‘পেঁয়াজকাণ্ড’: ভোক্তার দিকে তাকাবে কে?

শুভ কিবরিয়া
শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘যখন চিনির দাম বেড়ে গেছে ভয়ঙ্কর

তারা খায় স্বেচ্ছায় নুনের পরিজ।

সমস্ত ভণ্ডুল হয়ে গেলে সব পৃথিবীর,

মসৃণ টেবিলে বসে খেলে যায় ব্রিজ।

জীবনকে স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের মত মেনে নিয়ে

মঞ্চে বক্তৃতা দেয় কর গুনে-কুকুর ক্ষেপীয়ে।’

(প্যারা-ডিম/জীবনানন্দ দাশ)

এক.

চিনির দামের বাড় বাড়ন্ত কবি জীবনানন্দ দাশকে কবিতার শব্দে বিচলিত করেছে বটে। প্রশ্ন হচ্ছে, বেঁচে থাকলে এখন কি পেঁয়াজ নিয়ে লিখতেন তিনি?

আপাতত সেই প্রশ্নের উত্তর পাবার জো নেই। তবে, পেঁয়াজের দাম নিয়ে মন্ত্রীর কথা আমরা শুনতে পারি। কারণ মন্ত্রী, সরকারই তো ভরসা! বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি এ বিষয়ে যা বলেছেন, সংবাদপত্রে তা শিরোনাম হয়েছে ,‘পেঁয়াজ ১০০ টাকার নিচে পাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই’।

এই খবরের বিস্তারে বলা হচ্ছে, ৮ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার রংপুর শহরে ইটভাটা মালিকদের বার্ষিক সাধারণ সভায় যোগ দিতে যেয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ‘চলতি মাসের শেষের দিকে উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারে এলে দাম কমবে। এর আগে দাম কমা হয়তো সম্ভব হবে না। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি। তবে পেঁয়াজ ১০০ টাকার নিচে পাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই।’

মন্ত্রী মহোদয়ের ইটভাটার কারবারিদের আসরে যেয়েও রেহাই নেই। সেখানেও পেঁয়াজ নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। তবে, মন্ত্রী পেঁয়াজ কারবারিদের একটা উপকার করেছেন, সেটা হলো- এখন আমদানি মূল্য যাই হোক না কেন ১০০ টাকার নিচে আর পেঁয়াজ বাজারে মিলবে না। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা মন্ত্রীর কথাকেই কাজে লাগাবেন।

অথচ, মাত্র কদিন আগেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সেখানে এক পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের উপস্থিতি পেয়েছেন, যারা মিয়ানমার থেকে ৪২ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ আমদানি করে ১১০ টাকা কেজিতে পাইকারি বাজারে বিক্রি করছেন। ১৫ জনের এই সিন্ডিকেটকে হন্যে হয়ে খুঁজছে প্রশাসন। এসব সিন্ডিকেটে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের টেকনাফভিত্তিক পেঁয়াজ আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আড়তদার আছেন। তাদের শাস্তির জন্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতও অনুসন্ধানে নেমেছে।

দুই.

পেঁয়াজ হঠাৎ করে মূল্যবান হয়ে ওঠে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ভারত পেঁয়াজ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে। এ খবর চাউর হলে বাজারে লাগে আগুন। ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ ১৪০-১৫০ টাকা দরেও বিক্রি হতে থাকে। প্রথম দিকে বাণিজ্য সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রী এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেবার কথা বলেন। বাজার মনিটরিংসহ অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবার জন্য মিটিং-সিটিং করলেও তা আদতে কোনো কাজে লাগেনি। সবটাই কথার কথা হয়ে পড়ে।

দু-চারজায়গায় ভ্রমমাণ আদালতের মিডিয়া শো চলে, ফেসবুক শো চলতে থাকে, কিন্তু পেঁয়াজের দর কমার বদলে বাড়তেই থাকে। ফলে সংবাদমাধ্যমে পেঁয়াজ নিয়ে নানান খবর চাউর হতে থাকে। হালি দরে পেঁয়াজ বেচাকেনার খবর পাওয়া যায়। নিম্ন আয়ের মানুষেরা ২০ টাকা হালিতে পেঁয়াজ কিনে তাদের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন সে খবর পত্রিকার শিরোনাম হয়। পেঁয়াজের দর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত সবুজ আপেল আর মাল্টার দরের পাশে এসে দাঁড়ায়।

তিন.

পেঁয়াজকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক নতুন ধারাকে চিহ্নিত করে। প্রথমত, বাজার ব্যবস্থায় সরকারের কোনো মনিটরিং নেই। ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে ভয় ছড়ানো ছাড়া বাজারকে সুস্থির, ন্যায্য ও ন্যয়সংগত আচরণ করাতে সরকারের কোনো প্রকাশ্য টুলসও নেই।

ব্যবসায়ীদের হাজারটা নীতি প্রণোদনা দিলেও ব্যবসায়ীরা যদি বিপথে যায় তা মোকাবিলা করার নীতিসংগত কোনো উপায় সরকারের হাতে নেই, এবারের পেঁয়াজকাণ্ড এর বড় প্রমাণ। শাস্তি দেয়া, গোপনে ও প্রকাশ্যে ভয় দেখানোর কায়দাটা বাজার মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে বহু আগেই অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা বাস্তবসম্মত ও নীতিশাসিত ব্যবস্থাও নয়।

এক-এগারোর শাসনামলে এটা পরীক্ষিত হয়ে গেছে যে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভয়ের গোলা বুমেরাং হয়ে ফেরে। তাহলে উপায়টা কী? সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আছে –ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) নামে। কথা ছিল, এই প্রতিষ্ঠানটি সক্ষম ও শক্তিমান করে তোলা হবে। বাজারে যে কোনো দুর্ভোগে টিসিবি ভোক্তার স্বার্থরক্ষা করতে সুরক্ষা দেবে। এবার যখন পেঁয়াজে আগুন ধরলো তখন দুর্বল টিসিবি প্রতি কেজি ৪৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে লাইনে দাঁড়ানো ক্রেতাপ্রতি দুই কেজি করে পেঁয়াজ বিক্রি করলেও পরে জনপ্রতি এক কেজি করে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। খুবই দুর্বল ব্যবস্থাপনায়, সীমিত সামর্থ্যে চলে টিসিবির এই কার্যক্রম। এটা সমুদ্রে এক বিন্দু শিশির দেবার মত অবস্থা! অথচ টিসিবিকে দিয়ে দ্রুত পেঁয়াজ এনে, বাজারে ছেড়ে, পরিস্থিতির সামাল দেয়া যেত। ব্যবসায়ীদের অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া যেতো। এই কাজটি কোনো সরকারই টিসিবিকে দিয়ে করাতে চায়নি, এখনো চাইছে তার প্রমাণ মেলেনি।

সরকারের হাতে দ্বিতীয় ব্যবস্থা হচ্ছে পরিকল্পনার বিষয়ে তৎপরতা। পরিকল্পনার অংকটা ভালো করে করা। একটা তথ্য বলছে, প্রতি বছর দেশে পেঁয়াজের মোট চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। দেশে উৎপাদিত হয় ১৫-১৬ লাখ টন। প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে দেশের কৃষক। বাকিটা আমদানি করতে হয় চীন ভারত, মিসর, তুরস্ক, মিয়ানমার থেকে। এখানে একাধিক বিকল্প রাখার সুযোগ আছে।

আমাদের ঘাটতির কথা মাথায় রেখে যদি পরিকল্পনা করা হয় তাহলে যে কোনো বিপদ আসার আগেই ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। বিপদের কথা হচ্ছে, আমাদের এই আমদানির ওপরে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পুরোটাই ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে টিসিবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে অতি সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আমাদের পেঁয়াজ ডিপ্লোম্যাসি কাজ করেনি। এখানেও সরকারের করণীয় আছে।

আরেকটা বড় বিষয় হচ্ছে দেশে চাহিদার যে ৬০ শতাংশ পেঁয়াজ উৎপাদন করে কৃষক, তারা উৎপাদন শেষে একরকম লস করে। একটা হিসাব বলছে, এবারের সিজনে কৃষকের প্রতিকেজি পেঁয়াজের গড় উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় ১৭ দশমিক ৩৮ টাকা। বিক্রি করতে হয়েছে কেজি প্রতি ১০ থেকে ১৩ টাকায়। কৃষকের এই ক্ষতি পূরণ হবার নয়।

কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদন করে লস দিলেও লাভ করেছে আড়তদার, মজুতদার, সরবরাহকারীসহ বড় একটা মধ্যস্বত্বভোগী। ফলে আগামী বছর এই কৃষকের একটা বড় অংশ পেঁয়াজ উৎপাদনে অনাগ্রহী হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। এখানেও সরকারের কাজ করার আছে। কৃষককে কীভাবে সুরক্ষা দেয়া যায়, কীভাবে কৃষকস্বার্থে একটা বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়, সেটাও ভাবার দরকার।

চার.

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারের ওপর নীতি সহায়তা ও মনিটরিং করে সরকার যেমন জনস্বার্থে ভূমিকা রাখতে পারে, ভোক্তাদেরও এক্ষেত্রে ভূমিকা আছে। বিশেষ করে ভোক্তাস্বার্থে যেসব সংগঠন কাজ করে তাদেরও একটা বড় ভূমিকা আছে। বলা যায়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশে যথেষ্ট ঘাটতি আছে। আমাদের এখানে ভোক্তাদের পক্ষে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ(ক্যাব) কাজ করলেও, তার সাহসী ও উদ্যমী ভূমিকার যথেষ্ট অভাব আছে।

ক্যাব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতাকে চিহ্নিত করার সামর্থ্য রাখে না বরং নানা উপায়ে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথেই লতায়পাতায় জড়িত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এবার যখন পেঁয়াজের দামে ভোক্তারা নাকাল তখন ক্যাবকে ভোক্তাস্বার্থে কোনো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে দেখা যায় নাই। ভোক্তাদের সংগঠনগুলো ভোক্তাদের নানাভাবে সচেতন করেও পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। সেক্ষেত্রেও ক্যাব খুবই দুর্বল। ফলে, আমাদের ভোক্তাস্বার্থ বরাবরই অরক্ষিত থাকছে। এবার অন্য একটি ভোক্তা সংগঠনের পক্ষে দাবি করা হয়েছে, ৪ মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে ভোক্তাদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা।

পেঁয়াজের দাম আমাদের একটা সতর্কবার্তা দিলো। ইতোমধ্যে বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে। সাবান, পেস্ট, ডিটারজেন্ট পাউডারসহ অনেক প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অযৌক্তিকহারে বাড়ানো হয়েছে। সবক্ষেত্রে জোরদার মনিটরিং দরকার। সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোক্তাবান্ধব প্রশাসকদের দায়িত্ব দেয়া দরকার। নীতিসহায়তার সাথ, পরিকল্পনার সাযুজ্য দরকার। ভোক্তাদেরও আরও সংগঠিত ভূমিকা দরকার।

 

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

আপনার মতামত লিখুন :