ছাত্র রাজনীতি ও এক আক্রান্তের বয়ান



নাহিদ হাসান
নাহিদ হাসান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

নাহিদ হাসান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১.
ছাত্রশিবির কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ছাড়া সকল ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করেছে। এরই মধ্যে বুয়েটে টগর-মুহিতের গোলাগুলিতে সনি নামের মেয়েটি মারা গেল। তার প্রতিবাদে একদিন ক্লাস শুরুর ৫ মিনিটের মধ্যে কয়েক হাজার লিফলেট বিতরণ করেই সটকে পড়ি। মহিলা হোস্টেলের বর্ধিত ফির বিরুদ্ধে তুবার নেতৃত্বে আন্দোলন সংগঠিত করি। এছাড়া স্বতন্ত্র পরীক্ষা হলের দাবির ধর্মঘটের মিছিলে যোগ দেই। যে মিছিলে আক্রমণ করে চিলমারীর বিঠুকে রক্তাক্ত করে। সেদিনই ছত্রভঙ্গ মিছিলে আমাকে পিস্তল দেখিয়ে শাসায় মাজেদুল, যে পরে নাকি কোথায় উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছে। এই রকম ঘটনার মধ্যে চলে আসে ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০০৩।

শহীদ মিনারে কলেজের অনুষ্ঠান। আমার আগে বক্তৃতা দিয়েছে শিবিরের নেতা। বক্তৃতায় ওরা যা বলার তাই বলল। তারপর ইতিহাস বিভাগের প্রধান সফিয়ার স্যার আমাকে ডাকলেন। তার কয়দিন আগে সে সময়ের আজকের কাগজের মাসিক 'ঐতিহ্য' তে কলিম খানের একটা আর্টিকেল পড়েছি। সেখান থেকে ঝাড়লাম ভাষার জন্ম-মৃত্যুর গোমর। তবে তার আগে এইটুকু বলে নিয়েছিলাম, কেউ যখন ভাষা নিয়ে চিৎকার বা কান্নাকাটি করে, তখন আমার হাসি পায়। কারণ এতে ভাষার কোনও লাভ নেই।

তারপর বক্তৃতা শেষ করে যেই মাটিতে বসেছি, তখনই ছাত্রদলের কে যেন আমাকে সরে যেতে ইশারা করলেন। আমি সরে পড়লাম। তারপর ১০ এপ্রিল, ২০০৩। দিনটা ছিল রৌদ্রময়। কতদিন আর প্রিয় ক্যাম্পাসকে ছেড়ে থাকা যায়। ক্যাম্পাসে গিয়ে এক পলক ঘুরে আসার জন্য লালবাগ থেকে আমি ও স্বাধীন রিক্সায় উঠলাম। প্রথমে কলেজ ক্যান্টিনে গেলাম। চা ও সিঙ্গারা খেয়ে হাটতে হাটতে ফার্স্ট বিল্ডিংএর সামনে আসতেই দেখি একদল শিবির কর্মী প্রিন্সিপাল স্যারের রুমের দিকে গেল। তাদের কারও কারও সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়ে গেল। এদিকে ভাস্কর্যের কাছে আসতেই ৫/৬ টি ছেলে এসে দুই পাশে আমার দুই হাত ধরে বলল, আমাদের নেতা আপনার সাথে কথা বলবেন। আমি বললাম, কোথায়? উত্তরে ওরা জিএল হোস্টেলের কথা বললে, আমি চলেন বলে এগিয়ে যাই। আমার মাথায় রাগ চড়েছে। দেখি এরা কি করে। তারপর লিচুতলা হয়ে জিএল হোস্টেলে চলে গেলাম।

আমাকে নিয়ে যাওয়া হল জিএল হোস্টেলের নিচতলার দক্ষিণের একটি রুমে। যাওয়ার পথে ওরা আরও কয়েকজনকে ডেকে নিলো। ঘরে খাটগুলোর নিচে কয়েকটি ক্রিকেট ব্যাট ও স্ট্যাম্প। প্রথমে তারা আমাকে একটি খাটে বসায়। পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বললাম, "কই ভাই আপনাদের নেতা? কি জন্যই বা ডেকে আনলেন?" শুয়োরের বাচ্চা বেশি কথা বলিস বলেই একজন কি দুজন প্রথম স্ট্যাম্প ও কাঠের রোলার দিয়ে পেটানো শুরু করে। ২/১ মিনিটের মধ্যেই সেগুলো ভেঙে যায়। এরই মধ্যে পায়ের চামড়া ফেটে রক্ত বের হয়ে গেছে। ক্রিকেট ব্যাট দুইটা ছাড়া ওদের আর মারার উপকরণ নাই দেখে খুশি হলাম। পা গুটিয়ে নেয়ায় যুৎ মত মারতে পারছিল না। তাছাড়া আমি চিৎকারও করছিলাম খুব। একারণে ওরা ব্যাট দিয়ে মেরুদণ্ডে ও বাঁ হাতে মারছিল। আঘাতের এক পর্যায়ে আর আঘাতগুলো সেভাবে লাগছিল না। এরই মধ্যে বাঁ হাতটা ভেঙে যায়।

এক পর্যায়ে তারা মাইর থামায়। আমি তখনও অবাক, মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে! এরকম বিস্ময় নিয়ে ওদের গ্রুপ লিডারের চোখের দিকে তাকাতেই আমার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। এবারও তার চোখে তাকিয়ে বললাম, কেন মারছেন? সে বলে, আবার চোখ তুলে কথা বলিস? এবার তারা আমার চোখ বাঁধে। ওদেরই একজন গলার মধ্যে ছুরি জাতীয় কিছু একটা ধরে জেরা করতে থাকে। তারা অতীতে এই রুমে কাকে কাকে মেরেছে তার ফিরিস্তি দিয়ে বলে, বল তুই কোথায় থাকিস? আমার মনে হয়েছিল, ঠিকানা বলে দিলে ওরা সত্যি সত্যি দীপক, সাদেকুলদের মেরে আসবে। তাই বললাম, ভাই আমি বিবাহিত। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ওরা ভবিষ্যতে যা যা করতে নিষেধ করে, সবগুলোতে রাজী হয়ে যাই। কারণ, আমাকে বাঁচতে হবে। তারপর আবরার ফাহাদকে যেভাবে কয়েক জন ধরে সিঁড়িতে রেখে আসে, ঠিক সেভাবেই আমাকেও রিক্সায় ওঠানো হয়। পা না ভাঙায় রিক্সায় বসে থাকতে পেরেছিলাম। কয়েকবার বমিভাব চলে আসে, কিন্তু মাথা বলছিল-বমি করা যাবে না। তারপর লালবাগে কেডিসি রোডের মুখে এক সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতার ফটোকপির দোকানে রিক্সাকে থামতে বলি। তারপর হাসপাতাল। আমার মুক্তিযোদ্ধা পিতা দীপকদের জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। মামলাটি পর্যন্ত করেননি। কারণ, এর আগের কয়েকটি খুনের মামলায় ছাত্রশিবির নেতারা খালাস পেয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া গ্রুপ লিডারটি এখন লীগারদের কাছের লোক। আমাকে মারার পর ওরা প্রচার চালিয়েছে, ইরাক যুদ্ধে আমি নাকি আমেরিকার পক্ষ নিয়া বক্তব্য দিয়েছি!

২.
২০১৯। ১২ বছরের ফারাক। আক্রান্ত ও আক্রমণকারী ভিন্ন। ভিন্ন স্থানও। আগেরটি মফস্বল শহর এখনকারটি মহানগর ঢাকা। তখন ফেসবুক ছিল না। তবু কি বদলে গেছে কিছু। আবরার ফাহাদ। কুষ্টিয়া থেকে পড়তে গেছে মহানগরী ঢাকায়। দেশের বেদনায় জেগে উঠেছিল সে। তার কোনো বড় মঞ্চ ছিল না, যেখানে সে বলতে পারে। নিতান্তই মেধাবী ছাত্র ছিল। যেখানে পড়ত তার ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী নাকি বিদেশে চলে যায়। তবুও সে ফ্রান্সের কৃষক কন্যা জোয়ানের মত ভারতের সাথে তার স্বদেশের চুক্তির নিয়ে মতামত দিয়েছিল ফেসবুকে। স্বদেশের হিতের তরে নাই যার মন/ কে বলে মানুষ তারে, পশু সেই জন। সে পশু হতে চায়নি। তাই সে অতি সামান্য একটি পোস্টই করেছিল ফেবুতে। সিসি ক্যামেরায় দেখা যায়, যখন সে টর্চার সেলে যাচ্ছিল সেই ভঙ্গিতে কোনো জড়তা ছিল না।

ফেবুর পোস্টে কোনও ব্যক্তিকে সে আক্রমণ করেনি, সরকারকে নিয়েও কিছু বলেনি। শুধু সে কথিত বন্ধু রাষ্ট্রকে নিয়ে ইতিহাস টেনেছে। আর তাতেই ক্ষেপে গেল কিছু মানুষ! এরা কারা? আবরার ফাহাদ কি আমাদের সকলের স্বর নয়?

৩.
ভিন্ন মত প্রকাশের কারণে আবরার হত্যা নিয়ে পুরো সমাজে যে আলোড়ন উঠেছে, তা সমাজকে নিয়ে এক আশার আলো দেখায়। এই সমাজে শুধু বিশ্বাসের কারণে ব্লগারদের হত্যা করা হয়েছে, তখনও হত্যাকারীর সমর্থক জুটেছে। ছেলেধরা সন্দেহে মাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্ব যুক্ত হওয়ায় পুরো সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তার রেশ ফেবুতে পাওয়া যাচ্ছে। এ থেকে মুক্তির পথ কি?

নাহিদ হাসান: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি