পশুপাখির প্রতি নবীজীর মমতা



মুফতি গোলাম রাজ্জাক কাসেমী, অতিথি লেখক, ইসলাম
পশুপাখির অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ, ছবি: সংগৃহীত

পশুপাখির অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কোরআনে কারিমে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ -সূরা আম্বিয়া: ১০৭

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, শুধু মানুষ নয়, সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি রাসূলের ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। কারণ তিনি হলেন- রাহমাতুল্লিল আলামীন। পশুপাখি প্রকৃতির অন্যতম উপাদান, তাদের প্রতি ভালোবাসা রাখা এবং অধিকার রক্ষা করা নবীর শিক্ষা। মহানবী (সা.) মানুষকে ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন পশুপাখি। ভালোবাসতেন তরুলতা ও প্রকৃতি। কেবল মানবজাতি নয়, জীবজন্তুর অধিকার রক্ষায়ও তিনি ছিলেন সোচ্চার। ইসলামপূর্ব অন্ধকার যুগে পশুপাখির সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা হতো। তারা জীবজন্তুদের নিশানা বানিয়ে হত্যা করত। ঠিকমতো খাবার দিত না। সুস্থতার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করত না। জীব-জন্তুর ওপর অতিমাত্রায় বোঝা চাপাত। পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হতো না। সারাদিন নির্দয়ভাবে খাটাত। নির্মমভাবে শাস্তি দিত এবং যেভাবে ইচ্ছা যত্রতত্র ব্যবহার করত। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এসব জঘন্যতম প্রথা দূর করেন। তিনি জীবজন্তু ও পশুপাখির দুঃখে ব্যথিত হন এবং তাদের কষ্টে বিচলিত হয়ে জীবজন্তু ও পশুপাখির প্রতি সদয় আচরণ করার আদেশ দেন।

একবার হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি উটের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন ক্ষুধার তাড়নায় উটের পিঠ পেটের সঙ্গে লেগে গেছে। অনাহারে অপুষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ দৃশ্য দেখে রহমতের নবীর ভীষণ মায়া হলো। সাহাবিদের ডেকে বললেন, ‘এসব বাকশক্তিহীন প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এগুলোতে আরোহণ করো, সুস্থ অবস্থায় আহার করো।’ -সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৮

পশুপাখির প্রতি রাসূলের দয়া
নবী করিম (সা.) মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য যেমন পদক্ষেপ নিতেন, তেমনি জীবজন্তু পশুপাখির প্রতিও দয়া প্রদর্শন করতেন। তাই তিনি সর্বদা তাদের অধিকার রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রাণীদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা কোমল হৃদয়বান, তিনি কোমলতা পছন্দ করেন, তিনি এতে আনন্দিত হন এবং সাহায্য করেন- যা কঠোরতার সময় করেন না। যখন তোমরা এসব বাকশক্তিহীন সওয়ারির ওপর আরোহণ করো, তখন তাকে সাধারণ মঞ্জিলে নামাও (অর্থাৎ স্বাভাবিক দূরত্বের অধিক চালিয়ে অধিক কষ্ট দিও না)। যেখানে বিশ্রাম করবে, সেখানকার জায়গা যদি অনুর্বর হয় এবং ঘাস না থাকে তবে শিগগিরই সেখান থেকে একে বের করে নিয়ে যাও নতুবা এর হাড় শুকিয়ে যাবে (অর্থাৎ ঘাসপাতাহীন জায়গায় বিলম্ব করলে এসব পশু না খেয়ে শুকিয়ে যাবে। ফলে হাঁটতে পারবে না)। আর তোমাদের জন্য রাতে ভ্রমণ করাই উচিত। কারণ রাতে যে পরিমাণ পথ অতিক্রম করা যায়, দিনে তা হয় না। রাতে যদি কোনো স্থানে অবস্থান করো, তবে পথে অবস্থান করো না। কেননা সেখানে জীবজন্তু চলাফেরা করে এবং সাপ বাস করে। -মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ১৭৬৭

প্রাণীদের অযথা কষ্ট দেওয়া পাপ
পশুপাখির প্রতি নম্রতা প্রদর্শন ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত। পশুপাখিকে কষ্ট দেওয়া গোনাহের কাজ। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক বিষয়ে তোমাদের ওপর ‘ইহসান’ অত্যাবশ্যক করেছেন। অতএব তোমরা যখন হত্যা করবে, দয়ার্দ্রতার সঙ্গে হত্যা করবে; আর যখন জবেহ করবে তখন দয়ার সঙ্গে জবেহ করবে। তোমাদের সবাই যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং তার জবেহকৃত জন্তুকে কষ্টে না ফেলে।’ -সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫

পশুপাখির সঙ্গে যথাসম্ভব দয়াশীল আচরণ করতে হবে। এদের সঙ্গে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না। পশুপাখির অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে প্রাণীদের অঙ্গচ্ছেদ করে। -সহিহ বোখারি: ৫৫১৫

সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রাণীর মুখে আঘাত করতে এবং মুখে সেঁক লাগাতে বারণ করেছেন। -সহিহ মুসলিম: ২১১৬

প্রাণীকে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি
যেকোনো প্রাণীকে ভালোবাসতে হবে। অযথা কষ্ট দিলে অবশ্যই এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো চড়ুইকে অযথা হত্যা করল, তা কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালার নিকট উঁচু স্বরে ফরিয়াদ করে বলবে, ইয়া আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমাকে হত্যা অযথা করেছিল, সে কোনো লাভের জন্য আমাকে হত্যা করেনি।’ -সুনানে নাসায়ি: ৪৪৪৬

বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ার কারণে এক মহিলাকে জাহান্নামে যেতে হয়েছিল। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক নারীকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেওয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। ওই অবস্থায় বিড়ালটি মারা যায়। মহিলাটি ওই কারণে জাহান্নামে গেল। কেননা সে বিড়ালটিকে খানাপিনা কিছুই দেয়নি এবং ছেড়েও দেয়নি যাতে সে জমিনের পোকা-মাকড় খেয়ে বেঁচে থাকত।’ -সহিহ বোখারি: ৩৪৮২

প্রাণীর প্রতি মমতার পুরস্কার
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে এক মহিলার জাহান্নামে যাওয়ার কথা যেমন বর্ণনা করেছেন, তেমনি পশুপাখি ও জীবজন্তুর প্রতি সহনশীল আচরণ ও মমতা দেখিয়ে একজনের বেহেশতে যাওয়ার ঘটনাও বর্ণনা করেছেন। ঘটনাটি হলো- রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে এক ব্যক্তির ভীষণ পিপাসা লাগে। সে কূপে নেমে পানি পান করল। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেল একটা কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চাটছে। সে ভাবল, কুকুরটারও আমার মতো পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামল এবং নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে সেটি ধরে উপরে উঠে এসে কুকুরটিকে পানি পান করাল। আল্লাহতায়ালা তার আমল কবুল করেন এবং তার গোনাহ মাফ করে দেন। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেও পুণ্য রয়েছে। -সহিহ বোখারি: ২৩৬৩