শিগগিরই ভাঙা শুরু হচ্ছে বিজিএমইএ ভবন

নাজমুল আহসান রাজু, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
বিজিএমইএ ভবন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বিজিএমইএ ভবন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীর হাতিরঝিলে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভবন শিগগিরই ভাঙা শুরু হচ্ছে। কোন প্রক্রিয়ায় ভাঙা হবে এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করতেই ভবন ভাঙার কাজ এতোদিন আটকে ছিল।

তবে এরই মধ্যে দরপত্র নিলামে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ভবন ভাঙার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আর আলোচিত ভবনটি ভাঙা হবে প্রচলিত পদ্ধতিতে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঊর্ধ্বতন সূত্র।

এদিকে আদালতের বেধে দেওয়া সর্বশেষ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভবন না ভাঙায় অসন্তুষ্ট মামলার বাদীপক্ষ। দ্রুত ভবনটি ভাঙা না হলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রাজউকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা মামলা করার কথা ভাবছেন তারা।

রাজউক সূত্র জানিয়েছে, হাতিরঝিলের ভবন ভাঙতে মেসার্স সালাম অ্যান্ড ব্রাদার্সকে কার্যাদেশ দিয়েছে রাজউক। গত ৬ অক্টোবর হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের রাজউক অংশের পরিচালক ভবন ভাঙার জন্য কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে। দু’টি বেজমেন্টসহ ১৫তলা বিশিষ্ট বিজিএমইএ ভবন ভাঙা ও মালপত্র অপসারণের জন্য এক কোটি ৭০ লাখ টাকার সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিলাম মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে শর্ত সাপেক্ষে রাজউক চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ কার্যাদেশের অনুমোদন দেন।

ভবনটি রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় হওয়ায় নিরাপত্তা, শব্দ দূষণ ও ধুলাবালু এড়াতে গুরুত্ব দিচ্ছে রাজউক। এজন্য ভবন ভাঙার কাজ চলাকালে তদারকির জন্য রাজউক একটি বিশেষ টিম ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পৃথক টিম গঠন করবে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভবন ভাঙতে ১১ মাস সময় চাইলেও ছয় মাস সময় দিতে রাজি হয়েছে রাজউক।

গত ১৬ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবনটি ভাঙা ও মালপত্র অপসারণের জন্য নিলাম দরপত্র আহ্বান করে রাজউক। সাতটি প্রতিষ্ঠান নিলামে অংশ নেয়।

সোমবার (১৪ অক্টোবর) রাজউকের চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘শিগগিরই ভবন ভাঙার কাজ শুরু হবে। কোন পদ্ধতিতে ভাঙা হবে তা চূড়ান্ত হয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে ভবন ভাঙবে, এ শর্তে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।’

আরো পড়ুন: বিজিএমইএ ভবন: মন্ত্রীর কথা আর রাজউকের কাজে মিল নেই

তিনি বলেন, ‘শুধু ভবন ভাঙলেই হবে না। নিরাপত্তা, শব্দ দূষণ ও ধুলাবালুর বিষয় রয়েছে। সে জন্য একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। এ জন্য সময় লেগেছে। আশা করছি, আমরা শিগগির ভবন ভাঙার কাজ শুরু করতে পারব।’

তবে কবে নাগাদ ভাঙা শুরু হবে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক এ মহাপরিচালক। গত ২১ মে রাজউক চেয়ারম্যান পদে তিনি যোগ দেন।

তিনি বলেছেন, ‘এটা প্রক্রিয়ার বিষয়। নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বলা যাচ্ছে না।’

মামলার আইনজীবী, মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইট অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে সোমবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে বলেন, ‘আদালতের বেধে দেওয়া সময় শেষ হওয়ার পরও কেন ভবনটি ভাঙা হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। আমরা রাজউকের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছেন, ভবন ভাঙার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশও দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভবন ভাঙতে বেশি সময় নেওয়া ঠিক হবে না। জনগণের মধ্যে এ আশঙ্কা যেন না দেখা দেয় যে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করা হচ্ছে। এটি ভাঙার দায়িত্ব রাজউকের হলেও সাধারণ মানুষ মনে করবে সরকার আদালতের নির্দেশ মানছে না। আমার আশা থাকবে, সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করবে সরকার। না হলে আমরা আদালত অবমাননার আবেদন নিয়ে যাব।’

জলাধার আইন লঙ্ঘন ও রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে উল্লেখ করে ২০১০ সালের ২ অক্টোবর ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ডি এইচ এম মনিরউদ্দিন আদালতে উপস্থাপন করেন। এর পরদিন বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ বিজিএমইএ ভবন ভাঙার রায় দেন। রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএ ভবন হাতিরঝিল প্রকল্পের ক্যান্সার। ভবনটি নির্মাণের আগে ওই স্থানের জমি যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বিজিএমইএর খরচে ভবনটি ভাঙতে বলা হয়।

ওই বছরের ৫ এপ্রিল বিজিএমইএর আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় আপিল বিভাগ স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ান।

২০১৩ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের ৬৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেয়ে লিভ টু আপিল করে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ। ২০১৬ সালের ২ জুন ওই আপিল খারিজ হয়ে যায়। এরপর বিজিএমইএ রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে। ২০১৭ সালের ৪ মার্চ তখনকার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের বেঞ্চ বিজিএমইএর রিভিউ আবেদনও খারিজ করে দেন। ভবন সরিয়ে নিতে কতদিন সময় লাগবে বিজিএমইএকে তা লিখিতভাবে আবেদন করতে বললে তারা তিন বছর সময় চায়। ওই বছরের ১২ মার্চ আদালত ছয় মাস সময় দেন। ওই সময়ে ভবন না সরানোয় আরো সাত মাস সময় পায় বিজিএমইএ। ২০১৮ সালের ২৭ মার্চ শেষ সুযোগ হিসেবে মুচলেকা দেওয়ায় আরো এক বছর সময় বাড়ান সর্বোচ্চ আদালত। মুচলেকার এক বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় চলতি বছরের ১২ এপ্রিল।

আপনার মতামত লিখুন :