মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা ২৪
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

'পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো, বলো কবে শীতল হবো' কিংবা 'ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে' অথবা 'মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে'; 'ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলোনা, ও বাতাস আঁখি মেলো না'; 'আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি'; এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো'। —গায়ক বা সুরকার হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেরা দশটি গান বাছা, আর সমুদ্রের ঢেউ গোনা, একই রকমের ব্যর্থ প্রয়াস। অবিস্মরণীয়, অনবদ্য, কালজয়ী, যে বিশেষণই ব্যবহার করা যাক না কেন, অধিকাংশ বাঙালিরই তা যথেষ্ট মনে হবে না।

বাংলা সংগীতজগতের অন্যতম পুরোধা ও সুরস্রষ্টা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে বলা হয় সংগীতের ঈশ্বর। তিনি বাংলা সংগীতজগৎকে বিশাল উচ্চতায় তুলে ধরেছেন। গান গেয়েছেন, সুর করেছেন, অনন্য সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিয়েছেন সংগীতবলয়কে। নানামুখী গানে আর কোনো শিল্পী তার সমকক্ষ হতে পারেননি। রবীন্দ্রসংগীতের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন তিনিই। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকী।

১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। কালজয়ী এই সঙ্গীতব্যক্তিত্ব সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীতানুরাগীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে আছেন। শিল্পীসত্তাকে অক্ষুণ্ণ রেখে কি করে একজন ভালো মানুষ হওয়া যায়, সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠা যায়- হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনজুড়েই তার উদাহরণ রয়েছে। আজও তিনি সুরের জাদুকর হয়েই বেঁচে আছেন বাঙালির মানবস্রোতে।

১৯২০ সালের ১৬ জুন ভারতের কাশীতে বেনারসে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা গানের এই প্রথিতযশা শিল্পী। তার সুরেলা কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত আর আধুনিক গান আজও গেঁথে আছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। তিনি বাংলা, হিন্দি এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন। তিনি হিন্দি সংগীত জগতে হেমন্ত কুমার নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন।

সিনেমার গান হোক বা রবীন্দ্রসঙ্গীত বা আধুনিক, গায়ক হিসেবে কোনও ক্ষেত্রেই বিন্দুমাত্র অস্বচ্ছন্দ বোধ করতেন না তিনি। সুরকার হিসেবেও বারবার প্রমাণ দিয়ে গিয়েছেন অগাধ বৈচিত্র্যের। একদিকে পশ্চিমী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন, অন্যদিকে ভারতীয় সঙ্গীতের নানা আঙ্গিকও ছিল তার নখদর্পণে।

তার আদি নিবাস ছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার জয়নগরে। তার ছেলেবেলা কেটেছে জয়নগরের বহেডু গ্রামে। চব্বিশ পরগনা থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে‌ তার পরিবার কলকাতায় চলে যায়। বড় ভাই তারাজ্যোতি ছোটগল্প লিখতেন। হেমন্ত মেজো। বড় ভাই ছাড়া বাকি দুই ভাই তারাজ্যোতি ও অমল মুখোপাধ্যায়। হেমন্তের ছোটভাই অমল মুখোপাধ্যায় গান করতেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কখনো গান শিখেননি। লোকমুখে শুনে শুনে গান তুলে নিতেন গলায়। টিফিন পিরিয়ডে স্কুলের ক্লাসরুমে বসে গান গাইতেন। একবার সেই গান শুনে ফেলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। স্কুল থেকে প্রায় বিতাড়িত করে দিয়েছিলেন। পরে বাবা গিয়ে অনেক অনুরোধ করে সামাল দিয়েছিলেন।

শিক্ষাজীবনে হেমন্ত ভবানীপুরের মিত্র ইন্সটিটিউশনে ছিলেন। সেখানেই তার সাথে পরিচয় হয় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। হেমন্তকে রেডিওতে নিয়ে গিয়েছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। শৈলেশ দাসগুপ্তের সহায়তায় ১৯৩৫ সালে ১৪ বছর বয়সে রেডিওতে প্রথম গান গাইলেন হেমন্ত।

সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুরস্কার-সম্মাননার পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সম্মানসূচক ডিলিট। পেয়েছেন সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অসংখ্য গানের মধ্যে জনপ্রিয় কিছু গান- মাগো ভাবনা কেন; পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো, বলো কবে শীতল হবো; ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে; আয় খুকু আয়,আয় খুকু আয়; মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে; ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলোনা, ও বাতাস আঁখি মেলোনা; আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি; এই রাত তোমার আমার, ঐ চাঁদ তোমার আমার… শুধু দুজনে; মেঘ কালো, আঁধার কালো, আর কলঙ্ক যে কালো; রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে; বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও, মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও; আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ; কেন দূরে থাকো, শুধু আড়াল রাখো; ওলিরও কথা শুনে বকুল হাসে; ছেলে বেলার গল্প শোনার দিনগুলো; আমিও পথের মত হারিয়ে যাবো; ইত্যাদি।