মানবসেবা আল্লাহর সেবাতুল্য সওয়াবের কাজ



মাহফুজ আবেদ, অতিথি লেখক, ইসলাম
মানুষের অভাবের দিনে এগিয়ে আসা আল্লাহর সেবাতুল্য পুণ্যের কাজ, ছবি: সংগৃহীত

মানুষের অভাবের দিনে এগিয়ে আসা আল্লাহর সেবাতুল্য পুণ্যের কাজ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

তিনটি বৈশিষ্ট্য আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে ভালো কাজ হিসেবে গণ্য হয়। একজন মুসলমান যখন অন্য মুসলমানকে খাবার দিয়ে তার ক্ষুধা মেটায় আল্লাহতায়ালা তখন ভীষণ খুশি হন। এছাড়া কেউ যখন অন্যের সমস্যার সমাধান করে এবং কারও ঋণ পরিশোধ করে তখন আল্লাহ খুশি হন। এ কারণে একজন মুসলমানের উচিত অন্যের উপকার করতে পারাকে আল্লাহর অনুগ্রহ বলে মনে করা এবং কেউ যখন বিষয়টিকে এভাবে বিবেচনা করেন তখন সে আর এ ক্ষেত্রে পিছপা হতে পারে না। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত অন্যের উপকার করে আল্লাহকে খুশি করার জন্য সব সময় তৎপর থাকা। পাশাপাশি কেউ যদি অন্যের উপকার করার মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারে তাহলে তার উচিৎ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরকালের জন্য পাথেয় সঞ্চয় করা।

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য একে অপরের সহযোগিতা অপরিহার্য। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া সুন্দর ও সুখময় জীবন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পরোপকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পরোপকার তথা পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে যখন কোনো সমাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব হ্রাস পায়, সে সমাজের মানুষ সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়তে থাকে। একইসঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি হয়। এমন অনেক সমস্যা আছে, যা একা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। অন্যের সহযোগিতা ছাড়া বড় কোনো সাফল্য অর্জন প্রায় অসম্ভব। ঐক্যবদ্ধভাবে কোনো কাজের উদ্যোগ নিলে তা খুব সহজেই সম্পন্ন হয়ে যায়, অনেক কঠিন সমস্যার সমাধানও সহজেই হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, ইসলাম পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহানুভূতির ধর্ম। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, পরোপকারিতা ও সহযোগিতার মনোভাব ইসলাম ধর্মের অন্যতম আদর্শিক বিষয়।

ইসলাম ধর্মের দিক-নির্দেশনা থেকে এটা স্পষ্ট, মানবজীবন শুধু নিজের ভোগ-বিলাসিতার জন্য নয় বরং গোটা সৃষ্টির উপকার সাধন ও কল্যাণকামিতা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র সৃষ্টিই আল্লাহর পরিবার। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সব মানুষই একই বংশের। দুনিয়ার প্রথম মানব-মানবী হলেন হজরত আদম আলাইহিস সালাম ও হজরত হাওয়া আলাইহিস সালাম। তারা হচ্ছেন মানব জাতির আদি পিতা ও মাতা। সে অর্থে এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের সহজাত ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রয়েছে। ইসলাম এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও অর্থবহ করে তোলার পক্ষে। একজন মানুষ অন্য মানুষের বিপদে-আপদে সহায়তা করবে, সহমর্মিতার পরিচয় দেবে- এমনটিই উৎসাহিত করা হয়েছে ইসলাম ধর্মে। এ কারণে পরোপকারের চেতনায় কোনো শ্রেণিভেদ নেই। ছোট-বড়, ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বজাতি-বিজাতি, মুসলিম-অমুসলিম এসব ব্যবধানের ঊর্ধ্বে উঠে শান্তিময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয় ইসলাম।

মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরণের সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গোটা মানবজাতির জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। পরোপকারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। আল্লাহতায়ালা তাকে গোটা মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। হাদিসে এসেছে, এই জগতে যে আল্লাহর সৃষ্টির উপকার করবে আল্লাহও তার প্রতি দয়া ও মমতা দেখাবেন।

ইসলাম ধর্ম বারবারই শত্রু-বন্ধু-নির্বিশেষ সবার উপকারের শিক্ষা দেয়। নানাভাবে পরোপকার করা যেতে পারে। আমরা বিপদগ্রস্ত মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধারে সহযোগিতা করতে পারি। অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারি। এছাড়া প্রতিটি পদক্ষেপেই পরোপকার করা যায়। যদি তা ছোট ক্ষেত্রও হয়, সেটার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজ-খবর নেওয়া প্রতিটি মানুষের কর্তব্য।

অসুস্থ মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়ালে সাহায্যকারীর প্রতি আল্লাহ অনেক খুশি হন। অনেক অসহায় মানুষ রয়েছেন যাদেরকে সহযোগিতা করার মতো কেউ নেই, অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন যাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো সন্তান বা স্বজন নেই। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অনেক বড় ধরণের পরোপকার। আমাদের জীবনে চলার পথে অনেকে আছেন যারা বিপদগ্রস্ত, তাদেরকে সাহায্য করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্বও বটে। ইসলাম ধর্ম বারবারই এ কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রতিবেশীদের সর্বদা খোঁজ-খবর নেওয়া সবার দায়িত্ব। প্রতিবেশীকে উপোস রেখে খাবার গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছে ইসলাম ধর্ম। শীতকালে অনেক মানুষ প্রচণ্ড শীতে কষ্ট পায়। তাদের কষ্ট লাঘবে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সামর্থ্য অনুযায়ী উপযুক্ত শীতবস্ত্র বিতরণ করে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম-বর্ণ কোনো বিষয় নয়, মানবসেবাই মূল উদ্দেশ্য।

মহান আল্লাহ কারোর সেবার মুখাপেক্ষী নন। কিন্তু কোনো মানুষের অভাবের দিনে কিংবা বিপদের দিনে যখন অন্য কোনো মানুষ এগিয়ে আসে, সেটিকে আল্লাহর সেবাতুল্য পুণ্যের কাজ বলে মূল্যায়ন করা হয়। মানবসেবার মাধ্যমে আল্লাহর সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখাও এক ধরণের পরোপকার। কিন্তু বর্তমানে অন্যের দোষ গোপন রাখার পরিবর্তে অন্যের দোষ বলে বেড়ানোর প্রবণতাই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা যেকোনো সমাজের জন্যই ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।