Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

হারুকি মুরাকামির বক্তৃতা

হারুকি মুরাকামির বক্তৃতা
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
অনুবাদ | এমদাদ রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাতাস যেখানে গান গায়’ নামে মুরাকামি তার প্রথম উপন্যাসটি লিখেছিলেন ’৭৯ সালে, তারপর টানা ৩ দশক মানুষের মনোজগতকে তিনি আশ্চর্য দক্ষতায় পর্যবেক্ষণ করেছেন। শুধু জাপান নয়, মুরাকামি বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম। বিশ্বের কয়েক কোটি পাঠক তার লেখা পড়েন। ইতোমধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার বইগুলি। পাঠককে অদ্ভুত ও পরাবাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চান এই পোস্ট মডার্ন লেখক। ২০০৫-এ বেরিয়েছে তার বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘কাফকা অন দ্য শোর’। মুরাকামি টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়, যদিও তার পড়ার বিষয় ছিল নাটক। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় সঙ্গীত নিয়ে সেজি ওযাওয়া’র সঙ্গে আলাপচারিতার বই ‘অ্যাবসোলিউটলি অন মিউজিক’।

জে. ডি স্যালিঙ্গারের ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’, এফ. স্কট ফিটজিরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’ বই দুটি তিনি অনুবাদ করেছেন। ফিটজিরাল্ডের উপন্যাসটিকে তিনি তার লেখক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই বলেছেন। লেখালেখির শ্রমসাধ্য দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে তিনি ভিডিও গেমস প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, লিখতে বসে কখনো মনে হয় ভিডিও গেম ডিজাইন করছি। আমিই প্রোগ্রামার, আমিই প্লেয়ার। এক বিচ্ছিন্ন খেলোয়াড়। দৌড়বিদ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। ২০০৮-এর জুনে দ্য নিউইয়র্কারে মুরাকামি’র ‘দৌড়বিদ উপন্যাসিক’ লেখাটি প্রকাশিত হয়, একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনস্মৃতি ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’।

মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ সালে, জাপানের কিয়োটোয়। তিনি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, সাংবাদিক। ‘ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স’, ‘আফটার দ্য কোয়েক’, ‘দ্য স্ট্রেঞ্জ লাইব্রেরি’, ‘ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইম্যান’, ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’, ‘নরওয়েজিয়ান উড’, ‘দি উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’, ‘কাফকা অন দ্য শোর’, ‘স্পুটনিক সুইটহার্ট’, ‘ওয়ানকিউএইটফোর’ ইত্যাদি তাঁর অন্যতম সৃষ্টি।

‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ উপন্যাসটি লেখার শৈলি নিয়ে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি ইনস্টিটিউটে তিনি একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ১৯৯২-এ। ‘হারুকি মুরাকামি এন্ড দ্য মিউজিক অব ওয়ার্ডস’ বইয়ে জে. রুবিন এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন, সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ নিয়ে গদ্য লিখেছেন ঔপন্যাসিক লাওরি পেই, তার ব্লগ ‘অন দ্য ওয়ে টু রাইটিং’-এ।

***
‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ যেভাবে  লিখেছি, লিখতে লিখতে অনুভব করছিলাম এর গল্পটি ‘মোনোগাতারি’, মুখে মুখে কথিত হয়েছে, আমি কিছু সৃষ্টি করিনি; আবার এই গল্পটি এমন কিছু যেন তাকে আপনি নিজের ভেতর থেকে বের করছেন। গল্পটি আপনার ভেতরেই আছে। আপনি তাকে গড়বেন, তাকে বের করে আনবেন। আমার কাছে শেষ পর্যন্ত যে ব্যাপারটি সত্য, তা হলো গল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা। আমার ক্ষেত্রে, গল্প হচ্ছে একটি চলন্ত গাড়ি, যে গাড়ি তার পাঠককে কোথাও না কোথাও নিয়ে যায়। যাত্রাপথেই আপনার যা কিছু বলার বলবেন, পাঠকের সংবেদনে যতটুকু কম্পন তোলার তুলবেন, অনুভূতিকে তীব্র করবেন, কিন্তু প্রথমেই যা করতে হবে, তা হচ্ছে পাঠককে গাড়িতে তুলতে হবে, তারপর গল্পটি এমনভাবে বলে যেতে হবে যাতে পাঠককে বিশ্বাস করানোর ক্ষমতাটি আপনার থাকে। এ শর্ত গল্পটিকে অবশ্যই পূরণ করতে হবে।

আমি যখন ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ লেখা শুরু করি তখন আমার কাছে আগে থেকে ভেবে রাখা কোনো আইডিয়া ছিল না। প্রথম অধ্যায়টি টানা লিখে গেছি। এমনকি তখনও আমার ধারণা ছিল না কিভাবে আর কোন জায়গা থেকে গল্পটি শুরু করব! নির্ভার নিরুদ্বেগে লিখতে থাকলাম। শুধু এই অনুভূতিটি হতে থাকল যে গল্পটি আমার ভেতর কোথাও আছে, আমি সেটা জানি; ধীরে ধীরে গল্পটি খাড়া হচ্ছে, নিজের ভেতরে আমি তার রূপটা দেখতে পাচ্ছি। তখন আমি ভূগর্ভস্থ ধাতু সন্ধানকারী যন্ত্রের সেই অলৌকিক দণ্ড যে কাদামাটির ভেতর অনুসন্ধান করছে। আমি অনুভবে জানতাম কোথায় সেই কাদামাটি, জানতাম বলেই খনন শুরু করতে পেরেছিলাম। 

‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ উপন্যাসটির নির্মাণ কাঠামো [স্ট্রাকচার] চ্যান্ডলারের গোয়েন্দা কাহিনীগুলির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। চ্যান্ডলারের বইগুলির আমি এক উন্মুখ পাঠক, তার কয়েকটি বই বারবার পড়েছি। আমি আমার নতুন উপন্যাসে তার ‘প্লট স্ট্রাকচার’কে ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম উপন্যাসের মুখ্যচরিত্রটি হবেন শহরের বসবাসকারী এক নিঃসঙ্গ ব্যক্তি যিনি কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। খুঁজে বেড়ানোর পুরোটা সময় তিনি বিভিন্ন ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে পড়বেন। অবশেষে তিনি যখন তার আরাধ্য জিনিসটিকে খুঁজে পাবেন, ইতোমধ্যে তা হয় ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটা স্পষ্টতই চ্যান্ডলারের নিজস্ব পদ্ধতি, একেই আমি ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’-এ ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম।

‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’-কে, আমি যা-ই বলি না কেন, কখনো রহস্যোপন্যাস হিসেবে লিখতে চেষ্টা করিনি। এসব উপন্যাসে হয় কী—একটি রহস্য থাকবে, সমগ্র উপন্যাস জুড়ে চলবে সেই রহস্যের সুলুকসন্ধান, উন্মোচনের খুঁটিনাটি, কিন্তু আমি তো কোনোকিছুর সমাধানের চেষ্টা করছি না। আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা হচ্ছে রহস্যময়তার জন্ম দেওয়া। রহস্য থাকবে অমীমাংসিত। উপন্যাসে ‘শিপ ম্যান’ চরিত্রটি সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে চাইনি, সেই মেষটি সম্পর্কেও কিছু প্রকাশ করতে চাইনি যার পেছন দিকে আছে একটি তারা; কিংবা ‘র‌্যাট’ চরিত্রটির ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল সে সম্পর্কেও আমি নিশ্চুপ। আমি রহস্যোপন্যাসের কাঠামোকে ব্যবহার করেছি কিন্তু তাতে ভরে দিয়েছি অপরিচিত মালমসলা। এর বেশি বলতে হলে বলব—এই উপন্যাসের গঠন কাঠামোটি এমন যেন এক কলের গাড়ির ইঞ্জিন।

প্রথম কয়েক অধ্যায়ে আমি আমার আরাধ্য পথটিকে খুঁজেছি, অন্ধের মতো, কিন্তু তখনও আমি অনিশ্চিত গল্প কোথায় যাচ্ছে, কিভাবে নির্মিত হচ্ছে ভেবে; বিপুল অন্ধকারে ডুবে থাকা পথটিকে শুধু অনুভব করছি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। কখন আর কোথায় মেষদলের গল্পের সঙ্গে উপন্যাসের অন্য গল্পটি পরস্পরকে একত্রে জড়িয়ে নেবে, ছেদ করবে তারপর আবারও এগিয়ে যাবে? ভাবছি ভাবছি, হঠাৎ অজানা কিছু একটা ক্লিক করল, নিকষ কালো অন্ধকারের সামনে দীপ্তিময় কিছু দেখা যাচ্ছে যেন! তার মানে—আলো আছে! আর আলো এখানেই ছিল। কেউ যেন আমাকে বলে দিচ্ছে এদিকে নয়, ওদিকে যাও, হ্যাঁ, এবার বাঁক নাও...এবার আমাকে দেখে দেখে পা ফেলতে হবে, পদক্ষেপে যেন ভুল না হয়, যেন অসাবধানতায় হোঁচট না খাই, ভুলে যেন গর্তে না পড়ি।

লেখালেখির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। গল্পটি বলার শক্তি, জলের বুকে তীব্র আলোড়ন আর পাজলের এলোমেলো টুকরোগুলিকে একসঙ্গে জুড়ে দেবার তীক্ষ্ণতা আপনার থাকতে হবে। এই আস্থা ছাড়া আপনি এক লাইনও এগোতে পারবেন না। লেখালেখি ব্যাপারটা মুষ্টিযুদ্ধের মতো। একবার যদি রিঙের মধ্যে ঢুকে পড়েন তাহলে আর ফিরতে পারবেন না, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে লড়ে যেতে হবে।

উপন্যাসগুলো আমি এভাবেই লিখি আর সেই ঠিক এভাবে লিখিত উপন্যাসগুলোই পড়তে পছন্দ করি। আমার কাছে স্বতঃস্ফূর্ততাই সব।

[নোট : ‘মোনোগাতারি’ জাপানি সাহিত্যের একটি বিশেষ ফর্ম। যেসব উপাখ্যান মহাকাব্যের সাথে তুলনীয়, গল্প বলার ‘ওরাল ট্র্যাডিশন’, বিশেষত ঐতিহাসিক ঘটনাবলী পুনঃকথনকে ‘মোনোগাতারি’ বলে।]

আপনার মতামত লিখুন :

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও কল্পনা
বাংলায় ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

দক্ষিণ এশিয়ার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস কতটুকু রচিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় মাঝেমধ্যে। কবির কল্পনা না প্রকৃত ইতিহাস সত্য, এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না।

কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ ইতিহাস জেনেছে গল্প, উপন্যাস, নাটকে। শাহজাহান, সিরাজদ্দৌলা, মীর কাসিম সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস মানুষ যত কম জানে, তারচেয়ে ঢের বেশি জানে নাটকের আবেগাপ্লুত সংলাপ। ঐতিহাসিক সত্য চাপা পড়ে সাহিত্যিক কৃতকৌশল ও কল্পনার স্তূপের তলে।

ফলে সৃজনে অগ্রাধিকার কার? কবি যা রচিবে তাই কি সত্য? নাকি স্রষ্টাকে ইতিহাসের সত্যের কাছে নতজানু হতেই হবে? এসব প্রশ্ন বারবার গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস প্রসঙ্গে।

দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, ঔপনিবেশিক বাংলায় পণ্ডিত সমাজের চিন্তা-চেতনার আবহে এসব প্রশ্ন খুব বড় হয়ে উঠেছিল। বিশেষত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত নাটকগুলোকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটেছিল।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন ঐতিহাসিক নাটকের আদিগুরু। তিনি নিজেকে মনে করতেন, ইতিহাসের সত্য-প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ সাধক। এ বক্তব্যের দৃষ্টান্তও তিনি রেখেছেন। সিরাজদ্দৌলা (১৩০৪ বঙ্গাব্দ) ও মীর কাসিম (১৩১২ ব.) বই দুটিতে তিনি তথ্যের ভিত্তিতে এই দুই নবাব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিতে সচেষ্ট হন।

ইংরেজগণ এই দুই দেশপ্রেমিক নায়কের প্রতি যে মিথ্যাচার ও কলঙ্কলেপন করেছিলেন, অক্ষয়কুমার সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে গবেষকের নিবিষ্টতায় প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করেন। তবে তিনি ইতিহাস রচনা করেননি, নাটক লিখেছিলেন। এবং সাহিত্যে ঐতিহাসিক সত্যের সন্নিকটে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি, সমকালীন সাহিত্যিকদেরকেও সত্যানুসন্ধানী হতে প্রণোদিত করেছিলেন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র, মীর কাসিম ও তকি খাঁর চরিত্রচিত্রণে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছেন বলে তীব্র ভাষায় অভিযোগ করতেও দ্বিধা করেননি অক্ষয়কুমার। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় যে বিতণ্ডা শুরু হয়, তাতে রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমারের সমর্থনে কলম ধরেন।

তবে কৌশলী রবীন্দ্রনাথ এ কথাও বলেন যে, “ইতিহাসের রসটুকুর প্রতিই ঔপন্যাসিকের লোভ, তার সত্যের প্রতি তাঁর কোনো খাতির নেই।”

রবীন্দ্রনাথের এ কথায় ঔপন্যাসিক কল্পনার অধিকার পেলেও ‘ইতিহাসের মূল রসটুকু’ বা নির্যাস এড়িয়ে যাওয়ার এখতিয়ার পান না। এটাই মোটামুটি মানদণ্ড হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ইতিহাসের নির্যাসটুকু নিয়ে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করা যেতে পারে। তবে সেটা সাহিত্য নামেই চিহ্নিত ও ব্যক্ত হতে হবে, ইতিহাস নামে নয়।

অক্ষয়কুমারের যুগ পেরিয়ে শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও ইতিহাস ও সাহিত্যের মিশ্রণ থেমে থাকেনি। বরং আরো বেড়েছে। অতি সাম্প্রতিক লেখকদের কথা উহ্য রেখে একটু পুরনো হিসেবে দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। তার ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ ইত্যাদি উপন্যাস মানুষকে আলোড়িত করেছে। বই আকারে বের হওয়ার আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় লেখাগুলোর তথ্য ও সত্যাসত্য নিয়ে এন্তার চিঠি ও ভিন্নমত ছাপা হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563451116521.jpg

একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমরা এত পরিশ্রম করে, কত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে ইতিহাস রচনা করি। কিন্তু মানুষ সেগুলো খুব একটা পড়ে না। ইতিহাসের বই জনপ্রিয় হয় না। আর আপনি ইতিহাসকে উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে এত জনপ্রিয় হলেন কেমন করে?’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাসের মূল গল্পটি শুনতে চায়। আমি আমার মতো করে গল্পটি বলি।’

মানুষ যত দিন ইতিহাসের মধ্যে শুধু গল্পটি শুনতে চাইবে, ততদিন ইতিহাসের নির্জলা সত্যটি তার কাছে আসতে পারবে না। ইতিহাস আর কল্পনার মাখামাখি চলতেই থাকবে। এটাই সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক অদৃষ্ট বা হিস্টরিকাল ফেট!

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

আরো হাঁস

এইরূপ কান্দে কন্যা নিরালা বসিয়া
হাঁসের লাগিয়া কন্যা ধুড়িল শহর

কান আশে হইছে বিয়া স্বপ্নের ভিতর
ঘটকালি করে আপন মামতো ভাই

হাঁসের সহিত হইল বিয়া স্থায়ী ঘর
কারা পানখিলি খাইয়া গপ মারে তাই

সজিনার তলে বসি কান্দিল তামাম
এর কিবা মানে শুন কান খাড়া করি
চিক চিক করে মনে এ বিয়ার জরি।

হেমন্তের হাঁস

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।

আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।

আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর।

হাঁসের জলেরা

হাঁসের পায়ের জল
শুকায়, তাই তারা ফের জলে নামে।
একটা কথা আমি ভুলি যাই
হাঁসের কোনো ইচ্ছা নাই।
হাঁসের জলে আমি ভাসি
হাঁসের পায়ের জলে
আমি মুখ ধুইছি,
আমার নিজের মুখ কেন মোর যেনতেন মোকাম ন রে!
আমার চোখে এই ফেরেবি জল ধরা দেয়
যেন বখিল আমি তার কিছু নির্ভরতাময় তর্জমা করি!
দাদি যেই ছাড়ে হাঁস
তারা আমার মরা দাদির জইফ হাঁস!
স্বপ্ন তারা আমার নিকট
তাদের নিকট
আমি তেমন বাস্তব ন রে!

এই বাড়িতে

দেয়ালের পর কাঠবিড়ালির দৌড় দেখি
যেন রইদ নাকফুল হয়,
তারপর সারা সকালটা গড়ায় দেয়াল ধরি,
একটা দোয়েল ডিম জারি হইলে
অনেক দোয়েল চিল্লায়ে ধরে বা গান,
একদিন আসে আসে করি শেষে আসে,
তারার মতন গোল চোখ ঘুঘু তার
চোখের বর্ডার আলতার রঙ পাছে
পায়ের রঙের সাথে মিশিবার চায়,
এ বাড়িতে আসি যেই হাঁসগুলি দুলি দুলি ও বাড়ি ত যায়,
ওদের ঘ্রাণের ভিতর ঘুরি ঘুরি থামি,
বাতাস হবেনে আসল শরিক
আডিয়াকলার ঝাড়ের নিকটে আসি,
আমি শুনি জলের মর্মর কলপাড়ে তড়পায়,
তারে ঢাকিবার আরো মিহি ধ্বনি আছে
এ বাড়ির অনেক অ-বাক কণ্ঠস্বর আছে!


প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
(কবি আল মাহমুদকে)

ভাইয়ের ডাক শুনি উঠি রাতদুপারে স্বপ্নের ভিতর। যেন
বাতাসের ডাক শুনি ঢেউ উঠে তৎপর।
দেখি আব্বা আগেই উঠছেন, নিজ হাতে আতাফল, গাছপাকা তরমুজ
পরম আদরে ছেনি দিই কাটি কাটি ফালি ফালি করি খাওয়াইতেছেন,
খা, আহারে কতদিন খাস নাই!
আম্মা তজবিহ হাতে এক হাতে ভাইরে বাতাস করতেছে, আয়েশা ফুল তোলা
একটা রুমাল দিই কইলো, এইটা দিয়া মুখ মুইছো, মাথা মুইছো, চোখের কান্দন মুইছো না গো ভাই!
অথচ ভাই মারা গেছে তার চল্লিশাও পার হয় নাই। উনি কবরতে উঠি আসছেন, উনার চোখ দুইটা
তারার নিভু নিভু, এট্টু সর্দি লাগছে ক্যাল, ভাই হাঁকি কইলো, বকনা বাছুরটারে খ্যাতের আইলে
বান্ধিলি অইডা তো দড়ি ছিড়ি সব পাকাধান সাবাড় করবেনে!
আম্মা কান্দে আর ইশারা করে, ঠোঁট টিপে আঙুলে, কন, একদম চুপ!
ভাই যে মারা গেল শুক্রবার, ভাই নিজেই জানে না!
তাই আমাদের সংসারে কাঁঠাল পাতার নারকেল ছায়ার লোভে
পড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে আইস্যে আগের মতো ধমক দিতেছে আমাদের সংসারে
জায়গা মতো, আব্বা কইলেন, খবরদার তোরা চুপ থাক,
ও যেন না জানে পাছে, ও মরি গেছে, পাছে বেচারা কষ্ট পাবে!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র