ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের কাছে সাধারণ মানুষ ভালো কিছুর প্রত্যাশা করে, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের কাছে সাধারণ মানুষ ভালো কিছুর প্রত্যাশা করে, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ওয়াজ মাহফিল ও ওয়ায়েজদের (বক্তা) নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক বক্তার বক্তব্য নিয়ে ট্রল হচ্ছে। তাদের দেখানো নানা দৃশ্য হাসির খোরাকে পরিণত হয়। সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়িয়ে ‘চা খাব? খাই একটু? আপনারা খাবেন? ঢেলে দেই?’ গিয়াস উদ্দিন তাহেরির এই কথা সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। এর সঙ্গে ছড়িয়েছে, ‘ভাই! পরিবেশটা সুন্দর না? কোনো হৈ চৈ আছে?’

এর আগে দেশে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, জঙ্গিবাদে উসকানি, নারী বিদ্বেষ, গণতন্ত্র ও দেশিয় সংস্কৃতি বিরোধী বক্তব্য এবং বিশেষ ওয়াজ মাহফিলে সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করার কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের ১৫ জন আলেমকে চিহ্নিত করে তাদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কতিপয় দিকনির্দেশনা দিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বিভাগীয় কমিশনারদের নিকট পরিপত্র পাঠায়।

তখন থেকে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী, মিডিয়াকে ওয়াজ মাহফিল ও বক্তাদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্বেষ উগড়ে দিতে দেখা গেছে। অনেকে সরাসরি ওয়াজ মাহফিল বন্ধের দাবিও তুলেছেন। এমতাবস্থায় সারাদেশের বক্তাদের তত্ত্বাবধান, দিক-নির্দেশনা দেওয়ার উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ লক্ষে ‘ইত্তেফাকুল ওয়ায়েজীন বাংলাদেশ’ শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী রাজধানীর বিএমএ মিলনায়তনে ‘ওয়ায়েজ, খতিব ও দায়ী ওলামায়ে কেরামের করণীয়’ শীর্ষক এক কর্মশালার আয়োজন করেছে।

সংগঠনের উপদেষ্টা শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক, পীরে কামেল মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবি ও মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা হাসান জামিল স্বাক্ষরিত প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে ওয়াজ-নসিহত দ্বীনি দাওয়াত ও তালিমের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আল্লাহর মেহেরবানী, বাংলাদেশে সারাবছর ব্যাপকহারে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মাহফিলগুলোর মাধ্যমে দেশব্যাপী ইসলামি পরিবেশ বিরাজমান থাকে। নানা ধরনের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়। মানুষ দ্বীনের পথে পরিচালিত হয়। বিপুল পরিমাণ নবীণ ও প্রবীণ ওলামায়ে কেরাম এ ময়দানে খেদমত আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এ ময়দানকে নিয়ে বাতিলপন্থীরা ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। দ্বীনের এই মহান ক্ষেত্রটিকে সংকুচিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের সরলমনা অনেক ভাইয়ের কিছু কিছু অপরিণামদর্শী কার্যকলাপ ষড়যন্ত্রের যাচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে রসদ জোগাচ্ছে।’

লিফলেটে আরও বলা হয়, ‘ওয়াজ-নসিহতের ময়দান নির্বিঘ্ন থাকা দ্বীনের জন্য একান্ত জরুরি। আগামী দিনে মসজিদ ও ওয়াজের মিম্বর নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও কার্যকর রাখতে হলে আমাদের সকলের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। বিশেষত নবীন ওয়ায়েজ, খতিব ও দাঈ ভাইদের দায়িত্ব ও কর্মকৌশল বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা ও সচেতনতা প্রয়োজন।’ আর এসব বিষয়কে মাথায় রেখে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।

কর্মশালা প্রসঙ্গে পীরে কামেল মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবি বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো- কমেডি বক্তা, উগ্রপন্থা ও পরস্পর বিদ্বেষ রোধ করা। মাঝে মাঝে মাহফিলের মঞ্চে বিভিন্ন রকমের কমেডি দেখা যায়। যা শোভনীয় নয়। কারণ, ওয়াজের মূল উদ্দেশ্য মানুষের আত্মশুদ্ধি। পরস্পরে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করা। কোনো বিষয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো ও কৌতুক করা মাহফিলের উদ্দেশ্য নয়। এ সব বিষয়কে সামনে রেখে বাংলাদেশের মুরুব্বি আলেমদের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশে গঠিত হয়েছে ইত্তেফাকুল ওয়ায়েজীন বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত তিন বক্তা
ইত্তেফাকুল ওয়ায়েজীন বাংলাদেশের তিন উপদেষ্টা মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবি ও মাওলানা হাসান জামিল 

 

অন্যদিকে সংগঠনের আরেক উপদেষ্টা শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক বলেন, এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘দাওয়াত ও নসিহতের লক্ষ্যে যারা মাঠে-ময়দানে বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তাদেরকে সহযোগিতা করা; তাদের সামনে ওয়াজ-নসিহত ও দাওয়াতের উদ্দেশ্য এবং কর্মপন্থা বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া। সেই সঙ্গে এই ময়দানে কর্মরতদের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও তাদেরকে সংগঠিত করে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মোকাবিলা করা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটা কোনো সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনী কিংবা শোডাউন নয়, এটি প্রশিক্ষণমূলক একটি কর্মসূচি।’

মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা হাসান জামিল বলেন, ওয়াজ মাহফিল যেহেতু একটি দ্বীনি বিষয়, তাই দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ের মতো এক্ষেত্রেও হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিনের অনুকরণ করা জরুরি। মানুষের ব্যক্তি জীবনের পরিশুদ্ধি ও আকিদা-বিশ্বাসের সংশোধনের ক্ষেত্রে ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়গুলোই কর্মশালায় আলোচনা করা হবে।

বস্তুত ওয়াজ ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক কাজ। তাই বক্তার কোরআন-হাদিসের অর্থ, ব্যাখ্যা, বিশুদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা দরকার। সেই সঙ্গে তাকে আলেম, দ্বীনদার, মুত্তাকি ও পরিপূর্ণ সুন্নাহর অনুসারী ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হওয়া আবশ্যক। আমরা মনে করি, সত্যিকারের বক্তা পেশাদার ওয়ায়েজ নন। তার দ্বারা সমাজে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় না।

এ কথা মানতে দ্বিধা নেই, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, খুতবা, ওয়াজ মাহফিল, সিরাত মাহফিল, ইসলাহি মাহফিল ও তাফসির মাহফিলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আলেমরা ইসলামের বাণী ও শিক্ষাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। সৎ, ঈমানদার, যোগ্য ও দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন নাগরিক তৈরিতে ওয়াজ মাহফিলের ভূমিকা অসামান্য।

ইসলামে ব্যভিচার, মদ, জুয়া, ঘুষ, সুদ, জবর দখল, অশ্লীলতা, জুলুম, নির্যাতন, অন্যের সম্পদহরণ, কারও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, নারী নির্যাতন, যৌতুক নেওয়া, মিথ্যা বলা, ওজনে কম দেওয়া, অফিস ফাঁকি দেওয়া পাপের কাজ। সাধারণ মুসলমান যেহেতু এ সম্পর্কে কম ওয়াকিবহাল, সেহেতু আলেমরা কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে এসব পাপাচার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। সে হিসেবে বলা চলে, ওয়াজ মাহফিল হলো- মানুষ সংশোধনের কেন্দ্র। আলোকিত শিক্ষালয়। এটাকে বন্ধ করা কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ হলো- সমাজকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আমরা মনে করি, দেশের সম্মানিত ও বিজ্ঞ আলেমদের তত্বাবধানে পরিচালিত ওয়াজ মাহফিলে বিশুদ্ধ কোরআন-হাদিসের চর্চা অব্যাহত থাকবে। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়েল জানার পাশাপাশি এখান থেকে শ্রোতারা নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত সম্পর্কে জানা ছাড়াও ইসলামি জীবন বিধানের সন্ধান পাবেন। এসব মাহফিল থাকবে অমুসলিমদের জন্যও উন্মুক্ত। এখান থেকে ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হবে যুক্তির আলোকে। গোঁড়ামি, উগ্রপন্থা, বিশেষ মতবাদ প্রচার যেনো ওয়াজ মাহফিলকে কলুষিত না করে সে বিষয়েও লক্ষ্য রাখবেন বক্তারা। আমাদের প্রত্যাশা এই কর্মশালায় মাহফিল চলার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করার পাশাপাশি ভিডিওধারণ, ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার, ওয়াজের বিষয় নির্ধারণ এবং উপস্থাপনা পদ্ধতি নিয়েও প্রয়োজনীয় আলোচনা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :