Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেসার্স গঘ ব্রাদার্স

মেসার্স গঘ ব্রাদার্স
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
শফিকুল কবীর চনদন


  • Font increase
  • Font Decrease

‘তুমি ছাড়া সত্যিই আমার কোনো বন্ধু নেই, এবং অসুস্থ হলেও তুমি সর্বদাই আমার ভাবনা জুড়ে থাকো।’১

কী ছিল ভ্যান গঘের অনুপ্রেরণা? কিভাবে তিনি আধুনিক চিত্রশিল্পী হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন? কারা তাঁর এই যাত্রার সহযোগী ছিলেন? তিনি তাঁর বহুবিধ সীমাবদ্ধতাকে কিভাবে অতিক্রম করেছিলেন? তিনি কি ভাগ্যবান প্রেমিক বা চিত্রশিল্পী ছিলেন? এমনই নানাবিধ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ভিনসেন্টের এই নাতিদীর্ঘ জীবনজুড়ে খানাতল্লাশী দেওয়া যায়।

বিশ্ব-শিল্পের ইতিহাসে সবচে দৃঢ় ভ্রাতৃত্ব ‘ভ্যান গঘ ভাই’। একদিকে এক ছাদের নিচে ভ্ৰাতৃদ্বয়ের বসবাস যখন বিরক্তির চরমে তখনও বড়ভাই ভিনসেন্টের অনুপস্থিতি থিও’র কাছে অকার্যকর ও অসম্পূর্ণ যাপন হয়ে উঠেছিল। অবিচল পত্রালাপ আমাদের দেখিয়ে দেয়, তাঁরা শারীরিক সংস্থানে পৃথক হলেও সর্বদাই তাঁদের জীবনের জমা খরচের হিসাব নম্বর যেন যৌথই ছিল।

‘পরস্পরের কাছে আমাদের একনাগাড়ে চিঠি লিখে যেতে হবে।’২

থিও ছিলেন ভিনসেন্টের সর্বশ্রেষ্ঠ সমর্থক। উভয় ভাইয়েরই ছিল অস্থির জীবনযাপন। তাঁদের সম্পর্কের পরতে পরতে দৃষ্টি দিলে যে কারো চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতে বাধ্য। তা আনন্দ বেদনার এক সমূহ তাৎপর্যে। সর্বকালের অন্যতম সেরা চিত্রকর হয়েও তিনি ছিলেন উদ্বেগাকুল ও বিষণ্ণ। তার সময়ে অনালোচিত। প্রথাগত প্রজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করেই তারা যে লড়েছিলেন সেসব নির্যাস নিয়েই একটি অভিসন্দর্ভ হয়ে ওঠে। থিও ভাইদ্বয়ের গল্প ছাড়া যা অসম্পূর্ণ।

এক ‘গঘ’ ঋণদাতা আরেক ‘গঘ’ ঋণ গ্রহীতা। একজন চিত্রকলা ব্যবসায়ী আরেকজন চিত্রকর্ম নির্মাতা। কেনা বেচার হিসাব মাথায় রেখেই যত আগাম দেনা পাওনা ‘গঘ ব্রাদার্সের’। যদি এই ব্যবসায় লক্ষ্মী হতো তাহলে গোপীল এন্ড কোং গঘ ব্রাদার্সে রূপ নিতে পারত! তবে এই ‘মেসার্স গঘ ব্রাদার্স’ তাদের অব্যবসায়িকতার শিল্পঋণ দিয়ে অনাগত ভবিষ্যত্বের জন্য দুনিয়াকে যে ঋণে আবদ্ধ করেছেন তা বলাই বাহুল্য।

সম্প্রতি এক গবেষণার হিসাবে দেখা যায় অনুজ ভ্রাতঃ থিও তাঁর জীবদ্দশায় আনুমানিক ১৮০০০ ডলার ভিনসেন্টের জন্য অকাতরে খরচ করেছেন। যার পুরোটাই সহায়তার মোড়কে। অসাধারণ তাই না? আমরা যদি আজকের মুদ্রাস্ফীতির হিসেবে কষে দেখি তাহলে সে অঙ্ক দাঁড়ায় চার লক্ষ ডলারের কাছাকাছি। আমরা এখানে সেই সত্যিকার ভ্রাতৃত্বের ভালোবাসার বন্ধনের কথাই আলাপে নিচ্ছি। অবশ্যই থিও সব সময় আলাপে এই অর্থকে দাতব্য হিসাবে নয়—বিনিয়োগ হিসাবেই দেখেছে। কিন্তু সংবেদনটা হলো, এমন ভাইয়ের সন্ধান সহজলভ্য নয় নিশ্চয়ই যে কিনা শিল্পলগ্নি থেকে অর্থ সমাগমের সম্ভাবনা নেই জেনেও ‘বিনিয়োগে’ ব্রতী হয়।

‘আমার কাজের অর্থমূল্য আছে কিনা সে বিষয়ে বলতে চাই যে, আমাকে তা খুবই বিস্মিত করবে যদি অন্যদের কাজের মতো আমার আঁকা ছবিগুলিও সময়মত  বিক্রয়যোগ্য হয়ে না ওঠে, ব্যাস এর বেশি আমার আর কোনো ভড়ং নেই।’৩

একসময় গঘ ভাইদের যৌথ প্রকল্প হিসাবেই ভিনসেন্টের চিত্রশিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠাকল্পে থিও মানসিক, আর্থিক, শিল্প পরামর্শক হিসাবে স্বনিয়োজিত হন। অস্বীকার করার জো নেই যে আজকের বিশ্ববরেণ্য শিল্পীর প্রতিষ্ঠার পেছনে থিও’র নিরন্তর প্রণোদনাই মুখ্য হয়ে আছে। ভিনসেন্টের কাজের উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেও শিল্প-ব্যবসায়ী থিও কোনো সংগ্রাহককেই উৎসাহী করে তুলতে না পারার ব্যর্থতা সত্ত্বেও, ছবি বিক্রি করতে না পারার অযোগ্যতা সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে থিওই ভিনসেন্টের এক নম্বর সমর্থক হয়ে হাজির থেকেছেন সারাজীবন।

দুই দশকের চ্যালেঞ্জ-মুখর সময়ের মধ্যে দুই ভাইয়ের লেখা অসংখ্য চিঠি। ভিনসেন্টের হৃদয়ের কোরক থেকে উৎসারিত পত্রপুঞ্জের অধিকাংশ এমনকি আসন্ন মৃত্যুর অব্যাবহিত পূর্বে লেখা পত্রটিরও প্রাপক ছোটভাই থিও। থিও তাঁর ভাইয়ের হৃদয় নিঙড়ানো এসব শিকড় সমাচারের প্রাপক। ভিনসেন্ট নিজেরই গরজে তার অন্তর্জীবন ব্যক্ত করেছিলেন ভাই থিওর কাছে।

‘তোমার কাছে সেসব সুযোগ পেয়েছি তার সমতুল্য তত ভালো ছবি আমি এখনো এঁকে উঠতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো, একদিন যদি সেটা করে উঠতে পারি তাহলে যেন তুমিও তাদের রচনা করেছো, কেননা আমরা দুজনেই সেসব ছবি এঁকে তুলেছি।’৪

‘থিও এই প্রশংসার উপযুক্ত পাত্র; নিজেকে করে তুলেছিলেন নিমিত্ত মাত্র আধার। সেজন্যেই ভাইয়ের শতপ্লাবী সৃষ্টির শরিক হিসেবে নিজেকে কখনোই দাবি করেননি। একমাত্র অহংকার ছিল তার; ভিনসেন্টের কাছ থেকে তিনি যত চিঠি পেয়েছেন এমন সৌভাগ্য আর কারো হয়নি।’৫

ভাই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবন ও রচনার ভাণ্ডারী হবার অধিকার তারই। ১৮৭৩ সাল থেকে পত্র বিনিময় ভাইয়ের সাথে। আত্মবিশ্বাসের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে সেই থেকে ধীরে ধীরে। আর কখনো যে বনিবনার কোনো পরোয়াও করেনি তার লক্ষণও আছে পত্র চালাচালিতে। থিও মনে করেছিলেন তার ভাইয়ের মধ্যে দুটি পরস্পর বিরোধী সত্তা বিরাজিত—‘একজন বিস্ময়কর প্রতিভাদীপ্ত, পরিমার্জিত, দয়ালু এবং অন্যজন স্বার্থপর ও অনুভূতিহীন।’

কিন্তু ভিনসেন্ট তার জীবনের সমুদয় কর্জ করেছেন ভাই থিও’রই কাছ থেকে। তিনি প্রশান্তির জন্য মাথাও গুঁজেছেন ভাইয়েরই মমত্বের কাছে তার মুরোদকে ফিরিয়ে আনতে।

গরিমা, লালসা, ছলনা ছিল না, দুর্ভাগার পরনির্ভরশীলতার আশ্রয় যেমন হয়, তেমনি খ্যাতি, অর্থলিপ্সার জন্য নয়, এক অনন্যোপায় ভাবি-চিত্রীর মর্ম প্রকাশের একমাত্র উপায় হয়ে ওঠেন থিও। সেও নিষ্কলুষ ভ্রাতৃপ্রেম চিত্ত বিজড়িত পরিপূর্ণ অনুভব সাদা-নীল-হলুদের তারা ভরা রাতের মাহাত্ম্যকে রঙ চুবিয়ে টাঙিয়ে দেন ভবিষ্যতের প্রদর্শন দেয়ালে।

‘জীবনে কোনো মহৎ ঘটনায় আকস্মিকভাবে ঘটতে পারে না, তাকে ইচ্ছাশক্তিতেই ঘটাতে হয়।’৬

গঘ ভাইদ্বয় তাঁদের জবানে চিত্রশিল্পের সাথে ভ্রাতৃত্বের সহযোগিতার এমন এক প্রবল শক্তি ও আকর্ষণ দান করেছেন যা অনাগত ভবিষ্যৎ জুড়ে অসংখ্য শিল্পপ্রেমীদের হৃদয়কে আলোড়িত করবে।

ভিনসেন্টের জীবন-গগন জুড়ে নিনাদিত রং রেখার অবয়বচিত্রের থিও—বাস্তবের মনোজগতের মোহনচিত্র আঁকানোরও কারিগর। ভিনসেন্টের জীবনানুসন্ধান যে মগ্ন চৈতন্যের গভীরে তার কিনার ঘেঁষে অবস্থান থিও’র। রক্তক্ষরণের দাগে প্রকৃতি এঁকেছেন ভিনসেন্ট, তার ভাইকে এঁকেছেন শত শত পত্রের অসংখ্য বর্ণ  শব্দ ও বাক্যের মোহনীয় বিস্তারে।

‘আমার আশা তোমার সাহায্য ও সহানুভূতি কোনোভাবেই প্রত্যাহৃত হবে না এবং আমরা ভ্রাতৃত্ববোধে একে অপরের হাত ধরে থাকব বরাবরের মতো, যতই থাকুক না কেন সেসব জিনিস “জগৎ” যাদের বিরোধিতা করে।’৭

থিও ভিনসেন্টের আশ্রয়ের প্রতীক। প্রশ্রয়ের নীড়। প্রেমের জানালা। ক্ষরণের দাগ মেখে জীবনকে চেতনার সামর্থ্যে বাগে রাখার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, নিজেদের বোধ ও উপলব্ধির জাগরণে।

আর্থিক শূন্যতায় হাত রেখে প্রকরণে চোখ রেখে এঁকেছেন ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ। সহনস্বরের প্রত্যয়ে লেখা পত্র থিওকে, অথচ প্রতিকৃতি? নিজের পঁয়ত্রিশটি আত্মপ্রতিকৃতির সন্ধান পাওয়া গেলেও থিওকে এঁকেছেন মাত্রই একবার। যা আবার আবিষ্কৃত হয়েছে ২০১১ সালে। এতদিন যা আত্মপ্রতিকৃতি হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছিল। কেন প্রতিকৃতি রচনায় থিও বিষয় হয়ে উঠে আসেনি? নাকি নিজেকে আরো পরিশীলিত করে থিওকে আঁকার কোশেশের বাসনা ছিল?

‘তোমার আন্তরিক সাহায্য যতটুকুই পাই না কেন, তা আমি যতটা ভালো করে পারি কাজে লাগাব, কাজে উন্নতি ঘটাবার জন্য আমি সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালাব।’৮

গঘ ভাতৃদ্বয়ের সজীব ধারাভাষ্য তাঁদেরই মর্জির নিরীক্ষণের অনপনেয় স্বাক্ষর। তাতে সম্পর্ক জড়িয়ে রাখার মেহন্নত আছে। যা একজনকে টপকে গিয়ে আরেকজনকে প্রত্যক্ষ করার জো নেই। আছে বিবেকের যথোচিত প্রশ্রয়ের দাগ। যা মুদ্রিত হয়ে থাকে ভ্রাতৃপ্রেমের উজ্জ্বলতার আখরে। তাঁর শিল্পেরই মতো ভাই সম্পর্কের সমস্ত পূর্বধার্য্য সীমানাকে মানবিক উচ্চতায় সম্পর্কের অপাপবরণে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে স্থাপন করেন।

নিজেকে তিনি কোনোদিন সস্তা শ্রমে বিক্রয় করেননি। যদিও তাঁর সাধ ছিল চিত্রিত আলেখ্য যেভাবেই হোক বিক্রিবাট্টা করে আহার সংস্থান। এমনই ছিল তাঁর মর্জি। সৃষ্টিরাও তো চূড়ান্ত মর্জি মাফিক। তাঁর গোটা জীবন জুড়ে মেহন্নতের অনপনেয় স্বাক্ষর। শিল্পের নতুন ধারার পূর্বগামী হতে গিয়ে পত্রলেখক, ভ্রাতৃপ্রেম, সহোদরের সাথে চুক্তি, এসবই আসলে আপাত অস্থিরচিত্তের মানুষটার সৃষ্টিকাজের বৈভব মেনে নেওয়ার পথে অন্তরায় নয়।

‘....আঁকাচর্চা আরো আন্তরিকভাবে যদি করতে পারি সেটাই হবে বেশি কাজের, অন্তত তাঁর ওইসব বিক্রিযোগ্য অবিক্রিযোগ্য ইত্যাদি কথাবার্তার চাইতে কাজের কাজ। ওইসব বিক্রিটিক্রি ব্যাপার নিয়ে তাঁর যা মনে হচ্ছে সেসব জ্ঞান ট্যান আমার না শুনলেও চলবে।’৯

চিত্রকলা সমঝদার ব্যবসায়ী হয়েও থিও’র—ভাইয়ের প্রতি পক্ষপাত তো ছিলই, উপরন্তু যৌথ জীবন কারবারের এক প্রতিনিধির প্রতি ভালোবাসার শক্তির এক অন্তর্গত প্রবর্তনাও কি থিও’র দান নয়? ফলে এসব বাণিজ্য কায়কারবার ছাপিয়ে সহানুভূতি সেখানে কালান্তরে প্রসারিত হয়ে গিয়েছে। ফলত ‘মেসার্স গঘ ব্রাদার্স’-এর শিল্প পূর্বধার্য্য সীমানা চুরমার করে দিয়ে আত্মিক শিল্পায়নের দিকে তাঁদের যাত্রাপথের নিশানা সাব্যস্ত করেন।

‘প্রিয় ভাই, এটা তোমার কাছে পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো যে, তোমার বিশ্বস্ত সাহায্যের জন্য কত দৃঢ় ও তীব্রভাবে অনুভব করি যে তোমার কাছে আমি বিশালভাবে ঋণী।’১০

ফলে আলাদা নজর দেওয়ার কথা ওঠানোই পরিমিত জ্ঞান কেননা ঘনিষ্ঠ পরিসরে এক চিত্রকলা ব্যবসায়ী আরেক চিত্রকর্মী শরিককে কী-রকম প্রসন্ন উদ্বেগে প্রত্যক্ষ করেছেন সেদিকে আমাদের দরদ-মন যেমন আদ্র হয়, উষ্ণতায়ও ছাপিয়ে সেদিকে মন পড়ে থাকে। আর ‘গঘ ব্রাদার্স’-এর সর্বব্যাপী অস্তিত্বের সংগ্রাম ভাবসঙ্গে জেগে থাকে।

‘থিও না থাকলে আমার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করা কখনোই সম্ভব হতো না।’১১

ভিনসেন্টের মৃত্যুর পর থিও ভাই হারানোর বেদনায় তাঁর মৃত্যুর দায় অনুভব করেছিলেন? নিজেকে দোষী ভেবেছিলেন? একজনের গৃহী ব্যবসায়ী জীবন অন্যজনের শিল্পী জীবনের আপাত ভিন্ন জীবন হলেও গঘ ভাইদের জীবন এক সমাবৃত্তে এসে মীমাংসিত হয়ে যায়! থিও’র সমর্থন জারি থাকে। আওভারসের অদূরে বিস্তীর্ণ তৃণভূমির সবুজ কোমলে ঘেরা সমাধিক্ষেত্রে পাশাপাশি অন্তিম শয়নের মধ্য দিয়ে যৌথ যাপন, যৌথ হিসাব, যৌথ শিল্প প্রকল্প ‘মেসার্স গঘ ব্রাদার্স’-এর শহিদত্বের এজমালি স্মারক হয়ে।

কর্জ স্বীকার
০১. থিও ভ্যানগঘ, ২২ জুলাই, ১৮৮৩ হেগ
০২. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, ১৩ ডিসেম্বর ১৮৭২
০৩. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, জুলাই ৩১, ১৮৮২ হেগ  
০৪. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, পত্র সংখ্যা ৫৩৮
০৫. ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
০৬. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ
০৭. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মে ১৮৮২, হেগ
০৮. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মার্চ ১৮৮৩, হেগ
০৯. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মার্চ ১৮৮২, হেগ
১০. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মার্চ ১৮৮৩, হেগ
১১. ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, অক্টবর ১৮৮৭, প্যারিস

আপনার মতামত লিখুন :

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে
ছবি. লেখক

সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন না—“পুলিশ এলে ডরাই না আর, পালাই নে আর ভয়ে, আরশোলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।”—আমি কিন্তু তেমন নই। আরশোলা আর ফড়িংকে সয়ে নিলেও, পুলিশকে আমি ষোল আনা ডরাই। তাই কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক শহরের আব্দুররাহমানিভ স্ট্রিটে চলার সময়ে যখন দুজন পুলিশ দু দিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। তাদের সাথে আছেন সাদা পোশাকের আরো দুজন পুলিশ। আমাকে তারা এমনভাবে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন, চাইলেও সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে ভোঁ দৌড় দেবার কোনো উপায় নেই। মুখে তাই সরল একটা অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি নিয়ে তাদের জেরার অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। এ অঞ্চলে শুনেছি পুলিশ খুব একটা সততানিষ্ঠ নয়, তাই আমাকে পাকড়াও করে মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে কোনো পয়সা দাবি করে কিনা, সেরকম একটা সন্দেহও মনে উঁকি দেয়। তো সেই দলে থাকা একমাত্র নারীসদস্য আমার সমস্ত ভুল ভাঙিয়ে আশ্বস্ত করে জানালেন, তারা আসলে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিছুদিন হলো এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কাজ নেই তেমন। ট্যুরিস্ট যেমন কম, তার চেয়েও কম অপরাধের মাত্রা। ফলে ইনাদের একপ্রকার মাছি তাড়াবার অবস্থা। আমাকে দেখে এই দলটির আগ্রহ হয়েছে আমার কাছ থেকে দু চারটি কথা জানবার। এই যেমন কোথা থেকে এসেছি, কদিন থাকব, কেমন লাগছে বিশকেক, কোথায় কোথায় যাবার পরিকল্পনা আছে, এই সব আরকি। সবশেষে তাদের অভিলাষ হলো, আমার সাথে একটি ছবি তুলবেন। বেশ, তুলুন। ভেতরে ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছি ততক্ষণে। কোথায় ভেবেছিলাম উৎকোচ দাবি করা অসৎ পুলিশ, আর শেষে কিনা আবিষ্কার করলাম সদালাপী বন্ধুভাবাপন্ন ভিন্ন ধরনের পুলিশ, তাই অবাক আর উৎফুল্ল না হয়ে উপায় আছে?

আজ এখানে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া। ছেড়ে ছেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও এমনই ছিল। তবে বৃষ্টির তেজ ছিল আরো বেশি। তার মাঝেই এয়ারপোর্ট থেকে আসতে হয়েছে। সে-নিয়ে বেশ রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। বিশকেকের এয়ারপোর্ট মূল শহর থেকে বেশ দূরে, প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের পথ। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দু লেনের মন্থর পিচঢালা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিইনি। ভূতুড়ে জনমানবহীন সেই এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই দেখা পেয়েছিলাম ‘মারসুতকা’র, যেটি আদতে হলো ভাড়ায় খাটা মাইক্রোবাস। ভাড়া ট্যাক্সির দশ ভাগের এক ভাগ। যদিও যাত্রীবোঝাই হবার জন্যে অপেক্ষা করতে হলো বেশ খানিকটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির ভারি পর্দাকে উপেক্ষা করে জোরসে ওয়াইপার চালিয়ে শম্বুকগতিতে মারসুতকা ছুটে চলে। মিনিট পনের পথ আসার পর দেখি দু পাশটা প্রায়ান্ধকার। ঝুপ করেই যেন নেমে এসেছে বিদায়ীবেলার সন্ধ্যা। আর সামনের রাস্তায় এপাশের মাঠ উপচিয়ে তীব্র গতিতে জল ছুটে যাচ্ছে উল্টো দিকের মাঠের দিকে। এর মাঝ দিয়ে গাড়ি ছোটালে জলের স্রোতে কলার ভেলার মতো ভেসে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের ড্রাইভার বিশাল এক সিডার গাছের কোণে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা কিছুটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। ওখানেই আমরা আটকে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কিছুটা শঙ্কা জাগে, যদি বৃষ্টি আর না থামে? যদি জলের তোড় এসে পৌঁছায় এ গাড়ি অবধি, তাহলে? আশেপাশে গ্রামের কিছু চাষিবাড়ি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। এখানে বিপদে পড়লে সাহায্য করবার কেউ এগিয়ে আসবে কি?

বৃষ্টি থেমেছিল শেষ অবধি, সেই সাথে মন্থর হয়েছিল প্লাবনের তেজ। কিন্তু এতসব ডামাডোলে আমরা যখন আলাতু বাজারের কোণে এসে পৌঁছাই, ততক্ষণে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখান থেকে আমার হোটেল যে কোন দিকে, কিংবা কত দূরে, কিছুই ধারণা নেই আমার। কিছুটা ক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মাথার উপরের বুড়ো ওক গাছ থেকে টপ টপ করে ঝড়ে পড়ে বিকেলের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো। পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে হঠাৎ এক যুবক দাঁড়িয়ে যায়। আমার অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজ থেকেই বলে, ‘ট্যাক্সি খুঁজে দেব তোমায়?’ আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত কিছু টেপাটেপি করে জানায়, ‘মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই ট্যাক্সি এসে পড়বে। ততক্ষণ আমি তোমার সাথে আছি। আমি এখানকার টিভি স্টেশনে গ্রাফিক্সের কাজ করি। আজ আমার বিকেলের শিফটে কাজ ছিল। ফেরার সময়ে দূর থেকে দেখলাম, তুমি এখানে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তাই ভাবলাম, তোমার হয়তো কোনো সাহায্য প্রয়োজন।’ অজানা একটি দেশে এমন একজন অপরিচিত জনের কাছ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত পেয়ে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।

আলাতু স্কয়ারের কোণের দিকটায় টিউলিপের বাগান। সকালের বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে আছে আধবোজা টিউলিপের জঠরে। সেই সাথে আশেপাশে ফুটে আছে বেশকিছু ধবধবে সাদা ড্যাফোডিল। টিউলিপের বাগানের পেছনেই আইরিশ পাব। তবে সকালের দিক বিধায় পাবের দরজাটি বন্ধ। আর বাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘরের মতো দেখতে টিনের চালের লম্বা বারান্দা। বিশাল সেই চাতালে দুজন মাত্র মানুষ নানা আকারের পেইন্টিং এনে ঝুলিয়ে রাখছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেসব পেইন্টিংয়ের মাঝে লেনিন যেমন আছেন, তেমনি বেঁচে আছেন স্তালিনও। কিরঘিজ রমণীদের বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে। তবে তাদের অনেকটিতে শিল্পী নেত্রদানপর্ব সমাপ্ত করেননি। সেটি কোনো ধর্মীয় কারণে কি? এর আগে তাসখন্দে পরিচয় হওয়া একজন চিত্রশিল্পী তেমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখানে সেসব আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, যে দু যুবক ছবিগুলো চটের ছালা থেকে বের করে ঝুলিয়ে রাখার কাজ করছে, তাদেরকে মূল চিত্রকর বলে মনে হয় না। আর তাছাড়া ওরা মহাব্যস্ত। এই যে আমি খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছি, এর মাঝে কিন্তু একবারও তারা জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা কিনা। অতঃপর তাদেরকে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত রেখে আমি মূল স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705573218.jpg

কংক্রিটে ঢাকা বিশাল উন্মুক্ত সেই স্কয়ারটিকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে উঁচু বেদিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা এক বীর। এই বীর পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ ‘মানাস’-এ উল্লিখিত বীর। এই কিরঘিজ দেশটির নানা ক্ষেত্রে মানাস-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এদের এয়ারপোর্ট, এমনকি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার নামও মানাস। দূরদেশের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে কী করে বিজয়ীর বেশে ফিরেছিলেন সেই বীর, সেটি-ই কাব্যের ছন্দে শত শত বছর ধরে পঠিত হয়েছে ধূসর স্তেপের দেশ কিরঘিজস্তানে।

আজ উদ্দাম হাওয়াকে উপেক্ষা করে স্কয়ারের উন্মুক্ত স্থানটিতে বেশ কিছু লোকের সমাগম। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সামরিক বাহিনীর কসরত। তাদের দু দিকে ব্যান্ড দলের বাদ্যের তালে তালে নাচছে স্কুলের একদল কিশোর কিশোরী। কিশোরদের মাথায় ঐতিহ্যবাহী কিরঘিজ টুপি—কালপাক। তাদের কয়েক জনার হাতে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কমুজ। ত্রি-তার বিশিষ্ট কমুজ দেখতে অনেকটা গিটারের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট আর শীর্ণ। সেনা আর সেই স্কুলের কিশোর কিশোরীদের সাজ সাজ রব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনের কোনো এক দিনে হয়তো উৎসব পালনের ঘটা আছে। তাই প্রস্তুতি হিসেবেই এই মহড়া। আমি নিজেও হাওয়া উপেক্ষা করে কিছুক্ষণ শিশুদের মহড়া দেখি।

এই স্কয়ারটির পেছন দিকে একটি সবুজ উদ্যান। নাম—দুবভি পার্ক। সে উদ্যানের সমুখেই আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে সপ্রতাপে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। মধ্য এশিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র লেনিন-ভাস্কর্য। বাকিগুলোকে অনেক আগেই ধনতন্ত্রের আগমনের মধুলগ্নে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার এরা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি নিলেও বোধকরি অতীত স্মৃতিকে এক ঝটকায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পর অবধি লেনিন ভাস্কর্যটি স্কয়ারের সম্মুখ চত্বরেই ছিল। এই কিছু বছর আগে ওটিকে সরিয়ে এনে স্থান দেওয়া হয় ভবনের পেছন দিকে। লেনিনের প্রতি মানুষের মায়ামোহ এখনো যে কিছুটা টিকে আছে, তার আরেক প্রমাণ হলো—ভাস্কর্যের বেদিতে পড়ে থাকা গোলাপ আর টিউলিপের ম্লান গুচ্ছ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705392582.jpg

লেনিন ভাস্কর্যের উল্টোদিকের সেই পার্কটির একটি বেঞ্চে গিয়ে বসি। বাঁ ধারে কিরঘিজ নারীর প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্য। মধ্যবয়েসি এক নারী। মাথায় হেঁসেলের পাতিলের মতো দেখতে প্রথাগত মেয়েলি কিরঘিজ টুপি—এলিশেক। প্রায় দশ হাত দীর্ঘ সূতি কাপড় পাগড়ির মতো করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় এ টুপি। তবে বিশাল সাইজের এই কেশাচ্ছাদনকারী পরে হাঁটতে এযাবত কোনো নারীকে এ শহরে দেখিনি। হয়তো গাঁ গ্রামে এখনো এর কিছু চল থাকতে পারে। তবে পাথরের বেদির উপর সেই স্মিতহাস্যময়ী নারীর ভাস্কর্যটি দেখে আমার হঠাৎ জমিলার কথা মনে হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক চিঙ্গিস আইৎমাতভ সৃষ্ট অমর চরিত্র—জমিলা। বলা চলে, জমিলার গল্পের মাধ্যমেই এই কিরঘিজ দেশটির সাথে আমার পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জমিলার স্বামী মায়ের কাছে বৌকে রেখে ফ্রন্টে যায়। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত জমিলার সঙ্গী হয়ে থাকে বালক বয়সের দেবর। এর মাঝেই গ্রামের সমবায় ফার্মে কাজের জন্যে ডাক পড়ে তার। গ্রামের পুরুষরা যেহেতু সবাই যুদ্ধে, তাই সমর্থ নারীরা শস্যভাণ্ডার না সামলালে ফ্রন্টের সৈনিকদের মুখে খাবার জুটবে কী করে? জমিলা কাজে যোগ দেয়, সাথে বন্ধুর মতো লেগে থাকে সেই দেবরটি। এর মাঝেই সেখানে উদয় হয় জমিলার সমবয়েসী আরেক যুবক। জমিলা আর সেই যুবক দুজনেই একে অপরের প্রতি নৈকট্য অনুভব করে। আর সেভাবেই কাহিনী গড়ায়। ছোট গল্প। কিন্তু কী গভীর তার আকুতি! কিরঘিজ গ্রামীণ সমাজের সেই সময়কার চিত্রকে যেন জমিলার জীবনের কাহিনীর মধ্যদিয়েই আইৎমাতভ উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। আমি সেই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে ভাবি—তুমিই কি তবে গিরিপথ পেরিয়ে গ্রাম ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে দূর দেশে পালিয়ে যাওয়া সেই জমিলা?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705311264.jpg

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা অব্যাহত থাকায় চায়ের তেষ্টা জেগে ওঠে। আমি রাস্তা পেরিয়ে স্কয়ারের উল্টোদিকে যাই। ওদিকটাতে বেশ কিছু ক্যাফে-বেকারির দোকান আছে। বলা চলে, এ রাস্তাই শহরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। খুব বেশি দূর হাঁটতে হয় না। অল্প দূরেই লোহার দরজা ঘেরা মেট্রো পাব নজরে আসে। সেটির বাইরে চক বোর্ডে লেখা—‘তুমি+আমি+কফি= আনন্দ’। যদিও আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি আছি, কফিও হয়তো থাকবে, কিন্তু কোনো ‘তুমি’ নেই। তাই আনন্দের সঙ্কুলান হবে কিনা, জানি না। তবুও অনন্যোপায় না থাকায় সেই দশাতেই ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরটা গুমোট অন্ধকার। বাইরের দরজার সাথে মিল রেখেই চারধারে ছড়ানো লোহার টেবিল চেয়ার। সড়কের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ঘোলাটে কাচে ঢাকা। দেয়ালে টানানো নোটিশ বোর্ডে লেখা—টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। কোণের দিকটিতে বার। তবে সেটি বোধ করি জমজমাট হয়ে ওঠে আঁধার নামার পর। এই ভর দুপুরবেলায় কেই-বা এখানে মদ গিলতে আসবে? ওয়াটার এগিয়ে এলে আমি চায়ের অর্ডার করে পাশের টেবিলের দিকে তাকাই। সেখানে মাঝবয়েসী দু মার্কিন ভদ্রলোক আলাপ করছেন। নিচুস্বরে কথা বলায় তাদের আলাপন আমি ডিকোড করতে পারি না। ভাবতে থাকি এরা কি কোনো কনট্রাক্টর? একথা ভাবছি, কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে না হলেও কয়েক বছর আগ অবধি এই বিশকেক শহরটিতে আনগোনা ছিল বিপুল সংখ্যক মার্কিনীর। নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হলে তারা কিরঘিজস্তানের মানাস এয়ারপোর্টে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বানাবার জন্যে জায়গা চেয়ে বসে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকা কিরগিজস্তানের পক্ষে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে বিমান বাহিনীর লোক, তাদেরকে কেন্দ্র করে সাপ্লায়ার কোম্পানি ইত্যাদি নানা সংস্থার কাজ করা বিপুলসংখ্যক লোকেদের মচমচে পয়সায় গড়ে ওঠে এ এলাকার হোটেল, ডিস্ক, পাব, আর ক্যাফেগুলো। তবে কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নয়া কিরঘিজ সরকারের চাপে মার্কিন বিমান বাহিনী এখানকার ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিদেয় নিলে মাথায় হাত পড়ে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের। তারা সরকারের কাছে আর্জি জানায়—ফিরিয়ে আনুন আবার সেই মার্কিনীদের। নয়তো আমরা চলব কী করে? তাদের এই উদ্বিগ্নতার হেতুটা আমি বুঝি। এ পর্যন্ত বিশকেক শহরের নানা পথে হেঁটে যতদূর বুঝেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরুবার পর এখানকার নতুন কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। বিদ্যুৎচালিত যে সরকারি বাসগুলো রাস্তায় চলছে সেগুলো রঙচটা, লক্কড়-ঝক্কর মার্কা। রাস্তায় এখানে-ওখানে খানাখন্দ। রাজধানীর পাড়াগুলো শ্রীহীন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা উষর, চাষাবাদ-অনুপযোগী। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে একটি ছোট সোনার খনি। ভারি শিল্প নেই বললেই চলে। সে কারণেই দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ছুটে যায় রাশিয়ায়। অর্থনীতির এমন একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় মার্কিন ঘাঁটির প্রস্থানে তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিচলিত না হয়ে পারেনি। তবে ঘাঁটিটি গুটিয়ে নিলেও সব কর্মকাণ্ড হয়তো পুরোপুরি বিদেয় নেয়নি। কিছু কনট্রাক্টর, কিছু ফড়ে দালাল হয়তো এখনো রয়ে গেছে। অদূরের টেবিলে ভুঁড়ি ঠেকিয়ে বসা সেই দুই মার্কিনী তেমন কেউ কিনা কে জানে!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563704741206.jpg

ওয়েটার চা এনে রেখে যায়। চায়ের প্লেটে দুধবিহীন লিকার চায়ের পাশে রাখা থাকে মুসুম্বির কয়েকটি টুকরো। আমি সেই টুকরো দুটোকে চায়ে ভাসিয়ে দিই। সেই সাথে ভাবতে থাকি—দুপুরের খাবারটা সারা যায় কোথায়? খাবার নিয়ে এ অঞ্চলে বেশ হুজ্জতে পড়েছি। ইংরেজি জানা লোক এখানে নেই বললেই চলে। সবজি চাইলে এনে দেয় মাংস, আর মাংস চাইলে এনে দেয় সবজি। যেটা বুঝলাম, নিজের ইচ্ছেমতো খাবার চাইলে এ দেশে আসবার আগে টুকিটাকি রুশ শিখে আসাটা বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, এরা কিন্তু এখনো রুশ ভাষাকেই ধরে রেখেছে। আর এদের বর্ণমালাও সিরিলিক বর্ণমালা।

কফি পান শেষে আমি এগলি-ওগলি হেঁটে হায়াত রিজেন্সি হোটেলটা খুঁজতে থাকি। না, এ গরিব বান্দার সেখানে ওঠবার মতো সামর্থ্য নেই। আমি আসলে ওটি খুঁজছি, কারণ এর ঠিক পেছনেই নাকি কিরঘিজ জাতীয় নাট্যশালা। সেখানে যাবার কারণ আছে। সকালে হোটেলের খাবার ঘরে প্রাতরাশ সারার পর বেরিয়ে আসার সময়ে শুনছিলাম ম্যানেজার মেয়েটি কাকে যেন বলছে—আজ এখানে বিরাট অপেরা কনসার্ট হবার কথা। ভিয়েনা থেকে এদ্রিয়ান আর হাইদেমারিয়া নামক দুজন স্বনামধন্য শিল্পী আসবেন। সাথে থাকবে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রীদের একটি দল। তারা বাজাবেন—পিয়ানো, চেলো, ভায়োলিন আর বাস। অপেরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় গানের সুরের সাথে কোনো একটি অভিনয়ও মঞ্চস্থ করেন। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্যের মতো। তবে ভিয়েনা থেকে আসা অপেরা শিল্পীরা কেবলই গাইবেন, অভিনয়ে অংশ নেবেন না। এর আগে ভিয়েনায় গিয়ে পথেঘাটে এই অপেরা কনসার্টের টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি। সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকেট বেচা দালালদের মতোই ওখানকার থিয়েটারগুলোর আশেপাশের রাস্তায় আছে বেশ কিছু টিকেটবিক্রেতা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে তাদের অনেকের পরনে পুরনো আমলের ঝলমলে পোশাক। এমন কয়েকজনের কাছে টিকেটের মূল্য শুনে আমার একেবারে অক্কা পাবার দশা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ ইউরোর নিচে ভালো কোনো টিকেটই নেই। তাই অপেরা কনসার্টের তীর্থস্থল ভিয়েনায় অবস্থানকালে সেটির সুধা আস্বাদন আর সম্ভব হয়নি। তবে সেখানকার শিল্পীরা এখানে এসে অনুষ্ঠান করায় আমি অনুমান করি—টিকেটের মূল্য হয়তো তেমন একটা আকাশচুম্বী হবে না। ম্যানেজার মেয়েটিকে কোথা থেকে টিকেট কাটা যায়, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সে কিছুটা তাগিদের কণ্ঠে জানায়, “আজ রাতের এই শো যদি ধরতে চাও, তাহলে তোমাকে দুপুরের মধ্যে গিয়ে টিকেট কেটে আসতেই হবে। শোয়ের ঠিক আগে ওখানে টিকেট পাবে না।” মেয়েটির সেই কথাকে আমলে নিয়েই আমার এই নাট্যশালা খুঁজতে পথে নামা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705117000.jpg

গথিক স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল সেই নাট্যশালাটি দু গলি পরেই পেয়ে যাই। চূড়োতে এখনো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাওয়া তারাটি দেখেই বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি সোভিয়েত সময়ের অবদান। সামনের বারান্দায় উঠে দেখি, সেখানে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে ভেতরের প্যাসেজে জ্বলতে থাকা ঝাড়বাতির আলোকছটা। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে ভেতরে যাবার মুখে কাঠের ভারি দরজাটির হাতলে চাপ দিই। কিন্তু সেটি আমার প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। আমি বুঝে যাই, সন্ধ্যের আগে এই দোর খুলবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে টিকেট পাব কোথায়? নাকি এতটা পথ এসে আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হবে? সেই সময়ে খেয়াল করি, বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে দু পাল্লার জানালা। একটি পাল্লা খোলা, অপরটি বন্ধ। মুখে হাসি ফুটে ওঠে আমার, টিকেটের একটা বন্দোবস্ত হয়তো হয়ে গেল।

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র