নবী করিম সা.-এর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের চিত্র

ইসলাম ডেস্ক, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহুগুণে গুণান্বিত ছিলেন, ছবি: সংগৃহীত

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহুগুণে গুণান্বিত ছিলেন, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ও নবী আদর্শের অনেক বিষয় আছে, যেগুলো করণীয়। এগুলোর কোনোটি পালন করা ফরজ, কোনোটি সুন্নতে মোয়াক্কাদা আবার কোনোটি নফল অথবা মোস্তাহাব।

তদ্রূপ অনেক বিষয় বর্জন করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এগুলো থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। এগুলোর মধ্যে কোনোটি হারাম, কোনোটি মাকরূহে তাহরিমি অর্থাৎ এতে লিপ্ত হওয়া গোনাহ এবং তা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। আবার কোনোটি মাকরূহে তানযিহি। অর্থাৎ তা থেকেও বেঁচে থাকা উচিত।

এ স্পষ্ট যে, ফরজ বা ওয়াজিব ত্যাগকারী কিংবা হারাম ও মাকরূহে তাহরিমিতে লিপ্ত ব্যক্তি কখনও ‘সুন্নতের অনুসারী’ হতে পারে না। তার জন্য এই উপাধি প্রয়োগ করা যাবে না। যদিও সে অনেক সুন্নতে মোয়াক্কাদা, সুন্নতে গায়রে মোয়াক্কাদা বা নফল, মোস্তাহাব যত্নের সঙ্গে পালন করুক না কেন।

যেমন সুদখোর, ঘুষখোর, ধোঁকা ও প্রতারণাকারী, দায়িত্বে অবহেলাকারী এবং হারাম কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে সুন্নতের অনুসারী বলা যাবে না যদিও তার মুখে দাড়ি থাকে এবং দাড়ির সঙ্গে পাগড়ি থাকে। প্রকৃতপক্ষে সে সুন্নত থেকে অনেক অনেক দূরে। তাই শুধু নবী আদর্শের আলোচনা নয়, জীবনের নবীর আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

আমরা জানি, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহুগুণে গুণান্বিত ছিলেন। বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বদা দৃষ্টি অবনত রাখতেন। কোনো জিনিসের প্রতি পুনরায় দৃষ্টি দিতেন না, স্থির দৃষ্টিতেও তাকাতেন না। আকাশের চেয়ে জমিনের দিকে বেশি তাকাতেন। সাহাবাদের সঙ্গে হাঁটার সময় তাদেরকে আগে দিতেন। তিনি তাদের আগে বাড়তেন না। কারও সঙ্গে দেখা হলে সালাম দিতেন। তার কথা ছিল সংক্ষিপ্ত, অথচ ব্যাপক অর্থবোধক ও সুস্পষ্ট। প্রয়োজন অনুসারে কথা বলতেন বেশিও বলতেন না কমও বলতেন না। রাসূলের সব কথা ছিলো ভালো ও কল্যাণধর্মী। কিন্তু তিনি দীর্ঘ নীরবতা অবলম্বনকারী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বাধিক কোরআন তেলাওয়াতকারী, ইস্তেগফার ও জিকিরকারী এবং প্রার্থনাকারী। সারাজীবন সত্যের আহ্বানে ও সৎকাজে ব্যয় করেছেন। তিনি ইসলামের আগে ও পরে অর্থাৎ সদা সত্যবাদী ও আমানতদার ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন বুদ্ধিমান, গাম্ভীর্যপূর্ণ, সঠিক সিদ্ধান্তের অধিকারী, প্রজ্ঞাময় মহান নেতা, ক্রোধ সংবরণকারী, নম্র। সব কিছুতে নম্রতা পছন্দ করতেন এবং বলতেন, যে নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। -সহিহ মুসলিম: ৪৬৯৬

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সদা চিন্তাশীল, কোমল, শান্ত ও ভদ্র চরিত্রের অধিকারী, রূঢ় স্বভাবের ও হীন চরিত্রের অধিকারী ছিলেন না। নিয়ামত কম হলেও বেশি মনে করতেন। ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত হলে রাগ করতেন না। আল্লাহর বিধান লঙ্ঘিত হলে প্রতিবিধান না করা পর্যন্ত ক্রোধ থামাতেন না এবং ক্ষান্ত হতেন না। হাসির সময় প্রায় মুচকি হাসতেন। এক কথা তিনবার বলতেন। তিনবার সালাম দিতেন, তিন বার অনুমতি চাইতেন। যাতে তার কথা ও কর্ম, আচার-আচরণ সহজে বোধগম্য হয়, অনায়াসে মানুষের হৃদয়ে আসন করে নেয়।

এক কথায়, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল অপূর্ব ভারসাম্যপূর্ণ। জীবনের সব দিক দিয়েই তিনি ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা পরিবেশের কথা ধরতে পারি। তাহলে দেখতে পাবো রাসূলুল্লাহ (সা.) পরিবেশের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছেন।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি জানো যে আগামীকাল কেয়ামত নিশ্চিত। তবু আজ একটি গাছ লাগাও। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জীবজন্তুর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্বিচারে জীবজন্তু হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, তোমরা পৃথিবীর মাটিকে দয়া করো তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনিও তোমাদের দয়া করবেন। সামাজিক পরিবেশের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা সবার জন্য অনুকরণীয়।

সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল নবী করিম (সা.)-এর মূল লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি চরম সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন। অথচ তিনি ইচ্ছা করলে মক্কার অমুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে চরম শত্রু মক্কার ইসলামবিরোধী নেতাদের পরম মহানুভবতার সঙ্গে উদারভাবে সর্বজনীন ক্ষমা প্রদর্শন করলেন। আপন চাচার হত্যাকারীদেরও নির্দ্বিধায় মাফ করে দিলেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মাত্র ১০-১২ জন যুদ্ধাপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়। এই হলো হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের ছবি।

বস্তুত আল্লাহর সাহায্যে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) সারাবিশ্বে ইসলামের সাম্য মৈত্রী ও ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক এক অনন্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মানবসভ্যতা আজ উন্নতি অগ্রগতির উচ্চ চূড়ায় সমাসীন হলেও অনেকক্ষেত্রে প্রাকসভ্যতা ও প্রাক-ইসলাম যুগের বর্বরতাই প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। নানান ছুতোয় দূর্বল জাতিসমূহের ওপর সবল জাতিসমূহের অত্যাচার-নির্যাতন পুরোদমে চলছে। মুখে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বড় বড় বুলি আওড়িয়ে মানবতা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারকে দুনিয়া থেকে নির্বাসন দেওয়া হচ্ছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে শাসক, শাসিত সব শ্রেণির মুসলমানের দ্বীনী কর্তব্য হলো, বিশ্বময় ভোগবাদী মানুষের কর্তৃত্ব ও আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার অন্যায় প্রবণতা দ্বারা সৃষ্ট সব অশান্তি ও চক্রান্তের হাত থেকে মানবতাকে রক্ষায় এগিয়ে আসা এবং মহানবী (সা.) আনীত জীবনব্যবস্থা ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্যে ঐক্যবদ্ধভাবে বজ্রকঠোর শপথ গ্রহণ করা। তবেই মিলবে শান্তির সোনালী রাজপথের দেখা। আর এটাই আমাদের ঈমানের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন :