Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সমোটো শহরে হাতকাটা ক্যাপ্টেন

সমোটো শহরে হাতকাটা ক্যাপ্টেন
সমোটো শহরের দরিদ্র মহল্লা
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

বেশ বেলা হয়েছে, তবে নিকারাগুয়ার সমোটো শহর এখনো জেগে ওঠেছে বলে মনে হয় না। নিকারাগুয়ার অন্য একটি মফস্বল শহরে আমি বাস করছি বেশ কিছু দিন হলো। গতকাল এসেছি সমোটোতে। এখানে আছে সম্পূর্ণ পাথরে তৈরি দৃষ্টিনন্দন একটি পাহাড়। তার রুক্ষ পাষাণ কেটে ‘ককো’ নদীর বয়ে চলাতে প্রকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন একটি ক্যানিয়ন। এর রূপবৈচিত্র অসামান্য, তার টানে ইদানীং সমোটো শহরে টুরিস্ট আসছে বিস্তর। আমি নিকারাগুয়া ছেড়ে যাওয়ার আগে এ ক্যানিয়নে একবার ঘুরে বেড়াতে চাই। আমার সাথে আজ অন্য শহর থেকে এসে যোগ দিচ্ছে দুই নিকারাগুয়ান বান্ধবী ইভা ও গাবরিয়েলা। গাবরিয়েলা তার ছোট মেয়ে মারিয়াকে নিয়ে আসছে। ঘণ্টা দুয়েক পর তারা বাসে করে সমোটোতে আসলে আমরা একসাথে ক্যানিয়নে বেড়াতে যাব।

গতকাল এখানে এসে ‘আসিয়ানদা’ বলে একটি গেস্ট-হাউসে উঠেছি। তো একটু বেলা হতেই আমি বেরিয়ে পড়ি। খানিকটা হেঁটে আসতে হয় শহরে। ক্যানিয়নে যাওয়ার আগে শহরটির খতিয়ান আরো ভালো করে নেওয়া উচিত। তাই বেরিয়ে পড়েছি ভোরবেলা। এদিকের ঘরদুয়ারের হালত দেখে মনে হয় না মানুষজনের অর্থনৈতিক অবস্থা বিশেষ একটা সুবিধাজনক। সড়কটি পিচঢালা, তাতে একটি-দুটি ভ্যান-জাতীয় গাড়ি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাই না। ভ্যানের চালকেরাও এখনো খেপ দিতে সড়কে বেরোয়নি। হাঁটতে হাঁটতে বাড়িঘরের নির্মাণশৈলী ও দেয়ালের রংচঙ চুনকামের পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারি, চলে এসেছি মধ্যবিত্তদের মহল্লায়। এ এলাকাও জনহীন, তবে এখান থেকে পেছন ফিরে মিরাদর বলে খ্যাত পর্বতটিকে সবুজ ধূসরে আবছা দেখা যায়। ওদিকে বেশ ঘন হয়ে কুয়াশা জমেছে।

ফুটপাতের পাশে তোলা উনুনে তৈরি হচ্ছে ভাঁপা পিঠার মতো দেখতে নারকেল, শসা ও মরিচের কুচি দেওয়া তমালে। হাতে সময় আছে, তাই দাঁড়িয়ে পড়ে তমালের অর্ডার করে গতকাল সমোটোতে চলে আসার ব্যাপার নিয়ে গুছিয়ে ভাবি। জনসংখ্যার পরিমাপে সমোটোকে ঠিক শহর বলা চলে না। হাল্কাপাতলা কিছু আবাসিক এলাকা, কয়েকটি কমার্শিয়াল স্থপনা, গোটা কয়েক ক্যাফে-রেস্তোরাঁ, পেট্রলপাম্প ও বাসস্টপ মিলিয়ে শহরের বিস্তার। আমি কোনো হেটেল বা গেস্টহাউস রিজার্ভ করে এখানে আসেনি। তাই বাস থেকে নেমে ক্যাফেতিন কুয়ো বলে ডিসকোর চনমনে মিউজিক বাজা একটা রেস্তোরাঁতে বসে এক পেয়ালা কফি খাই। দেখা হয় এক ট্যুরগাইড তরুণীর সাথে। তার নাম লুসিয়া। সে পর্যটকদের সমোটো কেনিয়ানে গাইড হিসাবে তার ঘোড়ায় চড়িয়ে বেড়াতে নিয়ে যায়। মেয়েটি হাসিখুশি ও খুব সহজে তার সাথে কথাবার্তা বলা যায়।

কফি খাওয়া শেষ হতেই সে বলে—চলো, তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি একটি আসিয়ানদায়। আসিয়ানদা হচ্ছে একদম পাড়াগাঁয়ের ভেতর ছোট্ট গেস্ট-হাউস। চালাচ্ছে একটি পরিবার। দামে সস্তা। খুব নিরিবিলি। পছন্দ হবে তোমার। সে আমার ব্যাগ ও রুকস্যাখ তার ঘোড়ার জিনগদির ওপর বেঁধে দিয়ে লাগাম হাতে তুলে নেয়। কথাবার্তা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসি অসিয়ানদাতে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/02/1535885286565.jpg
আসিয়ানদার কটেজে ঝুলছে হ্যমোক

ঝোপঝাড়ে নিবিড় আসিয়ানদার প্রাঙ্গণে নদীর দিক থেকে বইছে মৃদুমন্দ সুবাতাস। মাটিতে লেপাপুছা দেয়ালের একটি কটেজ ভাড়া করি। দুটি কামরার বড়টিতে গাবরিয়েলা ও তার মেয়ে মারিয়া আমার অন্য বান্ধবী ইভার সঙ্গে থাকতে পারবে। পাশের কামরাটি ছোট হলেও তাতে আমার চলে যাবে। বারান্দায় জোড়া হ্যামোক বা দড়ির দোলনা ঝোলানো। বারোয়ারি আঙিনার চারপাশে অন্য কটেজগুলো গাছপালায় জড়ানো ঘন লতার ঘেরাটোপে আলাদা করা।

আঙিনায় জলপাই রঙের কমব্যাট কেতার জ্যাকেট পরে ক্রুকাট চুলের এক লোক বেজায় ভারী একটি ক্যামেরা নিয়ে কী যেন ধুন্দুর-মুন্দুর করেন। তাঁর জ্যাকেটের একটি হাতার ভেতরে বাহু বলে কিছু নেই। কানের সংখ্যাও এক। অন্যটির দগদগে ক্ষতময় ছিদ্রের ওপর লাগানো ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে একটি ইয়ারপিস। তিনি মাটিতে আয়না পেতে তাতে মস বা শুকনো শেওলার টুকরা রেখে চিমটা দিয়ে তাজাতনা লাল পিঁপড়া ধরে ছেড়ে দেন তার ওপর। পিঁপড়াটি মসের স্তূপ বেয়ে নেমে আসতে গেলে আয়নাতে তার পরিষ্কার প্রতিফলন হয়। তিনি ভারী ক্যামেরার স্ট্র্যাপ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে এক হাতে লেন্স পাল্টে তার ছবি তোলেন। আমি চিয়ার্স বলে তাঁর কামেরাম্যানশিপের তারিফ করলে তিনি চোখমুখ কুঁচকে কুৎসিতভাবে আমাকে স্বমেহন করার পরামর্শ দেন। আচরণটি শুধু অস্বাভাবিকই না অশোভনও বটে। কিন্তু কেন জানি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে ইচ্ছা হয় না। বিমর্ষ হয়ে আমার কটেজের দিকে ফিরে লতানো পত্রপল্লবে তৈরি কুঞ্জের আড়ালে বেতের চেয়ার টেনে বসলে সারা বাতাবরণ ভরে ওঠে অদেখা কোনো পতঙ্গের শার্প গুঞ্জনে।

আমার চেয়ারের সামনে সিমেন্টে বাঁধানো একটি স্মুদ পরিসর। কয়েকদিন আগে আমার বান্ধবী ইভা আমাকে উপহার দিয়েছে শিশুতোষ একটা লাটিম। তো পকেট থেকে বের করে ওখানে তা ঘোরাই। লাটিমটি একটি নির্দ্দিষ্ট বিন্দু থেকে ঘুরে ঘুরে তৈরি করছে বৃত্তের বাইরে একাধিক বৃহৎ বৃত্ত। তাদের ক্রমশ সম্প্রসারিত রেখার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, যে মুহূর্তে প্রথম ইভার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়, তার পর কিভাবে যেন তার যাপিত জীবনের বেশ কিছু অধ্যায় ঘুরে আবার তার উদ্যোগে গাবরিয়েলার সঙ্গে পরিচয়। তার সঙ্গে আমার মিথষ্ক্রিয়া লাটিমের চক্রের মতো বাঁক নিচ্ছে। জলপাই রঙের কমব্যাট জ্যাকেট পরা মানুষটি ক্যামেরা হাতে এসে দাঁড়িয়ে অবলোকন করেন লাটিমের ঘূর্ণমান রেখা। মে আই টেক আ পিকচার?—বলে মোলায়েম করে হেসে পোলাইটভাবে আমার পারমিশন চান। কী বলব, মাথা হেলিয়ে সায় দিতেই তিনি মাইক্রোলেন্সে তুলতে শুরু করেন তার ছবি। চেয়ার টেনে কাছে বসে আইপ্যাডের স্ক্রিনে লাটিমের ব্লারি রেখার ছবি দেখাতে দেখাতে তিনি এমন খোলামেলাভাবে নিজের কথা বলতে শুরু করেন যে আমি খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করি। তাঁর নাম এরোন হুরুম। মার্কিন সেনাবাহিনীতে কিছুদিন আগে তাঁর পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। যদিও ব্যাটেলফিল্ডে খুইয়েছেন একখানা হাত ও বাঁ কান, তিনি আর্মি কমান্ডের তেমন কিছু জানেন না। কমব্যাট ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি চলমান যুদ্ধের ছবি তুলতেন। আহত হওয়ার পর মিলিটারি তাঁকে জবাব দিয়েছে। পোস্ট ট্রামাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের স্নায়বিক বিপত্তিতে ভুগছেন। মানসিক ভারসাম্য ফিরে পেতে তাঁর সময় লাগছে। এবং সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে—গেস হোয়াট? বলে আমার অনুমান কী তা জানার জন্য মুখ তুলে তাকালে কোন বিষয়টি তাঁর জীবনে কঠিন মনে হচ্ছে, এ নিয়ে অনুমানপ্রসূত কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এবং একটু আগে তিনি যে মিলিটারি মেজাজের পরিচয় দিয়েছেন, তাই কিছু আন্দাজ করাও নিরাপদ মনে হয় না। সুতরাং নীরব থাকি। তিনি একটু অপেক্ষা করে গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেন—এই যে একা, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গভাবে চলাফেরা করা, দিস ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট, বলে রোদেলা দিনে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মতো কেঁদে ওঠেন।

এ রকমের শক্তসমর্থ যুদ্ধংদেহী লোককে কিভাবে সান্ত্বনা দিতে হয়, তার কলাকৌশল আমার জানা নেই, আবার কিছু বললে যদি হিতে বিপরীত হয়, তাই খামোশ মেরে থাকি। তিনি নিজেই চোখটোখ মুছে মোলায়েম হেসে বলেন—লাইফ ইজ নট অলওয়েজ ব্যাড অ্যাট অল। মিলিটারি থেকে খালাস পাওয়ার পর হাতে এসেছে অঢেল অবসর ও বেশ কিছু বিত্ত। ঘুরে বেড়াচ্ছি এক দেশ থেকে আরেক দেশে, ক্যামেরা দিয়ে শ্যুট করছি। তো ঘুরে বেড়ানো আপনি এনজয় করছেন ক্যাপ্টেন?—বলে আমি তাকালে তিনি রিলাক্স-ভাবে জবাব দেন—আ ফিউ মোমেন্টস। কোনো কোনো জায়গায় কিছু কিছু মুহূর্ত ভালোই লাগছে। ফর এক্সাম্পল, কিছুদিন আগে পেরুতে গেলাম। লিমার এক উষ্ণ জলের স্পাতে সারা শরীর হাত-পা ঘষে-মেজে দিলো ঝামা পাথর দিয়ে। তারপর ফার্মের লামা, তাদের তুলতুলে লোমে হাত বোলানো, বাচ্চা বাচ্চা লামারা খড়বিচালিতে হামা দিচ্ছে, এ সবের ছবি তোলা। ইনডিড হ্যাড আ ফাইন টাইম ইন পেরু।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/02/1535885165878.jpg
ফুটপাতে ছুটছে চশমা চোখে তরুণী

তমালে তৈরি হয়ে গেছে। কলাপাতায় মোড়া তপ্ত পিঠা হাতে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি শহরের মূল সরণিতে। গতকাল বিকেলে আসিয়ানদা থেকে বেরিয়ে এসে এখানে ঘোরাঘুরি করছি। দেখি ক্যাফেতিন কুয়া নামের রোস্তোরাঁয় রোয়াকে পাতা টেবিলে বসে ক্যামেরা হাতে ক্যাপ্টেন এরোন। আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি ডেকে তাঁর টেবিলে বসতে বলেন। ক্যাফেতিন কুয়োর ওপরের তলায় সরগরম পাব। রোয়াকের আঙিনায় ফুলগাছের ঝোপেঝাড়ে বেশ নিরিবিলি। উড়ছে জোড়া ডানার লাল ফড়িং। তাকে ধাওয়া করে উড়ে আসে ছোট্ট এক নীল পাখি। তারা চক্রাকারে ঘুরপাক খেলে ক্যাপ্টেন ক্যামেরায় তাক করেন। ঠিক তখনই দেখি প্রায় নির্জন সড়ক ধরে ছুটে আসছে চশমা চোখের এক তরুণী। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভীতি। বিষয় কী দেখতে আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। মেয়েটি রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে একটু থতমত করে, তারপর জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলে ঢুকে পড়ে ভেতরের কেবিনে। ততক্ষণে ক্যাফেতিনের সামনের ফুটপাতে এসে দাঁড়িয়েছে তাকে ধাওয়া করে নিয়ে আসা ছেলে দুটি। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে কথা বলছে। সম্ভবত রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকবে কি না, তা নিয়ে ইতস্তত করছে। ক্যাপ্টেন ভারী ক্যামেরাটি টেবিলে রেখে ব্যাকপ্যাক থেকে নোঙরের মতো একটি আংটায় প্যাঁচানো দড়ি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান দোতলায়। মিনিট দু-তিনেকের মধ্যে বিষয়টি বিদ্যুদ্বেগে ঘটে যায়। পাবের বারান্দার পিলার বা রেলিংয়ে তিনি নোঙরের মতো আংটা আটকে এক হাতে দড়িতে ঝুলে ফ্লায়িং কেতায় লম্ফ দিয়ে ছেলে দুটির গর্দানে এ্যায়সা পদাঘাত করেন যে, তারা কুকাৎ-জাতীয় আওয়াজ করে ফুটপাতে ছিটকে পড়ে। সিমেন্টে হুমড়ি খেয়ে পড়ে একজনের দাঁতফাতও বোধ করি ভেঙেছে। কাপড়চোপড় থেকে ধুলো ঝেড়ে তারা নজর করে ক্যাপ্টেনকে দেখে। কমব্যাট জ্যাকেট পরা মিলিটারির এই সাবেক সাঙ্গাৎকে চিনতে তাদের কোনো অসুবিধা হয় না। কোনো চোটপাট না করেই তারা উল্টাপথে হাঁটা দেয়।

শর্ট গ্লাসে সোডা ছাড়া ব্র্যান্ডির অর্ডার করে ক্যাপ্টেন খুব সংবেদনশীল স্বরে মেয়েটিকে ডেকে এনে টেবিলে বসান। জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে নিতে সে চশমা খুলে তাকালেই তার দৃষ্টিতে ঝাপসা অস্থিরতা থেকে বুঝতে পারি, তার মধ্যে ঘটছে অস্বাভাবিক কিছু। শর্টগ্লাস থেকে খুব ধীরে সে চুমুক দিয়ে ব্র্যান্ডি পান করছে। ক্যাপ্টেনকে দেখে মনে হয় খানিক দ্বিধায় পড়েছেন, ঠিক বুঝতে পারছেন না কী করবেন? আমি তরুণীর দিকে আই কন্টাক্ট করে জানতে চাই, কী সমাচার, কোথা থেকে এসেছো তুমি, কী ঘটেছে? কথা বলতে গিয়ে তার গলার স্বর তীব্রভাবে কাঁপে। হিস্পানিক আমেরিকান সে, তার ইংরেজিতে এসপানিওল উচ্চারণের প্রভাব আছে প্রচুর। আমেরিকার অখ্যাত শহরের এক স্কুলে সে সায়েন্স টিচার। পর্যটক হিসেবে সমোটো ক্যানিয়ন দেখতে গিয়েছিল। মাঝনদীতে নৌকা চালাতে চালাতে গাইড তাকে কোকেন অফার করলে স্রেফ কৌতূহলবশত সে তা স্মোক করে। দ্বীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়েটি বলে, গাইডের কাছ থেকে কোকেন নেওয়াটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। ঠিক মনে করতে পারছে না কখন পাথর বেয়ে গাইডের সঙ্গে চলে গেছে গুহার অন্ধকারে। কেইভে কোনো পর্যটক নেই দেখে তার খুব অবাক লাগে। আবছা মনে পড়ে, গাইড তার শরীর স্পর্শ করেছে কিন্তু কোনো ভায়োলেন্স ব্যবহার করেনি। নৌকা বেয়ে ফিরিয়ে এনে তাকে নামিয়েও দিয়েছে পাড়ে। তার শরীরে এখনো ক্রিয়া করছে কোকেনের গাঢ় কুয়াশা। এটা কাটানোর জন্য আমি কাউন্টার থেকে ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস নিয়ে এসে তাকে পান করতে বলি। জুস খেতে খেতে সে বলে, শহরে ঢোকার মুখে এ ছেলে দুটি তার পেছনে লেগেছে। ফিসফিস করে বলছিল—হানি, আমাদের কাছে আছে আরো ভালো কোয়ালিটির কোকেন। নিয়ে যাব সবচেয়ে সুন্দর গুহায়। চলো, আমাদের সঙ্গে, খুব সফিসটিকেটেড ইক্যুইপমেন্ট আছে, কোনো কষ্ট হবে না, তোমার শরীরে এঁকে দেব চমৎকার উল্কি। মেয়েটি অরেঞ্জ জুসের পুরা গ্লাস খালি করে ওয়াশ-রুমে যায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/02/1535885355537.jpg
দূরে ক্যানিয়নের পাথর কাটা নদী

ক্যাপ্টেন আমার দিকে কিছুক্ষণ খুব খেয়াল করে তাকিয়ে তাঁর নোঙরের মতো বস্তু ফ্লোর থেকে তুলে তাতে দড়ি প্যাঁচান। তা দিয়ে টেবিলের পায়ায় মৃদু ঠুকে বিদ্রূপ করে বলেন—সো, ইউ নো হাউ টু মেইক আ প্যারোট টক, টিয়া পাখির মুখে কিভাবে বুলি ফোটাতে হয়, তা তোমার জানা আছে দেখছি। জবাবে বলতে চাই, কোকেনের ঘোরে মেয়েটির মস্তিষ্ক এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। কতটা বলছে আর আদতে কী ঘটেছে, তার পরিষ্কার পিকচার পাওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আমাকে বক্তব্যের মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে টেবিলের ওপর নোঙরের মতো জিনিস রেখে ক্যাপ্টেন বলেন—ইউ আর আ কাওয়ার্ড, অ্যাডমিট ইট স্ট্রেইট। আমি এবার তাঁর চোখে চোখ রাখলে তাঁর এক্সপ্রেশনে পরিষ্কার বুঝতে পারি তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, চরের দখল নিয়েছি আমি, ওখানে ফসল বোনার অধিকার আমার। তিনি নোঙর ঠুকে বিষয়টিতে জোর দিয়ে বলেন—অ্যাডমিট ইট, ইউ আর আ কাওয়ার্ড। আমি দ্রুত হিসাব করি, তিনি ফ্লাইং কিক কষিয়ে একটু আগে যে বিক্রমের পরিচয় দিয়েছেন, তা হিন্দি সিনেমাতে সুলভ হলেও পর্যটনে এ ধরনের তাকদ প্রদর্শন বিরল। আমি খানিকটা কাপুরুষও বটে, আর কোথাও গল্পের সন্ধান পেলে হুঁশও ঠিক থাকে না। তদুপরি আমি কুংফুতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নই, সুতরাং, এক-হাতা সৈনিকের সঙ্গে হাতাহাতিতেও সফল হাওয়ার সম্ভাবনা জিরো। তাই তাঁকে গুডবাই বলে উঠে পড়ি। তিনি কুৎসিতভাবে পেছন থেকে বলেন—গো অ্যান্ড মাস্টারবেট ইয়োরসেল্ফ, স্বমেহন করগে, যাও।

আজ ভোরবেলা আসিয়ানদা থেকে বেরোবার পথে দেখি, যে কটেজে ক্যাপ্টেন এরোন আছেন, তার বারান্দায় হ্যামোকে শুয়ে ঝিমাচ্ছে কোকেন নেওয়া শিক্ষয়িত্রী তরুণীটি। হয়তো সে তার নিজের হোটেলে একা ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছিল। ক্যাপ্টেন তাকে আসিয়ানদায় নিয়ে এসে শেল্টার দিয়েছেন। পুরা ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয় না। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে চাই না, আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেড়াতে আসা মাস্টারনি গোছের হিস্পানিক মেয়েটির আসলে কী হয়েছে, সবকিছু জেনে আমার হবেই বা কি? এ মুহূর্তে আমার অতিথিদের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। ইভা গাবরিয়েলাকে নিয়ে সমোটোতে আসছে, সঙ্গে আছে গাবরিয়েলার বছর চারেকের মেয়ে মারিয়া। তাদের জন্য সমস্ত কিছুর অ্যারেঞ্জমেন্ট খতিয়ে দেখতে হয়। এসব ভাবতে ভাবতে আমি ক্যাফেতিন কুয়ো রেস্তোরাঁর দিকে হাঁটি।

আপনার মতামত লিখুন :

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে
ছবি. লেখক

সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন না—“পুলিশ এলে ডরাই না আর, পালাই নে আর ভয়ে, আরশোলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।”—আমি কিন্তু তেমন নই। আরশোলা আর ফড়িংকে সয়ে নিলেও, পুলিশকে আমি ষোল আনা ডরাই। তাই কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক শহরের আব্দুররাহমানিভ স্ট্রিটে চলার সময়ে যখন দুজন পুলিশ দু দিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। তাদের সাথে আছেন সাদা পোশাকের আরো দুজন পুলিশ। আমাকে তারা এমনভাবে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন, চাইলেও সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে ভোঁ দৌড় দেবার কোনো উপায় নেই। মুখে তাই সরল একটা অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি নিয়ে তাদের জেরার অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। এ অঞ্চলে শুনেছি পুলিশ খুব একটা সততানিষ্ঠ নয়, তাই আমাকে পাকড়াও করে মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে কোনো পয়সা দাবি করে কিনা, সেরকম একটা সন্দেহও মনে উঁকি দেয়। তো সেই দলে থাকা একমাত্র নারীসদস্য আমার সমস্ত ভুল ভাঙিয়ে আশ্বস্ত করে জানালেন, তারা আসলে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিছুদিন হলো এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কাজ নেই তেমন। ট্যুরিস্ট যেমন কম, তার চেয়েও কম অপরাধের মাত্রা। ফলে ইনাদের একপ্রকার মাছি তাড়াবার অবস্থা। আমাকে দেখে এই দলটির আগ্রহ হয়েছে আমার কাছ থেকে দু চারটি কথা জানবার। এই যেমন কোথা থেকে এসেছি, কদিন থাকব, কেমন লাগছে বিশকেক, কোথায় কোথায় যাবার পরিকল্পনা আছে, এই সব আরকি। সবশেষে তাদের অভিলাষ হলো, আমার সাথে একটি ছবি তুলবেন। বেশ, তুলুন। ভেতরে ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছি ততক্ষণে। কোথায় ভেবেছিলাম উৎকোচ দাবি করা অসৎ পুলিশ, আর শেষে কিনা আবিষ্কার করলাম সদালাপী বন্ধুভাবাপন্ন ভিন্ন ধরনের পুলিশ, তাই অবাক আর উৎফুল্ল না হয়ে উপায় আছে?

আজ এখানে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া। ছেড়ে ছেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও এমনই ছিল। তবে বৃষ্টির তেজ ছিল আরো বেশি। তার মাঝেই এয়ারপোর্ট থেকে আসতে হয়েছে। সে-নিয়ে বেশ রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। বিশকেকের এয়ারপোর্ট মূল শহর থেকে বেশ দূরে, প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের পথ। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দু লেনের মন্থর পিচঢালা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিইনি। ভূতুড়ে জনমানবহীন সেই এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই দেখা পেয়েছিলাম ‘মারসুতকা’র, যেটি আদতে হলো ভাড়ায় খাটা মাইক্রোবাস। ভাড়া ট্যাক্সির দশ ভাগের এক ভাগ। যদিও যাত্রীবোঝাই হবার জন্যে অপেক্ষা করতে হলো বেশ খানিকটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির ভারি পর্দাকে উপেক্ষা করে জোরসে ওয়াইপার চালিয়ে শম্বুকগতিতে মারসুতকা ছুটে চলে। মিনিট পনের পথ আসার পর দেখি দু পাশটা প্রায়ান্ধকার। ঝুপ করেই যেন নেমে এসেছে বিদায়ীবেলার সন্ধ্যা। আর সামনের রাস্তায় এপাশের মাঠ উপচিয়ে তীব্র গতিতে জল ছুটে যাচ্ছে উল্টো দিকের মাঠের দিকে। এর মাঝ দিয়ে গাড়ি ছোটালে জলের স্রোতে কলার ভেলার মতো ভেসে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের ড্রাইভার বিশাল এক সিডার গাছের কোণে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা কিছুটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। ওখানেই আমরা আটকে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কিছুটা শঙ্কা জাগে, যদি বৃষ্টি আর না থামে? যদি জলের তোড় এসে পৌঁছায় এ গাড়ি অবধি, তাহলে? আশেপাশে গ্রামের কিছু চাষিবাড়ি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। এখানে বিপদে পড়লে সাহায্য করবার কেউ এগিয়ে আসবে কি?

বৃষ্টি থেমেছিল শেষ অবধি, সেই সাথে মন্থর হয়েছিল প্লাবনের তেজ। কিন্তু এতসব ডামাডোলে আমরা যখন আলাতু বাজারের কোণে এসে পৌঁছাই, ততক্ষণে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখান থেকে আমার হোটেল যে কোন দিকে, কিংবা কত দূরে, কিছুই ধারণা নেই আমার। কিছুটা ক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মাথার উপরের বুড়ো ওক গাছ থেকে টপ টপ করে ঝড়ে পড়ে বিকেলের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো। পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে হঠাৎ এক যুবক দাঁড়িয়ে যায়। আমার অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজ থেকেই বলে, ‘ট্যাক্সি খুঁজে দেব তোমায়?’ আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত কিছু টেপাটেপি করে জানায়, ‘মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই ট্যাক্সি এসে পড়বে। ততক্ষণ আমি তোমার সাথে আছি। আমি এখানকার টিভি স্টেশনে গ্রাফিক্সের কাজ করি। আজ আমার বিকেলের শিফটে কাজ ছিল। ফেরার সময়ে দূর থেকে দেখলাম, তুমি এখানে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তাই ভাবলাম, তোমার হয়তো কোনো সাহায্য প্রয়োজন।’ অজানা একটি দেশে এমন একজন অপরিচিত জনের কাছ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত পেয়ে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।

আলাতু স্কয়ারের কোণের দিকটায় টিউলিপের বাগান। সকালের বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে আছে আধবোজা টিউলিপের জঠরে। সেই সাথে আশেপাশে ফুটে আছে বেশকিছু ধবধবে সাদা ড্যাফোডিল। টিউলিপের বাগানের পেছনেই আইরিশ পাব। তবে সকালের দিক বিধায় পাবের দরজাটি বন্ধ। আর বাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘরের মতো দেখতে টিনের চালের লম্বা বারান্দা। বিশাল সেই চাতালে দুজন মাত্র মানুষ নানা আকারের পেইন্টিং এনে ঝুলিয়ে রাখছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেসব পেইন্টিংয়ের মাঝে লেনিন যেমন আছেন, তেমনি বেঁচে আছেন স্তালিনও। কিরঘিজ রমণীদের বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে। তবে তাদের অনেকটিতে শিল্পী নেত্রদানপর্ব সমাপ্ত করেননি। সেটি কোনো ধর্মীয় কারণে কি? এর আগে তাসখন্দে পরিচয় হওয়া একজন চিত্রশিল্পী তেমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখানে সেসব আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, যে দু যুবক ছবিগুলো চটের ছালা থেকে বের করে ঝুলিয়ে রাখার কাজ করছে, তাদেরকে মূল চিত্রকর বলে মনে হয় না। আর তাছাড়া ওরা মহাব্যস্ত। এই যে আমি খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছি, এর মাঝে কিন্তু একবারও তারা জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা কিনা। অতঃপর তাদেরকে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত রেখে আমি মূল স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705573218.jpg

কংক্রিটে ঢাকা বিশাল উন্মুক্ত সেই স্কয়ারটিকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে উঁচু বেদিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা এক বীর। এই বীর পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ ‘মানাস’-এ উল্লিখিত বীর। এই কিরঘিজ দেশটির নানা ক্ষেত্রে মানাস-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এদের এয়ারপোর্ট, এমনকি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার নামও মানাস। দূরদেশের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে কী করে বিজয়ীর বেশে ফিরেছিলেন সেই বীর, সেটি-ই কাব্যের ছন্দে শত শত বছর ধরে পঠিত হয়েছে ধূসর স্তেপের দেশ কিরঘিজস্তানে।

আজ উদ্দাম হাওয়াকে উপেক্ষা করে স্কয়ারের উন্মুক্ত স্থানটিতে বেশ কিছু লোকের সমাগম। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সামরিক বাহিনীর কসরত। তাদের দু দিকে ব্যান্ড দলের বাদ্যের তালে তালে নাচছে স্কুলের একদল কিশোর কিশোরী। কিশোরদের মাথায় ঐতিহ্যবাহী কিরঘিজ টুপি—কালপাক। তাদের কয়েক জনার হাতে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কমুজ। ত্রি-তার বিশিষ্ট কমুজ দেখতে অনেকটা গিটারের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট আর শীর্ণ। সেনা আর সেই স্কুলের কিশোর কিশোরীদের সাজ সাজ রব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনের কোনো এক দিনে হয়তো উৎসব পালনের ঘটা আছে। তাই প্রস্তুতি হিসেবেই এই মহড়া। আমি নিজেও হাওয়া উপেক্ষা করে কিছুক্ষণ শিশুদের মহড়া দেখি।

এই স্কয়ারটির পেছন দিকে একটি সবুজ উদ্যান। নাম—দুবভি পার্ক। সে উদ্যানের সমুখেই আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে সপ্রতাপে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। মধ্য এশিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র লেনিন-ভাস্কর্য। বাকিগুলোকে অনেক আগেই ধনতন্ত্রের আগমনের মধুলগ্নে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার এরা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি নিলেও বোধকরি অতীত স্মৃতিকে এক ঝটকায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পর অবধি লেনিন ভাস্কর্যটি স্কয়ারের সম্মুখ চত্বরেই ছিল। এই কিছু বছর আগে ওটিকে সরিয়ে এনে স্থান দেওয়া হয় ভবনের পেছন দিকে। লেনিনের প্রতি মানুষের মায়ামোহ এখনো যে কিছুটা টিকে আছে, তার আরেক প্রমাণ হলো—ভাস্কর্যের বেদিতে পড়ে থাকা গোলাপ আর টিউলিপের ম্লান গুচ্ছ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705392582.jpg

লেনিন ভাস্কর্যের উল্টোদিকের সেই পার্কটির একটি বেঞ্চে গিয়ে বসি। বাঁ ধারে কিরঘিজ নারীর প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্য। মধ্যবয়েসি এক নারী। মাথায় হেঁসেলের পাতিলের মতো দেখতে প্রথাগত মেয়েলি কিরঘিজ টুপি—এলিশেক। প্রায় দশ হাত দীর্ঘ সূতি কাপড় পাগড়ির মতো করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় এ টুপি। তবে বিশাল সাইজের এই কেশাচ্ছাদনকারী পরে হাঁটতে এযাবত কোনো নারীকে এ শহরে দেখিনি। হয়তো গাঁ গ্রামে এখনো এর কিছু চল থাকতে পারে। তবে পাথরের বেদির উপর সেই স্মিতহাস্যময়ী নারীর ভাস্কর্যটি দেখে আমার হঠাৎ জমিলার কথা মনে হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক চিঙ্গিস আইৎমাতভ সৃষ্ট অমর চরিত্র—জমিলা। বলা চলে, জমিলার গল্পের মাধ্যমেই এই কিরঘিজ দেশটির সাথে আমার পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জমিলার স্বামী মায়ের কাছে বৌকে রেখে ফ্রন্টে যায়। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত জমিলার সঙ্গী হয়ে থাকে বালক বয়সের দেবর। এর মাঝেই গ্রামের সমবায় ফার্মে কাজের জন্যে ডাক পড়ে তার। গ্রামের পুরুষরা যেহেতু সবাই যুদ্ধে, তাই সমর্থ নারীরা শস্যভাণ্ডার না সামলালে ফ্রন্টের সৈনিকদের মুখে খাবার জুটবে কী করে? জমিলা কাজে যোগ দেয়, সাথে বন্ধুর মতো লেগে থাকে সেই দেবরটি। এর মাঝেই সেখানে উদয় হয় জমিলার সমবয়েসী আরেক যুবক। জমিলা আর সেই যুবক দুজনেই একে অপরের প্রতি নৈকট্য অনুভব করে। আর সেভাবেই কাহিনী গড়ায়। ছোট গল্প। কিন্তু কী গভীর তার আকুতি! কিরঘিজ গ্রামীণ সমাজের সেই সময়কার চিত্রকে যেন জমিলার জীবনের কাহিনীর মধ্যদিয়েই আইৎমাতভ উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। আমি সেই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে ভাবি—তুমিই কি তবে গিরিপথ পেরিয়ে গ্রাম ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে দূর দেশে পালিয়ে যাওয়া সেই জমিলা?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705311264.jpg

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা অব্যাহত থাকায় চায়ের তেষ্টা জেগে ওঠে। আমি রাস্তা পেরিয়ে স্কয়ারের উল্টোদিকে যাই। ওদিকটাতে বেশ কিছু ক্যাফে-বেকারির দোকান আছে। বলা চলে, এ রাস্তাই শহরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। খুব বেশি দূর হাঁটতে হয় না। অল্প দূরেই লোহার দরজা ঘেরা মেট্রো পাব নজরে আসে। সেটির বাইরে চক বোর্ডে লেখা—‘তুমি+আমি+কফি= আনন্দ’। যদিও আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি আছি, কফিও হয়তো থাকবে, কিন্তু কোনো ‘তুমি’ নেই। তাই আনন্দের সঙ্কুলান হবে কিনা, জানি না। তবুও অনন্যোপায় না থাকায় সেই দশাতেই ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরটা গুমোট অন্ধকার। বাইরের দরজার সাথে মিল রেখেই চারধারে ছড়ানো লোহার টেবিল চেয়ার। সড়কের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ঘোলাটে কাচে ঢাকা। দেয়ালে টানানো নোটিশ বোর্ডে লেখা—টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। কোণের দিকটিতে বার। তবে সেটি বোধ করি জমজমাট হয়ে ওঠে আঁধার নামার পর। এই ভর দুপুরবেলায় কেই-বা এখানে মদ গিলতে আসবে? ওয়াটার এগিয়ে এলে আমি চায়ের অর্ডার করে পাশের টেবিলের দিকে তাকাই। সেখানে মাঝবয়েসী দু মার্কিন ভদ্রলোক আলাপ করছেন। নিচুস্বরে কথা বলায় তাদের আলাপন আমি ডিকোড করতে পারি না। ভাবতে থাকি এরা কি কোনো কনট্রাক্টর? একথা ভাবছি, কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে না হলেও কয়েক বছর আগ অবধি এই বিশকেক শহরটিতে আনগোনা ছিল বিপুল সংখ্যক মার্কিনীর। নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হলে তারা কিরঘিজস্তানের মানাস এয়ারপোর্টে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বানাবার জন্যে জায়গা চেয়ে বসে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকা কিরগিজস্তানের পক্ষে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে বিমান বাহিনীর লোক, তাদেরকে কেন্দ্র করে সাপ্লায়ার কোম্পানি ইত্যাদি নানা সংস্থার কাজ করা বিপুলসংখ্যক লোকেদের মচমচে পয়সায় গড়ে ওঠে এ এলাকার হোটেল, ডিস্ক, পাব, আর ক্যাফেগুলো। তবে কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নয়া কিরঘিজ সরকারের চাপে মার্কিন বিমান বাহিনী এখানকার ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিদেয় নিলে মাথায় হাত পড়ে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের। তারা সরকারের কাছে আর্জি জানায়—ফিরিয়ে আনুন আবার সেই মার্কিনীদের। নয়তো আমরা চলব কী করে? তাদের এই উদ্বিগ্নতার হেতুটা আমি বুঝি। এ পর্যন্ত বিশকেক শহরের নানা পথে হেঁটে যতদূর বুঝেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরুবার পর এখানকার নতুন কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। বিদ্যুৎচালিত যে সরকারি বাসগুলো রাস্তায় চলছে সেগুলো রঙচটা, লক্কড়-ঝক্কর মার্কা। রাস্তায় এখানে-ওখানে খানাখন্দ। রাজধানীর পাড়াগুলো শ্রীহীন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা উষর, চাষাবাদ-অনুপযোগী। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে একটি ছোট সোনার খনি। ভারি শিল্প নেই বললেই চলে। সে কারণেই দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ছুটে যায় রাশিয়ায়। অর্থনীতির এমন একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় মার্কিন ঘাঁটির প্রস্থানে তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিচলিত না হয়ে পারেনি। তবে ঘাঁটিটি গুটিয়ে নিলেও সব কর্মকাণ্ড হয়তো পুরোপুরি বিদেয় নেয়নি। কিছু কনট্রাক্টর, কিছু ফড়ে দালাল হয়তো এখনো রয়ে গেছে। অদূরের টেবিলে ভুঁড়ি ঠেকিয়ে বসা সেই দুই মার্কিনী তেমন কেউ কিনা কে জানে!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563704741206.jpg

ওয়েটার চা এনে রেখে যায়। চায়ের প্লেটে দুধবিহীন লিকার চায়ের পাশে রাখা থাকে মুসুম্বির কয়েকটি টুকরো। আমি সেই টুকরো দুটোকে চায়ে ভাসিয়ে দিই। সেই সাথে ভাবতে থাকি—দুপুরের খাবারটা সারা যায় কোথায়? খাবার নিয়ে এ অঞ্চলে বেশ হুজ্জতে পড়েছি। ইংরেজি জানা লোক এখানে নেই বললেই চলে। সবজি চাইলে এনে দেয় মাংস, আর মাংস চাইলে এনে দেয় সবজি। যেটা বুঝলাম, নিজের ইচ্ছেমতো খাবার চাইলে এ দেশে আসবার আগে টুকিটাকি রুশ শিখে আসাটা বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, এরা কিন্তু এখনো রুশ ভাষাকেই ধরে রেখেছে। আর এদের বর্ণমালাও সিরিলিক বর্ণমালা।

কফি পান শেষে আমি এগলি-ওগলি হেঁটে হায়াত রিজেন্সি হোটেলটা খুঁজতে থাকি। না, এ গরিব বান্দার সেখানে ওঠবার মতো সামর্থ্য নেই। আমি আসলে ওটি খুঁজছি, কারণ এর ঠিক পেছনেই নাকি কিরঘিজ জাতীয় নাট্যশালা। সেখানে যাবার কারণ আছে। সকালে হোটেলের খাবার ঘরে প্রাতরাশ সারার পর বেরিয়ে আসার সময়ে শুনছিলাম ম্যানেজার মেয়েটি কাকে যেন বলছে—আজ এখানে বিরাট অপেরা কনসার্ট হবার কথা। ভিয়েনা থেকে এদ্রিয়ান আর হাইদেমারিয়া নামক দুজন স্বনামধন্য শিল্পী আসবেন। সাথে থাকবে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রীদের একটি দল। তারা বাজাবেন—পিয়ানো, চেলো, ভায়োলিন আর বাস। অপেরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় গানের সুরের সাথে কোনো একটি অভিনয়ও মঞ্চস্থ করেন। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্যের মতো। তবে ভিয়েনা থেকে আসা অপেরা শিল্পীরা কেবলই গাইবেন, অভিনয়ে অংশ নেবেন না। এর আগে ভিয়েনায় গিয়ে পথেঘাটে এই অপেরা কনসার্টের টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি। সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকেট বেচা দালালদের মতোই ওখানকার থিয়েটারগুলোর আশেপাশের রাস্তায় আছে বেশ কিছু টিকেটবিক্রেতা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে তাদের অনেকের পরনে পুরনো আমলের ঝলমলে পোশাক। এমন কয়েকজনের কাছে টিকেটের মূল্য শুনে আমার একেবারে অক্কা পাবার দশা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ ইউরোর নিচে ভালো কোনো টিকেটই নেই। তাই অপেরা কনসার্টের তীর্থস্থল ভিয়েনায় অবস্থানকালে সেটির সুধা আস্বাদন আর সম্ভব হয়নি। তবে সেখানকার শিল্পীরা এখানে এসে অনুষ্ঠান করায় আমি অনুমান করি—টিকেটের মূল্য হয়তো তেমন একটা আকাশচুম্বী হবে না। ম্যানেজার মেয়েটিকে কোথা থেকে টিকেট কাটা যায়, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সে কিছুটা তাগিদের কণ্ঠে জানায়, “আজ রাতের এই শো যদি ধরতে চাও, তাহলে তোমাকে দুপুরের মধ্যে গিয়ে টিকেট কেটে আসতেই হবে। শোয়ের ঠিক আগে ওখানে টিকেট পাবে না।” মেয়েটির সেই কথাকে আমলে নিয়েই আমার এই নাট্যশালা খুঁজতে পথে নামা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705117000.jpg

গথিক স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল সেই নাট্যশালাটি দু গলি পরেই পেয়ে যাই। চূড়োতে এখনো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাওয়া তারাটি দেখেই বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি সোভিয়েত সময়ের অবদান। সামনের বারান্দায় উঠে দেখি, সেখানে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে ভেতরের প্যাসেজে জ্বলতে থাকা ঝাড়বাতির আলোকছটা। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে ভেতরে যাবার মুখে কাঠের ভারি দরজাটির হাতলে চাপ দিই। কিন্তু সেটি আমার প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। আমি বুঝে যাই, সন্ধ্যের আগে এই দোর খুলবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে টিকেট পাব কোথায়? নাকি এতটা পথ এসে আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হবে? সেই সময়ে খেয়াল করি, বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে দু পাল্লার জানালা। একটি পাল্লা খোলা, অপরটি বন্ধ। মুখে হাসি ফুটে ওঠে আমার, টিকেটের একটা বন্দোবস্ত হয়তো হয়ে গেল।

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র