জীবনকে গতিশীল করতে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা



জাওয়াদ তাহের, অতিথি লেখক, ইসলাম
জীবনকে গতিশীল করতে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, ছবি: সংগৃহীত

জীবনকে গতিশীল করতে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

দেখতে দেখতে রমজানের প্রথম দশক অতিবাহিত হয়ে গেছে, এখন দ্বিতীয় দশক চলছে। প্রত্যেক মুমিন এ মাসটির অধির অপেক্ষায় থাকেন। একজন মুমিনের জন্য এ মাসটি কত গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গুরত্বপূর্ণ মাসটি চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের অর্জনের খাতা কতটুকু পূর্ণ হয়েছে? আমরা কী পেরেছি, রমজানের যথাযথ হক আদায় করতে? রমজানের সময়গুলোর কদর করতে?

বলা হয়, যারা সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগায়, সফলতা তাদের পদচুম্বন করে। যুগ যুগ ধরে এ নিয়মেই চলে আসছে। চলে যাওয়া সময় তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু আত্মসমালোচন পর্যালোচনার মাধ্যমে সামনের দিনগুলো সুন্দরভাবে কাটানোর পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। আমাদের পূর্ববর্তী আলেমরা নিজেই নিজের আত্মসমালোচনা করতেন। হজরত ওমর (রা.) বলেছেন, ‘তোমার হিসাব নেওয়ার পূর্বেই তুমি তোমার হিসাব করো।’

ব্যক্তি গঠন ও জীবনকে গতিশীল করার জন্য আত্মসমালোচনা অপরিহার্য। এই আত্মসমালোচনাকে ইসলামি পরিভাষায় ইহতেসাব বা মুহাসাবা বলে।

আত্মসমালোচনাকারীদের প্রশংসা করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাদের অন্তরে ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তান আগমন ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বোধশক্তি জাগ্রত হয়ে উঠে।’ -সূরা আল আরাফ: ২০১

কোরআনে কারিমের অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামীকালের জন্য (আখেরাতের জন্য) সে কি প্রেরণ করেছে, তা চিন্তা করা। আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদের আত্মভোলা করে দিয়েছেন। নিশ্চয় তারা ফাসিক। -সূরা হাশর: ১৮

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বলেন, আমি ওই দিনের চেয়ে বেশি অনুশোচনা অন্যকোনো ব্যাপারে করিনি যে দিনটি আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে কিন্তু আমার আমল বৃদ্ধি পায়নি।

তাই আসুন, আমরা হিসাব নেই। চলতি রমজানের এক তৃতীয়াংশ চলে গেছে আমি কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি। পাপ-পঙ্কিলতা থেকে কতটুকু মুক্ত হতে পেরেছি। কেউ যদি একান্তে, নির্জনে বসে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য, সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে তার এমন চিন্তাভাবনা তার আমলকে আরও বেগবান করে তুলবে।

হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, যার দু‘দিন সমান হলো- সে ক্ষতিগ্রস্ত, (অর্থাৎ গতকাল থেকে আজকে একটু উন্নত না হয় তাহলে সে ক্ষতিগ্রস্ত) গতকালের চেয়ে আজকের দিনটি যার মন্দ হলো সে বঞ্চিত।

পার্থিব জীবনের জন্য আমরা সবাই একথা চিন্তা করি, গতকাল থেকে আজকে কিভাবে আমার ব্যবসাকে উন্নত করা যায়। কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে আমাদের মনে এ ভাবনা আসে না। বৈশি^ক এই মহামারিতে আমরা সবাই ঘরবন্দী। এমতাবস্থায় আমাদের একটু সতর্কতা হতে পারে আমার জন্য এই রমজানকে স্মরণীয় করে তুলতে।

মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবন জ্বলন্ত মোমবাতির ন্যায় প্রতি মুহূর্তে গলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই রমজানের বাকি দিনগুলোর প্রতিদিন নিজেকে একটু যাচাই করা দরকার, গতকালের চেয়ে আমার আমলে আজকে কতটুকু উন্নতি হয়েছে। আমলের সূচক ঊর্ধ্বমূখি না নিম্নমুখি।

আমার প্রতিটি রাত-দিন জীবনের মূলধন, এর লাভ হচ্ছে জান্নাত আর লোকসান হচ্ছে জাহান্নাম। প্রতিটি বছর একটি গাছের ন্যায়, মাস ও দিনগুলো তার শাখা, আর তার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস ফলের ন্যায়, সুতরাং যার প্রতি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্যে কাটে তবে তার ফল সুমিষ্ট ও বরকতময়, আর যদি তার সময় অবাধ্যতায় কাটে তবে তার ফল মন্দ, স্বাদ তিক্ত।

তাই প্রতিটি কাজের শুরুতে এ কথা চিন্তা করবো যে, কাজটি ইহকাল ও পরকালের জন্য লাভ না ক্ষতিকর, কাজটিতে আল্লহর সন্তুষ্টি নিহিত আছে না নেই? যদি ভালো কাজ হয় তাহলে সামনে অগ্রসর হবো। আর খারাপ হলে তা থেকে বিরত থাকবো।

সময়ের গুরুত্বের ব্যাপারে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। প্রসিদ্ধ এক হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, এমন দুটি নেয়ামত আছে, বহু মানুষ সে দু’টির ব্যাপারে ধোঁকায় রয়েছে। তা হলো সুস্থতা ও অবসর।

তাই আসুন আমরা বরকতময় মাসকে অপূর্ব সুযোগ মনে করে মোহাসাবার মাধ্যমে সাধ্যনুযায়ী কাজে লাগাই।