জুমার সংক্ষিপ্ত খুতবা বিচক্ষণতার পরিচায়ক

ফয়সল আহমদ জালালী, অতিথি লেখক, ইসলাম
সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ইন্দোনেশিয়া জুমার নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা, ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ইন্দোনেশিয়া জুমার নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সময় জ্ঞান বলে একটি কথা সমাজে প্রচলিত আছে। যাদের এর অভাব রয়েছে তারা সমাজে ধিকৃত হয়। অবহেলিত হয় সচেতন মহলে। ভদ্রতার খাতিরে মানুষ সামনাসামনি ধিক্কার প্রকাশ করে না বটে, তবে মনে মনে গভীরভাবে বিক্ষুব্ধ হয়। সময়-সুযোগ পেলে বিক্ষোভ প্রকাশ করে। তখন আর সামাল দেওয়ার পথ থাকে না। বক্তৃতা এমনই একটি বিষয়, যা শ্রোতারা শুনতে শুনতে তিক্ত হয়ে যায়, কিন্তু বক্তার বক্তৃতার স্পৃহা মেটে না।

বিষয়টি সর্বকালের সেরা বিবেচক প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নজর এড়ায়নি। তাই তিনি জুমার খতিবদের এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। সাহাবি হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির নামাজ দীর্ঘ হওয়া আর খুতবা ছোট হওয়া তার বিচক্ষণ হওয়ার আলামত। সুতরাং তোমরা নামাজ দীর্ঘ করো আর খুতবা সংক্ষিপ্ত করো। বয়ান হলো- যাদুমন্ত্রের ন্যায়। -সহিহ মুসলিম: ৮৬৯

এখানে নামাজ দীর্ঘায়িত করার অর্থ হলো- তুলনামূলকভাবে লম্বা করা। কারণ অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যারা নামাজে কেরাত লম্বা করে তাদেরকে তিনি ফেতনা সৃষ্টিকারী বলে শাসিয়েছেন। জুমার নামাজে তিনি বেশিরভাগ সময় প্রথম রাকাতে ‘সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আলা’ এবং দ্বিতীয় রাকাতে ‘হাল আতা আলাল ইনসান’ সূরা তেলাওয়াত করতেন। এ থেকে অনুমান করা যায়, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় জুমার খুতবা এবং নামাজ কী পরিমাণ দীর্ঘ হতো।

বর্তমান সময়ের জুমার হালচাল
অনেক মসজিদ এমনও আছে যেখানে পৃথকভাবে খতিব রয়েছেন। ওয়াক্তিয়া ইমামের চেয়ে তিনি যোগ্যতাসম্পন্ন। আবার কোনো মসজিদে ইমাম সাহেবই খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। কোনো কোনো মসজিদে কোনোমতে ইমামতি করতে পারেন, আরবি ভাষার সাহিত্য ও ব্যাকরণ জানেন না। এমন ব্যক্তি খুতবা দিয়ে থাকেন। বাজারে বিভিন্ন নামে খুতবার কিতাব আছে, সেগুলো দেখে দেখে খুতবার কাজ তারা সেরে ফেলেন। মানসম্পন্ন খতিব হোক আর ইমাম হোক, জুমার মূল খুতবার পূর্বে তারা দীর্ঘসময় নিজ ভাষায় বয়ান দিয়ে থাকেন। এ বয়ানে যারা পারদর্শী তাদেরকে মূলত যোগ্য আলেম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর সঙ্গে যদি খতিব সাহেবের কন্ঠ ভালো হয়- তাহলে তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। লক্ষ্য করবেন, মূল খুতবার ন্যায় বাংলা বয়ানের আগে আরবিতে পূর্ণ একটি খুতবা প্রদান করা হয়। তারপর বাংলা বক্তব্য শুরু। এখানে কম পক্ষে আধা ঘন্টা সময় নির্ধারিত। বয়ানের জোশ উঠলে আর সময়সীমা বলতে কিছু থাকে না।

অথচ হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জুমার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে মসজিদে গিয়ে সর্বপ্রথম খুতবা শুরু করতেন। মিম্বরে উঠে তিনি মুসল্লিদের উদ্দেশ্য সালাম দিতেন তারপর খুতবা প্রদান করতেন। খুতবায় আদেশ-নিষেধ, উপদেশ, অধ্যাদেশ ও আল্লাহর কাছে দোয়া ইত্যাদি সবকিছু থাকতো। এতকিছুর পরও খুতবা যেন নামাজ থেকে লম্বা না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন। আর অন্যদের সংক্ষিপ্ত খুতবা প্রদানের আদেশ দিতেন।

আর আমরা বাংলা-আরবি মিলিয়ে কমপক্ষে এক ঘন্টা খুতবায় সময় ব্যয় করি। গলার পানি শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে ৩-৪ আয়াত পড়ে দ্রুত নামাজ শেষ করি। আবার মোনাজাতের নামে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম এবং মকসুদের কথা উল্লেখ করে দোয়ার নামে সময়ক্ষেপণ করি। এটি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুকরণের জুমা হয়?

কোরআনে কারিমে জুমার আলোচনা
কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো। এটিই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি করো। নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ -সূরা জুমা: ৯-১০

জুমার আজান হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, বেচা-কেনা ছেড়ে মসজিদের দিকে দৌঁড়ে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। সোয়া ঘন্টা-দেড় ঘণ্টা পূর্বে আজান দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কল-কারখানা বন্ধ করে দিয়ে মানুষকে ওয়াজ শোনানোর আয়োজন করা বিবেকবানদের কাজ? লক্ষ্য করুন, যেখানে আল্লাহতায়ালা নামাজ শেষে জীবিকা অন্বেষণে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ার কথা বলেছেন। সেখানে এই অলস আয়োজনের কি প্রয়োজন আছে? এই সময় দেখা যায়, বক্তা বক্তৃতা করছেন আর বেশিরভাগ শ্রোতা ঝিমুচ্ছেন। বর্ণিত আয়াতে ‘ফাদলুল্লাহ’ আল্লাহর অনুগ্রহ বলতে তাফসিরকারগণ বলেছেন, এর অর্থ আল্লাহর দেওয়া রিজিক। কারণ জমিনে ছড়িয়ে পড়ে তা হতে প্রাপ্ত জিনিসপত্রই আহরণ করা হয়।

উল্লেখ্য, রিজিককে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে ব্যক্ত করার মাঝে হিকমত হলো- রিজিক অন্বেষণ করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া। কেউ যেন একে পার্থিব স্বার্থ মনে করে অবজ্ঞা না করেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জুমা
করোনাভাইরাসের সংক্রমাণ ঠেকাতে জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ পুরো দুনিয়ার মানুষের। আশা করি, বিশ্ব বিবেককে আমলে নিয়ে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করে জুমা আদায় করবো। সংক্ষিপ্ত খুতবা দিয়ে নামাজ আদায় করে মুসল্লিদের বলে দিলেই হয়, আপনারা নিজ নিজ বাসায় গিয়ে সুন্নত আদায় করুন। উম্মাহর নেতৃত্ব দানকারী উলামায়ে কিরামকে মানব জীবনের এই ক্রান্তিকালে সর্বোচ্চ বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। এটাই প্রত্যাশিত।

লেখক: মুহাদ্দিস ও ভিজিটিং ইমাম, নিউ ইয়র্ক ঈদগাহ।