‘রেহানা মারিয়ম নূর’: বাংলাদেশের সিনেমার মাইলফলক



সুমন ভট্টাচার্য
‘রেহানা মারিয়ম নূর’ ছবির দৃশ্য

‘রেহানা মারিয়ম নূর’ ছবির দৃশ্য

  • Font increase
  • Font Decrease

বাঁধন। এটা আরেক বাঁধনের গল্প। আজমেরী হক বাঁধন। একজন বাঙালি মহিলা। আরও স্পষ্ট করে বললে, এই দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের একজন বাঙালি মুসলিম নারী। সিঙ্গল মাদার। কিন্তু এই মুহুর্তে পর্দায় যাঁর সিঙ্গল মাদারের চরিত্রায়ণ ঘিরে আপ্লুত তাবৎ চলচ্চিত্রবিশ্ব। কান-এর মতো বিশ্ববন্দিত চলচ্চিত্র উৎসবে যাঁর অভিনীত সিনেমা ‘রেহানা মারিয়ম নূর’ দেখানোর পর গোটা প্রেক্ষাগৃহ উঠে দাঁড়য়ে হাততালি দিয়েছে, যাকে বলা হয় স্ট্যান্ডিং ওভেশন। 'হলিউড রিপোর্টার' বা 'স্ক্রিন'-এর মতো পত্রিকা বাংলাদেশের এই সিনেমা ঘিরে যা উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে, গত ৪০ বছরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনো বাংলা সিনেমা সেই আলোড়ন তুলতে পারেনি।

বাঁধন, তোমার এই ২১ বছরের জীবনে ইউরোপ আর আমেরিকায় চক্কর মারার কারণে তুমি জানো কান চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমা দেখানো হয়েছে বলে যাঁরা অনেকে দাবি করেন, তাঁদের চলচ্চিত্র মূল প্রতিযোগিতামূলক কোনো বিভাগে তো দূরের কথা, ফেস্টিভ্যালেই দেখানো হয় না। হয়তো ফ্রান্সের এই সমুদ্রশহরের কোনো হলে দেখিয়েই কানে দেখানো হয়েছে বলে সেই পরিচালক বা প্রযোজক কলার তুলে ঘুরে বেড়ান। সেই সব অতিশয়োক্তির তুলনায় আবদুল্লাহ মহম্মদ সাদের এই সিনেমা, রেহানা মারিয়ম নূর শুধু আঁ সাতেঁ রিগা Uncertain Regard বিভাগে অফিসিয়াল সিলেকশনে নেই, পুরস্কার জেতার দৌড়ে রয়েছে। আগামী ১৬ তারিখ বোঝা যাবে বাংলাদেশের তরুণ চিত্রপরিচালক সাদ আমাদের বাঙালি হিসেবে কতটা গর্বিত করবেন।

বাঁধন, কিন্তু তুমি শুধু পারলে ইউ টিউবে এই সিনেমার ট্রেলার আর কানে স্ট্যান্ডিং ওভেশন পাওয়ার পরে আজমেরি হক বাঁধনের কান্নায় ভেঙে পড়ার প্রতিক্রিয়াটা দেখে নিও। দেখলে হয়তো একজন বাঙালি মহিলার এই অসামান্য সাফল্যে তোমার যেমন গর্ব হবে, তেমনই অকিঞ্চিৎকর মনে হবে বাংলার তাবড় মিডিয়াকে, যারা বাঁধনকে পিছনে ঠেলে দিয়ে কোনও রাজনীতিকের বান্ধবী বা পরকীয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আসলে এটাই বাঙালির কাঁকড়ার জাতের পরিচয়, যেখানে সত্যজিত রায়কে নিয়েও হইচই শুরু হয়েছিল এই কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালই তাঁকে 'পথের পাঁচালী'র জন্য স্বীকৃতি জানানোর পর।

‘রেহানা মারিয়ম নূর’-এর কানে পৌছে যাওয়াটা যদি বাংলাদেশের সিনেমার জন্য মাইলফলক হয়, তাহলে সিনেমার নামভূমিকায় আজমেরী বাঁধনের অভিনয়কে ঘিরে উচ্ছ্বাস বাঙালি মহিলার জন্য বিজয়কেতন। ‘রেহানা মারিয়ম নূর’ আসলে এক একবগ্গা চিকিৎসক শিক্ষকের গল্প, যিনি তাঁর ছাত্রীর যৌননিগ্রহের প্রতিবাদের দায়িত্বকে শুধু নিজের কাঁধে তুলে নেন না, এমন পর্যায়ে নিয়ে যান যে দর্শকদের শিহরিত করে। সাদের চিত্রনাট্য আর সিনেমাটোগ্রাফার তুহিন তাজমলের নীলাভ লুক এই চলচ্চিত্র, তার চরিত্রদের জীবন এবং রাগ, দুঃখ হতাশাকে এমন তীব্র চেহারা দিয়েছে যে, পশ্চিমী চলচ্চিত্র দুনিয়া আপ্লুত। মি টু আন্দোলন, তার টানাপোড়েন যে এইভাবে পর্দায় নিয়ে আসা যেতে পারে, এক সিঙ্গল মাদারের লড়াই দিয়ে বাঙ্ময় করে তোলা যেতে পারে, তা বোধহয় কেউ ভাবেনি।

বাঁধন, এটা সত্যি, কান যাঁর অভিনয় নিয়ে মুগ্ধ, পশ্চিমের সব সিনেমা পত্রিকা যাঁর চরিত্রায়ণ নিয়ে উচ্ছসিত, সেই আজমেরী হক বাঁধনকে নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলে বা খবরের কাগজে খবর নেই। এপার বাংলাতে তো নেই। যাঁরা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও টুইট করেন বা ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন, তাঁরা পর্যন্ত একজন বাঙালি অভিনেত্রীর এই শিখরে আরোহণ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিশ্চুপ। হয়তো বাংলাদেশি এই মডেল,অভিনেত্রীকে রেফার করা হবে, ওই যে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ওয়েব সিরিজ 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেন নি'র নায়িকা বলে। আমরা উল্লেখ করতে ভুলে যাব বাংলাদেশের এই নায়িকা আন্তর্জাতিক মঞ্চে কি তুফান তুলে দিয়ে এসেছেন| কিন্তু কেউ যদি বাঁধনের ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার সামনে দাঁড়িয়ে মধ্যাহ্নভোজে যাওয়ার ভিডিওটা দেখেন, তাহলে আরেকবার এই মহিলাকে কুর্ণিশ করবেন। কত অনায়াসে এই মডেল লাইভে এসে বলে যান, আমার এই শাড়িটা আড়ং এর। গুচ্চি,আরমানির পাশে বাঙালি ব্র্যান্ড আড়ং!

বাঁধন, আসলেই এটা বাঙালি মহিলার বিশ্বজয়। আড়ং এর শাড়ি পরে কানের মঞ্চে তাক লাগিয়ে দেওয়ার কাহিনী| এক একাকী মহিলার লড়াইয়ের গল্প নিয়ে আরেক সিঙ্গল মাদারের ওভার বাউন্ডারি হাঁকানোর আখ্যান।

বাঁধন, কলকাতার মিডিয়ায় যখন নায়িকার বয়ফ্রেন্ড এর হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ নিয়ে তোলপাড়, তখন কান-এ আজমেরি হক বাঁধন এর ফোটোকল এর ভিডিওটা দেখতে পারো। দুনিয়ার সেরা বিনোদন আলোকচিত্রীরা চিৎকার করে এক বাঙালি মহিলাকে বলছেন, ম্যাডাম, লুক দিস সাইড অথবা স্মাইল,;স্মাইল,;তখন একটা গর্ব, আবেগ হৃদয়কে স্পর্শ করে যায় বইকি!

সুমন ভট্টাচার্য, কলকাতার বিশিষ্ট সাংবাদিক। কবি, কথাশিল্পী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।