ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বহীনতা নাকি অতি সতর্কতা?

মুফতি মাহফূযুল হক, অতিথি লেখক, ইসলাম
২৯ মার্চ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে বৈঠকে দেশের শীর্ষ আলেমরা, ছবি: বার্তা২৪.কম

২৯ মার্চ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে বৈঠকে দেশের শীর্ষ আলেমরা, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিরাজমান পরিস্থিতিতে জনগণকে ধর্মীয়ভাবে দিক-নির্দেশনা দেওয়ার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সঙ্গে পর পর দুইটি বৈঠক করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা)। সেই সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জনগণকে নানাবিধ আহ্বান জানিয়ে আসছেন। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক। তার পরও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে, কোথায় যেন একটু ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। এটা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বহীনতা নাকি অতি সতর্কতা বলা মুশকিল।

অনেকে বলছেন, বর্তমান বিষয়ে ধর্মীয় বিষয়ে কোনো পরামর্শ দিতে যেয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবেই সমালোচিত হতে চায় না। তাই তাদের এই বাড়তি সতর্কতা। আবার অনেকে বলছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) বেশ কিছুদিন হলো দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এর আগের ডিজি টানা ১১ বছর দায়িত্বপালন করে একটা বলয় সৃষ্টি করে গেছেন। সেই বলয় ভেঙে নতুন ডিজিকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তাই সব কিছুতে একটু সময় লাগছে।

বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। জানা গেছে, ২৪ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে ইসলামের বিধি-বিধান অনুসরণের বিষয়ে দেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে বৈঠকে বসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে ওই বৈঠকের বিষয় সম্পর্কে জানানো হয় ২৫ মার্চ। ততক্ষণে বৈঠকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিভিন্ন ভুল তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, এটা নিয়ে দেখা দেয় বিভ্রান্তি।

একইভাবে ২৯ মার্চ সকালে ইফা দ্বিতীয়বার দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সঙ্গে লম্বা বৈঠক করে। সেটাও গণমাধ্যমকে জানানো হয় ৩০ মার্চ। এ বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়গুলো স্পর্শকতার হওয়ার যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্তগুলো জানানোর ক্ষেত্রে সময় লাগছে। যেহেতু এ বিষয়ের সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় জড়িত সেটা মানা যায়। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন কী আলেমদের সিদ্ধান্তগুলো প্রচারের ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রেখেছে?

২৯ মার্চের বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা সম্মিলিতভাবে জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ ৮টি পরামর্শ প্রদান করেন। ওই পরামর্শের মধ্যে মসজিদ সংক্রান্ত ও মসজিদের ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিন ও পরিচালনা কমিটির করণীয় বিষয়ে নির্দেশনাগুলো ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মসজিদ খোলা কিংবা বন্ধ রাখা এবং মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের মসজিদ পরিচালনা সংক্রান্ত ইমাম-কমিটির করণীয় বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিরাজমান পরিস্থিতিতে জনগণের সুরক্ষা বিষয়ে দেশের বিশিষ্ট আলেমদের আহ্বানে খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মসজিদ কমিটির করণীয় সম্পর্কে বলা হয়-

১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পূর্বে সম্পূর্ণ মসজিদকে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং কার্পেট, কাপড় সরিয়ে ফেলা,
২. জামাত সংক্ষিপ্ত করা,
৩. জুমার বয়ান, খুতবা ও দোয়া সংক্ষিপ্ত করা,
৪. বর্তমান সঙ্কটকালে দরসে হাদিস, তাফসির ও তালিম স্থগিত রাখা,
৫. অজুখানায় অবশ্যই সাবান ও পর্যাপ্ত টিস্যু রাখা,
৬. বর্তমান পরিস্থিতিতে জামাতের কাতারে ফাঁক ফাঁক হয়ে দাঁড়ানো ও
৭. ইশরাক, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও অন্যান্য আমল ঘরে করা।

২৯ তারিখ, রোববার আলেমরা সাধারণ জনগণ ও মসজিদ সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে এ পরামর্শ প্রদান করেন। অর্থাৎ পরবর্তী জুমার ৫ দিন আগে তারা এসব গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। পরামর্শ দেওয়ার ৫ দিন পর জুমার নামাজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মসজিদগুলোতে দেখা গেছে এসব পরামর্শের কোনোটাই প্রতিপালিত হয়নি। সবকিছুই হয়েছে বরাবরের মতো। মসজিদগুলোতে পাওয়া যায়নি দৈনিক ৫ বার জীবাণুমুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা। জুমার বয়ান, খুতবা, নামাজ ও দোয়া সংক্ষেপ করতে দেখা যায়নি অনেক মসজিদে। দৈনন্দিন কিতাবের তালিম চলছে প্রায় মসজিদে।

বেশ কয়েকটি মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ইমামদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুমার ৫ দিন আগে আলেমদের প্রদত্ত এসব পরামর্শের কথা তারা জানেন না। উল্টো এসব শোনে তারা বেশ অবাক হন। এমনকি এই প্রতিবেদন লেখার দিন (৫ এপ্রিল) আরও বেশ কয়েকজন ইমাম ও কমিটির সদস্যদের জিজ্ঞেস করে জানা গেছে, এমন পরামর্শের কথা তারা জানেন না। তাদের কাছে কোনো চিঠিপত্র, নির্দেশনা কিংবা প্রচারপত্র পৌঁছেনি।

এখন প্রশ্ন হলো- ৫ দিন পরও যে তারা জানেন না, এর দায় কার? নিশ্চয়ই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব ছিল দেশের সকল ইমাম ও মসজিদ কমিটির কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়া। আর ৫ দিন এ কাজের জন্য অনেক যথেষ্ট সময়। তাছাড়া এ কাজ করার মতো যথেষ্ট জনবলও ফাউন্ডেশনের আছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক গণশিক্ষা ও কোরআন শিক্ষার শিক্ষক রয়েছে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে। তাদের এ কাজে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অথবা ফাউন্ডেশনের শিক্ষকদের অনেকেই শীর্ষস্থানীয় আলেমদের এ পরামর্শপত্রের কথা জানেন না।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন একদিন পর গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দায়মুক্ত হয়ে গেছে, কিংবা তাদের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজে দিয়ে প্রচারের মহান কাজ শেষ করেছে।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, আলেমদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকের বিষয় সেভাবে প্রচার না হওয়ায়, দ্বিতীয় বৈঠকে আলেমরা বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যাপক প্রচার ও বাস্তবায়নের জন্য দেশের সব মসজিদের ইমাম-খতিব, মসজিদ কমিটি, গণমাধ্যম, জনপ্রতিনিধি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী-শিক্ষকসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে উদাত্ত আহ্বান জানান।

কিন্তু কোন কারণে পর্যাপ্ত সময় ও জনবল থাকার পরও ইসলামিক ফাউন্ডেশন আলেমদের পরামর্শপত্রকে দেশের ইমাম ও মসজিদ কমিটির কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়নি- সেটা বোধগম্য নয়। বর্তমান সময়ের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এমন অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণ অনুসন্ধান- সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন :