শান্তিচুক্তির দুই যুগের পথে উন্নয়নমুখী পার্বত্য চট্টগ্রাম



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
শান্তিচুক্তির দুই যুগের পথে উন্নয়নমুখী  পার্বত্য চট্টগ্রাম।

শান্তিচুক্তির দুই যুগের পথে উন্নয়নমুখী পার্বত্য চট্টগ্রাম।

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় সংসদে বিশেষ আলোচনার প্রস্তাবে বুধবার (২৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'শত বাধা অতিক্রম করে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশ আজ এক উন্নয়ন বিস্ময়', যার ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামেও। কোনো তৃতীয় পক্ষের সহযোগিতা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে দীর্ঘ সংঘাতের অবসানে ১৯৯৭ সালে সূচিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। শান্তিচুক্তির দুই যুগের পথে উন্নয়নমুখী পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের জনপদে পরিণত হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে মাত্র সাতটি বৈঠকের মাধ্যমে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি করা সম্ভব হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, তা পার্বত্যাঞ্চলে শান্তির আবহ তৈরি করেছে। সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে শান্তির, উন্নয়নের, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের ইতিবাচক পরিবেশ।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বিগত ২৪ বছরে বেশ কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং নিয়ন্ত্রণাধীন ৩৩টি দফতর-সংস্থার মধ্যে রাঙামাটিতে ৩০টি, খাগড়াছড়িতে ৩০টি এবং বান্দরবানে ২৮টি হস্তান্তর করা হয়েছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গঠন করা হয়েছে ভূমি কমিশন। প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩টি উপজাতি শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
সংসদ উপনেতার নেতৃত্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল-২০১০ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। ক্ষুদ্র তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিভিন্ন দফতরে চাকরির ক্ষেত্রে নৃগোষ্ঠীর লোকদের নির্ধারিত কোটা অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৃগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিষদ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে জারিকৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে।

ভূমিবিষয়ক আইন ও বিধিমালা ছিল না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন ২০০১ প্রণয়ন এবং ২০১৬ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিকভাবেও উন্নয়ন হয়েছে। অনেক উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বাজেট ছিল ৫০.৫৭ কোটি টাকা, আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ হয়েছে ৯১৫.৮৩ কোটি টাকা। তিন পার্বত্য জেলায় দুই হাজার ৮৯৯ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্গম হওয়ার কারণে যেখানে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়, এ রকম পাঁচ হাজার ৫০০টি পরিবারকে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

শান্তিচুক্তির আগে পার্বত্য অঞ্চলে মাত্র ২০০ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। রুমা ও থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদীর ওপর কোনো সেতু ছিল না। এখন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাস্তা ও বিভিন্ন আকারের সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। শান্তিচুক্তির পর এক হাজার ৫৩২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে এবং প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের রয়েছে।

শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে টেলিযোগাযোগ, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের আওতা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হয়েছে, যা শান্তিচুক্তির আগে ছিল না বললেই চলে। চুক্তির আলোকে পার্বত্য জেলায় কৃষি, স্বাস্থ্য, নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি বেশ কিছু এলাকা পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি চালু রয়েছে। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় দারিদ্র্য বিমোচন তথা জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েক শ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: শান্তির পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম

সংঘাত থেকে শান্তির পথে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রযাত্রা কণ্টকমুক্ত নয়। শান্তি বিরোধী নানা গোপন তৎপরতা হিংসা ও সন্ত্রাস বাড়াচ্ছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘শান্তি চুক্তি’ ও ‘স্থায়ী শান্তি’ প্রসঙ্গ দুটি আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত চর্চা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হয়। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিকে এ লক্ষ্যে অব্যাহতভাবে কাজ করতে হয়। ‘শান্তির পক্ষে’ ও ‘শান্তির জন্য’ সহায়ক পরিবেশ ও পরিকাঠামো গঠন এবং নাগরিক সমাজে আস্থা, বিশ্বাস, সৌহার্দ্য, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সমঝোতা বজায়ের মাধ্যমে তরান্বিত করতে হয় শান্তির গতিবেগ।

‘চুক্তি’ স্থায়ী শান্তি পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর গুরুত্ব অপরিসীম। পাশাপাশি সময়ের পরিবর্তনে ক্রমে ক্রমে তৈরি হওয়া শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর প্রতিও নজর দেওয়া অপরিহার্য। এজন্য সরকার ও জনসংহতি সমিতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক সংস্থাকে শান্তি, নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ হানিকর প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সতর্ক, সজাগ থেকে নিরাপত্তা ও শান্তির পক্ষে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি সকলেরই প্রত্যাশা। অশান্তির আগুন সকলের জন্যই বিপজ্জনক এবং অশান্তির কুফল ভয়াবহ ও ক্ষতিকর। অতীতে দেশে-বিদেশে অশান্তির ভয়াবহ পরিণাম দেখা গেছে। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সার্বক্ষণিক ভাবে একযোগে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। অশান্তি নয়, সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে স্থায়ী শান্তির পথে অগ্রসর হওয়াই কল্যাণকর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে সম্পন্ন শান্তিচুক্তির পটভূমিতে শান্তি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা সূচিত হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় শান্তি ও উন্নয়নের জনপদে পরিণত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। চুক্তির দুই যুগের প্রাক্কালে শান্তিপূর্ণ ও উন্নত পাবর্ত্য চট্টগ্রামের অপেক্ষায় দেশবাসী।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।