জঙ্গিবাদ কবলিত বিশ্ব

লুৎফে আলি মহব্বত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

পৃথিবীতে কখনোই চিরশান্তি বিরাজমান ছিল না। কিন্তু একথাও ঠিক যে, বর্তমানের মতো এতো প্রবলভাবে জঙ্গিবাদ ও সংঘাত কবলিত হয়নি বিশ্ব। সারা বিশ্বের সামনে এখন এক নম্বর সমস্যার নাম সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ।

মানব সভ্যতার অসংখ্য অর্জনের গৌরবময় ইতিহাসের পাশাপাশি সংঘাত আর অশান্তির কথাও কম নেই। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংঘাত ও দ্বন্দ্বের কারণে কখনো কখনো যুদ্ধ, মহাযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবী এক চাপা যুদ্ধাবস্থার সংঘাতময় পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে চলছে, যার কারণ জঙ্গিবাদ এবং যাকে বলা হচ্ছে ভীতির সংস্কৃতি বা সন্ত্রাসবাদের নবরূপ।

জঙ্গিবাদ শব্দটি এসেছে ‘জঙ্গ’ থেকে যা থেকে জঙ্গি শব্দের উদ্ভব। শব্দটি মূলত ফারসি যার অর্থ যুদ্ধ বা লড়াই। সে হিসেবে ‘জঙ্গি’ অর্থ সাধারণভাবে যোদ্ধা বা লড়াকু। কিন্তু বর্তমান ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক অর্থে এরা প্রথাগত, আনুষ্ঠানিক প্রকাশ্য কোনো যোদ্ধা বা সৈনিক নন, বরং এক ভয়ানক গুপ্ত যোদ্ধাদল। আর জঙ্গিদের দ্বারা উদ্ভূত জঙ্গিবাদ হলো এমন এক মতাদর্শ যা শান্তি ও নিয়মের বিপরীতে রক্ত ও নৈরাজ্যের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এবং সরাসরি যুদ্ধ বা গুপ্ত সহিংসতার মাধ্যমে নিজেদের মত ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

জঙ্গিবাদ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। বিশ্বের প্রায়-প্রতিটি দেশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জঙ্গিবাদের বিপদ অথবা ভীতি কবলিত। শুধু ধর্মের নামেই যে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে তা নয়, ভাষা, অঞ্চল, জাতীয়তা ভিত্তিক জঙ্গিবাদও প্রসারিত হচ্ছে।

বর্তমানে বিভিন্ন ইসলামিক, খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু, এমনকি অহিংসাবাদী বৌদ্ধদের মধ্যেও বিভিন্ন জঙ্গিদল তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ও মানবতাবাদী আদর্শকে অবজ্ঞা করে সৃষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী ধর্মের নাম ও লেবেল ব্যবহার করলেও ধর্মের মূল চেতনা ও আদর্শের সঙ্গে জঙ্গিদের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। লুণ্ঠন ও নির্যাতন তাদের একমাত্র কাজ। ধর্ম প্রচার ও প্রতিষ্ঠা তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। এমনও দেখা গেছে, প্রতিপক্ষ বা শত্রুরা নিজেদের লোক দিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠী বানিয়ে ভেতর থেকে ক্ষতি ও দুর্নাম ছড়ানোর অপকর্ম করছে।

ধর্মের বাইরেও অসংখ্য জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা তাদের দাবি বা অধিকারের প্রশ্নে নিয়মতান্ত্রিকতাকে ত্যাগ করে সন্ত্রাসবাদকে নীতি ও আদর্শ রূপে গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগার, ভারতের মাওবাদীরা, জাপানের রেড আর্মি, নর্দান আয়ারল্যান্ডের আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি, কম্বোডিয়ায় খেমারুজরা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে জঙ্গিবাদী আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।

ধর্ম বা অন্য কোনও আদর্শ গ্রহণ করা হলেও জঙ্গিবাদের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যার ফলে সাড়া বিশ্বে জঙ্গিবাদ বিপদজনক বিষয় রূপে চিহ্নিত। কারণ, তারা মৌলবাদী, সশস্ত্র, নাশকতা ও হঠকারিতায় লিপ্ত ও আত্মঘাতী এবং বিচ্ছিন্ন। সাধারণ জনগণের সঙ্গে তাদের সংযোগ ও সম্পর্ক নেই। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে জঙ্গিবাদকে সহজে শনাক্ত ও নির্মূল করা অনেক সময়ই সহজ হয় না।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় যে নজিরবিহীন বিমান হামলা হয়েছিল, তারপর থেকে রং-বেরঙের জঙ্গিবাদ পৃথিবীতে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের ইতিহাস ও উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু এরাই দেশে দেশে নাশকতা, সংঘাত ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন ও উদ্বাস্তু হচ্ছে এদের দ্বারা সৃষ্ট হিংসায় কিংবা এদেরকে মোকাবেলা করার জন্য গৃহযুদ্ধ কবলিত হয়ে। ফলে জঙ্গিবাদের বিপদ নানা দিক থেকে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে নস্যাৎ করছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব অর্জনের পাশাপাশি জঙ্গিরা দখল করছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ও প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের তেল, গ্যাসের বিরাট হিস্যা তাদের দখলে, যা সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদীরা গোপনে কম দামে কিনে নিচ্ছে জঙ্গিদের কাছ থেকে। মাদক, অস্ত্র ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করছে জঙ্গিরা। জঙ্গিরা মানব পাচার, নারী পাচার ও আধুনিক দাস ব্যবসাও করছে। যেসব অপকর্মের ফায়দা কোনও ধর্ম বা আদর্শ নয়, পাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদীরা।

অবস্থা এমন হয়েছে যে, জঙ্গিবাদ ক্রমশ এক অন্ধকার অপরাধ বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে। স্বাধীনতা, অধিকার বা মানবমুক্তির কোনও শর্তই তারা মানছে না। তারা হিংসা, সন্ত্রাস, হত্যা, রক্তপাতে আকীর্ণ হচ্ছে। জাতীয় সম্পদ, তেল, গ্যাস তুলে দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে এবং অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচারের মাধ্যমে মানবতাকে বিপন্ন করে পুষ্ট করছে পুঁজিবাদীদের পকেট।

সময় এসেছে জঙ্গিবাদ কবলিত বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও দেশের প্রতিটি মানুষকে এই ভয়ঙ্কর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার; ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন হওয়ার; শান্তি, স্থিতি, উন্নয়ন ও নিয়মতান্ত্রিকতার পথে অটল থাকার; সকলে মিলে এই বিপদকে মোকাবেলা করার।

লুৎফে আলি মহব্বত: লেখক, কলামিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :