কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ‘বিনা’ উদ্ভাবিত তেল ফসল

ড. মো. আব্দুল মালেক
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কৃষি প্রধান বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনে তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩.৬ শতাংশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের কল্যাণকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ সহ অন্যান্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। কৃষি ক্ষেত্রে সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি। কৃষির উন্নয়নে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার বাধা হয়ে আসলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঠিক ও সময়োপযোগী নির্দেশনা এবং কৃষিমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় তা সাফল্যের সাথে অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে কোভিড-১৯ সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশের জন্যও নতুন এক অভিজ্ঞতা। এতে পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে মানবিক দুর্যোগ। করোনার প্রভাবে কোটি মানুষের আক্রান্ত ও লক্ষ মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ—জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের সংকট তৈরি হতে পারে মর্মে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আশঙ্কা করেছে।

এমতাবস্থায় বিশ্বের অনেক দেশ প্রতিষেধক উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখনো সফল হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তারা আক্রান্ত হলেও কোভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট ক্রিটিকাল অবস্থা মোকাবেলায় সক্ষম। তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন বেশি পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তথা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার, যদিও দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষ খাবার বলতে ভাতকেই বোঝেন।

অথচ মানবদেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের জন্য ভাত ছাড়াও সবজি, ফল, ডাল ও তেল ফসলের গুরুত্ব অপরিসীম। শরীরের পুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপাদান ভোজ্যতেলে বিদ্যমান। তেল ছাড়াও শর্করা, আমিষ, চর্বি, খণিজ পদার্থ যেমন লৌহ ও জিংক এবং বিভিন্ন ভিটামিন যথা ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ই, থায়ামিন ও রাইবোফ্লোভিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো তেল ফসল। তেল ফসলে সিদ্ধ চাল অর্থাৎ ভাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি আমিষ, অর্ধেক শর্করা, চার গুণের বেশি লৌহ ও জিংক বিদ্যমান। এছাড়া তেল ফসল চর্বির অন্যতম প্রধান উৎস।

দেশের একমাত্র বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) নিরাপদ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফসলের উৎপাদন বাড়ানোসহ পুষ্টিগুণের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রেখে বিনা উদ্ভাবন করেছে উচ্চ ফলনশীল ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ দানাদার, তেল, ডাল, সবজি এবং মশলা ফসলসহ লেবুর মোট ১১২টি জাত। বিনা ইতোমধ্যে তেল ফসলের মোট ৩০টি জাত উদ্ভাবন করেছে তন্মধ্যে সরিষার ১০টি, চিনাবাদামের ১০টি, সয়াবিনের ৬টি এবং তিলের ৪টি জাত। অধিকাংশ জাতই কৃষকের মাঝে সমাদৃত হয়ে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরোর তথ্যে দেখা যায় গত ২০১৮ সালে দেশে ৪৬.২১ লক্ষ টন ভোজ্যতেল আমদানিতে ২৭.৭৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যদিও আমদানিকৃত তেলের বড় একটি অংশ শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরিষাসহ অন্যান্য তেল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা (১.৩৭% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রায় ২২.০ লক্ষ) এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে ভোজ্যতেলের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিগত তিন বছরে এই আমদানি হার পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২০২১ সালে মাথাপিছু দৈনিক ৪০ গ্রাম হারে দেশে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ২৫.০ লক্ষ টনে।

চাহিদার তুলনায় ভোজ্যতেলের মোট দেশজ উৎপাদন অনেক কম বিধায় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে ঘাটতি মোকাবেলার জন্য বিদেশ হতে ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। দেশে ভোজ্যতেলের মূল উৎস হলো সরিষা এবং সামান্য পরিমাণে সূর্যমুখী, সয়াবিন ও তিল এবং রাইস ব্রান যা থেকে মোট ৫.০ লক্ষ টনের কাছাকাছি ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। দেখা যাচ্ছে ঘাটতি থাকে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ এবং করোনার নেতিবাচক প্রভাবে তা আরো বাড়তে পারে।

এ বাস্তবতা বিবেচনায় এখনই প্রয়োজন তেল ফসলের চাষাবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া। উল্লেখ্য বর্তমানে দেশে আবাদি জমির মাত্র ৪ শতাংশ তেল ফসলের আবাদের জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রচলিত জাতের সরিষায় শতকরা ৩৩-৩৫ ভাগ এবং সয়াবিনে ১৮ ভাগ তেল থাকে। অন্যদিকে বিনা উদ্ভাবিত বিনাসরিষা-৪ ও বিনাসরিষা-৯ এ শতকরা ৪৪ ভাগ পর্যন্ত তেল থাকে। বিনা উদ্ভাবিত বিনাসয়াবিন-৩, বিনাসয়াবিন-৫ ও বিনাসয়াবিন-৬ জাতে শতকরা ২০ ভাগ তেল আহরণ করা সম্ভব।

মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন-ই’র প্রয়োজনীয়তা অনেক, যা সবরকম রোগ বা দুর্বলতা উপশম করতে পারে। তেল ফসলের মধ্যে চিনাবাদামে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন-ই থাকে। তাছাড়া বিনা উদ্ভাবিত চিনাবাদাম জাতগুলো হতে ২৮.১% আমিষ ও ৫০.৬% তেল পাওয়া যায়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের প্রতিদিন ৮.০ মিলিগ্রাম ও মহিলাদের ১৮.০ মিলিগ্রাম আয়রনের প্রয়োজন হয়। তেল ফসলের মধ্যে ক্যালসিয়াম ও আয়রনের সবচেয়ে বড় যোগানদাতা হচ্ছে তিল। তিলে সাধারণভাবে ৪৩ ভাগ তেল থাকলেও বিনা উদ্ভাবিত বিনাতিল-১ এ তেলের পরিমাণ শতকরা ৫২ ভাগ।

দেশে করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফায় ‘খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখা, অধিক ফসল উৎপাদন করা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জমি যেন পতিত না রাখার’ নির্দেশনা আছে। এ লক্ষ্যে ‘বিনা’ একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। করোনা পরবর্তী ভোজ্যতেলের সংকট মোকাবেলায় আগামী রবি মৌসুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন রবি মৌসুমে বিনা উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহনশীল সরিষা, সয়াবিন ও চিনাবাদামের আবাদ বৃদ্ধিতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে। সে লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সক্রিয় সহযোগিতায় বিনা-র প্রধান কার্যালয়সহ এর ১৩টি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদেরকে বিনা উদ্ভাবিত তেল ফসল উৎপাদনে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং বীজ বিতরণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তাছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় কৃষকের মাঠে বিনা-র উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহনশীল তেল ফসলের (সরিষা, তিল, সয়াবিন ও চিনাবাদাম) প্রদর্শনী স্থাপন ও মাঠ দিবস আয়োজনের মাধ্যমে কৃষকেদেরকে উচ্চ ফলনশীল তেল ফসলের জাত চাষাবাদে উৎসাহিত করতে বিনা ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।

স্বাধীনতার পর সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তা বাস্তবায়নের পুরো দায়িত্ব নিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। জননেত্রী শেখ হাসিনার এ দায়িত্ব পূরণে বিনা উল্ল্যেখযোগ্য অবদান রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।


ড. মো. আব্দুল মালেক
মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান
উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বিনা, ময়মনসিংহ

আপনার মতামত লিখুন :