Alexa

ঋণ খেলাপিদের আরো সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব!

ঋণ খেলাপিদের আরো সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব!

বাংলাদেশি মুদ্রা, পুরনো ছবি

ঋণ খেলাপিদের আরো সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। ডাউন পেমেন্টে ঋণ স্থিতির ১ শতাংশ অথবা ১ কোটি টাকার মধ্যে যেটি কম সেটি জমা করেই খেলাপি ঋণ নবায়ন বা পুনঃতফসিল করা যাবে।

এছাড়া ঋণ পরিশোধে দুই বছরের মোরাটরিয়ামসহ সর্বমোট ১৫ বছর সময় দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ১৫ বছরের মধ্যে দুই বছর ঋণ কিস্তি পরিশোধে এক টাকা খরচ করতে হবে না। ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ সরল সুদ হার হবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে এ প্রস্তাবগুলো উপস্থানের প্রায় সব আয়োজন শেষ করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত আট সদস্যবিশিষ্ট উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি। কমিটির প্রস্তাব পাস হলে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিরা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

গত বছর দেশের প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন ব্যবসায়ী/শিল্প উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ব্যাংকে অনিয়মিত ঋণগুলোকে নিয়মিতকরণের জন্য ব্যাংক দায় পরিশোধে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তিন জন চেয়ারম্যান ও চার জন সিইও/ব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়েছেন।

ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ঋণ পুনঃতফসিলের বিভিন্ন সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মতামত দিয়েছে। এতে দেখা গেছে, কমিটির বেশিরভাগ সুপারিশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অমত রয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রীর জন্য যে প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে সেটিতে এগুলো আমলে নেওয়া হচ্ছে না।

কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ গ্রহীতাদের বেইল আউট বা মন্দ ঋণকে ভাল ঋণে রূপান্তরিত করার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এক্ষেত্রে ঋণ খেলাপিদের বিনা ডাউন পেমেন্টেই পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে বিষয়টির বিরোধিতা করে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের মতামতে বলেছে, ডাউন পেমেন্ট দেয়ার মাধ্যমে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা প্রকাশ পায়। বিনা ডাউন পেমেন্টে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয়া হলে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিরা তা অপব্যবহার করতে পারে। ঋণ শৃঙ্খলার স্বার্থে বিনা ডাউন পেমেন্টের পরিবর্তে ঋণ স্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্প মাত্রায় হলেও বিভিন্ন হারে ডাউন পেমেন্ট ধার্য করা উচিৎ হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতের ভিত্তিতে ডাউন পেমেন্টে ঋণ স্থিতির ১ শতাংশ অথবা ১ কোটি টাকা-এ দু’য়ের মধ্যে যেটি কম সেটি জমা করে আবেদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ঋণ পরিশোধের সময়কাল ১৫ বছর পর্যন্ত রাখার পক্ষে সরকার গঠিত উচ্চ পর্যায়ের এ কমিটি। কমিটি বলেছে, এ ১৫ বছরের মধ্যে আবার ২ বছর মোরাটরিয়াম থাকবে। অর্থাৎ এ দুই বছর ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এটি করা হলে ব্যাংকের তারল্য সংকটসহ মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত বর্ধিত মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলে বিশেষ করে নিয়মিত ঋণগ্রহীতারা শুধু দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুবিধা গ্রহণের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি ঋণগ্রহিতায় পরিণত হবার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ঋণ আমানত ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতি সৃষ্টি হতে পারে এবং ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক মোরাটরিয়ামসহ চলতি মূলধণ ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৬ বছর এবং মেয়াদি ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ পরামর্শ আমলে না নিয়ে কমিটির প্রস্তাবই চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়। তবে এক্ষেত্রে শুধু কেইস টু কেইস বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছে মন্ত্রণালয়।

ঋণের সুদ হারের ক্ষেত্রে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে নোশাল রেট ৭ শতাংশ হিসেবে সরল সুদ হারে ঋণ পুনঃতফসিল হবে বলে প্রস্তাব করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আমানত ও ঋণের সুদ হার চক্রবৃদ্ধি হারে নির্ধারণ করা হয়। সরল সুদে ঋণ দেয়ার বিষয়টি বিদ্যমান বাজার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদ হিসাবায়ন নীতিমালার (বিআরপিডি সার্কুলার নং-২৭, তারিখ ৩১ আগষ্ট ২০১০ ও বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং-১৪, তারিখ-৭ ডিসেম্বর, ২০১০) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কমিটির সুপারিশ মোতাবেক সুবিধা দেয়া হল ব্যাংক তাদের আয়ের যে অংশ থেকে বঞ্চিত হবে তা পুষিয়ে নিতে অন্যান্য খাতের ভালো ঋণ গ্রহীতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে।

তাছাড়া, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের জন্য স্বল্প সুদ নির্ধারণ করা হলে এই সুবিধা গ্রহণের জন্য ভালো ঋণগ্রহীতারাও ইচ্ছাকৃত খেলাপিতে পরিণত হবার আশঙ্কা রয়েছে। আর ব্যাংক ব্যবসায় কষ্ট অব ফান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বিশেষ খাতের ঋণগ্রহীতাদের সুদ হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের স্বার্থ যাতে ক্ষুন্ন না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পুনঃতফসিল সুবিধার হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত বিদ্যমান সব নীতিমালার পাশাপাশি ব্যাংকের দায়-সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কস্ট অব ফান্ড, তারল্য অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রতিবেদনটিতে কমিটি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের পক্ষে প্রস্তাব করেছে। কমিটি বলেছে, কিস্তির মধ্যে আসল ও সুদের পরিমাণ মোট আসল ও সুদ আনুপাতিক হারে আদায়যোগ্য হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এটি ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কিস্তি নির্ধারণের কথা বলেছে।

আপনার মতামত লিখুন :

অর্থনীতি এর আরও খবর