৪৬ বছরে পা রাখছে বঙ্গবন্ধুর ইফা



বিল্লাল বিন কাশেম, অতিথি লেখক, ইসলাম
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয় ও লেখকের ছবি, ছবি: সংগৃহীত

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয় ও লেখকের ছবি, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

২২ মার্চ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। করোনার বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ঘরোয়া আয়োজনে অনাড়ম্বরভাবে পালন করা হচ্ছে দিবসটি। অবশ্য বিগত বছরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জমকালো অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন, কখনও রাষ্ট্রপতি যোগ দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে।

১৯৭৫ সালের এই দিনে (২২ মার্চ) ইসলামের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অধ্যাদেশবলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ২৮ মার্চ ১৯৭৫ সালে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ এ্যাক্ট প্রণীত হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি ইসলামের আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রচারসহ এ জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত। এছাড়া বায়তুল মোকাররমস্থ অফিসে প্রধান কার্যালয়ের কয়েকটি বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ৮টি বিভাগীয় কার্যালয়, ৬৪টি জেলা কার্যালয়, ৭টি ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আর্তমানবতার সেবায় ৫০টি ইসলামিক মিশন কেন্দ্র এবং ২৯টি ইসলামিক প্রচারণা কেন্দ্রের সহায়তায় কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়ন করে থাকে। ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত আছেন অতিরক্তি সচিব আনিস মাহমুদ।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। সুপ্রাচীনকাল থেকে এ দেশে ইসলামি আর্দশ ও মূল্যবোধের লালন ও চর্চা হয়ে আসছে। ইসলামের এই সমুন্নত আর্দশ ও মূল্যবোধের প্রচার-প্রসারকে বেগবান করার লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এ্যাক্ট অনুযায়ী এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো হলো-

ক. মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমী ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা ও রক্ষণাবেক্ষণ;
. মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমী ও ইনস্টিটিউট এবং সমাজসেবায় নিবেদিত সংগঠনসমূহকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া;
গ. সংষ্কৃতি, চিন্তা, বিজ্ঞান ও সভ্যতার ক্ষেত্রে ইসলামের অবদানের ওপর গবেষণা পরিচালনা;
ঘ. ইসলামের মৌলিক আর্দশ বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ববোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, ন্যায়বিচার প্রভৃতি প্রচার ও প্রচারের কাজে সহায়তা এবং সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ইসলামি মূলোবোধ ও নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের সুপারিশ করা;
ঙ. ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালা জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি,আইন ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত গবেষণার আয়োজন ও তার প্রসার ঘটানো এবং জনপ্রিয় ইসলামি সাহিত্য সুলভে প্রকাশ করা এবং সেগুলোর বিলি-বন্টনকে উৎসাহিত করা;
চ. ইসলাম ও ইসলামের বিষয় সম্পর্কিত বই-পুস্তক, সাময়িকী-পুস্তিকা অনুবাদ, সংকলন ও প্রকাশ করা;
ছ. ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, আইন ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিষয়াদির ওপর সম্মেলন, বক্তৃতামালা, বির্তক ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা;
জ. ইসলাম বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য পুরস্কার ও পদক প্রবর্তন করা;
ঝ. ইসলাম সম্পর্কিত প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া, প্রকল্প গ্রহণ করা কিংবা তাতে সহায়তা করা;
. ইসলাম বিষয়ক গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদান করা;
ট. বায়তুল মোকাররম মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও উন্নতিবিধান করা এবং
ঠ. উপরোক্ত কার্যাবলির যেকোনোটির ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক সব কাজ সম্পাদন করা।

দেশের সব শ্রেণির আলেম-উলামা যাতে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ইসলাম প্রচার করতে পারেন, এই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এরই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত দিকনির্দেশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্ট প্রণয়ন করেন। অ্যাক্টে এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালনা কাঠামোর মধ্যে রয়েছে-

৫৬০ মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নকশা, ছবি: সংগৃহীত

বোর্ড অব গভর্নরস
সরকারি অর্থে পরিচালিত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম একটি বৃহৎ সংস্থা ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাকাল থেকে সারাদেশে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। এর পরিচালনা কাঠোমো বেশ মজবুত। ফাউন্ডেশনের সার্বিক নীতি নির্ধারণ, নির্দেশনা প্রদান, কার্যক্রম গ্রহণ, তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের জন্য সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইসলামি চিন্তাবিদ ও সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বোর্ড অব গভর্নরস রয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বোর্ডের চেয়্যারম্যান এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বোর্ডের সদস্য সচিব।

সাংগঠনিক কাঠামো
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী হলেন মহাপরিচালক। তিনি সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী। বোর্ড অব গর্ভনরসের সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত থাকে। কার্য সম্পাদনের তাকে সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রেষণে নিযুক্ত ১ জন সচিব, ১৭ জন পরিচালক, ১ জন তত্ত্বাবধায়ক এবং ৭ জন প্রকল্প পরিচালক রয়েছেন। তারা প্রত্যেকে এক-একটি বিভাগ বা প্রকল্পের প্রধান।

জনবল
বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে ২ হাজার ৩১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সম্মানী বা ভাতার ভিত্তিতে ৭১ হাজার ১৮৫ জনসহ সর্বমোট ৮৪ হাজার ২৫৩ জন কর্মরত রয়েছেন।

তহবিল
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তহবিলের উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের নিকট থেকে প্রাপ্ত অনুদান ও ঋণ, বিদেশি রাষ্ট্র অথবা সংস্থার নিকট হতে প্রাপ্ত সাহায্যে ও ঋণ, দান ও অনুদান, বিনিয়োগ, রয়্যালটি ও সম্পত্তি হতে প্রাপ্ত আয়।

৫৬০ মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি করে নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে উন্নত মসজিদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। জেলা পর্যায়ে ৪ তলা ও উপজেলার জন্য ৩ তলা এবং উপকূলীয় এলাকায় ৪ তলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। শিগগির সারা দেশে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সেগুলোতে নারী ও পুরুষদের পৃথক অজু ও নামাজ আদায়ের সুবিধা, লাইব্রেরী গবেষণা ও দীনি দাওয়া কার্যক্রম, পবিত্র কোরআন হেফজ, শিশু শিক্ষ, অতিথিশালা, বিদেশি পর্যটকদের আবাসন, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, হজযাত্রীদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, ইমামদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম চালু করবে। এছাড়া ইমাম-মুয়াজ্জিনের আবাসনসহ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

লেখক: বিল্লাল বিন কাশেম, উপ-পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন।