Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ : আশা ও বেদনার যৌথভাষ্য

ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ : আশা ও বেদনার যৌথভাষ্য
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
বীরেন মুখার্জী


  • Font increase
  • Font Decrease

‘মা রে, তুই ছাড়া আমার কেউ নাই।... মারে রে কথা কসনা ক্যান? হোন্। জানোয়ারে কিছু কইরলে হে মনে রাখতা নাই। কুকুর কামর দিলে কি মানুষে মনে রাখে, না পা কাইট্যা ফেলে? মানুষের কিছু করইলে অন্য কথা। জানোয়ারকে মানুষ মাফ কইরা দ্যায়।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনির নারী ধর্ষণের চিত্র এভাবে অঙ্কন করেছেন শওকত ওসমান তার ‘ক্ষমাবতী’ গল্পে। পাকিস্তানিদের বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন যে কত মর্মস্পর্শী ও ভয়াবহ ছিল তা একাত্তরের নয় মাসের যুদ্ধে প্রত্যক্ষ করা গেছে। পাকিস্তানি শাসকের শোষণ ও নিপীড়নের জটাজাল থেকে জাতিসত্তা রক্ষা, আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল বাঙালি জাতি। ‘৫২-এ বাংলা ভাষা রক্ষার বিজয় বাঙালির হৃদয়পটে সাহসের রাজটীকা এঁকে দেয়; সেই সাহসকে ভিত্তি করে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পৃথিবীর মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকাবাহী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাতে সক্ষম হয় বাঙালি জাতি। যুদ্ধের সাফল্য ও গৌরবগাঁথা, ক্লেদ, হতাশা এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রাপ্তির কাঙ্ক্ষা ইত্যাদি প্রপঞ্চ বাঙালির মননে নানামুখী আবেগের সৃষ্টি করে। যার প্রতিফলন পাওয়া যায় সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়। বলা যায়, মুক্তিসংগ্রামের ইতিবৃত্ত ও যুদ্ধোত্তর বাস্তবতা সসম্ভ্রমে বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে। শিল্পসংবেদনশীল মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন দেশের সাহিত্যিকগণ এমনকি ভিনদেশি সাহিত্যিকরাও নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজটি করেছেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক দৃশ্যপট নানান আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে ছোটগল্পে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে যেমন এ দেশের স্বাধীনতাকামী আপামর ছাত্রজনতা, সৈনিক, শ্রমিক-কৃষক, শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী নানাভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, তেমনিভাবে এ দেশের কবি-সাহিত্যিকরাও মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা ও পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে কলমকে শাণিত রেখেছেন। রচনা করেছেন গান, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস ও নাটক। এসব সাহিত্যকর্ম একদিকে যেমন যুদ্ধরত বাঙালিকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে অন্যদিকে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকেও করেছে সমৃদ্ধ। ‘সাহিত্যের আরেক নাম জীবন সমালোচনা (Criticism of life) মাধ্যমে জীবনের সত্য, জীবনাতীতের সত্য ভাষার সৌন্দর্যে মণ্ডিত হয়ে সাহিত্যে উদ্ভাসিত হয়।’ সাহিত্যের দর্পণে যদি প্রতিবিম্বিত হয় একটি জাতি তথা একটি রাষ্ট্রের জীবন প্রণালী। প্রতিফলিত হয় সেই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়েও বাঙালি জাতির আপোসহীন সত্তাকে শনাক্ত করা যায়। 

কথাসাহিত্যে, বিশেষ করে ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক প্রতিফলন লক্ষণীয়। সৃজনশীলতার প্রশ্নে একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কিত থাকায় আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তির স্বার্থে নৃ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উজিয়েও অপরাপর ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সংগ্রামের সোপানতলে একীভূত হয়েছে—অস্তিত্বের লড়াইয়ে। বিভিন্ন সময়ে ঔপনিবেশিক শক্তির দীর্ঘ ও ধারাবাহিক শাসন-শোষণে ভঙ্গুর আর্থ-সামাজিক অবস্থায় নিমজ্জিত বাঙালির মধ্যবিত্ত মানস যুদ্ধচলা সময়ে দু’টি বিপরীতমুখিন দর্শন অবলম্বন করে স্পষ্ট হয়। প্রথমত ধর্মীয় ভীরুতা, স্বাচ্ছন্দ ও সুবিধাবাদী নীতি গ্রহণ ও তোষণের সনাতন রূপ এবং দ্বিতীয়ত সমস্ত পঙ্কিলতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তীর্ণ হবার চেতনা। প্রথম ধারার সমর্থকরা সত্য ও যুক্তিনিষ্ঠ দ্বিতীয় ধারার বিপরীতে অবস্থান করলেও ঘটনার প্রবহমানতা ও প্রতিক্রিয়ায় একসময় মুক্তিকামী চেতনায় মিলিত হয়। মানবিক উন্নয়ন ঘটে। ব্যক্তির অভিজ্ঞানসঞ্জাত, মর্মস্পর্শী উপলব্ধি নিয়ে বশীর আল হেলাল-এর গল্প ‘প্রথম কৃষ্ণচূড়া’। পাকবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ঢাকা শহরের অর্ধেক মানুষ শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রসুল তার পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। শিক্ষকের তরুণ পুত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আগ্রহী হলেও পিতার অনুমতি পায়নি। কিন্তু ঢাকা শহরে অবস্থান ও প্রতিদিন নির্যাতন, হত্যা প্রত্যক্ষ করে তার বিদ্রোহী সত্তার জাগরণ ঘটে। বয়সের ভারে নিজে যুদ্ধে যেতে না পারলেও ওই শিক্ষক পুত্রকে চিঠি লিখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নির্দেশ দেয়।

হানাদার বাহিনীর মানবতা বিরোধী হত্যা-নির্যাতন ও দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এক যুবকের বীরত্বগাঁথা নিয়ে রচিত জহির রায়হানের শ্রেষ্ঠ গল্প ‘সময়ের প্রয়োজনে’। গল্পের মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রের যুবক জীবনত্যাগী বীর সহযোদ্ধাদের কথা ভেবে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ে আবার একই সঙ্গে পাকবাহিনীকে হত্যা করে উল্লাসে ফেটে পড়ে। গল্পের চূড়ান্ত পর্যায়ে সে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নিজের জীবনও উৎসর্গ করে। তবে ধরা পড়ার পূর্বে সে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণ অনুসন্ধান করে। গল্পটি একজন মুক্তিযোদ্ধার দিনলিপি হিসেবে ধরা যায়। বাঙালি জাতি সেদিন কোন সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়েছে? বর্তমানের বাস্তবতায় দ্বিধান্বিত জাতির সামনে সেই সত্যটিই কি নানা মাত্রিকতা নিয়ে দৃশ্যমান নয়? গল্পটিতে লেখকের শক্তিমত্তা পূর্ণমাত্রায় সমর্থনযোগ্য। আবেগী, তারল্যপূর্ণ লেখকদের মতো মুক্তিযুদ্ধকে তিনি শুধু নারী-লাঞ্ছনা হিসেবে দেখেননি। পাকসেনা ও এদেশীয় বর্বরদের যৌনলিপ্সা যুদ্ধখণ্ডের একটি প্রপঞ্চমাত্র। যে বাস্তবতা, কাঙ্ক্ষা নিয়ে একাত্তরের যুদ্ধে অংশ নেয় সাধারণ জনতা, তার মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন গল্পটিতে পূর্ণমাত্রায় উপস্থিত।

প্রায় সমজাতীয় বাস্তবতা নিয়ে রচিত হারুন হাবীবের ‘লালশার্ট’ গল্পটি। কামালপুর নামের এক অখ্যাত অঞ্চলের রণক্ষেত্রের প্রকৃত অবস্থা এ গল্পে পূর্ণরূপে ফুটে ওঠে। এলাকার পাকিস্তানি ঘাঁটির নিকটবর্তী মুক্তিযোদ্ধাদের বাঙ্কার পাহারারত জলিল, সতিশ ও মোতালেব নামের তিন মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এ গল্পে। পাকসেনারা বাঙ্কার আক্রমণ করলে তিনজনের একজনও ফিরে আসে না। পরদিন খুঁজতে গিয়ে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় এক বাঁশঝাড়ের মধ্যে স্থির বসে থাকতে দেখে সহযোদ্ধা তাহের। ওই আক্রমণে সতিশ ও মোতালেব নিহত হয়। জলিল আহত হলেও মৃত দুই সহযোদ্ধার অস্ত্র দু’টি যুদ্ধের কাজে লাগবে বলে সে সঙ্গে নিয়ে আসে। জলিলও ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে এগুতে থাকে। এ সময় তার মনে পড়ে মা আর বোনের কথা। যাদের না বলে সে যুদ্ধে অংশ নেয়। স্বাধীনতা প্রত্যাশায় জীবন উৎসর্গকারী এই যুবক যোদ্ধা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও নিহত সহযোদ্ধাদের অস্ত্র, তাদের রক্তাক্ত লালশার্টের ছেঁড়া অংশ বহন করে দেশমাতৃকার প্রতি অগাধ ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ দেশমাতৃকার সম্মানই গল্পে নিঁখুত ভাবে উঠে আসে।

হাসান আজিজুল হকের ‘আটক’ গল্পটি যুদ্ধখণ্ডের আরেক বাস্তবতা নিয়ে বিকশিত। মিত্রবাহিনীর সঙ্গে বাঙালি যোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে দিশেহারা পাকসেনারা। রাতের আঁধারে তাদের পশ্চাদপসরণ নিখুঁতভাবে বিবৃত হয়েছে। তার ‘ভূষণের একদিন’ গল্পে পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার নির্যাতনে বাঙালির বিধস্ত জীবনের চিত্র ও বাঙলার প্রত্যন্ত জনপদের বিবর্ণ ছবি ফুটে ওঠে। গল্পে তিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পরের বাস্তব অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। নামহীন গোত্রহীন গল্পটি বিকশিত হয়েছে থমথমে ও ভয়াবহ পরিস্থিতিকে সামনে রেখে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর লোমহর্ষক বর্বরতার ছবি তিনি এ গল্পে শিল্পসম্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘সে’ নামের এক চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে। গল্পটি মুক্তিযুদ্ধ প্রেক্ষাপটে রচিত অপরাপর গল্পের ভেতর ভিন্নতা নির্দেশ করে।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন ‘মুক্তিযুদ্ধের বিজয়’ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই। মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়েছে একথাও সত্য। কিন্তু এর জন্যে বাঙালি জাতিকে যা হারাতে হয়েছে তার পরিমাণও নিতান্ত কম নয়। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত ছোটগল্পগুলোতে বিজয়ের পাশাপাশি বেদনারও ভয়াবহ চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বিজয়ী বেশে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন দেশের মাটিতে ফিরে এলেও তাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে নিষ্ঠুর বাস্তবতার। ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে মা হারিয়েছে সন্তান, নারীরা বিসর্জন দিয়েছে সম্ভ্রম, প্রিয়জনের মৃতদেহ মাড়িয়েও যুদ্ধ করতে হয়েছে সতীর্থ যোদ্ধাদের। নিজ জন্মভূমি ছেড়ে উদ্বাস্তু, উন্মুল হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে সাধারণ মানুষদের। গল্পগুলোতে এসব মানুষেরও অসহায়ত্বের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ফুটে উঠেছে মানবিক সকরুণ আর্তি। সেলিনা হোসেন তার পরজন্ম গল্পে যুদ্ধ যন্ত্রণায় নিঃসঙ্গ ও বেদনাজর্জর এক পিতার করুণ আর্তি তুলে ধরেছেন। বৃদ্ধ কাজেম আলীর মুক্তিযোদ্ধা চার সন্তান এক অপারেশনে গিয়ে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তার চোখের সামনেই পাকসেনারা তাদের গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর নিঃসঙ্গ কাজেম আলীর স্ত্রী পুত্রশোকে মারা গেলে বৃদ্ধ কাজেম আলী আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

হরিপদ দত্ত’র বাস্তব সত্যদর্শন ‘কাকজোছনার বনপুদিনা’ গল্পটি। মুক্তিযুদ্ধকে নিকট থেকে দেখার অভিজ্ঞতা এবং গল্পে বিবৃত সত্য ঘটনাটি তিনি সৃজনশীল চেতনার মিশেলে শিল্পঋদ্ধ ফসল হিসেবে উপস্থাপন করেন। যুদ্ধে ধর্মীয় ভীরুতা ও আখের গোছাতে উৎসাহী এক অর্থলিপ্সু অধ্যাপক পিতা ও যুদ্ধশেষে পাকক্যাম্প থেকে ফিরে আসা কন্যার বেদনাদায়ক সংলাপ গল্পের চুম্বকীয় অংশ হিসেবে গল্পটিকে বিশিষ্টতা দান করে। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি নিয়ে লিখিত এটি একটি সার্থক ছোটগল্প।

ছোটগল্প লেখকরা নানারৈখিক চিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলোকে মাত্রিক, ব্যঞ্জনাঋদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনা কর্তৃক নারী ধষর্ণের চিত্র অঙ্কনের পাশাপাশি তুলে ধরেছেন বাঙালি নারীর গুপ্তচরবৃত্তির সফল কাহিনী। নারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে পাকসেনাদের নিষ্ঠুরতা মেনে নিয়েছে আবার বিষধর ছোবল দিয়েও তাদের প্রাণ সংহারে ব্রতী হয়েছে। পাকসেনাদের নির্যাতনে অন্তঃসত্ত্বা এবং সন্তান প্রসব করে মাতৃত্বের অপমানের প্রতিশোধ হিসেবে সেই সন্তানকে মেরে ফেলার দৃশ্যও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের গল্পে। শক্তিশালী গল্পকার শওকত ওসমান ‘দ্বিতীয় অভিসার’ গল্পে এইভাবে বাঙালি নারীর প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবৃত্তিকেই সফলভাবে চিত্রায়িত করতে সচেষ্ট হয়েছেন।

এছাড়া শওকত ওসমান-এর ‘দুই ব্রিগেডিয়ার’, ‘ক্ষমাবতী’, ‘জননী: জন্মভূমি’, ‘দ্বিতীয় অভিসার’, বশীর আল হেলাল-এর ‘প্রথম কৃষ্ণচূড়া’, ‘রণকৌশল’, জহির রায়হান-এর ‘সময়ের প্রয়োজনে’, আবু জাফর শামসুদ্দীন-এর ‘ছাড় দেয়াল’, ‘চাঁদমারি’, হাসান আজিজুল হক-এর ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘রাফি’, ‘কৃষ্ণপক্ষের দিন’, ‘আটক’, কায়েস আহমেদ-এর ‘নচিকেতাগণ’, ‘বাংলাদেশ কথা কয়’, মঈনুল আহসান সাবের-এর ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, শাহরিয়ার কবির-এর ‘একাত্তরের যীশু’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর ‘অপঘাত’, মাহমুদুল হক-এর ‘বেওয়ারিশ লাশ’, ‘কালো মাফলার’, আলাউদ্দিন আল আজাদ-এর ‘আমাকে একটি ফুল দাও’, হরিপদ দত্ত-র ‘কাকজোছনার বনপুদিনা’, সেলিনা হোসেন-এর ‘পরজন্ম’, হারুন হাবীব-এর ‘লালশার্ট’, কাজী ফজলুর রহমান-এর ‘২৫ শে মার্চ’ গল্পগুলো সন্ধানী পাঠশেষে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত সার্থক ছোটগল্প হিসাবে উল্লেখ করা যায়।

পরিশেষে বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, উপলব্ধি, তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত, মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা নিবিড়ভাবে ধরা পড়েছে বাংলা ছোটগল্পের জমিনে। গল্পগুলোতে চিত্রায়িত হতে দেখি যুদ্ধখণ্ডে বাঙালির নিজস্ব উপলব্ধি, স্বাধিকার প্রশ্নে আত্মোৎসর্গকারী জনতার নির্লোভ মুখ। বিবৃত হয় এদেশীয় স্বাধীনতা বিরোধী ও পাক হানাদার বাহিনীর যৌথ যৌনলিপ্সা। অপরাপর ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে সম্ভ্রম হারানো নারীর হৃদয়। লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী কল্পনার মিশেলে পুষ্ট গল্পগুলো আবেগসঞ্চারী বাক্যবিন্যাসে মূর্ত হয়ে ধরা দেয় মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত যাবতীয় হতাশা, দীর্ঘশ্বাস, আশা, প্রাপ্তিসহ নানাবিধ প্রপঞ্চ। লেখকের শক্তিমত্তা, বুননশৈলীতে শব্দচিত্রে ভাস্বর হয় অসহায়-অনাহারী আমজনতার দীর্ঘশ্বাস ও দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। গল্পে বিবৃত ঘটনারাশি তাই পারস্পরিক সহমতের নিরিখে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে পাঠক চেতনায়। গল্পগুলোতে অঙ্কিত বিভিন্ন চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তি ঘটনা পরম্পরায় মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ ইতিহাস হয়ে ওঠার দাবি রাখে।

দোহাই
১. মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ছোটগল্প, মুহম্মদ হায়দার, বাংলা একাডেমি, মে ২০০৩
২. বাংলাদেশের ছোটগল্প (গবেষণা গ্রন্থ), খালেদা হানম, চট্টগ্রাম

আপনার মতামত লিখুন :

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে
ছবি. লেখক

সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন না—“পুলিশ এলে ডরাই না আর, পালাই নে আর ভয়ে, আরশোলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।”—আমি কিন্তু তেমন নই। আরশোলা আর ফড়িংকে সয়ে নিলেও, পুলিশকে আমি ষোল আনা ডরাই। তাই কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক শহরের আব্দুররাহমানিভ স্ট্রিটে চলার সময়ে যখন দুজন পুলিশ দু দিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। তাদের সাথে আছেন সাদা পোশাকের আরো দুজন পুলিশ। আমাকে তারা এমনভাবে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন, চাইলেও সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে ভোঁ দৌড় দেবার কোনো উপায় নেই। মুখে তাই সরল একটা অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি নিয়ে তাদের জেরার অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। এ অঞ্চলে শুনেছি পুলিশ খুব একটা সততানিষ্ঠ নয়, তাই আমাকে পাকড়াও করে মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে কোনো পয়সা দাবি করে কিনা, সেরকম একটা সন্দেহও মনে উঁকি দেয়। তো সেই দলে থাকা একমাত্র নারীসদস্য আমার সমস্ত ভুল ভাঙিয়ে আশ্বস্ত করে জানালেন, তারা আসলে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিছুদিন হলো এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কাজ নেই তেমন। ট্যুরিস্ট যেমন কম, তার চেয়েও কম অপরাধের মাত্রা। ফলে ইনাদের একপ্রকার মাছি তাড়াবার অবস্থা। আমাকে দেখে এই দলটির আগ্রহ হয়েছে আমার কাছ থেকে দু চারটি কথা জানবার। এই যেমন কোথা থেকে এসেছি, কদিন থাকব, কেমন লাগছে বিশকেক, কোথায় কোথায় যাবার পরিকল্পনা আছে, এই সব আরকি। সবশেষে তাদের অভিলাষ হলো, আমার সাথে একটি ছবি তুলবেন। বেশ, তুলুন। ভেতরে ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছি ততক্ষণে। কোথায় ভেবেছিলাম উৎকোচ দাবি করা অসৎ পুলিশ, আর শেষে কিনা আবিষ্কার করলাম সদালাপী বন্ধুভাবাপন্ন ভিন্ন ধরনের পুলিশ, তাই অবাক আর উৎফুল্ল না হয়ে উপায় আছে?

আজ এখানে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া। ছেড়ে ছেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও এমনই ছিল। তবে বৃষ্টির তেজ ছিল আরো বেশি। তার মাঝেই এয়ারপোর্ট থেকে আসতে হয়েছে। সে-নিয়ে বেশ রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। বিশকেকের এয়ারপোর্ট মূল শহর থেকে বেশ দূরে, প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের পথ। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দু লেনের মন্থর পিচঢালা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিইনি। ভূতুড়ে জনমানবহীন সেই এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই দেখা পেয়েছিলাম ‘মারসুতকা’র, যেটি আদতে হলো ভাড়ায় খাটা মাইক্রোবাস। ভাড়া ট্যাক্সির দশ ভাগের এক ভাগ। যদিও যাত্রীবোঝাই হবার জন্যে অপেক্ষা করতে হলো বেশ খানিকটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির ভারি পর্দাকে উপেক্ষা করে জোরসে ওয়াইপার চালিয়ে শম্বুকগতিতে মারসুতকা ছুটে চলে। মিনিট পনের পথ আসার পর দেখি দু পাশটা প্রায়ান্ধকার। ঝুপ করেই যেন নেমে এসেছে বিদায়ীবেলার সন্ধ্যা। আর সামনের রাস্তায় এপাশের মাঠ উপচিয়ে তীব্র গতিতে জল ছুটে যাচ্ছে উল্টো দিকের মাঠের দিকে। এর মাঝ দিয়ে গাড়ি ছোটালে জলের স্রোতে কলার ভেলার মতো ভেসে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের ড্রাইভার বিশাল এক সিডার গাছের কোণে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা কিছুটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। ওখানেই আমরা আটকে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কিছুটা শঙ্কা জাগে, যদি বৃষ্টি আর না থামে? যদি জলের তোড় এসে পৌঁছায় এ গাড়ি অবধি, তাহলে? আশেপাশে গ্রামের কিছু চাষিবাড়ি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। এখানে বিপদে পড়লে সাহায্য করবার কেউ এগিয়ে আসবে কি?

বৃষ্টি থেমেছিল শেষ অবধি, সেই সাথে মন্থর হয়েছিল প্লাবনের তেজ। কিন্তু এতসব ডামাডোলে আমরা যখন আলাতু বাজারের কোণে এসে পৌঁছাই, ততক্ষণে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখান থেকে আমার হোটেল যে কোন দিকে, কিংবা কত দূরে, কিছুই ধারণা নেই আমার। কিছুটা ক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মাথার উপরের বুড়ো ওক গাছ থেকে টপ টপ করে ঝড়ে পড়ে বিকেলের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো। পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে হঠাৎ এক যুবক দাঁড়িয়ে যায়। আমার অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজ থেকেই বলে, ‘ট্যাক্সি খুঁজে দেব তোমায়?’ আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত কিছু টেপাটেপি করে জানায়, ‘মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই ট্যাক্সি এসে পড়বে। ততক্ষণ আমি তোমার সাথে আছি। আমি এখানকার টিভি স্টেশনে গ্রাফিক্সের কাজ করি। আজ আমার বিকেলের শিফটে কাজ ছিল। ফেরার সময়ে দূর থেকে দেখলাম, তুমি এখানে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তাই ভাবলাম, তোমার হয়তো কোনো সাহায্য প্রয়োজন।’ অজানা একটি দেশে এমন একজন অপরিচিত জনের কাছ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত পেয়ে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।

আলাতু স্কয়ারের কোণের দিকটায় টিউলিপের বাগান। সকালের বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে আছে আধবোজা টিউলিপের জঠরে। সেই সাথে আশেপাশে ফুটে আছে বেশকিছু ধবধবে সাদা ড্যাফোডিল। টিউলিপের বাগানের পেছনেই আইরিশ পাব। তবে সকালের দিক বিধায় পাবের দরজাটি বন্ধ। আর বাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘরের মতো দেখতে টিনের চালের লম্বা বারান্দা। বিশাল সেই চাতালে দুজন মাত্র মানুষ নানা আকারের পেইন্টিং এনে ঝুলিয়ে রাখছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেসব পেইন্টিংয়ের মাঝে লেনিন যেমন আছেন, তেমনি বেঁচে আছেন স্তালিনও। কিরঘিজ রমণীদের বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে। তবে তাদের অনেকটিতে শিল্পী নেত্রদানপর্ব সমাপ্ত করেননি। সেটি কোনো ধর্মীয় কারণে কি? এর আগে তাসখন্দে পরিচয় হওয়া একজন চিত্রশিল্পী তেমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখানে সেসব আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, যে দু যুবক ছবিগুলো চটের ছালা থেকে বের করে ঝুলিয়ে রাখার কাজ করছে, তাদেরকে মূল চিত্রকর বলে মনে হয় না। আর তাছাড়া ওরা মহাব্যস্ত। এই যে আমি খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছি, এর মাঝে কিন্তু একবারও তারা জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা কিনা। অতঃপর তাদেরকে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত রেখে আমি মূল স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705573218.jpg

কংক্রিটে ঢাকা বিশাল উন্মুক্ত সেই স্কয়ারটিকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে উঁচু বেদিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা এক বীর। এই বীর পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ ‘মানাস’-এ উল্লিখিত বীর। এই কিরঘিজ দেশটির নানা ক্ষেত্রে মানাস-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এদের এয়ারপোর্ট, এমনকি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার নামও মানাস। দূরদেশের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে কী করে বিজয়ীর বেশে ফিরেছিলেন সেই বীর, সেটি-ই কাব্যের ছন্দে শত শত বছর ধরে পঠিত হয়েছে ধূসর স্তেপের দেশ কিরঘিজস্তানে।

আজ উদ্দাম হাওয়াকে উপেক্ষা করে স্কয়ারের উন্মুক্ত স্থানটিতে বেশ কিছু লোকের সমাগম। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সামরিক বাহিনীর কসরত। তাদের দু দিকে ব্যান্ড দলের বাদ্যের তালে তালে নাচছে স্কুলের একদল কিশোর কিশোরী। কিশোরদের মাথায় ঐতিহ্যবাহী কিরঘিজ টুপি—কালপাক। তাদের কয়েক জনার হাতে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কমুজ। ত্রি-তার বিশিষ্ট কমুজ দেখতে অনেকটা গিটারের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট আর শীর্ণ। সেনা আর সেই স্কুলের কিশোর কিশোরীদের সাজ সাজ রব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনের কোনো এক দিনে হয়তো উৎসব পালনের ঘটা আছে। তাই প্রস্তুতি হিসেবেই এই মহড়া। আমি নিজেও হাওয়া উপেক্ষা করে কিছুক্ষণ শিশুদের মহড়া দেখি।

এই স্কয়ারটির পেছন দিকে একটি সবুজ উদ্যান। নাম—দুবভি পার্ক। সে উদ্যানের সমুখেই আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে সপ্রতাপে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। মধ্য এশিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র লেনিন-ভাস্কর্য। বাকিগুলোকে অনেক আগেই ধনতন্ত্রের আগমনের মধুলগ্নে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার এরা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি নিলেও বোধকরি অতীত স্মৃতিকে এক ঝটকায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পর অবধি লেনিন ভাস্কর্যটি স্কয়ারের সম্মুখ চত্বরেই ছিল। এই কিছু বছর আগে ওটিকে সরিয়ে এনে স্থান দেওয়া হয় ভবনের পেছন দিকে। লেনিনের প্রতি মানুষের মায়ামোহ এখনো যে কিছুটা টিকে আছে, তার আরেক প্রমাণ হলো—ভাস্কর্যের বেদিতে পড়ে থাকা গোলাপ আর টিউলিপের ম্লান গুচ্ছ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705392582.jpg

লেনিন ভাস্কর্যের উল্টোদিকের সেই পার্কটির একটি বেঞ্চে গিয়ে বসি। বাঁ ধারে কিরঘিজ নারীর প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্য। মধ্যবয়েসি এক নারী। মাথায় হেঁসেলের পাতিলের মতো দেখতে প্রথাগত মেয়েলি কিরঘিজ টুপি—এলিশেক। প্রায় দশ হাত দীর্ঘ সূতি কাপড় পাগড়ির মতো করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় এ টুপি। তবে বিশাল সাইজের এই কেশাচ্ছাদনকারী পরে হাঁটতে এযাবত কোনো নারীকে এ শহরে দেখিনি। হয়তো গাঁ গ্রামে এখনো এর কিছু চল থাকতে পারে। তবে পাথরের বেদির উপর সেই স্মিতহাস্যময়ী নারীর ভাস্কর্যটি দেখে আমার হঠাৎ জমিলার কথা মনে হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক চিঙ্গিস আইৎমাতভ সৃষ্ট অমর চরিত্র—জমিলা। বলা চলে, জমিলার গল্পের মাধ্যমেই এই কিরঘিজ দেশটির সাথে আমার পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জমিলার স্বামী মায়ের কাছে বৌকে রেখে ফ্রন্টে যায়। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত জমিলার সঙ্গী হয়ে থাকে বালক বয়সের দেবর। এর মাঝেই গ্রামের সমবায় ফার্মে কাজের জন্যে ডাক পড়ে তার। গ্রামের পুরুষরা যেহেতু সবাই যুদ্ধে, তাই সমর্থ নারীরা শস্যভাণ্ডার না সামলালে ফ্রন্টের সৈনিকদের মুখে খাবার জুটবে কী করে? জমিলা কাজে যোগ দেয়, সাথে বন্ধুর মতো লেগে থাকে সেই দেবরটি। এর মাঝেই সেখানে উদয় হয় জমিলার সমবয়েসী আরেক যুবক। জমিলা আর সেই যুবক দুজনেই একে অপরের প্রতি নৈকট্য অনুভব করে। আর সেভাবেই কাহিনী গড়ায়। ছোট গল্প। কিন্তু কী গভীর তার আকুতি! কিরঘিজ গ্রামীণ সমাজের সেই সময়কার চিত্রকে যেন জমিলার জীবনের কাহিনীর মধ্যদিয়েই আইৎমাতভ উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। আমি সেই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে ভাবি—তুমিই কি তবে গিরিপথ পেরিয়ে গ্রাম ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে দূর দেশে পালিয়ে যাওয়া সেই জমিলা?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705311264.jpg

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা অব্যাহত থাকায় চায়ের তেষ্টা জেগে ওঠে। আমি রাস্তা পেরিয়ে স্কয়ারের উল্টোদিকে যাই। ওদিকটাতে বেশ কিছু ক্যাফে-বেকারির দোকান আছে। বলা চলে, এ রাস্তাই শহরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। খুব বেশি দূর হাঁটতে হয় না। অল্প দূরেই লোহার দরজা ঘেরা মেট্রো পাব নজরে আসে। সেটির বাইরে চক বোর্ডে লেখা—‘তুমি+আমি+কফি= আনন্দ’। যদিও আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি আছি, কফিও হয়তো থাকবে, কিন্তু কোনো ‘তুমি’ নেই। তাই আনন্দের সঙ্কুলান হবে কিনা, জানি না। তবুও অনন্যোপায় না থাকায় সেই দশাতেই ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরটা গুমোট অন্ধকার। বাইরের দরজার সাথে মিল রেখেই চারধারে ছড়ানো লোহার টেবিল চেয়ার। সড়কের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ঘোলাটে কাচে ঢাকা। দেয়ালে টানানো নোটিশ বোর্ডে লেখা—টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। কোণের দিকটিতে বার। তবে সেটি বোধ করি জমজমাট হয়ে ওঠে আঁধার নামার পর। এই ভর দুপুরবেলায় কেই-বা এখানে মদ গিলতে আসবে? ওয়াটার এগিয়ে এলে আমি চায়ের অর্ডার করে পাশের টেবিলের দিকে তাকাই। সেখানে মাঝবয়েসী দু মার্কিন ভদ্রলোক আলাপ করছেন। নিচুস্বরে কথা বলায় তাদের আলাপন আমি ডিকোড করতে পারি না। ভাবতে থাকি এরা কি কোনো কনট্রাক্টর? একথা ভাবছি, কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে না হলেও কয়েক বছর আগ অবধি এই বিশকেক শহরটিতে আনগোনা ছিল বিপুল সংখ্যক মার্কিনীর। নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হলে তারা কিরঘিজস্তানের মানাস এয়ারপোর্টে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বানাবার জন্যে জায়গা চেয়ে বসে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকা কিরগিজস্তানের পক্ষে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে বিমান বাহিনীর লোক, তাদেরকে কেন্দ্র করে সাপ্লায়ার কোম্পানি ইত্যাদি নানা সংস্থার কাজ করা বিপুলসংখ্যক লোকেদের মচমচে পয়সায় গড়ে ওঠে এ এলাকার হোটেল, ডিস্ক, পাব, আর ক্যাফেগুলো। তবে কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নয়া কিরঘিজ সরকারের চাপে মার্কিন বিমান বাহিনী এখানকার ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিদেয় নিলে মাথায় হাত পড়ে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের। তারা সরকারের কাছে আর্জি জানায়—ফিরিয়ে আনুন আবার সেই মার্কিনীদের। নয়তো আমরা চলব কী করে? তাদের এই উদ্বিগ্নতার হেতুটা আমি বুঝি। এ পর্যন্ত বিশকেক শহরের নানা পথে হেঁটে যতদূর বুঝেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরুবার পর এখানকার নতুন কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। বিদ্যুৎচালিত যে সরকারি বাসগুলো রাস্তায় চলছে সেগুলো রঙচটা, লক্কড়-ঝক্কর মার্কা। রাস্তায় এখানে-ওখানে খানাখন্দ। রাজধানীর পাড়াগুলো শ্রীহীন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা উষর, চাষাবাদ-অনুপযোগী। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে একটি ছোট সোনার খনি। ভারি শিল্প নেই বললেই চলে। সে কারণেই দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ছুটে যায় রাশিয়ায়। অর্থনীতির এমন একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় মার্কিন ঘাঁটির প্রস্থানে তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিচলিত না হয়ে পারেনি। তবে ঘাঁটিটি গুটিয়ে নিলেও সব কর্মকাণ্ড হয়তো পুরোপুরি বিদেয় নেয়নি। কিছু কনট্রাক্টর, কিছু ফড়ে দালাল হয়তো এখনো রয়ে গেছে। অদূরের টেবিলে ভুঁড়ি ঠেকিয়ে বসা সেই দুই মার্কিনী তেমন কেউ কিনা কে জানে!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563704741206.jpg

ওয়েটার চা এনে রেখে যায়। চায়ের প্লেটে দুধবিহীন লিকার চায়ের পাশে রাখা থাকে মুসুম্বির কয়েকটি টুকরো। আমি সেই টুকরো দুটোকে চায়ে ভাসিয়ে দিই। সেই সাথে ভাবতে থাকি—দুপুরের খাবারটা সারা যায় কোথায়? খাবার নিয়ে এ অঞ্চলে বেশ হুজ্জতে পড়েছি। ইংরেজি জানা লোক এখানে নেই বললেই চলে। সবজি চাইলে এনে দেয় মাংস, আর মাংস চাইলে এনে দেয় সবজি। যেটা বুঝলাম, নিজের ইচ্ছেমতো খাবার চাইলে এ দেশে আসবার আগে টুকিটাকি রুশ শিখে আসাটা বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, এরা কিন্তু এখনো রুশ ভাষাকেই ধরে রেখেছে। আর এদের বর্ণমালাও সিরিলিক বর্ণমালা।

কফি পান শেষে আমি এগলি-ওগলি হেঁটে হায়াত রিজেন্সি হোটেলটা খুঁজতে থাকি। না, এ গরিব বান্দার সেখানে ওঠবার মতো সামর্থ্য নেই। আমি আসলে ওটি খুঁজছি, কারণ এর ঠিক পেছনেই নাকি কিরঘিজ জাতীয় নাট্যশালা। সেখানে যাবার কারণ আছে। সকালে হোটেলের খাবার ঘরে প্রাতরাশ সারার পর বেরিয়ে আসার সময়ে শুনছিলাম ম্যানেজার মেয়েটি কাকে যেন বলছে—আজ এখানে বিরাট অপেরা কনসার্ট হবার কথা। ভিয়েনা থেকে এদ্রিয়ান আর হাইদেমারিয়া নামক দুজন স্বনামধন্য শিল্পী আসবেন। সাথে থাকবে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রীদের একটি দল। তারা বাজাবেন—পিয়ানো, চেলো, ভায়োলিন আর বাস। অপেরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় গানের সুরের সাথে কোনো একটি অভিনয়ও মঞ্চস্থ করেন। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্যের মতো। তবে ভিয়েনা থেকে আসা অপেরা শিল্পীরা কেবলই গাইবেন, অভিনয়ে অংশ নেবেন না। এর আগে ভিয়েনায় গিয়ে পথেঘাটে এই অপেরা কনসার্টের টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি। সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকেট বেচা দালালদের মতোই ওখানকার থিয়েটারগুলোর আশেপাশের রাস্তায় আছে বেশ কিছু টিকেটবিক্রেতা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে তাদের অনেকের পরনে পুরনো আমলের ঝলমলে পোশাক। এমন কয়েকজনের কাছে টিকেটের মূল্য শুনে আমার একেবারে অক্কা পাবার দশা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ ইউরোর নিচে ভালো কোনো টিকেটই নেই। তাই অপেরা কনসার্টের তীর্থস্থল ভিয়েনায় অবস্থানকালে সেটির সুধা আস্বাদন আর সম্ভব হয়নি। তবে সেখানকার শিল্পীরা এখানে এসে অনুষ্ঠান করায় আমি অনুমান করি—টিকেটের মূল্য হয়তো তেমন একটা আকাশচুম্বী হবে না। ম্যানেজার মেয়েটিকে কোথা থেকে টিকেট কাটা যায়, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সে কিছুটা তাগিদের কণ্ঠে জানায়, “আজ রাতের এই শো যদি ধরতে চাও, তাহলে তোমাকে দুপুরের মধ্যে গিয়ে টিকেট কেটে আসতেই হবে। শোয়ের ঠিক আগে ওখানে টিকেট পাবে না।” মেয়েটির সেই কথাকে আমলে নিয়েই আমার এই নাট্যশালা খুঁজতে পথে নামা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705117000.jpg

গথিক স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল সেই নাট্যশালাটি দু গলি পরেই পেয়ে যাই। চূড়োতে এখনো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাওয়া তারাটি দেখেই বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি সোভিয়েত সময়ের অবদান। সামনের বারান্দায় উঠে দেখি, সেখানে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে ভেতরের প্যাসেজে জ্বলতে থাকা ঝাড়বাতির আলোকছটা। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে ভেতরে যাবার মুখে কাঠের ভারি দরজাটির হাতলে চাপ দিই। কিন্তু সেটি আমার প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। আমি বুঝে যাই, সন্ধ্যের আগে এই দোর খুলবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে টিকেট পাব কোথায়? নাকি এতটা পথ এসে আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হবে? সেই সময়ে খেয়াল করি, বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে দু পাল্লার জানালা। একটি পাল্লা খোলা, অপরটি বন্ধ। মুখে হাসি ফুটে ওঠে আমার, টিকেটের একটা বন্দোবস্ত হয়তো হয়ে গেল।

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র