্তব্য আরো বেশী উস্কে দিয়েছে তাদের এই অভিমানকে। কর্তৃপক্ষকে উন্নাসিকতার সুরে বলতে শোনা গেছে- ‘আন্দোলন করে করে ওরা ক্লান্ত হোক তখন দেখা যাবে।’এভাবে সরকারের তরফ থেকে দীর্ঘদিন এই আন্দোলনকে গুরুত্ব না দেয়ায় যে বিভ্রান্তি ও ভুল বুঝাবুঝি পারস্পরিক আলাপ আলোচনায় না গিয়ে শুধু হম্বিতম্বি ও দৈহিক শক্তি প্রদর্শণ করাটা সবার জন্যই চরম ক্ষতিকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। চারদিকে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকে।

এর পরবর্তী ঘটনাগুলোর সময় দেশে ইন্টারনেট সচল থাকায় হয়তো সবাই মোটামুটিভাবে অবগত হয়েছেন। কিন্তু ১৮ জুলাই থেকে হঠাৎ করে দেশের ইন্টারনেট সেবা ও মোবাইল ফোর জি সেবা বন্ধ করে দেয়ায় এই আন্দোলনের সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে জনগণের নিকট পৌঁছাতে পারেনি। দেশের মানুষ যা ভাবেনি বা জানে না কিন্তু এসময় কোন কোন নেতা আগ বাড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছেন- ‘শেখ হাসিনা মারা গেলেও দেশ ছেড়ে পালাবে না’। এসব হঠকারী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা সন্দেহ দানা বাঁধতে দেখা গেছে। কিন্তু দেশে ইন্টারনেট না থাকলেও বিদেশী গণমাধ্যমের মাধ্যমে কোন না কোনভাবে সেগুলো মানুষের নিকট পৌঁছাতে থাকে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গুলিতে প্রাণ হারায় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু দেশের গণমাধ্যমগুলো সে রাত ১০টা পর্যন্ত মাত্র ১১ জন নিহত হবার কথা প্রকাশ করেছে।

এতে সাধারণ জনগণ আরো বেশী কৌতুহলী ও হতাশ হয়ে উঠে।  জায়গায় তারা রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সারা দেশে আন্দোলনের গতি ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার সাথে দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পুলিশের সাথে র‌্যাব, বিজিবি-কে মাঠে নামানো হয়। গত ১৮ জুলাই এসকল বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় অজানা সংখ্যক মানুষ।

কেন এমন হলো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের হলগুলো ভ্যাকেট করে দেয়ায় তারা বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যায়। তারা নিকটস্থ বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হল বা মেসে অবস্থান নেয়। সেখানে তাদের বন্ধু, আত্মীয় বা পরিচিতজনদের আশ্রয়ে থেকে আন্দোলনকে আরো বেশী শাণিত করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো হঠাৎ ভ্যাকেট  ‘শাঁখের করাত’হিসেবে মনে করা হচ্ছে। রাজধানীর উত্তরা, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, সাভার ইত্যাদিতে তারা ছড়িয়ে থেকে ১৮ জুলাই আরো সক্রিয় হয়ে উঠে। পুলিশও সেখানে মারমুখি হয়ে উঠে গুলি, গ্যাস ছোঁড়ায় যুদ্ধ বেঁধে যায়। পুলিশের সাঁজোয়া যান ছাত্রদের মিছিলে উঠে যায়। সেদিন রয়টার, সিএনএন, এনএইচকে, এপি, সিনহুয়া, নিউইয়র্ক টাইমস্ ইত্যাদি থেকে প্রচারিত সংবাদে ৮৩ জনের মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হলেও দেশের গণমাধ্যমগুলো কারো ভয়ে মাত্র কয়েকজনের মৃত্যুর কথা বলেছে! হাসপাতাল সূত্রে মৃত্যুসংখ্যা শত শত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে তেমন কোন সংখ্যা প্রচার করেনি। এটাই কি তাদের বৃহত্তর গণতন্ত্রের নমুনা?

কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে সাঁজোয়া যান দিয়ে আঘাত করার এই নিষ্ঠুর কান্ড ঘটানো দেখে পুরো পৃথিবী নির্বাক, স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। তার পরেও দেশের কর্ণধাররা এতদিন নির্বিকার হয়ে আরো বেশী হার্ডলাইনে যাবার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে মর্মাহত করেছে।

সাধারণত: সামরিক সরকারকে জনগণের পালস্ বুঝতে দয়ে না তার আশেপাশের চাটুকাররা। কিন্তু এমন বিষাদময় পরিস্থিতিতেও একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দাবীদারকে সেই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কেন? যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করে সুবিধা নিয়ে আসছেন এক্ষেত্রে তাদের চাটুকারিতা ও দাপট বেশী। তারা প্রধানমন্ত্রীকে বাইরের আন্দোলনের আবহাওয়া বুঝতে না দিয়ে ঘেরাটোপের মধ্যে রেখে দেন। এভাবে একটি জনগণের পালস্ বুঝেও সেটা বুঝেও না বোঝার চেষ্টা করা বা শক্তি দেখানো বিপজ্জনক-সেটা সম্প্রতি অতি নেতিবাচকভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

অন্যদিকে এই আধুনিক যুগে আন্দোলন দমনের নামে সারাদেশে ইন্টারনেট ও ফোরজি মোবাইল সেবা বন্ধ করে দিয়ে আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ফুডের ই-সেবা সবকিছু স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটা ডিজিটাল স্বৈারচারের নতুন দিক। এ দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক মানুষের কর্মগতি রুদ্ধ করা যায় না। যারা শুধু শুধু মানুষের হতাশা বাড়ানোর জন্য এসব কুবুদ্ধি দেন তারা প্রাচীন যুগের মনমানসিকতা নিয়ে আধুনিকতার বড়াই করেন মাত্র।

কর্তৃপক্ষ বলছেন, আন্দোলনকারীরা নেটওয়ার্ক অফিসে আগুন দিয়েছে বলে নেটসেবা নেই। কিন্তু মাত্র একটি অফিসে আগুন লাগলে যদি কয়েকদিন ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায় ও তড়িৎ কোন বিকল্প ব্যবস্থায় নেট চালু করা সম্ভব না হয় তাহলে এই সেক্টর নিরাপত্তাহীনতার চাদর গায়ে এতদিন কি ঘুমিয়ে ছিল? যে কোন দুর্ঘটনায় উন্নত বিশ্বের মানুষ বিকল্প উপায়ে এসব সেবা দ্রুত পেয়ে যান।

ইন্টারনেট আজকাল একটি জরুরী সেবা, এদিয়ে মানুষ খাদ্য-পথ্য কেনে, ওষুধ কেনে, এ্যম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে যায়।। এটাকে বন্ধ করে দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়। এই জরুরী সেবা বন্ধ রেখে মানুষকে কষ্ট-হতাশায় ফেলে যারা বাহাদুরী করেছেন তাদের মুখে ডিজিটাল বাংলাদেশ মানায় না। যদি আন্দোলনকারীরা অথবা কোন শত্রুতাবশত কেউ ইন্টারনেট নষ্ট করে দিয়ে থাকে তাহলে বিকল্প বা প্যারালাল চ্যানেলে দ্রুত রিকভার করার ব্যবস্থা না থাকাটা বোকামি। যে কোন কারনেই হোক দীর্ঘদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশের সবার জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

অন্যায়ভাবে কোন ভাল ইনোসেন্ট মানুষকে গালি দেয়া, খারাপ কিছুর তকমা দেয়া একধরণের বুলিং, ইভটিজিং। এগুলোও বিভিন্ন দেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। আমাদের সমাজে খোটা দেয়া, গাজ্বলা তকমা ছুঁড়ে দিয়ে মানুষের মনে কষ্ট, ক্ষোভ, অভিমান, পারস্পরিক বৈরীতা সৃষ্টি করা একটি অন্যায় কালচার ও সামাজিক অপরাধ। এর জন্য সৃষ্ট ক্ষোভ ও অভিমান সংগে সংগে নিরসনের জন্য ব্যবস্থা নিতে বড্ড দেরী করায় বাংলাদেশে ‘কারফিউ’জারি রাখতে হচ্ছে। তবে এখনও যে ক্ষতির ঢেউ বয়ে যাচ্ছে তার দায় কেউ নিতে এলেও সেই ক্ষত দ্রুত সেরে উঠবে কি? সেই ক্ষতি কি খুব সহজে পোষানো সম্ভব হবে ?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

;

বিভাজিত দেশ, লাল রক্ত কতটা লাল



কবির য়াহমদ
ছবি- বার্তা২৪.কম

ছবি- বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease
রক্তের রঙ সতত লাল। তবে বিভাজিত দেশে রক্তের রঙ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিহতের পরিচয় কী? সে বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী লীগ নাকি অন্য কোন দল এনিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তার রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হয়। এরপর সে রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্র ধরে চলে জায়েজিকরণ প্রক্রিয়া।
শিক্ষার্থী আন্দোলনে ঠিক কত ‘প্রাণের অপচয়’ হয়েছে, সঠিক পরিসংখ্যান-তথ্য নেই কারো কাছে। তবে আলোচনা মূলত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে ঘিরে। আবু সাঈদ পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। দাবির স্বপক্ষে জীবন বাজি রেখে তার পেতে দেওয়া বুক সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তাকে গুলি করার দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি করেছে। প্রথম গুলিতেও দমে যাননি সাঈদ, পুনর্বার গুলির আমন্ত্রণে তারুণ্যের স্পর্ধা দেখিয়েছেন। মুকুন্দ দাসের গানের মতো ‘ভয় কী মরণে...’ উচ্চারিত হয়েছে তার দুর্বার সাহসে।
বিভাজিত দেশে তার দুর্বার সাহসকে ছাপিয়ে কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা তার রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে এনেছেন। আবু সাঈদ আন্দোলনকারী নয়, জামায়াত-শিবিরের কর্মী, এমন একটা প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর মৃত্যুতে ‘বিদায় রাহবার’ লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন আবু সাঈদ, সেই পোস্ট ফেসবুকে অনেকেই সেয়ার করেছিলেন। সাঈদ নানা সময়ে জামায়াত-শিবিরপন্থী নানা অনলাইন অ্যাক্টিভিজমে জড়িত ছিলেন এমন প্রচারণা চলছিল সমান তালে। কেউ জামায়াত-শিবির করলেও তাকে প্রাণে মেরে ফেলার যুক্তি থাকতে পারে না, এমন বোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
আবু সাঈদের মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে  বিএনপি-জামায়াতপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদেরও ছিল সমান প্রচারণা। ছাত্রলীগের নেতাদের ছাদ ফেলে দেওয়ার তথ্য প্রচার করে, ছাত্রলীগ নেতা ও পুলিশের মৃত্যুর খবরের নিচে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ লিখে অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করে। তাদের কাছে পুলিশ ও আওয়ামীপন্থী কারো মৃত্যু আনন্দপ্রদায়ক সংবাদ।
মানুষের মধ্যকার এই পরিবর্তন বিভাজনের রাজনীতির ফল। পক্ষের লোকজন এবং স্বীয় মতাদর্শের কেউ ছাড়া বাকি সবাই অচ্ছুৎ এবং পরিত্যাজ্য এমন প্রচারণার অংশ। এই বিভাজন একদিকে যেমন হিংসার উদ্রেক করছে, অন্যদিকে মানুষদের মানবিক গুণাবলী এবং মানবিক চরিত্রে পরিবর্তনে রাখছে ভূমিকা।
শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার বিলোপ। কোটা ব্যবস্থা মেধাবীদের চাকরির সুযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, এমনই অভিযোগ। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে আপত্তি ছিল আন্দোলনকারীদের। এই কোটার বাইরে আরও ছিল জেলা কোটা, নারী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী কোটা; অর্থাৎ ২০১৮ সালের আগে ৫৬ শতাংশ ছিল কোটার অধীন। যদিও সাম্প্রতিক কয়েকটি সরকারি নিয়োগে কোটার চাইতে মেধার মূল্যায়ন বেশি হয়েছিল। এটা অনুল্লেখ্য ছিল আন্দোলনের পুরোটা সময়ে।
কোটা ব্যবস্থার অবসান চাইতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধিতা করতে গিয়ে অতি-ক্ষোভে এক শ্রেণির লোক মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল। অনেকের বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কটূক্তি ঝরছিল, ক্ষোভ উপচে পড়ছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকেই রাষ্ট্র সব দিয়ে দিচ্ছে এমন একটা প্রচারণার জন্ম দিয়েছিল। বিভাজনের কবলে তখন পড়েছিল দেশ। অথচ মুক্তিযোদ্ধারা যৌবনের সোনালী সময়কে বিসর্জন দিয়েছিলেন দেশের জন্যেই, এই বোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়াই যেখানে প্রাধিকার, সেখানে স্রেফ এই কোটা ব্যবস্থার কারণে মুক্তিযোদ্ধারাই হয়ে পড়েছিলেন অপমানের লক্ষ্যবস্তু।
এই সুযোগে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলো এর সুযোগ গ্রহণ করে। অগ্রণী ভূমিকায় নামে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাকে তুলনার মুখে এনে ‘রাজাকার’ শব্দটিকে মহিমান্বিত করার চেষ্টাও দেখা যায়। রাজাকার শব্দের বিরোধিতাকারীদের ফের ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দেওয়ার সুযোগ ছাড়ে না তারা। আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থক সবাইকে ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে থাকেন বিএনপিপন্থীরা। তাদের অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধও ভারতের প্ররোচনায় একটা যুদ্ধ, যেখানে তাদের ভাষায় ভারত চেয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাঙন। অথচ এই দলটির প্রতিষ্ঠানা মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণার অন্যতম পাঠক ছিলেন। যদিও তার আগে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর, এরপর আরও কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পাঠ করেন।
একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান ‘বীর উত্তম’ খেতাব পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার তার এই খেতাব বাতিল করে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের নাম থাকলেও তার দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন হয়। তিনি রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করেন। যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলিমকে মন্ত্রিসভার সদস্য করেন। কুখ্যাত স্বাধীনতাবিরোধী শর্ষিনার পির আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শিক্ষায় অবদানের জন্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পান। স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় জিয়াউর রহমানের পথ ধরে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পায়। তিনি যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলি আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রিত্ব দেন; যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে রাজনৈতিক উপদেষ্টা করেন; এরবাইরে আরও অনেক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে উচ্চ স্থানে আসীন করেন।
একাত্তর-পরবর্তী বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির জন্ম বলে মুক্তিযুদ্ধে দলটির নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধুর সময়ে তাকে দেওয়া ‘বীর উত্তম’ খেতাব বলছে মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকার কথা। বঙ্গবন্ধু হত্যায় তার বিতর্কিত ও অপ্রমাণিত ভূমিকায় আওয়ামী লীগ যতই তাকে অস্বীকার করুক না কেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আখ্যা দেওয়ার বিভাজনের যে প্রচেষ্টা সেটা বঙ্গবন্ধু-সরকারের সিদ্ধান্তকেই আদতে প্রশ্নবিদ্ধ করে। খেতাব বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক করেছে। যদি কখনো বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে তারা যে বীর উত্তম খেতাব ফিরিয়ে নেবে না, তা কে বলবে!
এই সময়ে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কথা বলে না, তাদেরকে বিএনপি-জামায়াত আখ্যা দেওয়া হয়, ষড়যন্ত্র খোঁজা হয়। সরকারের বিরুদ্ধে বললে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেওয়ারও একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সরকার ও রাষ্ট্র যে এক নয়, সূক্ষ্ম এই পার্থক্য মানতে নারাজ অনেকেই। আবার বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে না বললে, তাদেরকেও একইভাবে বিভাজনের ভেদ রেখায় ফেলে আওয়ামী লীগ ও ভারতের দালাল আখ্যা দেওয়া হয়। মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে বিভাজনের মধ্যে ফেলে সীমিত করার চেষ্টা করা হয়। এই বিভাজন এত শক্তিশালী যে স্বতন্ত্র চিন্তার ক্ষেত্র ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।  
বিভাজনের এই রাজনীতি জুলাইয়ের শিক্ষার্থী আন্দোলনেও আমরা দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধিতা করার কারণে অনেককে স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবি যারা করেছেন তাদেরকে আওয়ামী লীগ ও ভারতের দালাল আখ্যা পেতেও দেখেছি। ফলে আবু সাঈদ কিংবা জীবনের মতো তরুণপ্রাণের মৃত্যুতে আমরা ভেদরেখা টেনে দেখতে চেয়েছি কে আওয়ামী লীগ, আর কে জামায়াত? এখানে রক্তের যে লাল রঙ, প্রাণের অপচয়ের যে অপূরণীয় ক্ষতি, সে সব ছাপিয়ে ব্যস্ততা দেখেছি রক্তের লাল রঙে আর কী রঙের অস্তিত্ব!
;

জনজিজ্ঞাসার জবাব কি রাজনীতিবিদরা দেবেন?



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গেল কয়েক দিন অন্ধকারে ডুবে থাকা সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ, যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, তাদের বহু জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। অবস্থার পাকে পড়ে কম্পিত ও দ্বিধান্বিত এসব মানুষেরা দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে অসংখ্য জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিয়েছেন। সাতেপাঁচে না যাওয়া মানুষেরা অনেক কিছু না বুঝেও যা বুঝেছেন তার মর্মার্থ হচ্ছে, ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা আকড়ে থাকতে চান আর বিরোধীরা চান ক্ষমতার গদিতে আসীন হতে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের পথ ধরে ধ্বংসলীলার শুরুর পর সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে যা বলা যায় তা হচ্ছে, ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করাই সবচেয়ে জরুরি ছিল এবং সরকার তা-ই করেছে। কয়েক দিন ধরে চলা নজিরবিহীন এই ধ্বংসলীলার ঘটনাবলী ও সংবাদমাধ্যমের কাছে থাকা ছবি-ভিডিও বিশ্লেষণ করলে যা দেখা যাচ্ছে তাতে কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করা কঠিন হবে না।

সরকারের নীতিনির্ধারক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা বার বারই দাবি করেছেন, জামায়াত-শিবির এবং বিএনপি ও দলটির সহযোগি সংগঠনের প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরাই এই ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। তারা এও দাবি করেছেন যে, ‘বিদেশে পালিয়ে’ থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই এই অরাজকতা সৃষ্টির মাস্টারমাইন্ড। এই অপচেষ্টার পেছনে সরকারকে হটানোই ছিল মূল লক্ষ্য। সংহিসতা শুরুর পূর্ব পর্যন্ত সকলেই পথে পথে ছাত্র-জনতার উপস্থিতিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনই মনে করেছিল। শুরুর দিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনটি কিভাবে নজিরবিহীন তাণ্ডবলীলার হাতিয়ার হলো তা সাধারণের বোধগম্য নয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যানার ‘ছিনতাই’ হওয়া এবং তাতে বহু আমজনতার না বুঝেই জড়িয়ে পড়ার দাবিও কেউ কেউ করছেন। পথে বের হওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষের সকলেই ধ্বংসলীলা চালায়নি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি ও ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করলেও তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে ‘কিছু সংখ্যক’ সন্ত্রাসী কয়েক দিন ধরে তাণ্ডবলীলা চালাল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমনের চেষ্টা করে হতাহত হল’; তারপরও ধ্বংসের স্রোত থামাতে টানা কয়েক দিন লাগলো! এই সময়ে দেশের বাদবাকী মানুষদের ভূমিকা তাহলে কেমন ছিল? সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, হয়ত সাধারণের একটি অংশের সহানুভূতি বা মৌন সমর্থন ছিল এই ‘কিছু সংখ্যক’দের প্রতি। আর সাধারণ মানুষের আরও একটি অংশ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তাদের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে কোন একটি পক্ষকে সমর্থন, বর্জন কিংবা প্রতিরোধের অবস্থা ছিল না; কারণ প্রকৃত সত্য তারা জানতেনই না।

যদি দৃষ্টি ফেরাই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের দিকে, সেখানেও দেখব দ্বিধাবিভক্তির এক চরম অবস্থা। টানা দেড় দশক শাসন ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ঐতিহাসিকভাবে দেশের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করেছে। বর্তমানে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা প্রায় সব দলই স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত। সাংবিধানিক ভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামো স্বীকৃত হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধরে কিংবা বাহিরে কোথাও গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই-এই অভিযোগ সর্বত্রই উচ্চারিত হয়।

ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দর্শনকে অবলম্বন করে তাদের রাজনীতি ও শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করেন বলে দাবি করে থাকেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরুর দিকে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বিরোধে জড়ায় মূলতঃ সরকারি চাকুরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। অবস্থাদৃষ্টে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বর্তমান সমাজের দ্বিধাবিভক্তি আরও প্রশস্ত হয়েছে। নিঃসন্দেহে একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তার সুমহান চেতনার প্রতি সমান্যতম অবজ্ঞা বা শ্লেষোক্তি অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু দেশের প্রজন্ম যদি সত্যিকারের ইতিহাস জানার সুযোগই না পায় তাহলে নতুন প্রজন্মকে আপনি কিভাবে দায়ী করবেন? রাজনীতির অন্ধরে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে সর্বজনীনন অভিন্ন অবস্থান কেন স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দি পেরিয়েও আমরা অর্জন করতে পারলাম না, সেই জনজিজ্ঞাসার জবাব রাজনীতিবিদদেরই দিতে হবে।

কেবল আওয়ামীলীগই নয়, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় সকলেই মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ উঠতেই মুখে ফেনা উঠিয়ে ফেলেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিপালনে তাদের সামান্য মনযোগ দেখা যায় না। একথাগুলো এজন্য বলা জরুরি যে, বিগত জাতীয় নির্বাচনের সময়কার স্মৃতি উলটে যদি আমরা দেখি তবে শুধুমাত্র মনোনয়ন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন দলের কি পরিমাণ তথাকথিত নেতা রাজধানীতে ভিড় করেছিলেন তা আমরা সহজেই মনে করতে পারব। তখন গণমাধ্যমের কাছে তারা প্রত্যেকেই দেশ ও জনগণের সেবায় নিজেদের পুরোপুরি উৎসর্গ করার পণ করে ফেলেছিলেন। জিজ্ঞাসা এখানেই, রাজধানীসহ সারাদেশে যে নজিরবিহীন তাণ্ডবলীলা চললো, জনগণের-রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ পুড়ে ছাই হলো, লুট করা হলো-তারা তখন কোথায় ছিলেন?

এই নজিরবিহীন সময়ে প্রায় প্রতিদিনই দুই প্রধান দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপির শীর্ষনেতারা সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন। এতে নেতাদের উপচেপড়া ভিড়। দলের সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিব বক্তব্য দিচ্ছেন আর সবাই মাথা নেড়ে, কেউবা উচ্চস্বরে ‘ঠিক..ঠিক’ বলে রব করেছেন। খুব স্বাভাবিক জ্ঞানে রাজনীতির ওই মুখগুলোকে কপট ছাড়া কিছুই মনে হয় না। কেননা দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তাদের স্ব-স্ব এলাকায় দিয়ে নিজদের সমর্থক, অনুগত এবং সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাণ্ডবলীলা প্রতিরোধ করতে যাওয়ার কথা। দলবেঁধে সংবাদ সম্মেলনে নিজের চেহারা দেখানোর প্রতিযোগিতায় থাকার কথা নয়। ঔপনিবেশিক কিংবা সামন্তবাদী সময়কাল পেরিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির উন্মেষের পরবর্তী সময়ে আমরা এদেশেই রাজনীতিবিদদের নিষ্ঠা দেখেছি। কিভাবে নিজের সবকিছু নিঃশেষ করে জনগণের পাশে দাঁড়াতেন তাঁরা! 

বর্তমানে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যসহ দেশের ৩৫০জন সংসদ সদস্য আছেন। আছেন সিটি মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধি। জনগণের প্রতি সত্যিকারের দায়বদ্ধতা থাকলে এই জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র ও জনগণের জানমাল রক্ষায় সচেষ্ট থাকতেন। জনগণ সম্পৃক্ত জনপ্রতিনিধিরা উসকানি না দিয়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মাঠে থাকলে আমরা হয়ত এই ধ্বংসলীলা নাও দেখতে পারতাম। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, বাস্তবে এর কিছুই আমরা দেখিনি। তার অর্থ কি জনগণের হিত সাধনের জন্য আমাদের রাজনীতিবিদদের ‘রাজনীতি’ নিবেদিত নয়? কিন্তু আমরা তো দেখি, একই দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমাতে মাঠে ময়দানে তাদের প্রাণপণ চেষ্টা! এই নিষ্ঠার সামান্যও যদি তারা জনগণের কল্যাণ ও সমাজের শান্তি বিধানে প্রয়োগ করতেন, তবে দেশে এমন ক্রান্তিকাল উপস্থিত হতো না।

আমরা যদি সাম্প্রতিক বছরের সংবাদপত্রে প্রকাশিত আঞ্চলিক রাজনীতির খবরাখবরের দিকে দৃষ্টি দিই তবে দেখতে পাবো-ক্ষমতাসীন দলের অন্দরেই কি পরিমাণ বিবাদ! তৃণমূলের একনিষ্ঠ কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটির নেতারা স্ব-স্ব অবস্থানে নিজেদের এতটাই ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করেন যে কর্মীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সামান্যই। এর ফলে সংকটকালে জনগণের পাশে থাকার যে কর্তব্য ছিল আওয়ামীলীগের তৃণমূলের, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাইকমাণ্ড নির্দেশ সত্ত্বেও তা উপেক্ষিত হচ্ছে বলেই সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ। ফলে বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়ে আওয়ামীলীগ যতটা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও তাদের সাংগঠনিক অবস্থাকে ভঙ্গুর না বললেও খুব সুসংগঠিত বলা যায় না। এই প্রসঙ্গটি এজন্য উল্লেখ করা প্রয়োজন, কারণ দেশবিরোধী স্বার্থান্বেষী চক্রের উত্থানে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাও ভূমিকা রাখে। 

রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের কিছু কিছু স্থানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে দেখেছি নাশকতাকারীদের। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামীলীগ বাদে দেশের নিবন্ধিত বাকী ৪৩টি রাজনৈতিক দল তাহলে কি করেছিল এ কয়দিন? পরস্পরকে দোষারোপ করে সংবাদ সম্মেলন কিংবা গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েই তারা দায় সেরেছেন। কেউ কেউ হয়ত তাও করেনি, নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে। এই ‘রাজনীতিবিদদের’ জনবিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও প্রতি জাতীয় নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট চাইতে তারা কোন মুখে আসেন?

সমাজ, রাজনীতি ও সরকার বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অবশ্য এ নিয়ে মত হচ্ছে, জনগণের অসচেতনতা ও হুজুগে প্রবৃত্তি কপট রাজনীতির পথকে অনেকটা প্রশস্ত করে তুলেছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অপ্রতুল বিনিয়োগে মননশীলতা ও মূল্যবোধ বিকাশের পথ আজ সংকুচিত। এই অনুদারতায় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক শিক্ষা অর্জন মুখ থুবড়ে পড়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে এগিয়ে গেলেও সমাজে মানুষের মূল্যবোধ যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তা ভেবে দেখার কথা হয়ত রাজনীতিবিদরা ভুলেই গেছেন! নইলে প্রায় ৭ লক্ষ কোটি টাকা জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দ কিভাবে ৭৭৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা হয়?

এই অনুদারতায় দেশের প্রান্তিক জনপদে কুসংস্কার আরও কূপমণ্ডুকতার বিস্তার ভয়াবহভাবে ঘটেছে। সাধারণ মানুষের মাঝে বোধগম্যতার এই যে সংকট তা লাঘবের চেষ্টা নেই বলেই হয়ত মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক ও মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মগৌরবের ইতিহাস নিয়ে কটাক্ষের সুযোগ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশেই সৃষ্টি হয়। এর জন্য জনসেবা ভুলে গিয়ে আদর্শচ্যুত রাজনীতিবিদদের সম্পদ অর্জনে বল্গাহীন দুর্নীতিই অনেকাংশে দায়ী বলে মনে কনে বিশ্লেষকরা। সচেতন জনগণের অগণিত প্রশ্নবাণে জর্জরিত এই সময়ের রাজনীতিবিদরা কি এ দায়মোচনে আদৌ কোন চেষ্টা করবেন?

;