ক্যাসিনো কালচার চিরতরে বন্ধ হোক

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রথমেই একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিচ্ছি। তিনদশক সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করছি। এক সময় ঢাকায় রাত-বিরাতে প্রচুর ঘোরাঘুরিও করেছি। নব্বইয়ের দশকে বাংলাবাজার পত্রিকায় সহকর্মী ফজলুল বারী, শহীদুল আজম, কাওসার মাহমুদরা রাতের ঢাকা নিয়ে টানা রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু কখনোই ক্যাসিনোর নামও শুনিনি। ঢাকার ক্লাবগুলোতে হাউজি খেলা হয়, এটা জানতাম। ক্লাবের খরচ মেটাতে হাউজির ব্যাপারে একটা অলিখিত অনুমতি যেন ছিলই। কিন্তু মতিঝিলের ক্লাবপাড়াসহ ঢাকার অন্তত ৬০টি স্থানে রীতিমত টেবিল
সাজিয়ে, বিদেশ থেকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নারী-পুরুষ কর্মী এবং নিরাপত্তারক্ষী এনে, অঢেল মাদকের ব্যবস্থা করে ক্যাসিনো সাজানোর খবর আমি ঘুণাক্ষরেও জানতাম না।

আমি কখনো ক্রাইম রিপোর্টিং করিনি। তবু ঢাকা শহরের এত বড় আপডেটের খবর না জানাটা অবশ্যই লজ্জার। এখন শুনছি, শুধু আজকে নয়, আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, বিএনপি আমলেই ঢাকায় ক্যাসিনো সংস্কৃতির বিস্তার। তার মানে আমার না জানার গ্লানি আরো প্রলম্বিত হলো।

ক্যাসিনো নিয়ে আমার কোনো ট্যাবু নেই। দেশে ক্যাসিনো থাকা উচিত কি উচিত নয়, সে নিয়ে অনেকে বিতর্ক করছেন। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্যাসিনোর কোনো অনুমতি নেই। ঢাকায় ক্যাসিনো আছে, এটা আগে জানলে আমি সেখানে যেতাম কিনা জানি না। তবে রিপোর্ট করার চেষ্টা করতাম এটা নিশ্চিত। তবে এখন যা শুনছি, এই ক্যাসিনোগুলোর নিরাপত্তা প্রায় দুর্গের মত। ফকিরাপুর ইয়ংম্যান্স ক্লাবে প্রথম দিন অভিযানের সময় ক্যাসিনোতে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পেতে র‌্যাবকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তাই চাইলেই হুট করে ক্যাসিনোয় ঢুকে পড়া সম্ভব ছিল না। ঢাকায় সরকার অনুমোদিত বেশ কয়েকটি বার আছে। অনুমোদিত কোনো নাইট ক্লাব নেই। তবে ঢাকার অভিজাত এলাকায় বা ঢাকার উপকণ্ঠের বাগান বাড়িতে নাইট ক্লাবের আদলে এক্সক্লুসিভ পার্টির গল্পও শুনি। ইউরোপ-আমেরিকা তো বটেই আমাদের আশপাশের অধিকাংশ দেশেই বার, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো আছে। বার, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো না থাকলে পর্যটকরা আসবে না। কিন্তু পর্যটকের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতি, সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে বার, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো চালু করা সম্ভব নয়।

আনুষ্ঠানিকভাবে চালু না থাকলেও চাহিদা থাকলে তার বিস্তার ঘটবেই। তার প্রমাণ ঢাকার এই ক্যাসিনো কালচার। বাংলাদেশে মাদক নিষিদ্ধ, তাই বলে কি মাদকাসক্তের সংখ্যা কম? আমার ধারণা, অন্তত বিয়ার যদি সহজলভ্য করে দেওয়া যায়, তাহলে ক্ষতিকর ইয়াবা ধরনের মাদকের বিস্তার কমে আসবে। বাংলাদেশে নাইট ক্লাবও চালু করা সম্ভব নয়। আপনি ঢাকার ইংলিশ রোড থেকে, নারায়ণগঞ্জের টানবাজার থেকে পতিতালয় উচ্ছেদ করেছেন। কিন্তু আদিম ব্যবসা পতিতাবৃত্তি কি বন্ধ হয়ে গেছে?

বাংলাদেশে জুয়া কালচারও নতুন নয়, তবে ক্যাসিনো আকারে জুয়ার বিস্তার হয়তো বেশি দিনের নয়। গ্রামে গঞ্জে যাত্রার সঙ্গে হাউজি বা তিন তাস খেলে সর্বশান্ত হওয়ার ইতিহাস কম নয়। এখন যেটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, এক সময় সেটি ছিল রেসকোর্স ময়দান। মানে সেখানে ঘোড়দৌড় হতো। ঘোড়ার এই দৌড় কিন্তু এক ধরনের জুয়াই।

ঢাকার ক্যাসিনোতে অভিযানের পর বিভিন্ন টিভিতে ছবি দেখে আমি একটু স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম। বছর দশেক আগে আমি একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। যাওয়ার আগেই আমার পরিকল্পনা ছিল, একদিন নাইট ক্লাবে যাব। সময়ের কারণে লাসভেগাস যেতে পারিনি বটে, তবে ফেরার ফ্লাইটের আগের রাতটি কাটিয়েছি আটলান্টিক সিটির বিখ্যাত তাজমহল ক্যাসিনোতে। ক্যাসিনোর জন্য আমার বাজেট ছিল ১০০ ডলার। ভাগ্য ভালো ১০০ ডলারেই রাত পাড় করতে পেরেছি। স্মৃতিকাতর হয়েছি, কারণ আটলান্টিক সিটির ক্যাসিনোতে যেমন সরঞ্জাম দেখেছি, ঢাকার ক্যাসিনোতেও তেমনই।

ফেসবুকে একজন প্রশ্ন তুলেছেন, এই সরঞ্জামগুলো দেশেই বানানো হয়েছে নাকি আমদানি করা হয়েছে? আমদানি করা হলে কী নামে করা হয়েছে? আমার ধারণা, আমদানি করা হয়েছে। কারণ এত নিখুত ক্যাসিনো সরঞ্জাম এখনো দেশে বানানো সম্ভব নয়। তবে কী নামে আমদানি করা হয়েছে, এই প্রশ্নটি অবান্তর। বছরের পর বছর পুলিশের নাকের ডগায় ক্যাসিনো চলতে পারলে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম আমদানি করা কোনো সমস্যা নয়। তবে আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আমি কখনো ক্যাসিনো চালানোর অনুমতি দিতাম না। কাউকে একবার জুয়ার নেশায় পেয়ে গেলে তার ধ্বংস অনিবার্য। মাসে দুয়েকবার বিয়ার খেলে কেউ ধ্বংস হবে না। কিন্তু জুয়া সর্বস্ব কেড়ে নেয়। ঢাকার স্বল্পকালীন জুয়া সংস্কৃতিও অনেককে নিঃস্ব করেছে। তাই আমি চাই, সব ধরনের জুয়া থেকে যেন মানুষকে দূরে রাখা হয়। কারণ জুয়ার বিস্তার এক সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটাবে।

একবার ভাবুন, প্রধানমন্ত্রী শনিবার ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আর ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছে বুধবার। অভিযানের দিন দৈনিক ইত্তেফাকের শীর্ষ সংবাদ ছিল ঢাকার ক্যাসিনো নেটওয়ার্ক নিয়ে। যারা প্রধানমন্ত্রীর হুশিয়ারির পরও ক্যাসিনোতে গেছেন, আমি খালি তাদের সাহসের তারিফ করেছি। ফকিরাপুল ক্লাবেই আটক করা হয়েছে ১৪২ জনকে, চার ক্যাসিনো থেকে আটক করা হয় ২০১ জনকে। সত্যিই সাহস বটে! তবে আগেই যেটা বলেছি, জুয়ার নেশা এমন নেশা, জুয়ারুরা কিছুই পরোয়া করেন না।

পুলিশের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ক্যাসিনো সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে, আর পুলিশ কিছুই জানতেন না, এটা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক মাস্তানরা নিয়ন্ত্রণ করতেন এটা ঠিক। তবে নিজেরা নিজেরা এত বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নিশ্চয়ই পুলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতারাও এই ক্যাসিনোর আায়ের ভাগ পেতেন। এখন শুনছি, সাংবাদিকরাও পেতেন। শুনে লজ্জায় আমার মাথা লুকানোর দশা। ক্যাসিনো বন্ধ করতে হলে শুধু এক-দু’জন রাজনৈতিক মাস্তানকে গ্রেফতার করলে হবে না। যারা দিনের পর দিন প্রশ্রয় দিয়েছে, টাকার ভাগ খেয়েছে; তাদের সবাইকে ধরতে হবে।

ক্যাসিনো অভিযানের পর অনেকেই ফেসবুকে হাহাকার করেছেন, এত কাছে, তবু কেউ টের পেলেন না। তারা বলছেন, ক্যাসিনো বন্ধ হয়ে গেলে, বাংলাদেশের কিছু মানুষের নেপাল-ব্যাংকক যাওয়া বেড়ে যাবে। তবে মন্ত্রীরা যে এতদিন বলতেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে; ঢাকা ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড হয়ে গেছে। এখন তারা গর্ব করে বলতে পারবেন, ঢাকা লাসভেগাস, আটলান্টিক সিটি, ব্যাংকক হয়ে গেছে। তবে এই উন্নতি এখনই আমরা চাই না।

এক সময় ফকিরাপুল ইয়ংম্যান্স, ওয়ান্ডারার্স, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবগুলো দেশজুড়ে পরিচিত ছিল খেলাধুলার জন্য। ঢাকার ফুটবল মাতিয়েছে এই ক্লাবগুলো। এক সময় অল্প কিছুদিন ক্রীড়া সাংবাদিকতা করার সুবাদে এইসব ক্লাবে গেছিও। কিন্তু সেই ক্লাবগুলো যে মাঠের খেলা থেকে টেবিলের খেলায় ঝুঁকে গেছে; ফুটবল নয়, তাদের আগ্রহ এখন জুয়ায়; এটা আমাদের জাতির জন্যই দুর্ভাগ্যজনক। জাতি হিসেবে আমাদের সত্যিকার অগ্রগতি চাইলে, ক্লাবগুলোকে জুয়া খেলা থেকে মাঠের খেলায় নিয়ে যেতে হবে। আর রাজনীতিকে মাস্তান-চাঁদাবাজদের হাত থেকে রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে।

লেখক: প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :