Alexa

অবশেষে নতুন ‘পোয়েট লরিয়েট’!

অবশেষে নতুন ‘পোয়েট লরিয়েট’!

ব্রিটেনের রাজকীয় 'পোয়েট লরিয়েট' হলেন আর্মিটেজ (বামে), অসম্মতি জানালেন ইমতিয়াজ (ডানে)/ ছবি: সংগৃহীত

তার কবিতা ব্রিটেনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্য। লাহোরে জন্ম হলেও আশৈশব বসবাস বিলাতে। তিনি একজন নেতৃস্থানীয় কবি তবু পদমোহহীন। পোস্টট্রুথ, পোস্ট-মর্ডান লম্বিত পরিস্থিতিতে প্রকৃতই কবি তিনি। বলেছেন, ‘‘I had to weigh the privacy I need to write poems against the demands of a public role.’ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া কবির নাম ইমতিয়াজ ধরকর।

পদটি গ্রহণ করলে অবলীলায় তিনি তৈরি করতে পারতেন একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড। হতে পারতেন প্রথম এশীয় হিসেবে ব্রিটেনের রাজকবি বা ‘পোয়েট লরিয়েট’। হলেন না। তাতে কী! পদ, পদবী, পদক না নেওয়াই যে এখন সম্মানের, আলতো করে এই সত্যটি বুঝিয়ে দিলেন লোভেমত্ত মানুষদের।

রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ সহজ বিষয় নয়। ব্রিটেনের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজতন্ত্রের মতোই অভিজাত ও বনেদি পদটির সৃষ্টি হয়েছিল ১৬৬৮ সালে। ব্রিটিশ সম্রাট দ্বিতীয় চালর্স কর্তৃক প্রথম ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন জন ড্রাইডেন, পুরো ইংরেজি সাহিত্যের ভাণ্ডারে যিনি অনন্য কাব্যশৈলী, সুষমা ও নান্দনিক প্রকাশের জন্য বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

সপ্তদশ শতকে সৃষ্ট রাজকীয় পদটি তারপর থেকে এখনো সক্রিয়। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের সুদীর্ঘ সময়কালে এ পদে অভিষিক্ত হয়েছেন ব্রিটেনের বহু নামীদামী কবি, যারা বিশ্বসাহিত্যেরও একেকটি অমূল্য রত্ন। তালিকায় ছিলেন রবার্ট সার্ডি, ওয়াডর্সওয়ার্থ, টেনিসন, রবার্ট ব্রিজেস, সেলিল ডে লুইস, টেড হিউজ, অ্যান্ডু মোশন প্রমুখ।

ব্রিটেনের সর্বশেষ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ ক্যারল অ্যান ডাফি। ২০০৯ সালে দায়িত্ব পেয়ে এই ২০১৭ সালের মে মাসে তিনি মেয়াদ শেষ করেন। তখনই পরবর্তী রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য অনুসন্ধান শুরু হয়। সাধারণত এ পদের জন্য সমকালীন কবিদের মধ্যে যথাযোগ্য কাউকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

তবে এবারই প্রথম আলোচনার সবচেয়ে শীর্ষে অ্যাংলো-পাকিস্তানি কবি ইমতিয়াজ ধরকরের নাম চলে আসে ব্রিটেনের রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য। তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয় এবং সম্মতি চাওয়া হয়। কিন্তু খোদ কবি জানিয়ে দেন নিজের অসম্মতি। পরিস্কার ভাষায় অপারগতা প্রকাশ করেন রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ গ্রহণের ব্যাপারে।

রাষ্ট্রাচার বা প্রটোকল মেনে গ্রেট ব্রিটেনে ‘পোয়েট লরিয়েট’ কাউকে না কাউকে করতে হবে, এটাই শতবর্ষের দস্তুর। ইমতিয়াজ ধরকরের অসম্মতির পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে একজনকে খুঁজে বের করেছেন এ পদের জন্য এবং তিনিও যথারীতি গ্রহণ করেছেন ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ। যদিও কয়েক সপ্তাহ অনিশ্চিত ছিল ক্যারল অ্যান ডাফি-র পর কে হবেন ইউনাইটেড কিংডমের পরবর্তী ‘পোয়েট লরিয়েট’। সেই অনিশ্চয়তারও অবসান হয়ে গ্রেট ব্রিটেনে অবশেষে পাওয়া গেলো ‘পোয়েট লরিয়েট’।

সমকালীন ব্রিটিশ কবি সাইমন আর্মিটেজ নির্বাচিত হয়েছেন সম্মানীয় রাজকীয় কবি বা ‘পোয়েট লরিয়েট’ হিসেবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নিজেই ফোন করে আর্মিটেজের সঙ্গে আলাপ করে পুরো প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করেন। আর্মিটেজ নিজেও কবি হিসেবে সে দেশে যথেষ্ট প্রভাবশালী ও সম্মানীত। বহু পুরস্কারে ভূষিত এই কবি পেয়েছেন ‘কুইন্স গোল্ড মেডাল ফর পোয়েট্রি’র মতো রাজকীয় খেতাব। ২০১০ সালে তাকে দেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত সম্মানজনক সিবিই (কমান্ডার অব দ্যা অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) উপাধি।

ইমতিয়াজ ধরকর যেমন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানিত হয়েছিলেন, আর্মিটেজকে ২০১৫ সালে আরেক বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রফেসর অব পোয়েট্রি’ পদে গ্রহণ করেছিল। ফলে কেউ কারো চেয়ে কম যান না। পার্থক্য একটাই, নীতিগত প্রশ্নে ইমতিয়াজ যেখানে ‘না’ বলেছেন, আর্মিটেজ সেখানে বলেছেন সম্মতিসূচক বাক্য। এতে কারোই কবিকৃতির হ্রাস-বৃদ্ধি না হলেও বিষয়টি কাব্য-সাহিত্যের ইতিহাসে তো বটেই, গ্রেট ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘পোয়েট লরিয়েট’ প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকবে।

গ্রেট ব্রিটেনে ‘পোয়েট লরিয়েট’ আসলে একটি ‘রাজসম্মান’। সদ্য-বিগত ‘পোয়েট লরিয়েট’ ক্যারল অ্যান ডাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি রাজপরিবারের বন্দনা করে এবং রাজকীয় ঘটনাবলীকে মর্যাদা জানিয়ে তেমন কিছুই তার কবিতায় আনেননি। যদিও ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের শর্তে এমন কিছু নেই যে, মনোনীত কবিকে ‘রয়্যাল ইভেন্ট’ নিয়ে লিখতেই হবে। রাজ-বন্দনার অফিসিয়েল বাধ্যবাধকতার কথাও কাগজে-পত্রে উল্লেখ নেই। কিন্তু ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদাধিকারীকে ঐতিহ্য মেনে কিছু ভালো কথা ও প্রশংসা-বাক্য রাজা, রানি ও রাজপরিবার সম্পর্কে বলার ও লেখার রেওয়াজকেও অস্বীকার করা যায় না।

ইমতিয়াজ ধরকর কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ না নিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকির দিকগুলোকে সরাসরি এগিয়ে গেলেন। সাইমন আর্মিটেজ বিষয়টিকে সহজভাবেই নিয়েছেন। বলেছেন: ‘‘It is still a royal appointment…but I think it’s become a much more every day, commonplace, domestic activity now in the workplace of poetry and not just something that’s seen as it was in the old days as a duty or a requirement or an invitation to write about royal occasions.’’

ইতিহাসই বলতে পারবে, কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন: সাইমন আর্মিটেজ নাকি ইমতিয়াজ ধরকর?

আপনার মতামত লিখুন :