মিরাজের শিক্ষা প্রতিফলিত হোক মুমিন জীবনের পরতে পরতে



জুয়ায়রিয়া জয়নব, অতিথি লেখক, ইসলাম
মিরাজের শিক্ষা প্রতিফলিত হোক মুমিন জীবনের পরতে পরতে, ছবি: সংগৃহীত

মিরাজের শিক্ষা প্রতিফলিত হোক মুমিন জীবনের পরতে পরতে, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয় তিনি পরম শ্রবণকারী ও দ্রষ্টা।’ –সূরা বনি ইসরাইল: ১

মিরাজের ঘটনা
হাদিসের বর্ণনা অনুসারে মেরাজের ঘটনা হিজরতের এক বছর আগে সংগঠিত হয়। কোরআন-হাদিসে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সাহবি হজরত উম্মে হানী (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী মিরাজের ঘটনাটি এভাবে এসেছে-

একদিন রাতে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাহাজ্জুদ আদায়ের উদ্দেশ্যে অজু করতে বের হলেন। এমন সময় হজরত জিবরাঈল (আ.) তাকে উঠিয়ে বোরাক নামক বাহনে চড়িয়ে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত নিয়ে যান। সেখানে তিনি সব নবীদের সঙ্গে নিয়ে নামাজ আদায় করেন। তারপর জিবরাঈল (আ.) তাকে ঊর্ধ্বজগতে নিয়ে চলেন এবং আকাশের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন নবীদের সঙ্গে সাক্ষাত হয়। অবশেষে উচ্চতার সর্বশেষ স্তরে পৌঁছে তিনি নিজের রবের সামনে হাজির হন। এ উপস্থিতির সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করার চূড়ান্ত আদেশ জানানো হয়। এরপর হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আবার বায়তুল মাকদিস হয়ে মসজিদে হারামে ফিরে আসেন। এ সফরকালীন সময়ে রাসূলুল্লাহকে (সা.) জান্নাত-জাহান্নাম দেখানো হয়। জাহান্নামে কোন ধরনের পাপের জন্য কোন শাস্তি দেওয়া হবে, তার বেশ কিছু প্রতীকী নমুনা রাসূল (সা.) কে দেখানো হয়। হাদিসসমূহে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে।

মিরাজের প্রেক্ষাপট
মক্কাবাসীর প্রবল অত্যাচারে যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মানসিকভাবে জর্জরিত ছিলেন, তখন মিরাজের ঘটনা ছিল রাসূল (সা.)-এর জন্য মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ব্যাপারে আশাবাদ তৈরি ও ইসলাম বিজয়ের আত্মবিশ্বাস অর্জনের এক অনবদ্য নিয়ামক।

মুসলমানদের পরীক্ষা করাও ছিল মিরাজের ঘটনার একটি উদ্দেশ্য। অনেক দুর্বলচিত্তের মুমিন মিরাজের ঘটনা বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও তার মতো মুমিনরা শোনামাত্রই বিস্মময়কর এই মুজিজার প্রতি ঈমান আনেন।

মিরাজের ঘটনার পর নাজিল হওয়া সূরা বনী ইসরাঈলে বর্ণিত ১৪টি মূলনীতি ছিলো- ইসলামের সমাজ বিনির্মাণের মূল মেনিফেস্টো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধানসহ মূল কিছু ইসলামের বিধান মিরাজের ঘটনার সময় নাজিল হয়। জান্নাত-জাহান্নামসহ আল্লাহতায়ালা সঙ্গে কথা বলার সুযোগ প্রাপ্তি, নবী-রাসূলদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ- এগুলো হলো রাসূল (সা.)-এর জ্ঞানার্জনের উৎস।

মিরাজের ঘটনা শুধুমাত্র একটি অলৌকিক কোনো কাহিনি নয়। বরং মুমিন জীবনের জন্য শিক্ষণীয় একটি নিদর্শন। মিরাজের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) জাহান্নামের এক একটি দলের অপরাধ ও শাস্তির যে ঘটনাগুলো চাক্ষুস করেন, শুধু সেগুলোও যদি আমরা বিশ্লেষণ করি; তাহলে আল্লাহতায়ালার শাস্তির ভয়ে হলেও সমাজের তাবৎ ভুল-ত্রুটি ও অপরাধ সংশোধন হতে বাধ্য।

মিরাজের শিক্ষা ও তাৎপর্য
মিরাজের ঘটনা থেকে মুমিনদের জন্য রয়েছে শিক্ষণীয় অনেক বিষয়। এর অন্যতম কিছু বিষয় হলো- আল্লাহতায়ালার অসীম ক্ষমতার ওপর নিঃশঙ্ক চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ চাইলে সবকিছুই পারেন এবং তার ক্ষমতা অপরিসীম। এই চেতনা মাথায় রেখে আল্লাহকে ভয় করে, সার্বক্ষণিক আল্লাহর উপস্থিতির চিন্তা করে সব কাজ করা।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদাকে উপলব্ধি করে পরিপূর্ণভাবে সিরাত অনুসরণ করা। আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব, জান্নাত-জাহান্নামের মতো বিষয়গুলো মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান নয়, সেগুলোতে পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনা এবং এতে কোনো প্রকার সন্দেহ না রাখা।

মিরাজের পর সূরা বনী ইসরাইল নাজিল হয়। মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনার আলোকে বেশকিছু (১৪টি) নীতিমালা এই সূরায় উঠে এসেছে। এসব মূলনীতি ইসলামি সমাজ ব্যবস্থার মূল রূপরেখা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ১৪টি মূলনীতির মাধ্যমে যে বিষয়গুলো আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে তা হলো-

এক. আল্লাহতায়ালার ইবাদত ব্যতীত অন্য সব সত্তার ইবাদত নিষিদ্ধ।

দুই. বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিনদের সঙ্গে আচরণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতিমালা। বিশেষ করে তাদের অধিকারের কথাগুলো খুব স্পষ্টভাবে এসেছে- এগুলো মানা। আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন ও মুসাফিরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হলেও তাদের প্রতি নরম ভাষায় কথা বলা।

তিন. সম্পদ ব্যবহারের সুষম নীতিমালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অপচয় ও কৃপণতা উভয়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

চার. ব্যভিচারের সঙ্গে এর সহায়ক সব ধরনের উপকরণ, পথ, পন্থা ও মাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পাঁচ. দারিদ্র্যের অভাবে সন্তান হত্যা না করা। রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা করা।

ছয়. অনুমান নির্ভর কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা সবধরনের ভুলের সূত্রপাত করে।

সাত. নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা, যা কি চূড়ান্ত পর্যায়ের বিপর্যয় সৃষ্টি করে; তা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আত্মহত্যাও কার যাবে না।

আট. লেন-দেন, বেচাবিক্রির ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, অনৈতিকতার সব পথ রুদ্ধ করে ওজনে কমবেশি করাকে হারাম করা হয়েছে।

নয়. পারস্পারিক সম্পর্ক রক্ষা, সম্পর্কের হক আদায়ের অন্যতম মূল শর্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর জোরালোভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কৃপণতা ও অপব্যয় দু’টোই পরিত্যাগ করা।

দশ. অহংকার সব ধরনের অরাজকতার মূল উৎস। দাম্ভিক মানুষ সর্বদা মানুষের সঙ্গে ভুল আচরণ করে। অহংকার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

মিরাজের ঘটনা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সকালে বর্ণনা করেন লোকদের কাছে, তখন মুশরিকরা নানা ধরণের ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা শুরু করে। মুশরিকদের অনেকে রাসূলকে (সা.) মসজিদুল আকসা পর্যন্ত পথের নানা কিছু জিজ্ঞেস করলেন, নানা ধরনের প্রশ্ন করে নবী করিমকে (সা.) বিব্রত করতে চাইলো। কিন্তু আল্লাহ রাসূল (সা.) সব প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর দেন। যে কারণে এটা প্রমাণিত হয়, তিনি এই ভ্রমণ করেছিলেন।

পবিত্র রমজান মাস আসতে আর খুব বেশি দেরি নেই। রমজানের প্রাক্কালে মিরাজের তাৎপর্য ও শিক্ষা আমাদের রমজানের প্রস্তুতিকে করবে আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল। তাই আসুন, মিরাজের শিক্ষাকে নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করি, অন্যকে বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানাই।