‘ফণী’র ফণা ও পরাজিত পরিবেশে দুর্যোগ মোকাবিলার ভাবনা



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

গত বছর জ্যৈষ্ঠ হাওড়ে শুরু হয়েছিল পাহাড়ি ঢল। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়ে আধাপাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছিল। এবার বৈশাখের বিশ তারিখেই বঙ্গোপসাগরে ‘ফণী’ ফণা তুললে কৃষকরা তো বটেই, সরকারও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে মে মাসের ছয় তারিখের মধ্যে ধান (৮০ ভাগ পাকা মনে হলেই) কেটে নিরাপদে রাখার পরামর্শ দেন। বিষয়টা ভালো সতর্কবার্তা যে- ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল’। চোখের সামনে কৃষকদের স্বপ্ন পানিতে তলিয়ে পচে-গলে যাওয়ার চেয়ে পরবর্তীতে অন্তত: কাঁচা ধানের চিড়ে বানিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করা যেতে পারে তো!

এবারের প্রকৃতিটা একবারেই ভিন্ন। গেল সপ্তাহে সারা দেশে কমবেশি ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ওঠানামা করেছে। এটা ফণীর আগমনী বার্তা ছিল। ফণী মোকাবিলায় প্রস্তুতি ভাল, প্রচারও বেশ ভাল। এর পরেও উপকূলীয় মানুষের অসতর্কতা লক্ষণীয়। ঝড় না থামতেই আশ্রয়শিবির ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে কারণ,ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে অতিরিক্ত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। যেখানে বৃদ্ধ, রোগী, মহিলা ও শিশুদের টয়লেট, নিরাপত্তা, খাদ্য ও ঘুমানোর ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক।অন্যদিকে ছেড়ে আসা বাড়িতে চুরি ডাকাতির ভয়।

আরেকটি বড় আতঙ্কের নাম পাহাড়ের ভূমিধস। সাধারণত: বড় ঘূর্ণিঝড় হলে অতিবৃষ্টি শুরু হয়। দীর্ঘ অতিবৃষ্টি ও দমকা বাতাসে ঘর-বাড়ি ও গাছপালা উপড়ে পড়ে। পাশাপাশি পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে প্রতিবছর ভূমিধসে বহু প্রাণও সম্পদহানি ঘটে।

গত বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবনে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধ্বসে গলে নিচে নেমে গিয়েছিল। প্রকৃতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বারবার ধেয়ে এসে রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধ্বসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। আবাদের সমুদয় ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে পচে যাচ্ছে। হাজার হাজার মাছের খামারের মাছভেসে গিয়েছিল। মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছিল। আকাশের বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য সহযোগিতা দেয়া হলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।

পাহাড়ের পাদদেশে পুন:পুন: এই প্লাবনপানি ও মাটি ধসের দুর্যোগ যেন এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। চট্টগ্রামে বারংবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি যেন সবাইকে প্রহসন করে। এরপর কার্টুনেও কৌতুক করে বলা হচ্ছে ‘কী সুন্দুইজ্যা চাটগা নগর’। কার পাপে ডুবছে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাজধানী! নীল সাগরের কোলে অপরূপ পাহাড়ের পাদদেশে পরাজিত পরিবেশ আজ মুচকি মুচকি হাসে! সেজন্য এবারে বর্ষা মৌসুমের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে রাখা দরকার।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণী বেশি দূরে নয়। উপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলং-এর পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিতভাবে উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে।

ভোগবাদী লোভী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে ব্যবসায়ীর সংখ্যা সব জায়গায় লক্ষণীয়। ব্যবসায়ীরা এখন শুধু অর্থনীতিই নিয়ন্ত্রণ করেন না, রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করেন। ব্যবসায়িক রাজনীতিকগণ তাদের ব্যবসায় বিন্দুমাত্র কম মুনাফা হোক তা চান না। যেমন, বিশ্বেও সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্ট একজন সফল ব্যবসায়ী। অথচ তিনি জলবায়ু তহবিলে সায় দেননি। প্যারিসে অনুষ্ঠিত জি-২০ সামিটে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ডেঞ্জারাস গ্লোবালওয়ার্মিং-এর বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা চুক্তি থেকে বিরত রেখে একঘরে হয়ে গেছেন। তাইতো হামবুর্গের সম্মেলনে ‘জি-১৯’ করার তাগাদা এসে সারা বিশ্ব তাঁর একপেশে অবস্থানকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে- ‘নো-জি ২০’ ‘জি-১৯’ দিয়েই ’মেক ক্লাইমেট চেঞ্জ গ্রেট এগেইন’! বলাইবাহুল্য, জনকল্যাণের নিমিত্তে গৃহীত ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত নানা বৃহৎ প্রকল্পের নামে মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ের ওপরই আজ নেমে এসেছে খড়গহস্ত!

পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে ইউনেস্কো পরিবেশ এথিকস-এর কয়েকটি সম্মেলনে (জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় টোকিও ১৯৯৮, কিয়োতো ২০০২ ও ইউনেস্কো ব্যাংকক ২০০৬ ও ২০০৮) আমি ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য ছিলাম। সেখানে বলা হয়েছিল, নিরাপত্তাজনিত কিছু সমস্যা ছাড়া বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট বেশি প্রয়োজন। খুশির কথা এতদিনে আমরা সেদিকেও যাচ্ছি। কিন্তু কয়লা ভিত্তিক পাওয়ার প্লান্টও থেকেই গেছে। যে যাই ভাবুক, বলুক সেটা পরিবেশকে পরাজিত করবেই।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। সবার কথা শোনা উচিত বলে আমি মনে করি। বিগত ৪৭ বছরেও যে উন্নতি লাভকরা সম্ভব হয়নি তা কি আগামী দু’এক বছরেই করে ফেলা সম্ভব হবে? কখনই নয়। দেশের উন্নতির জন্য আশু দরকার নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষের সমন্বয়ে গড়া একটি শক্ত সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো। এ ধরণের কাঠামো এখনো খুবই দুর্বল। আমরা মানুষগুলো যদি এক পারসেন্ট ভালো হতে পারি তবে দেশের দশ পারসেন্ট তড়িৎ উন্নতি ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস।

আমাদের চারদিকে আরও অনেক সমস্যা আছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বহুদূর পেছনে ঠেলে দেয়। বন্যায় তলিয়ে যায় দেশের লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল। বোরো ধান ঘরে তোলার আগে ‘ফণী’ ফণা তোলায় এবারো পানিতে তলিয়ে গেছে লাখ লাখ হেক্টর উঠতি ফসলী জমি। দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার জয়মণি এলাকার শত শত চিংড়ি ঘেরে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়েছে। যেসকল ঘেরের চাষিরা জানিয়েছে একবার লোনা পানি ঢুকলে সেখানে আগামী দশ বছরেও চিংড়ি চাষ সম্ভব নয়। কৃষকদের এসব ক্ষতিপূরণ ত্রাণ দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়।

মূল কথা হলো- আজকাল প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় অহরহ ঘটছে ও ঘটাতে সহায়তা করে চলেছি। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিরসনে মানুষকে সতর্ক বার্তা দিলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই ভাববো, একাই করবো, এই নীতি পরিহার করা উচিত।সবার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশের মাধ্যমে সামাজিক ও গ্লোবাল এম্যিইনিটি কখনো একাই আনয়ন করা যায় না।

শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্ব পরিবেশ আজ সত্যিই পরাজিত। পরিবেশটা সবার সম্পদ। তাই সেটা রক্ষার দায়িত্বটাও সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিলে একটা টেকসই আবহ সৃষ্টি করা সম্ভব।

 



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।