গানে গানে লতা মঙ্গেশকরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

বিনোদন ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
লতা মঙ্গেশকর

লতা মঙ্গেশকর

  • Font increase
  • Font Decrease

পণ্ডিত দ্বীনানাথ মঙ্গেশকর ও স্ত্রী সেবন্তী মঙ্গেশকরের ঘর আলোকিত করে ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেছেন হেমা মঙ্গেশকর। সংগীত ও নাটক দুই ক্ষেত্রেই ছিলো দ্বীননাথের সাবলীল যাতায়াত।

শোনা যায়- ‘ভাউবন্ধন’ নামের এক নাটক পরিচালনার পর নাটকের প্রধান চরিত্র লতিকাকে খুব মনে ধরেছিল দ্বীনানাথ-সেবন্তী দম্পতির। এরপরই সন্তানের নাম হেমা মঙ্গেশকর বদলে লতা মঙ্গেশকর রাখেন তারা। আজ (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রখ্যাত এই সংগীতশিল্পী ৯১তম জন্মদিন।

লতা মঙ্গেশকরের পুরো পরিবারই বলতে গেলে সংগীতের রথী মহারথী ছিলেন। লতার পর একে একে সেবন্তীর কোলে আসেন আশা ভোঁসলে, উষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর ও সর্বকনিষ্ঠ হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর।

 

শোনা যায়- লতাকে ছোটবেলায় গান শেখানো হলেও এর প্রতি কোনো অগ্রগতি ছিল না তার। অন্যদিকে দ্বীনানাথ নিজের বাড়িতেই অনেককে গান শেখাতেন। একদিনের ঘটনা, অল্প কিছু সময়ের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন দ্বীননাথ। এক ছাত্রকে বলে গিয়েছেন গানের অনুশীলন করতে। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন ছোট্ট লতা তার ছাত্রের গানের রাগ শুধরে দিচ্ছেন। তারপর থেকেই বাবার কাছে লতার তালিমের শুরু।

পাঁচ বছর বয়স থেকে বাবার লেখা মারাঠি গীতি নাটকে ছোট ছোট চরিত্রে অংশগ্রহণ করতেন লতা। একদিন দ্বীনানাথের নাটকে নারদ মুনির চরিত্রের অভিনেতা কোনো কারণে এসে পৌঁছাননি। তার আবার গানও গাওয়ার কথা। লতা বাবাকে এসে বললেন, তিনি নারদের ভূমিকায় অভিনয় করতে চান। প্রথমেই দ্বীননাথ তার প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন। তবে লতার জোরাজুরিতে শেষশেষ রাজি হন তিনি। নাটক শেষে দর্শকদের মুখে নারদ মুনি চরিত্রে অভিনয় করা মেয়েটির প্রশংসা। তারপর থেকেই বাবার সাথে ছায়ার মতো সবখানেই যাওয়া আসা শুরু। এভাবেই কিছু সিনেমায় ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়। তবে অভিনয় তার নিজের কাছে কখনোই ভালো লাগতো না। 

পিতার ছায়া খুব বেশিদিন থাকেনি লতা এবং মঙ্গেশকর পরিবারের উপর। লতার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন (১৯৪২ সাল) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দ্বীনানাথ মঙ্গেশকর মারা যান। ফলে সম্পূর্ণ পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে ১৩ বছর বয়সী লতার কাঁধে। পরিবারের বন্ধু ‘নবযুগ চিত্রপট চলচ্চিত্র কোম্পানি’র মালিক মাস্টার বিনায়ক তখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মঙ্গেশকর পরিবারের।

 

ছোটবেলায় মাঝে মাঝে চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন লতা। কিন্তু বিনায়ক তাকে বলেন যে কোন একটি মাধ্যমে সিরিয়াসলি কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে। অভিনয় ভালো লাগতো না তাই চিকন এবং একটু পাতলা গায়কী নিয়েও গান গাইবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৩ বছর বয়সী সেই মেয়েটি।

তারপর তখনকার আরেক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী এবং সংগীত পরিচালক গুলাম হায়দার তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন শশধর মুখার্জীর সাথে। মুখার্জী তখন ‘শহীদ’ (১৯৪৮) চলচ্চিত্রটি নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি লতার গান শুনে, ‘বেশি চিকন গলা, এমন কণ্ঠ প্লে-ব্যাকের জন্য নয়’ বলে বাতিল করে দিয়েছিলেন। বিরক্ত রাগান্বিত হায়দার বলে বসেছিলেন, ‘একদিন পরিচালকেরা এই মেয়ের পায়ে পড়ে তাকে তাদের চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার জন্য ভিক্ষা চাইবে।’ সেদিন কে জানত, এই ভবিষ্যৎবাণী অতি দ্রুতই সত্য হতে চলেছে। সেই চিকন গলার মেয়েটি উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন গায়িকা হিসেবে রাজত্ব করবেন পরবর্তী কয়েকটি দশক। পরবর্তীতে ভারতের গানের পাখি বলে অভিহিত করা হয় লতা মঙ্গেশকরকে।

গুলাম হায়দারের হাত ধরে তার জীবনে সুযোগ এল ‘মজবুর’ (১৯৪৮) চলচ্চিত্রে ‘দিল মেরা তোড়া, মুঝে কাহি কা না ছোড়া’ গানটি গাওয়ার। এই এক গানেই বলিউড ইন্ডাস্ট্রি নতুন এই গায়িকাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। জীবনের প্রথম বড় ধরনের হিট নিয়ে আসে ‘মহল’ (১৯৪৯) চলচ্চিত্রের ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি।

পঞ্চাশের দশকেই লতা মঙ্গেশকর গান করে ফেললেন নামি-দামি সব সংগীত পরিচালকদের সাথে। ষাটের দশকে উপহার দিলেন ‘পেয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া’ বা ‘আজিব দাসতা হ্যায় ইয়ে’, ‘লাগ যা গালে’ এর মতো এখনো পর্যন্ত তুমুলভাবে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় সব গান।

সংগীতের সাত দশকের ক্যারিয়ারে সহস্রাধিক চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। ভারতের ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষা ও বিদেশি ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। গেয়েছেন চলচ্চিত্রের বাইরে আরও অনেক গান।

১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বিশ্বে সর্বাধিক গান রেকর্ড করার জন্য গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম ওঠে তার। এই সময়ে তিনি ২০টি ভাষায় ২৫০০০ এর বেশি গানে কণ্ঠ দেন। কিন্তু ২০১১ সালে এ রেকর্ডটি ভেঙে দেন তারই ছোট বোন আশা ভোঁসলে।

লতা মঙ্গেশকর এ পর্যন্ত ভারতরত্ন, পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। পেয়েছেন দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার, তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার চারবার সেরা নারী প্লেব্যাক, ১৯৯৩ সালে আজীবন সম্মাননা এবং ১৯৯৪-২০০৪ সাল পর্যন্ত বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া ১২ বার বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস’ অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার।

গত বছর তার ৯০ বছর পূর্ণ হবার সন্ধিক্ষণে একটি মারাঠি গানে কণ্ঠ দেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দেন এটিই তার গাওয়া শেষ গান। লতা হয়তো তার শেষ গানটি গেয়ে ফেলেছেন, কিন্তু লতার কালজয়ী সব সৃষ্টির রেশ রইবে চিরকাল।