ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবন্ধীদের মর্যাদা ও সম্মান

ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ইসলাম প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন লোকদের দায়িত্ব লাঘব করেছে, ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন লোকদের দায়িত্ব লাঘব করেছে, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রতিবন্ধীরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধের পরিবর্তন লক্ষণীয়। সাম্প্রতিকালে বিভিন্ন দেশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর নানাবিধ কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিবন্ধী বিষয়ক বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণের অঙ্গীকার প্রদান করছে। তবুও পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সাধারণত সমাজের অনগ্রসর ও পরনির্ভরশীল অংশ হিসেবেই রয়ে গেছে। এ কঠিন বাস্তবতা।

প্রতিবন্ধীদের ‘যুয়াফা’ (যয়িফ এর বহুবচন) হিসেবে কোরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। শারীরিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক অপূর্ণাঙ্গতাকে ইসলাম যথাযথ গুরুত্ব, মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর জন্য হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সতর্ক করা হয়েছে এবং তার শানে পবিত্র কোরআনে ১৬টি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি পাওয়া যায়, যারা তাদের পূণ্যময় কীর্তির কারণে পৃথিবীতে চিরদিনের জন্য ভাস্কর হয়ে আছেন। কোরআনে কারিমে প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে হৃদ্যতামূলক আচরণ করতে এবং তাদেরকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, প্রতিবন্ধীদের প্রতি কোনো ধরনের অনীহা পোষণ, তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা জাহেলি যুগের স্বভাব এবং অহংকারের নিদর্শন। কোরআনে কারিমে প্রতিবন্ধীদের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার প্রতি বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু আল্লাহতায়ালার নিকট মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড হচ্ছে বিশুদ্ধ ঈমান ও আমল। সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকা মর্যাদার মানদণ্ড নয়। তাই কারও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা অন্যায় কাজ, পাপের কাজ।

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, কেউ যেন অন্যকে নিয়ে কোনো বিষয়ে উপহাস না করে। কারণ হতে পারে, তার মর্যাদা আল্লাহর নিকট উপহাসকারীর চেয়ে বহুগুণ বেশি। অনুরূপ কোরআনে কারিমে মানুষকে তাচ্ছিল্য করে মন্দ নামে ডাকতেও নিষেধ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে, কারণ হতে পারে যাকে নিয়ে উপহাস করা হয় উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম এবং কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীকে উপহাস না করে; কারণ হতে পারে যাকে নিয়ে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং মন্দ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর মন্দ নামে ডাকা অতি মন্দ কাজ। যারা তওবা না করে তারাই জালেম।

কাজেই কাউকে লেংড়া, খোঁড়া, কানা, বধির, বেটে ইত্যাদি বলে ডাকা নাজায়েজ। তাদের উপস্থিতিতে যেমন তাদেরকে এমন বিশেষণে বিশেষায়িত করা নাজায়েজ, অনুরূপ তাদের অনুপস্থিতিতেও নাজায়েজ। কারণ অনুপস্থিতিতে তাকে এসব নামে ডাকলে তা পরনিন্দায় পরিণত হবে। আর পরনিন্দা হলো, এমন ভাষায় কারও আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে।

ইসলাম প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন লোকদের দায়িত্ব লাঘব করেছে। তাদের সামর্থ্যরে কথা বিবেচনা করে তাদের প্রতি সাধ্যাতীত কোনো দায়িত্ব আরোপ করেনি। সেই ধারাবাহিকতায় তাদের থেকে জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফরজ বিধান রহিত করেছে। আল্লাহতায়ালা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে কোরআনে কারিমের বহু আয়াত নাজিল করেন। এর দ্বারা তাদের মর্যাদার বিষয়টি অতি স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে।

সাহাবি হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.) খোঁড়া ছিলেন। একবার তিনি এবং ছালাবা বিন উসমা (রা.) নবী করিম (সা.) এর নিকট চাঁদের আবর্তনরহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! চাঁদ সূতোর ন্যায় চিকন হয়ে উদিত হয়, এরপর বাড়তে বাড়তে অনেক বড় ও বৃত্তাকার হয়ে আবর্তিত হয়। অতঃপর আবার সরু হয়ে ছোট হতে থাকে এবং পূর্বের আকার ধারণ করে। কখনোই অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকে না। এর কারণ কী? এর পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয়- লোকেরা আপনাকে চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলুন, তা মানুষ ও হজের জন্য সময় নির্দেশক।

হজরত আমর ইবনুল জামূহ (রা.) একজন সম্পদশালী বয়োবৃদ্ধ আনসারি সাহাবি। তিনিও খোঁড়া ছিলেন। একবার তিনি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কী সদকা করবো? কাদের প্রতি সদকা করবো? তার এ জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয়, লোকেরা আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? আপনি বলে দিন, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য। উত্তম কাজের যা কিছুই তোমরা করো না কেন, আল্লাহ তো সে সম্বন্ধে অবহিত।

এভাবে আরও অনেক আয়াত প্রতিবন্ধী সাহাবিদের জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। এসব কিছুর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, কোরআনে কারিম প্রতিবন্ধীদের পূর্ণ মানবিক মর্যাদা দিয়েছে। তাদের মর্যাদা অন্য সকল মানুষের মতোই। ক্ষেত্রবিশেষ, তাদের প্রাপ্য সুবিধা ও অধিকার সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় বেশি।