বাংলাদেশ হন্তারকের দেশ হতে পারে না

লুৎফে আলি মহব্বত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আবারও প্রমাণ হলো, বাংলাদেশ হন্তারকের দেশ হতে পারে না। বাংলাদেশে হত্যাকারী ও খুনিদের জায়গা নেই, এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হলো।

বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারকে নির্মম-নৃশংসভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার পর জাতির বিবেক সমূলে নড়ে উঠেছে। সরকারের শীর্ষ থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ক্ষোভ, ঘৃণা, ধিক্কার ও প্রতিবাদে বিস্ফোরিত হয়েছেন।

সন্দেহ দেখা দিয়েছিল, হত্যাকারীদের ধরা যাবে তো? প্রশ্ন উঠেছিল, ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হত্যাকারীরা ছাড় পেয়ে যাবে না তো? একটি আস্ত দিন তাবৎ বাংলাদেশ বিচার প্রক্রিয়া শুরুর প্রত্যাশায় ঐক্যবদ্ধ ও উদগ্রীব ছিল।

আশার কথা হলো, দ্রুততম সময়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনের আওতায় এনে দোষীদের বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়েছে। পরিষ্কার হয়েছে যে, বাংলাদেশ হন্তারকের দেশ হতে পারে না।

সাধারণত অনুন্নত দেশগুলোতে আইনের গতিশীলতা ও বিচারের সুষ্ঠু ধারা দেখা যায় না। বিশেষত ক্ষমতাসীনরা প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের বাঁচাতে সক্ষম হয়। বিশ্বের নানা দেশে এমন নিকৃষ্ট নজির দেখা গেছে।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত রণাঙ্গন পেরিয়ে স্বাধীনতার স্বর্ণ সোপানে আরোহণকারী বাংলাদেশ হলো উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের মানুষ কখনোই হত্যাকারীদের মেনে নেয় না। বাংলাদেশ কখনোই হত্যাকারীদের দেশ হয় না।

বাংলাদেশ হানাদার পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ মেনে নেয়নি। পরাজিত করে প্রতিশোধ নিয়েছে হন্তারকদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে জাতির স্থপতির হত্যাকাণ্ডকে মেনে নেয়া হয়নি। যে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল এবং দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও পৃষ্ঠপোষকতা, তাদেরকেও বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে জাতির দাবি ও প্রত্যাশার কারণে। হত্যার অভিশাপ ও কলঙ্ক মুছে উজ্জ্বল বাংলাদেশ দাঁড়িয়েছে বিশ্বের দরবারে।

হত্যা, নৃশংসতা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মানবিক বাংলাদেশের ভ্যানগার্ড হলো এদেশের সংগ্রামী জনতা। ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালি হত্যার পরিপন্থী। বাঙালি ছাত্র ও যুবক হত্যার বিরুদ্ধে সদা প্রতিবাদ মুখর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হত্যা ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে আপোষহীন।

কেবলমাত্র সামরিকতন্ত্রের তল্পিবাহক কতিপয় ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদ ছাড়া বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিবিদগণ মানবিকতার ধারক ও বাহক। বর্তমান সরকার প্রধান, জননেত্রী শেখ হাসিনা হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে নস্যাৎ করে জনতার বিপুল সমর্থনের শক্তিতে পথ চলছেন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে তিনি হত্যার রাজনীতির শিকার হয়ে স্বজনদের হারিয়েছেন। ফলে যে কোনও হত্যা ও নৃশংসতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান অটল ও সুদৃঢ়। যে কারণে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনে আশ্রয় নেওয়া খুনিরা স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় এসেছে।

বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও এ কথা প্রমাণ হয়েছে যে, সারা বাংলাদেশ রয়েছে তার পাশে। তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাংলাদেশের জাগ্রত ছাত্র, জনতা আর রাজনীতিবিদগণ এ বার্তাই ঘোষণা করেছেন যে, হত্যাকারীদের সঙ্গে কেউ নেই; বাংলাদেশ হন্তারকের দেশ হতে পারে না।

বুয়েটের উপাচার্য, শিক্ষক সমিতি বলেছেন, তারা হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে এবং বিচার প্রার্থী ছাত্র সমাজের পক্ষে আছেন। সরকার সুস্পষ্ট ঘোষণা ও পদক্ষেপে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় এনেছেন। দেশের সর্বত্র প্রতিবাদী মানুষের সম্মিলিত আওয়াজ কাঁপিয়ে দিচ্ছে হত্যাকারীদের সকল আয়োজন।

অতএব, আমরা আশা করবো আবরারের হত্যার যথোপযুক্ত বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে আর কোনও শিক্ষার্থী আবরারের মতো নৃশংসতা ও হত্যার শিকারে পরিণত হবে না। জ্ঞান ও যুক্তির আলোকিত অঙ্গন বিশ্ববিদ্যালয় আর কখনোই মৃত্যুকূপে রূপান্তরিত হবে না। পড়তে এসে আর কাউকে মরতে হবে না।বাংলাদেশ হন্তারকের দেশ হবে না।

এসব প্রত্যাশা দলমত নির্বিশেষে সকল বাঙালির। সরকার ও বিরোধী দলের। সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির। বাংলাদেশের সকল মানুষের। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে আমরা সবাই দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশ হন্তারকের দেশ হতে পারে না। বাংলাদেশের এই মানবিক ইমেজ ও শান্তিবাদী মর্যাদাকে যে কোনও মূল্যে সকলে মিলে রক্ষা করতে হবেই।

লুৎফে আলি মহব্বত: কলামিস্ট, লেখক

আপনার মতামত লিখুন :