নদী মরে না, মেরে ফেলা হয়

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আগ্নেয়গিরির অগ্নৎপাত ও ভূমিকম্পের ফলে হঠাৎ কোনো নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে বা উৎস বন্ধ হয়ে সে নদীর প্রাকৃতিক মৃত্যু হতে পারে। যদিও আজকাল এভাবে নদী নিজে মরে যায় না, কৌশলে মারা হয়। মেরে ফেলেও রাখা হয় না, নানাকাজে অবৈধভাবে ব্যবহার করা হয়। নদী শুধু মানব সভ্যতার আদি বাহন, জীবন-যাপনের উপজীব্যই ছিল না, মধ্যযুগে মানুষের বিকাশ ও বর্তমান সভ্যতারও উন্নতির পেছনে অন্যতম অবলম্বন হিসেবে বিবেচিত।

মানুষ আকাশ পথে বা ইন্টারনেটে যত দ্রুতই যোগাযোগ করতে সমর্থ হোক না কেন অথর্নৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে সস্তায় ভারী মালামাল পরিবহনে জলপথের গুরুত্ব সর্বাধিক। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে বহমান নদীর ভূমিকা যেন প্রাণবন্ত ভবিষ্যতের হাতছানি, নতুন জীবনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দেশে দেশে নদী যেন আজ দু:খিনী, জীর্ণ কঙ্কাল মরা, সরা অবয়ব!

কারণ নদীগুলো ক্রমাগত দখল করে নেওয়া হয়েছে, এ প্রক্রিয়া প্রতিনিয়ত চলছে। আন্তর্জাতিক, স্থানীয়, ছোট-বড়, প্রশস্ত-সরু, সব নদ-নদীর ওপর কোনো না কোনভাবে আগ্রাসন-নির্যাতন চলছেই। বাঁধ, ব্যারেজ, জলকপাট, রাবার ড্যাম, ইত্যাদি মনুষ্য প্রয়োজনেই তৈবি করা হয়েছে। নদীর টুটি চেপে ধরে স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ করে রাস্তা, ব্রীজ, কালভার্ট প্রতিদিন নতুন নক্সায় স্থাপন করা হচ্ছে। নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিজেদের স্বার্থে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে। বড় বড় নদী সরু খাল, নালা ও পয়:নিষ্কাশনের ড্রেনে পরিণত হয়েছে।

অনেক নদীতে কোনো স্রোত নেই, নেই কোন নাব্যতা। গতি হারিয়ে নদী মৃতপ্রায়। নদী তীরবর্তী শহরগুলোতে গার্মেন্টস কারখানাসহ কিছু কর্মসুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসা উপচে পড়া মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। বেড়েছে মেডিকেলবর্জ্য, গৃহবর্জ্য, কিচেনউচ্ছিষ্ট ও সৃষ্টি হচ্ছে ময়লা আবর্জনার ¯তূপ। এছাড়া বেড়েছে শিল্পবর্জ্য ও সেগুলো ফেলার যথেষ্ট জায়গা না থাকায় নিকটস্থ নদীগুলোই পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। মশা, মাছি ও উৎকট গন্ধের উৎস হয়ে উঠেছে নদীর পাড়গুলো।

এছাড়া কল-কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল, তেল, ডিজেল, পোড়া মবিল, গাদ, ভারী ধাতুর মিশ্রণ সরাসরি নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে। এসব নদীতে বর্ষাকাল ছাড়া তেমন পানি নেই, তাই প্রবাহ নেই। তলানীর সামান্য পানিতে চলছে নানা অত্যাচার। এতে নদীর পানি আর স্বাভাবিক পানি থাকছে না- হয়ে যাচ্ছে গন্ধযুক্ত কালো ভারী তরল পদার্থ।

যেখানে মানুষ গোসল করতে নামতে পারে না। এমনকি মাছও নেই। যেমন, বিভিন্ন কারণে ঢাকার কাছে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষা-তুরাগের দূষিত পানিতে বছরের বেশরিভাগ সময় বায়ো-অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি), কেমিক্যাল-অক্সিজেন ডিমান্ড (সিওডি) সঠিক মাত্রায় থাকছে না। তখন ঐ পানিতে শৈবাল বা মাছের জীবন ধারণের  জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক খাদ্য জন্মায় না। ফলে সাধারণ জলজ প্রাণী ও মাছ বেঁচে থাকতে পারছে না।

আবর্জনা ফেলে ফেলে নদীর পাড় ভরাট করে অবৈধভাবে দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি। প্রথম ক’বছর ঝুপড়িঘর তৈরি করে নানা ধরণের সমিতির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অস্থায়ী ব্যবসা চালানো হয়। এরপর তার ওপর বাশেঁর খুঁটিতে ভর দিয়ে অথবা কোথাও কোথাও মাটি ভরাট করে টিনশেড ঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়। এরপর ভুমি অফিসের দালালদের সাথে কারসাজি করে ভূয়া জমির দলিল তৈরি করে নামে-বেনামে মানুষের কাছে বিক্রি করে প্রতারণা করা হয়।

সেখানে বহুতল বাড়ি, বিলাসী দোকান-পাট, গ্যারেজ, তেলের ডিপো, মালামালের আড়ৎ তৈরি করা হয়। সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের তীরে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করতে গেলে ভুয়া দলিলসহ প্রতারিত জমির মালিকের দেখা মিলেছে ও তাদের কান্নাকাটি ও আহাজারি শোনা গেছে।

এছাড়া নামকরা হাউজিং ব্যাবসায়ীদেরও এসব অবৈধকাজে জড়িত থাকার কথা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। নদীখাদকদের বিচিত্র চরিত্র আজ জাতির কাছে অজানা নয়। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও অজানা কারণে আবার সেগুলো থেমে যায়। নদীখাদকদের সাথে রাজনৈতিক সখ্য ও ঘুষ বাণিজ্যের কথা শোনা যায়। ফলে এগুলোর প্রতিকার হয় না। দেশের কিছু প্রভাবশালী মানুষের মধ্যে অনৈতিকভাবে অবৈধ লেন-দেন প্রক্রিয়া একটি মজ্জাগত সামাজিক ও কৃষ্টিগত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়ে গেছে।

তাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে না বিধায় আমাদের নদীগুলো মরে যায়, বন উজাড় হয়ে যায়। নিমতলী, চুড়িহাট্টার মত করুণ ট্রাজেডি বার বার ফিরে আসে। বহু নিরীহ মানুষের দেহ-মন পুড়ে কয়লা হয়ে গেলে তাদের স্বজনদের ডুকরে ওঠা আকাশভারী করা কান্নায় কিছুদিন বাতাস থমথম করলেও ক’দিন পর যা তো তাই ঘুরে-ফিরে এক একাকার হয়ে যায়!

এতো গেল শহুরে নদ-নদীর কথা। উত্তরের হিমালয় থেকে জন্ম নিয়ে গিরিখাত পেরিয়ে গ্রামের নদী শহরে ঢুকে, আবার শহর ভেদ করে ওরা গ্রাম পেরিয়ে সাগরে মিশে যায়। এটই তো প্রাকৃতিক নিয়ম।

কিন্তু উৎসমুখ থেকে বেরিয়ে নানা বাধায় আমাদের আন্তর্জাতিক বড় বড় নদীগুলো উজানের দেশের একতরফা ভোগের বিষয় হয়ে পড়েছে। ফলে ভাটির দেশের গ্রাম এলাকায় নদীগুলো বর্ষাকালে ফুলে ফেঁপে বন্যা সৃষ্টি করলেও খরা মৌসুমে শুকিয়ে যায়। শুকিয়ে যাওয়া নদীর দু’পাড় ও তলদেশে কৃষিকাজ করা হয়।

দেশে বর্তমানে শুকিয়ে যাওয়া শত শত নদীর দু’পাড় ও তলদেশে আলু, সরিষা, গম, চিনেবাদাম ইত্যাদি ছাড়াও বোরা ধানের আবাদ করা হচ্ছে। কোথাও মাটি কেটে কিছুটা উঁচু করে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও তৈরি করতে দেখা যায়। পরের মৌসুমে বন্যা শুরু হলে এরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এজন্য গ্রাম-শহর-নগর সব জায়গার নদীপাড়ের জমিগুলোর সীমা পুন:নির্ধারণ করা খুব জরুরি। নদীপাড়ের জমির সীমানা চিহ্নিত করে পাকা স্থাপনা তৈরি করে দিতে হবে। যেসব নদীতে পাড় ভাঙ্গনের প্রবণতা বেশি সেগুলোর তীর থেকে নিকটস্থ পাঁচশত মিটারের মধ্যে বসতবাড়ি নির্মাণ নিষিদ্ধ করে সরকারি পরিপত্র জারি করতে হবে। নদীতে ময়লা আবর্জনা, বিষাক্ত তরল বর্জ্য ইত্যাদি ফেলার জন্য জরিমানা করা ও মামলার বিধান রাখা উচিত। নদী খনন করে খরার সময় সেচের জন্য পানির রিজার্ভার তৈরি করতে হবে।

উজানের নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ পেতে চীন, নেপাল ও সর্বপোরি ভারতের সাথে খরা মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির যৌথ দর-কষাকষি বন্ধ করা যাবে না। কারণ, বাংলাদেশের উত্তরের আন্তর্জতিক বড় বড় নদীগুলোতে সারা বছর উজানের পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত থাকলে সেই স্রোতের টানে ঢাকার বা দক্ষিণের নদ-নদীর স্থিত কেমিক্যাল দূষণ ও এ সম্পর্কিত পরিবেশগত সমস্যা এমনিতেই অর্ধেকে নেমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :