Barta24

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

কায়সারবাগের কাকা-হুজুর

কায়সারবাগের কাকা-হুজুর
রেঙুনের সুলে প্যাগোডা। ছবি. লেখক
মঈনুস সুলতান


  • Font increase
  • Font Decrease

সারা দুপুর সেন্ট্রাল রেঙুনের হাটবাজার ঘেঁটে ঘামে গরমে লবেজান হয়ে আমি ও হলেণ আমাদের ঘুমন্ত কন্যা কাজরিকে কাঁধে নিয়ে সুলে প্যাগোডার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি—এবার যাওয়া যায় কোথায়? আমাদের সামনে সুলে প্যাগোডার সুনশান সোনালি স্থাপত্য। তার চারপাশের চুনকাম করা শপিং কমপ্লেক্সে ক্রেতা বিক্রেতার কোনো পাত্তা নেই। দিন কয়েক হলো আমরা রেঙুনের হাটবাজারে বিস্তর ঘুরছি। খুঁজে খুঁজে খরিদ করছি বর্মার তাঁতে বোনা বস্ত্র, সোনালি ল্যাকারে রঞ্জিত লক্ষীপ্যাঁচা, টিক কাঠের ট্রে ও জেড পাথরের হাতি। কাজরি সব সময় স্থির থাকতে চায় না, সুতরাং তাকে নিয়ে বেশিক্ষণ বাজার-সওদা করা মুশকিল। তাই আমরা তাকে বিরতি দিতে প্রায়ই চলে আসি সুলে প্যাগোডার ভেতরের আঙিনায়। মন্দিরের হিমেল বাতাবরণে সে ওখানে ছোটাছুটি করতে ভালোবাসে। জনা কয়েক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীনীদের সাথে তার ভাবও হয়েছে। মাঝেমাঝে সে তাদের সাথে পালকের ঝাড়ু হাতে মন্দিরের বিগ্রহ ছড়ানো পরিসরে ঝাট দিতেও হাত লাগায়। এ মুহূর্তে সে ঘুমিয়ে পড়েছে, এবং আমাদের খুব পিপাসা পেয়েছে বলে আমরা কায়সারবাগ রেস্তোরাঁর দিকে হাঁটি।

সুলে প্যাগোডার পেছনভাগে ওয়ারলেস টাওয়ারের ছায়া ধরে হেঁটে আমরা কায়সারবাগ রেস্তোরাঁয় ঢুকি। খুব সস্তা কাঠ ও টিন দিয়ে সম্প্রতি তৈরি রেস্তোরাঁর ঘরটি আশপাশের অন্যান্য দোকানপাটের ডিজাইন থেকে ভিন্ন, এবং মানের দিক থেকে এক নজরে তার গরিবি হালতও খুব স্পষ্ট। এ রেস্তোরাঁয় আমরা আরো বার কয়েক এসেছি। সেন্ট্রাল রেঙুনে আসলে এখানে বসে এক পেয়ালা দুধপাত্তি চায়ের সাথে চালের রুটি দিয়ে সুজির হালুয়া—আমাদের পারিবারিক প্রিয় খাবারের তালিকায় পড়ে। এখানকার খদ্দেরদের বেশিরভাই বর্মার মুসলিম অভিবাসি সম্প্রদায়ের বেকার তরুণ। কায়সারবাগের বর্তমান স্বত্বাধিকারীর পরদাদা অনেক বছর আগে লখনৌ থেকে বর্মাটিক কাঠের ব্যবসা করতে রেঙুন এসেছিলেন। লখনৌ শহরে কায়সারবাগ নামে নবাবী আমলের মশহুর একটি প্রাসাদ আছে। রেস্তোরাঁর বর্তমান মালিক তার পুত্র সে স্মৃতিতে আদনা এ চা-খানার নামকরণ করেছেন। বয়সের দিক থেকে মুরব্বি হওয়ার কারণে সকলের কাছে তিনি কাকা-হুজুর বলে পরিচিত। তাঁর আসল নাম এ অব্দি আমাদের জানার সুযোগ হয়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/10/1536567592493.jpg
সেন্ট্রাল রেঙুনের দৃশ্যপট

কাকা-হুজুরের বয়স হলেও তাকদ এবং তনদুরুস্তির দিক থেকে তিনি এখনো দড়ো আছেন। তাঁর দীর্ঘ কোঁকড়ানো দাড়ি মেহদি রঞ্জিত। উপর ও নিচের পাটি মিলিয়ে তাঁর মোট চারটি দাঁত খোয়া গেছে। তাই হাসলে তাঁর মুখমণ্ডলকে শিক-ভাঙ্গা জানালার মতো দেখায়। কারণে অকারণে তিনি লখনৌয়ের কবি তকী মীরের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পছন্দ করেন। তাঁর কাউন্টারে ক্যাশবাক্সের পাশে ১৮৮৯ সালে লখনৌ থেকে ছাপা মীরের কবিতার একখান দিওয়ান হামেশা মজুদ থাকে। দিওয়ানের পাতাগুলো জিল ছিঁড়ে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। তাই তিনি শের-শায়েরীর কেতাবখানা তাঁতের কাপড়ে তৈরি বস্তনীতে সিজিলমিছিল করে রাখেন।

বেশ কিছুক্ষণ হলো আমরা কায়সারবাগে এসে বসেছি। কাকা-হুজুর আমাদের কোনো খোঁজখবর নিচ্ছেন না দেখে একটু অবাক লাগে। তাঁর খালি কাউন্টারে একটি আগরবাতি অযথা পুড়ে পুড়ে খুশবু ছড়াচ্ছে। আমরা পিপাসার্ত, তাই তাঁর খোঁজে কিচেন থেকে যে ফোঁকর দিয়ে চা-নাশতা সাপ্লাই দেওয়া হয়, তার সামনে এসে দাঁড়াই। রান্নাঘরে জ্বলন্ত চুলার উপর মস্ত এক হান্ডিতে কাকা-হুজুর হাতা দিয়ে কিছু নাড়ছেন। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি কপালের ঘাম মুছে বলেন, ‘জেরা ইন্তেজার করো বেটা, আখনি পাকা রাহা হ্যায়।’ সাথে সাথে আমার নাকে এসে লাগে মশলাদার খুশবু। আমাদের কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না, গামছায় হাত মুছতে মুছতে দু’পেয়ালা লাচ্ছি হাতে কাকা-হুজুর আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান। তারপর খুব স্নেহের স্বরে হলেণের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘বহুত পেরেশান লাগতা হ্যায়.. বাচ্চেলোক, শরবত লাচ্ছি পিয়া করো, আল্লাকা নাম লিয়া করো।’

আমরা হাতপাখা দিয়ে মাছি তাড়িয়ে ধীরেসুস্থে লাচ্ছি পান করতে থাকি। কাকা-হুজুর এখন কাউন্টারে বসে চশমা চোখে বস্তনী খুলে ঘাঁটছেন তকী মীরের শের-শায়েরী। আজ থেকে হপ্তা দুয়েক আগে পয়লা যেদিন তাঁর চা-খানায় আমরা এসে হাজির হই, তিনি আমাদের দিকে খুব তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। শ্বেতাঙ্গীনী হলেণের গাত্র বর্ণই বুঝি তাঁর অবাক হওয়ার কারণ। কপালে ভাঁজ ফেলে তিনি আমার নাম জানতে চেয়েছিলেন। আমি জবাবে ‘মঈনুস সুলতান’ বললে তিনি আমাকে শুধরে দিয়ে বলেন, ‘মোহাম্মদ মঈনুস সুলতান বলো বেটা।’ নামে মোহাম্মদ সংযোজনের তাঁর প্রস্তাব আমি বিনা বাক্যব্যয়ে কবুল করে নিলে—তিনি ভুরু কুঁচকে হলেণকে দেখিয়ে জানতে চান, ‘কৌণ হ্যায় উ হাসিন আওরত?’ জবাবে আমি কনফিডেন্টলি তাকে শাদি করা বেগম জানালে, তিনি শিক-ভাঙ্গা জানালা খোলার অভিব্যক্তিতে হো হো করে হেসে বলেন,  ‘তুমকো জরুর মীর ছাহেব ক্যা শ্যার শুনানো হোগা।’ তারপর তিনি বস্তনী বিছরিয়ে তকী মীরের দিওয়ান খোলেন। কিতাবখানার বয়স দেখে হলেণ রীতিমতো অবাক হয়। একটি হলুদ হয়ে আসা পৃষ্ঠা দেখিয়ে কাকা-হুজুর পড়েন, “মুহব্বৎসে হ্যায় ইন্তেজাম-এ জহাঁ/ মুহব্বৎসে গর্দিসমেঁ হ্যায় আসমাঁ।” অর্থাৎ “ভালোবাসার জন্যই তো সবকিছু/ আশমান ও তো চরকির মতো ঘুরছে তার টানে।” আচমকা শায়েরবাজিতে খানিক বিব্রত হলে কাকা-হুজুর কিতাব বন্ধ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ভুখা হ্যায় তুম দুনো, ঠিক হ্যায়, পয়লা আল্লাকা নাম লাও, ইসকা বাদ হালওয়া রুটি খিলাও। ইয়ে খানে কা লিয়ে কই পয়সা উইসা দেনে কা জরুরত নেহি।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Sep/10/1536567706425.jpg
কায়সারবাগে আদি কাঠের বাড়ি

ব্যাস্, মুফতে পয়লা দিন হালওয়া রুটি খিলানোর পর থেকে তাঁর সাথে আমাদের চাচা-ভাতিজার জানপহচান সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়। সেন্ট্রাল রেঙুনে আসলেই আমরা একবার করে কায়সারবাগে হাজিরা দিই। কিন্তু আজ কেন জানি কাকা-হুজুর নীরব হয়ে আছেন। হলেণ কায়সারবাগের দেয়ালে লটকানো একটি বড়সড় পিকচার ফ্রেমের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ফটোগ্রাফ আগে আমরা খেয়াল করে দেখিনি। ছবিতে বর্মী কেতায় চমৎকার একটি কাঠের বাড়ির নিচে বড়বড় হরফে ইংরেজিতে হাতে লেখা ‘কায়সারবাগ’। আমি কৌতূহলী হয়ে ছবিটি কিসের তা জানতে চাইলে তিনি দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে যা বলেন, তার সারমর্ম হচ্ছে—মন্দিরের মতো চূড়োওলা টালির ছাদের প্রান্তে কাঠের ঝালর লাগানো সুদর্শন এ বাড়িটি তাঁর পরদাদা তৈরি করিয়েছিলেন পারিবারিক বাসস্থান হিসাবে। ওখানে একান্নবর্তী পরিবারের তিন প্রজন্ম একসাথে বাস করত। বাড়িটির নিচ তলার হলঘরে তেতাল্লিশ বছর আগে কাকা-হুজুর চালু করেছিলেন টি-স্টল কাম রেস্তোরাঁ। বর্মায় গোপনভাবে পরিচালিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিছু মুসলমান ছেলেপিলে এ চা-খানায় এসে বসত। পুলিশ তাড়া করলে তিনি তাদের কায়সারবাগের ছাদের কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখতেন। বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশ তাঁর পিতামহের হাতে তৈরি কাঠের সুন্দর বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। আজকাল সে ধরনের বাড়ি আবার তৈরি করা খুবই মুশকিল। বর্মাটিক কাঠ বাজারে পাওয়া যায় না, অলঙ্কৃত ছাদ তৈরি করার হাতযশওলা করিগররাও বিগত হয়েছেন। এ রকমের একটি ঘর তৈরির রসদপত্রও দারুণভাবে এক্সপেনসিভ। কাকা-হুজুরের সে কিমত নেই। তাই তিনি সাদামাটা কাঠ ও টিন দিয়ে নতুন ঘর বানিয়ে আবার কায়সারবাগ রেস্তোরাঁটি চালু করেছেন। ঘটনা শুনে আমি ও হলেণ তাকে হামদর্দির সাথে সহানুভূতি জানাই। তিনি ম্লান হেসে—সব আল্লাতালার ইচ্ছা বলে তকী মীরের আরেকটি শের আবৃত্তি করে শোনান, “জফায়েঁ দেখ লিয়ে, বেবফাইয়া দেখি/ ভলা হুয়া কেহ্ তেরি সব বুরাইয়াঁ দেখি।” অর্থাৎ “প্রভু তোমার অসীম দয়ার সাথে আশা দিয়ে আশহত করার নির্মমতাও দেখলাম/ তোমার খারাপ দিকটা দেখতে পেয়ে কিন্তু ভালোই হলো।”

এ শের শুনে অবশেষে বিষণ্ণ মনে কাকা-হুজুরের কাছ থেকে বিদায় নিতে যাই। তিনি হাত নেড়ে বলেন, “বয়ঠো বাচ্চালোক, জেরা বয়ঠো, আভি আরেক দফা পরওয়াদেগার কি নাম লাও, ইস কা বাদ থোড়া আখনি খিলাও।

আপনার মতামত লিখুন :

সবিনয়ে গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি

সবিনয়ে  গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

যে বাতাস চেনে তোমার কার্বনশ্বাস

তোমার অমর্জিতে নামা সন্ধ্যারে পাশ কাটায়ে
আলিসার কোনায় গিয়া বসো
—ভর করা বাতাসে হেলান দিয়া।
করুণার মতো কইরা তাকাও
তবু যে পাখি ঘরে ফিরতাছে না ঠিক সময়ে—তার দিকে,
যেন কোনো নিদান নাই,
কোনো সময় তৈয়ার হয় নাই তখনও
অসময়ের ভেতর-বাহিরে,
এমন তো হরহামেশাই ঘটে বইলা চোখ ফিরাও নাই অ-দৃশ্যের থিকা,
যেন তারা থাকে এইসব দৃশ্যাবলিরে জড়ায়ে।
তুমি তবু অহেতুক পাখির মন ভাবো নিজেরে নিদারুণ নির্জনে।

কেমন কষ্ট!

এমন অনেক কিছু নিয়াই চলি প্রতিদিন, চলতে হয় তাই।
চাবি, মোবাইল, মানিব্যাগ, খুচরা কয়েন, গত মাসে ব্যাংকে ১০ ডলার জমা দেয়ার রসিদ,
ব্যবহৃত ডাকটিকেট, দেশলাই, সিগারেট, মেট্রোকার্ড,
চুইংগামের খোসা, বাজারের-ফর্দসহ বিবিধ আপঝাপ জিনিস থাকে হাতে পকেটে।
তার মাঝে যেইটা নিয়া চলতে সবচেয়ে কষ্ট হয় “তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট”
ওগো মা আমার—মাতৃভূমি—
তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট
এক পৃথিবীতে যত মানুষ থাকে তত পৃথিবী সমান।

অসুখ

এইসব নিয়া বইসা থাকতে থাকতে ক্লান্ত হইলে
নদীটা ডুবতে থাকে,
যেন—অনেক উঁচা থাইকা পালক খইসা পড়ে হেইলা দুইলা,
—যেন আলগোছে কেউ রাখল ঢেউ সিথানে, তেমন একটা পাতা
গন্ধকের মতো রটে
আলোকে সালোকে সংশ্লেষণে—
অথচ একটা সুর মরতে গেলে
পাখির দায় নিয়া ঘুমাইতে চায় সহজ উদ্ভিদ,
পাখনার পাশে মেলে ধরে—
পিঠে পিঠ বেয়ে উঠা জরাক্লান্ত স্বেদ, বাতাসের কনিকা,
একটা সবুজ অ্যাম্বুলেন্স ভর্তি চারা গাছের কংকাল,
আমাদের হীমবাহিত জলজ অসুখেরা
এবং
সবিনয়ে
গাছ নুয়ে
আসার স্মৃতি।

ঘনঘোর

মিল্কিওয়ে যখন তার একান্ত সূর্যদের নিয়া পৃথিবী সমেত পার হইতাছিল ছায়াপথ—
আমি তখন আরো ট্রিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ভিন্ন পৃথিবী হইতে
পৃথক কোনো উপগ্রহের ছায়ায় নিজেরে আরো একটু সরায়ে নিয়া তাকাইলাম—
দেখি দূর আরো দূর কোনো মহাকাশ স্টেশন,
যেখানে আমার যাইতে হবে,
যেন সেই স্টেশন ওত পাইতা থাকবে পৃথিবী—মিল্কিওয়ে যাওয়ার পথে।
সেই স্টেশনে থামলে পরে আমি উঠব পৃথিবীতে,
যেন ভ্রমণ করার ছলে দেইখা যাব আমার বিগত পৃথিবী,
যেখানে আমি ছিলাম, নাকি ছিলাম না?
কোনো কালে কি সেখানে থাকতে যাব আমি?
যাই হোক, এমন ভাবনা আমি ভাবতেই পারি কী ছিলাম কী ছিলাম না,
তাতে সেই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে থাইকা যাওয়ার বাসনা ঘোরে রূপ নিতে থাকলে—
আমি নাইমা আসব, স্টেশনে, যেন আমি স্টেশনের, যেন আমিই স্টেশন।
যেন একটা স্টেশন অপেক্ষা করে স্টেশনে অন্য একটা স্টেশনের।
আসলে আমরা সবাই এক একটা স্টেশনের অপেক্ষায় আছি।
পৃথিবী হইল সেই সব স্টেশনে যাইবার এক্সপ্রেস ট্রেইন,
বাসনার ঘোরে নাইমা গেলে অপেক্ষা অনন্তের।

আবাল প্রজা

এখন দেখো ভীষণ রৌদ্র, জ্বলো
এখন আষাঢ় ভাদ্র কিংবা ফাগুন
তোমার বুকে জ্বলছে করুণ আগুন
বাতাসে কি দারুণ ঘূর্ণি ধুলো।

এখন প্রজার নেইকো কিছু বলার
এখন প্রজা মুখ বুজে সব সয়
রাজ্যে এখন কম্পিউটিক শান্তি
বললে রাজা হাসতে সবার হয়।

রাজা বললে দিনটি হবে রাত
বললে সে তো তালগাছটিও তোমার
কিন্তু বেটার বুদ্ধি ভর্তি জামার
সেলাই করে প্রজার কঠিন হাত।

সেই হাতে নেই শাবল গাইতি কোনো
সেই হাত আজ করছে মালিশ তেল
আমরা সবাই মাতাল রকম ন্যাড়া
মাথার উপর ঝুলছে পাকা বেল।

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে
ছবি. লেখক

সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন না—“পুলিশ এলে ডরাই না আর, পালাই নে আর ভয়ে, আরশোলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।”—আমি কিন্তু তেমন নই। আরশোলা আর ফড়িংকে সয়ে নিলেও, পুলিশকে আমি ষোল আনা ডরাই। তাই কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক শহরের আব্দুররাহমানিভ স্ট্রিটে চলার সময়ে যখন দুজন পুলিশ দু দিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। তাদের সাথে আছেন সাদা পোশাকের আরো দুজন পুলিশ। আমাকে তারা এমনভাবে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন, চাইলেও সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে ভোঁ দৌড় দেবার কোনো উপায় নেই। মুখে তাই সরল একটা অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি নিয়ে তাদের জেরার অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। এ অঞ্চলে শুনেছি পুলিশ খুব একটা সততানিষ্ঠ নয়, তাই আমাকে পাকড়াও করে মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে কোনো পয়সা দাবি করে কিনা, সেরকম একটা সন্দেহও মনে উঁকি দেয়। তো সেই দলে থাকা একমাত্র নারীসদস্য আমার সমস্ত ভুল ভাঙিয়ে আশ্বস্ত করে জানালেন, তারা আসলে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিছুদিন হলো এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কাজ নেই তেমন। ট্যুরিস্ট যেমন কম, তার চেয়েও কম অপরাধের মাত্রা। ফলে ইনাদের একপ্রকার মাছি তাড়াবার অবস্থা। আমাকে দেখে এই দলটির আগ্রহ হয়েছে আমার কাছ থেকে দু চারটি কথা জানবার। এই যেমন কোথা থেকে এসেছি, কদিন থাকব, কেমন লাগছে বিশকেক, কোথায় কোথায় যাবার পরিকল্পনা আছে, এই সব আরকি। সবশেষে তাদের অভিলাষ হলো, আমার সাথে একটি ছবি তুলবেন। বেশ, তুলুন। ভেতরে ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছি ততক্ষণে। কোথায় ভেবেছিলাম উৎকোচ দাবি করা অসৎ পুলিশ, আর শেষে কিনা আবিষ্কার করলাম সদালাপী বন্ধুভাবাপন্ন ভিন্ন ধরনের পুলিশ, তাই অবাক আর উৎফুল্ল না হয়ে উপায় আছে?

আজ এখানে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া। ছেড়ে ছেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও এমনই ছিল। তবে বৃষ্টির তেজ ছিল আরো বেশি। তার মাঝেই এয়ারপোর্ট থেকে আসতে হয়েছে। সে-নিয়ে বেশ রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। বিশকেকের এয়ারপোর্ট মূল শহর থেকে বেশ দূরে, প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের পথ। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দু লেনের মন্থর পিচঢালা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিইনি। ভূতুড়ে জনমানবহীন সেই এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই দেখা পেয়েছিলাম ‘মারসুতকা’র, যেটি আদতে হলো ভাড়ায় খাটা মাইক্রোবাস। ভাড়া ট্যাক্সির দশ ভাগের এক ভাগ। যদিও যাত্রীবোঝাই হবার জন্যে অপেক্ষা করতে হলো বেশ খানিকটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির ভারি পর্দাকে উপেক্ষা করে জোরসে ওয়াইপার চালিয়ে শম্বুকগতিতে মারসুতকা ছুটে চলে। মিনিট পনের পথ আসার পর দেখি দু পাশটা প্রায়ান্ধকার। ঝুপ করেই যেন নেমে এসেছে বিদায়ীবেলার সন্ধ্যা। আর সামনের রাস্তায় এপাশের মাঠ উপচিয়ে তীব্র গতিতে জল ছুটে যাচ্ছে উল্টো দিকের মাঠের দিকে। এর মাঝ দিয়ে গাড়ি ছোটালে জলের স্রোতে কলার ভেলার মতো ভেসে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের ড্রাইভার বিশাল এক সিডার গাছের কোণে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা কিছুটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। ওখানেই আমরা আটকে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কিছুটা শঙ্কা জাগে, যদি বৃষ্টি আর না থামে? যদি জলের তোড় এসে পৌঁছায় এ গাড়ি অবধি, তাহলে? আশেপাশে গ্রামের কিছু চাষিবাড়ি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। এখানে বিপদে পড়লে সাহায্য করবার কেউ এগিয়ে আসবে কি?

বৃষ্টি থেমেছিল শেষ অবধি, সেই সাথে মন্থর হয়েছিল প্লাবনের তেজ। কিন্তু এতসব ডামাডোলে আমরা যখন আলাতু বাজারের কোণে এসে পৌঁছাই, ততক্ষণে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখান থেকে আমার হোটেল যে কোন দিকে, কিংবা কত দূরে, কিছুই ধারণা নেই আমার। কিছুটা ক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মাথার উপরের বুড়ো ওক গাছ থেকে টপ টপ করে ঝড়ে পড়ে বিকেলের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো। পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে হঠাৎ এক যুবক দাঁড়িয়ে যায়। আমার অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজ থেকেই বলে, ‘ট্যাক্সি খুঁজে দেব তোমায়?’ আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত কিছু টেপাটেপি করে জানায়, ‘মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই ট্যাক্সি এসে পড়বে। ততক্ষণ আমি তোমার সাথে আছি। আমি এখানকার টিভি স্টেশনে গ্রাফিক্সের কাজ করি। আজ আমার বিকেলের শিফটে কাজ ছিল। ফেরার সময়ে দূর থেকে দেখলাম, তুমি এখানে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তাই ভাবলাম, তোমার হয়তো কোনো সাহায্য প্রয়োজন।’ অজানা একটি দেশে এমন একজন অপরিচিত জনের কাছ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত পেয়ে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।

আলাতু স্কয়ারের কোণের দিকটায় টিউলিপের বাগান। সকালের বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে আছে আধবোজা টিউলিপের জঠরে। সেই সাথে আশেপাশে ফুটে আছে বেশকিছু ধবধবে সাদা ড্যাফোডিল। টিউলিপের বাগানের পেছনেই আইরিশ পাব। তবে সকালের দিক বিধায় পাবের দরজাটি বন্ধ। আর বাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘরের মতো দেখতে টিনের চালের লম্বা বারান্দা। বিশাল সেই চাতালে দুজন মাত্র মানুষ নানা আকারের পেইন্টিং এনে ঝুলিয়ে রাখছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেসব পেইন্টিংয়ের মাঝে লেনিন যেমন আছেন, তেমনি বেঁচে আছেন স্তালিনও। কিরঘিজ রমণীদের বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে। তবে তাদের অনেকটিতে শিল্পী নেত্রদানপর্ব সমাপ্ত করেননি। সেটি কোনো ধর্মীয় কারণে কি? এর আগে তাসখন্দে পরিচয় হওয়া একজন চিত্রশিল্পী তেমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখানে সেসব আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, যে দু যুবক ছবিগুলো চটের ছালা থেকে বের করে ঝুলিয়ে রাখার কাজ করছে, তাদেরকে মূল চিত্রকর বলে মনে হয় না। আর তাছাড়া ওরা মহাব্যস্ত। এই যে আমি খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছি, এর মাঝে কিন্তু একবারও তারা জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা কিনা। অতঃপর তাদেরকে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত রেখে আমি মূল স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705573218.jpg

কংক্রিটে ঢাকা বিশাল উন্মুক্ত সেই স্কয়ারটিকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে উঁচু বেদিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা এক বীর। এই বীর পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ ‘মানাস’-এ উল্লিখিত বীর। এই কিরঘিজ দেশটির নানা ক্ষেত্রে মানাস-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এদের এয়ারপোর্ট, এমনকি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার নামও মানাস। দূরদেশের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে কী করে বিজয়ীর বেশে ফিরেছিলেন সেই বীর, সেটি-ই কাব্যের ছন্দে শত শত বছর ধরে পঠিত হয়েছে ধূসর স্তেপের দেশ কিরঘিজস্তানে।

আজ উদ্দাম হাওয়াকে উপেক্ষা করে স্কয়ারের উন্মুক্ত স্থানটিতে বেশ কিছু লোকের সমাগম। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সামরিক বাহিনীর কসরত। তাদের দু দিকে ব্যান্ড দলের বাদ্যের তালে তালে নাচছে স্কুলের একদল কিশোর কিশোরী। কিশোরদের মাথায় ঐতিহ্যবাহী কিরঘিজ টুপি—কালপাক। তাদের কয়েক জনার হাতে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কমুজ। ত্রি-তার বিশিষ্ট কমুজ দেখতে অনেকটা গিটারের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট আর শীর্ণ। সেনা আর সেই স্কুলের কিশোর কিশোরীদের সাজ সাজ রব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনের কোনো এক দিনে হয়তো উৎসব পালনের ঘটা আছে। তাই প্রস্তুতি হিসেবেই এই মহড়া। আমি নিজেও হাওয়া উপেক্ষা করে কিছুক্ষণ শিশুদের মহড়া দেখি।

এই স্কয়ারটির পেছন দিকে একটি সবুজ উদ্যান। নাম—দুবভি পার্ক। সে উদ্যানের সমুখেই আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে সপ্রতাপে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। মধ্য এশিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র লেনিন-ভাস্কর্য। বাকিগুলোকে অনেক আগেই ধনতন্ত্রের আগমনের মধুলগ্নে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার এরা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি নিলেও বোধকরি অতীত স্মৃতিকে এক ঝটকায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পর অবধি লেনিন ভাস্কর্যটি স্কয়ারের সম্মুখ চত্বরেই ছিল। এই কিছু বছর আগে ওটিকে সরিয়ে এনে স্থান দেওয়া হয় ভবনের পেছন দিকে। লেনিনের প্রতি মানুষের মায়ামোহ এখনো যে কিছুটা টিকে আছে, তার আরেক প্রমাণ হলো—ভাস্কর্যের বেদিতে পড়ে থাকা গোলাপ আর টিউলিপের ম্লান গুচ্ছ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705392582.jpg

লেনিন ভাস্কর্যের উল্টোদিকের সেই পার্কটির একটি বেঞ্চে গিয়ে বসি। বাঁ ধারে কিরঘিজ নারীর প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্য। মধ্যবয়েসি এক নারী। মাথায় হেঁসেলের পাতিলের মতো দেখতে প্রথাগত মেয়েলি কিরঘিজ টুপি—এলিশেক। প্রায় দশ হাত দীর্ঘ সূতি কাপড় পাগড়ির মতো করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় এ টুপি। তবে বিশাল সাইজের এই কেশাচ্ছাদনকারী পরে হাঁটতে এযাবত কোনো নারীকে এ শহরে দেখিনি। হয়তো গাঁ গ্রামে এখনো এর কিছু চল থাকতে পারে। তবে পাথরের বেদির উপর সেই স্মিতহাস্যময়ী নারীর ভাস্কর্যটি দেখে আমার হঠাৎ জমিলার কথা মনে হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক চিঙ্গিস আইৎমাতভ সৃষ্ট অমর চরিত্র—জমিলা। বলা চলে, জমিলার গল্পের মাধ্যমেই এই কিরঘিজ দেশটির সাথে আমার পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জমিলার স্বামী মায়ের কাছে বৌকে রেখে ফ্রন্টে যায়। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত জমিলার সঙ্গী হয়ে থাকে বালক বয়সের দেবর। এর মাঝেই গ্রামের সমবায় ফার্মে কাজের জন্যে ডাক পড়ে তার। গ্রামের পুরুষরা যেহেতু সবাই যুদ্ধে, তাই সমর্থ নারীরা শস্যভাণ্ডার না সামলালে ফ্রন্টের সৈনিকদের মুখে খাবার জুটবে কী করে? জমিলা কাজে যোগ দেয়, সাথে বন্ধুর মতো লেগে থাকে সেই দেবরটি। এর মাঝেই সেখানে উদয় হয় জমিলার সমবয়েসী আরেক যুবক। জমিলা আর সেই যুবক দুজনেই একে অপরের প্রতি নৈকট্য অনুভব করে। আর সেভাবেই কাহিনী গড়ায়। ছোট গল্প। কিন্তু কী গভীর তার আকুতি! কিরঘিজ গ্রামীণ সমাজের সেই সময়কার চিত্রকে যেন জমিলার জীবনের কাহিনীর মধ্যদিয়েই আইৎমাতভ উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। আমি সেই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে ভাবি—তুমিই কি তবে গিরিপথ পেরিয়ে গ্রাম ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে দূর দেশে পালিয়ে যাওয়া সেই জমিলা?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705311264.jpg

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা অব্যাহত থাকায় চায়ের তেষ্টা জেগে ওঠে। আমি রাস্তা পেরিয়ে স্কয়ারের উল্টোদিকে যাই। ওদিকটাতে বেশ কিছু ক্যাফে-বেকারির দোকান আছে। বলা চলে, এ রাস্তাই শহরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। খুব বেশি দূর হাঁটতে হয় না। অল্প দূরেই লোহার দরজা ঘেরা মেট্রো পাব নজরে আসে। সেটির বাইরে চক বোর্ডে লেখা—‘তুমি+আমি+কফি= আনন্দ’। যদিও আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি আছি, কফিও হয়তো থাকবে, কিন্তু কোনো ‘তুমি’ নেই। তাই আনন্দের সঙ্কুলান হবে কিনা, জানি না। তবুও অনন্যোপায় না থাকায় সেই দশাতেই ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরটা গুমোট অন্ধকার। বাইরের দরজার সাথে মিল রেখেই চারধারে ছড়ানো লোহার টেবিল চেয়ার। সড়কের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ঘোলাটে কাচে ঢাকা। দেয়ালে টানানো নোটিশ বোর্ডে লেখা—টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। কোণের দিকটিতে বার। তবে সেটি বোধ করি জমজমাট হয়ে ওঠে আঁধার নামার পর। এই ভর দুপুরবেলায় কেই-বা এখানে মদ গিলতে আসবে? ওয়াটার এগিয়ে এলে আমি চায়ের অর্ডার করে পাশের টেবিলের দিকে তাকাই। সেখানে মাঝবয়েসী দু মার্কিন ভদ্রলোক আলাপ করছেন। নিচুস্বরে কথা বলায় তাদের আলাপন আমি ডিকোড করতে পারি না। ভাবতে থাকি এরা কি কোনো কনট্রাক্টর? একথা ভাবছি, কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে না হলেও কয়েক বছর আগ অবধি এই বিশকেক শহরটিতে আনগোনা ছিল বিপুল সংখ্যক মার্কিনীর। নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হলে তারা কিরঘিজস্তানের মানাস এয়ারপোর্টে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বানাবার জন্যে জায়গা চেয়ে বসে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকা কিরগিজস্তানের পক্ষে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে বিমান বাহিনীর লোক, তাদেরকে কেন্দ্র করে সাপ্লায়ার কোম্পানি ইত্যাদি নানা সংস্থার কাজ করা বিপুলসংখ্যক লোকেদের মচমচে পয়সায় গড়ে ওঠে এ এলাকার হোটেল, ডিস্ক, পাব, আর ক্যাফেগুলো। তবে কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নয়া কিরঘিজ সরকারের চাপে মার্কিন বিমান বাহিনী এখানকার ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিদেয় নিলে মাথায় হাত পড়ে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের। তারা সরকারের কাছে আর্জি জানায়—ফিরিয়ে আনুন আবার সেই মার্কিনীদের। নয়তো আমরা চলব কী করে? তাদের এই উদ্বিগ্নতার হেতুটা আমি বুঝি। এ পর্যন্ত বিশকেক শহরের নানা পথে হেঁটে যতদূর বুঝেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরুবার পর এখানকার নতুন কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। বিদ্যুৎচালিত যে সরকারি বাসগুলো রাস্তায় চলছে সেগুলো রঙচটা, লক্কড়-ঝক্কর মার্কা। রাস্তায় এখানে-ওখানে খানাখন্দ। রাজধানীর পাড়াগুলো শ্রীহীন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা উষর, চাষাবাদ-অনুপযোগী। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে একটি ছোট সোনার খনি। ভারি শিল্প নেই বললেই চলে। সে কারণেই দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ছুটে যায় রাশিয়ায়। অর্থনীতির এমন একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় মার্কিন ঘাঁটির প্রস্থানে তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিচলিত না হয়ে পারেনি। তবে ঘাঁটিটি গুটিয়ে নিলেও সব কর্মকাণ্ড হয়তো পুরোপুরি বিদেয় নেয়নি। কিছু কনট্রাক্টর, কিছু ফড়ে দালাল হয়তো এখনো রয়ে গেছে। অদূরের টেবিলে ভুঁড়ি ঠেকিয়ে বসা সেই দুই মার্কিনী তেমন কেউ কিনা কে জানে!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563704741206.jpg

ওয়েটার চা এনে রেখে যায়। চায়ের প্লেটে দুধবিহীন লিকার চায়ের পাশে রাখা থাকে মুসুম্বির কয়েকটি টুকরো। আমি সেই টুকরো দুটোকে চায়ে ভাসিয়ে দিই। সেই সাথে ভাবতে থাকি—দুপুরের খাবারটা সারা যায় কোথায়? খাবার নিয়ে এ অঞ্চলে বেশ হুজ্জতে পড়েছি। ইংরেজি জানা লোক এখানে নেই বললেই চলে। সবজি চাইলে এনে দেয় মাংস, আর মাংস চাইলে এনে দেয় সবজি। যেটা বুঝলাম, নিজের ইচ্ছেমতো খাবার চাইলে এ দেশে আসবার আগে টুকিটাকি রুশ শিখে আসাটা বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, এরা কিন্তু এখনো রুশ ভাষাকেই ধরে রেখেছে। আর এদের বর্ণমালাও সিরিলিক বর্ণমালা।

কফি পান শেষে আমি এগলি-ওগলি হেঁটে হায়াত রিজেন্সি হোটেলটা খুঁজতে থাকি। না, এ গরিব বান্দার সেখানে ওঠবার মতো সামর্থ্য নেই। আমি আসলে ওটি খুঁজছি, কারণ এর ঠিক পেছনেই নাকি কিরঘিজ জাতীয় নাট্যশালা। সেখানে যাবার কারণ আছে। সকালে হোটেলের খাবার ঘরে প্রাতরাশ সারার পর বেরিয়ে আসার সময়ে শুনছিলাম ম্যানেজার মেয়েটি কাকে যেন বলছে—আজ এখানে বিরাট অপেরা কনসার্ট হবার কথা। ভিয়েনা থেকে এদ্রিয়ান আর হাইদেমারিয়া নামক দুজন স্বনামধন্য শিল্পী আসবেন। সাথে থাকবে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রীদের একটি দল। তারা বাজাবেন—পিয়ানো, চেলো, ভায়োলিন আর বাস। অপেরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় গানের সুরের সাথে কোনো একটি অভিনয়ও মঞ্চস্থ করেন। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্যের মতো। তবে ভিয়েনা থেকে আসা অপেরা শিল্পীরা কেবলই গাইবেন, অভিনয়ে অংশ নেবেন না। এর আগে ভিয়েনায় গিয়ে পথেঘাটে এই অপেরা কনসার্টের টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি। সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকেট বেচা দালালদের মতোই ওখানকার থিয়েটারগুলোর আশেপাশের রাস্তায় আছে বেশ কিছু টিকেটবিক্রেতা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে তাদের অনেকের পরনে পুরনো আমলের ঝলমলে পোশাক। এমন কয়েকজনের কাছে টিকেটের মূল্য শুনে আমার একেবারে অক্কা পাবার দশা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ ইউরোর নিচে ভালো কোনো টিকেটই নেই। তাই অপেরা কনসার্টের তীর্থস্থল ভিয়েনায় অবস্থানকালে সেটির সুধা আস্বাদন আর সম্ভব হয়নি। তবে সেখানকার শিল্পীরা এখানে এসে অনুষ্ঠান করায় আমি অনুমান করি—টিকেটের মূল্য হয়তো তেমন একটা আকাশচুম্বী হবে না। ম্যানেজার মেয়েটিকে কোথা থেকে টিকেট কাটা যায়, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সে কিছুটা তাগিদের কণ্ঠে জানায়, “আজ রাতের এই শো যদি ধরতে চাও, তাহলে তোমাকে দুপুরের মধ্যে গিয়ে টিকেট কেটে আসতেই হবে। শোয়ের ঠিক আগে ওখানে টিকেট পাবে না।” মেয়েটির সেই কথাকে আমলে নিয়েই আমার এই নাট্যশালা খুঁজতে পথে নামা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705117000.jpg

গথিক স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল সেই নাট্যশালাটি দু গলি পরেই পেয়ে যাই। চূড়োতে এখনো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাওয়া তারাটি দেখেই বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি সোভিয়েত সময়ের অবদান। সামনের বারান্দায় উঠে দেখি, সেখানে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে ভেতরের প্যাসেজে জ্বলতে থাকা ঝাড়বাতির আলোকছটা। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে ভেতরে যাবার মুখে কাঠের ভারি দরজাটির হাতলে চাপ দিই। কিন্তু সেটি আমার প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। আমি বুঝে যাই, সন্ধ্যের আগে এই দোর খুলবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে টিকেট পাব কোথায়? নাকি এতটা পথ এসে আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হবে? সেই সময়ে খেয়াল করি, বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে দু পাল্লার জানালা। একটি পাল্লা খোলা, অপরটি বন্ধ। মুখে হাসি ফুটে ওঠে আমার, টিকেটের একটা বন্দোবস্ত হয়তো হয়ে গেল।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র