অবশেষে নতুন ‘পোয়েট লরিয়েট’!



ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
ব্রিটেনের রাজকীয় 'পোয়েট লরিয়েট' হলেন আর্মিটেজ (বামে), অসম্মতি জানালেন ইমতিয়াজ (ডানে)/ ছবি: সংগৃহীত

ব্রিটেনের রাজকীয় 'পোয়েট লরিয়েট' হলেন আর্মিটেজ (বামে), অসম্মতি জানালেন ইমতিয়াজ (ডানে)/ ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

তার কবিতা ব্রিটেনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্য। লাহোরে জন্ম হলেও আশৈশব বসবাস বিলাতে। তিনি একজন নেতৃস্থানীয় কবি তবু পদমোহহীন। পোস্টট্রুথ, পোস্ট-মর্ডান লম্বিত পরিস্থিতিতে প্রকৃতই কবি তিনি। বলেছেন, ‘‘I had to weigh the privacy I need to write poems against the demands of a public role.’ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া কবির নাম ইমতিয়াজ ধরকর।

পদটি গ্রহণ করলে অবলীলায় তিনি তৈরি করতে পারতেন একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড। হতে পারতেন প্রথম এশীয় হিসেবে ব্রিটেনের রাজকবি বা ‘পোয়েট লরিয়েট’। হলেন না। তাতে কী! পদ, পদবী, পদক না নেওয়াই যে এখন সম্মানের, আলতো করে এই সত্যটি বুঝিয়ে দিলেন লোভেমত্ত মানুষদের।

রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ সহজ বিষয় নয়। ব্রিটেনের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজতন্ত্রের মতোই অভিজাত ও বনেদি পদটির সৃষ্টি হয়েছিল ১৬৬৮ সালে। ব্রিটিশ সম্রাট দ্বিতীয় চালর্স কর্তৃক প্রথম ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন জন ড্রাইডেন, পুরো ইংরেজি সাহিত্যের ভাণ্ডারে যিনি অনন্য কাব্যশৈলী, সুষমা ও নান্দনিক প্রকাশের জন্য বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

সপ্তদশ শতকে সৃষ্ট রাজকীয় পদটি তারপর থেকে এখনো সক্রিয়। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের সুদীর্ঘ সময়কালে এ পদে অভিষিক্ত হয়েছেন ব্রিটেনের বহু নামীদামী কবি, যারা বিশ্বসাহিত্যেরও একেকটি অমূল্য রত্ন। তালিকায় ছিলেন রবার্ট সার্ডি, ওয়াডর্সওয়ার্থ, টেনিসন, রবার্ট ব্রিজেস, সেলিল ডে লুইস, টেড হিউজ, অ্যান্ডু মোশন প্রমুখ।

ব্রিটেনের সর্বশেষ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ ক্যারল অ্যান ডাফি। ২০০৯ সালে দায়িত্ব পেয়ে এই ২০১৭ সালের মে মাসে তিনি মেয়াদ শেষ করেন। তখনই পরবর্তী রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য অনুসন্ধান শুরু হয়। সাধারণত এ পদের জন্য সমকালীন কবিদের মধ্যে যথাযোগ্য কাউকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

তবে এবারই প্রথম আলোচনার সবচেয়ে শীর্ষে অ্যাংলো-পাকিস্তানি কবি ইমতিয়াজ ধরকরের নাম চলে আসে ব্রিটেনের রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য। তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয় এবং সম্মতি চাওয়া হয়। কিন্তু খোদ কবি জানিয়ে দেন নিজের অসম্মতি। পরিস্কার ভাষায় অপারগতা প্রকাশ করেন রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ গ্রহণের ব্যাপারে।

রাষ্ট্রাচার বা প্রটোকল মেনে গ্রেট ব্রিটেনে ‘পোয়েট লরিয়েট’ কাউকে না কাউকে করতে হবে, এটাই শতবর্ষের দস্তুর। ইমতিয়াজ ধরকরের অসম্মতির পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে একজনকে খুঁজে বের করেছেন এ পদের জন্য এবং তিনিও যথারীতি গ্রহণ করেছেন ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ। যদিও কয়েক সপ্তাহ অনিশ্চিত ছিল ক্যারল অ্যান ডাফি-র পর কে হবেন ইউনাইটেড কিংডমের পরবর্তী ‘পোয়েট লরিয়েট’। সেই অনিশ্চয়তারও অবসান হয়ে গ্রেট ব্রিটেনে অবশেষে পাওয়া গেলো ‘পোয়েট লরিয়েট’।

সমকালীন ব্রিটিশ কবি সাইমন আর্মিটেজ নির্বাচিত হয়েছেন সম্মানীয় রাজকীয় কবি বা ‘পোয়েট লরিয়েট’ হিসেবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নিজেই ফোন করে আর্মিটেজের সঙ্গে আলাপ করে পুরো প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করেন। আর্মিটেজ নিজেও কবি হিসেবে সে দেশে যথেষ্ট প্রভাবশালী ও সম্মানীত। বহু পুরস্কারে ভূষিত এই কবি পেয়েছেন ‘কুইন্স গোল্ড মেডাল ফর পোয়েট্রি’র মতো রাজকীয় খেতাব। ২০১০ সালে তাকে দেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত সম্মানজনক সিবিই (কমান্ডার অব দ্যা অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) উপাধি।

ইমতিয়াজ ধরকর যেমন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানিত হয়েছিলেন, আর্মিটেজকে ২০১৫ সালে আরেক বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রফেসর অব পোয়েট্রি’ পদে গ্রহণ করেছিল। ফলে কেউ কারো চেয়ে কম যান না। পার্থক্য একটাই, নীতিগত প্রশ্নে ইমতিয়াজ যেখানে ‘না’ বলেছেন, আর্মিটেজ সেখানে বলেছেন সম্মতিসূচক বাক্য। এতে কারোই কবিকৃতির হ্রাস-বৃদ্ধি না হলেও বিষয়টি কাব্য-সাহিত্যের ইতিহাসে তো বটেই, গ্রেট ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘পোয়েট লরিয়েট’ প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকবে।

গ্রেট ব্রিটেনে ‘পোয়েট লরিয়েট’ আসলে একটি ‘রাজসম্মান’। সদ্য-বিগত ‘পোয়েট লরিয়েট’ ক্যারল অ্যান ডাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি রাজপরিবারের বন্দনা করে এবং রাজকীয় ঘটনাবলীকে মর্যাদা জানিয়ে তেমন কিছুই তার কবিতায় আনেননি। যদিও ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের শর্তে এমন কিছু নেই যে, মনোনীত কবিকে ‘রয়্যাল ইভেন্ট’ নিয়ে লিখতেই হবে। রাজ-বন্দনার অফিসিয়েল বাধ্যবাধকতার কথাও কাগজে-পত্রে উল্লেখ নেই। কিন্তু ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদাধিকারীকে ঐতিহ্য মেনে কিছু ভালো কথা ও প্রশংসা-বাক্য রাজা, রানি ও রাজপরিবার সম্পর্কে বলার ও লেখার রেওয়াজকেও অস্বীকার করা যায় না।

ইমতিয়াজ ধরকর কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ না নিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকির দিকগুলোকে সরাসরি এগিয়ে গেলেন। সাইমন আর্মিটেজ বিষয়টিকে সহজভাবেই নিয়েছেন। বলেছেন: ‘‘It is still a royal appointment…but I think it’s become a much more every day, commonplace, domestic activity now in the workplace of poetry and not just something that’s seen as it was in the old days as a duty or a requirement or an invitation to write about royal occasions.’’

ইতিহাসই বলতে পারবে, কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন: সাইমন আর্মিটেজ নাকি ইমতিয়াজ ধরকর?

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

আমেরিকার নামজাদা এই ক্যাম্পাস সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা পড়তে এসেছে, তারা কেউ জীবনে নিজের চোখে রংধনু দেখে নি। এক উইকঅ্যান্ডে হাউস টিচার ম্যারি মার্গারেট নিকটবর্তী এক ঝর্ণার পাশে উপত্যকায় শিক্ষার্থী দলটিকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তথ্যটি জানতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবাই একটু বিষণ্ণভাবে অসম্মতিতে মাথা নাড়ায়। শিক্ষার্থীদের কেউ নবাগত ফরাসি, কেউ অভিবাসী ইহুদি, কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজি। সবাই বড় হয়েছে নাগরিক ঘেরাটোপে ও জাগতিক কোলাহলে। সবার উত্তরের মর্মার্থ হলো, “সত্যি রংধনু তো দেখিনি কখনও! স্টিল ছবি দেখেছি। আর কখনো কখনো ইউটিউবে ক্লিপ।”

ম্যারি বাচ্চাদের দোষ দেন না। কত কষ্ট করে প্রতিযোগিতায় টিকে ওরা পড়তে এসেছে বিশ্বের লিডিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকদের জীবন-সংগ্রামের সমান্তরালের কঠিন পরিস্থিতিতে বইপত্র নিয়ে পড়াশুনার সময় পেয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে তাকানোর ফুসরত পেয়েছে কমই। তাছাড়া প্রকৃতির নানা দিক ওরা দেখবেই-বা কী করে? এই পোড়া পৃথিবীতে কি আর আকাশ আছে? সবুজ আছে? রক্ষা পাচ্ছে প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য? নিজের মনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে ম্যারি রাচ্চাদের দোষ দিতে পারেন না।  

ম্যারি খেয়াল করেন, রংধনু দেখতে না পারার জন্য কেউই বিশেষ দুঃখিত নয়। তবু তিনি রেইনবো ইস্যুটি তাদের মগজের ভাঁজে রাখতে চান। তিনি জানেন, প্রকৃতি ও নিসর্গের নানা প্রপঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ইমাজিনেশন ও ভিজ্যুয়াল পাওয়ার বাড়াবে। তিনি সবাইকে কাছে ডেকে আনেন। কথা দেন একদিন রংধনু দেখাবেন। “একটা মজার বিষয় জেনো রাখো। রংধনুর শুরু আর শেষ দেখা যায় না, সেগুলো থাকে বাড়ি কিংবা গাছের আড়ালে। মনে থাকবে?” ম্যারির প্রশ্নে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 

শেষ বিকেলে ফিরে আসার পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকেন ম্যারি। এই সামারে দিন অনেক বড়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আকাশ স্বচ্ছ। তিনি জানেন, বর্ষা না এলে রংধনু দেখা অসম্ভব। তবু তিনি যেন আনমনে দিগন্তের কোণে কোণে রংধনু খোঁজেন।

রংধনুর সঙ্গে ম্যারি সম্পর্কটাই বেশ অদ্ভুত। কিছুটা নস্টালজিক আর কিছুটা সুপারন্যাচারাল। নিজের দেশের চেয়ে অনেক বেশি রংধনু তিনি দেখতে পেয়েছেন বিদেশের নানা স্থানে। একবারও প্ল্যান করে রংধনু দেখেন নি তিনি। রংধনু নিজেই নিজের খেয়ালে এসে ধরা দিয়েছে তার চোখে। ম্যারি নিজের ঘরের সীমানা পেরিয়ে চরাচরের আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে তন্ময় হয়ে থাকেন রংধনুর সাত রঙে।

“খেতে এসো।”

ডাইনিং টেবিল সাজাতে সাজাতে মৃদ্যু কণ্ঠে ডাক দেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা। ধ্যান-ভেঙে ম্যারি জানলার পাশ থেকে ডাইনিং স্পেসে চলে আসেন। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার দুনিয়ায়। দিন শেষে মায়ের আশ্রয়ে ম্যারি পুনর্জন্ম লাভ করেন। মায়ের হাত চেপে তিনি একটি চেয়ারে বসেন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল জীবন পেরিয়ে আসা ষাটের কাছাকাছি বয়সের দ্বারপ্রান্তের এক ক্লান্ত রমণীর মতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেকগুলো বছর একা থাকতে থাকতে যখন অস্থির ও দিশাহীন অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ম্যারি, তখনই মা এসে তার পাশে পাহাড়ের মতো অটল আস্থায় দাঁড়ান। সারাদিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বাকীটা সময় মা তার জীবনের চৌহদ্দী ও সাহস। অথচ একসময় তারও জীবন ছিল রংধনু রঙে রাঙা, যখন ক্যাভিন ছিল পাশে আর টমাস কোলে। এখন সবাই যার যার জীবনের বিবরে আবদ্ধ। সবাই সবার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। বিশাল আকাশের গভীরে রংধনুর রঙগুলোর মতো লুকিয়ে রয়েছে সবাই। কেউ কারো পাশাপাশি আসতে পারছে না। বৃষ্টি শেষে রংধনুর মতো খানিকক্ষণের জন্যেও দেখা হয় না ম্যারি আর তার জীবনের একদা রঙিন মানুষগুলোর সঙ্গে।    

অন্যমনস্ক ম্যারিকে দেখতে দেখতে মেয়ের মনের মধ্যে চাপা বেদনা টের পান মিসেস অ্যানি গিলবার্ট। চেষ্টা করেন কথা বলে সান্তনা দিতে।

“ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না।”

“হবে কেমন করে? যেমন বাপ তেমনই ছেলে। কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।”

মায়ের ক্ষোভ সঙ্গত। তবু সায় দিতে মন মানে না ম্যারির। ক্যাভিন তো এমনই। চরম বোহেমিয়ান। কখন কোথায় থাকবে, সে নিজেও জানে না। বাতাসের ঝাপ্টায় বেসামাল একখণ্ড ভাসমান মেঘের মতো আকাশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার স্বভাব। নিয়তিও তাকে তেমনই ভানিয়ে বেড়াচ্ছে। তবুও ভেসে ভেসেই জীবন তাদেরকে নিয়ে যৌথতায় বেশ চলছিল। ক্যাভিন একদিন বললো, “তুসি স্থিত হও। আমার মতো ঠিকানাবিহীন হলে তোমার চলবে না।” ততদিনে টমান এসে গেছে। ম্যারির মাতৃত্ব ও নারীত্ব একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছিল মনে মনে। ক্যাভিন তার ইচ্ছের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলে, “কিন্তু আমি তো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারবো না। তুমি বরং নিজের মতো শুরু করো। আমার শুভেচ্ছা থাকেবে।”

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ক্যাভিনের দেখা নেই। নেই মানে নেই। ঘরে নেই, আশেপাশে কোথাও নেই। রাতে বিছানা ঠিক করতে গিয়ে বালিশে চাপা ক্যাভিনের চিঠিটি হাতে আসে ম্যারির। চিঠির ভাষ্য অতি সংক্ষিপ্ত। “প্রকৃত অর্থে সঙ্গে না থেকে তোমাকে আটকে রাখা অনৈতিক। সেপারেশন ইউলে সাইন করে দিলাম। আর ব্যাঙ্কের নমিনি। আশা করি মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হবে।”

ম্যারি জানতেন ক্যাভিনের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সেতুতে ঝুঁলে থাকা, মাঝরাতের অন্ধকারে প্যাসিফিকে সুইমিং করা, হিমালয়ের কোনো গুহায় একাকী কয়েকদিন ধ্যানমগ্ন হওয়া তার কাছে নস্যি। এতো কমিটেড প্রেম, যৌথজীবন, এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি হাওয়া হয়ে গিয়েছে ক্যাভিন। সদ্যজাত পুত্র টমাসের জন্যেও বিন্দুমাত্র পিছুটান অনুভব করে নি লোকটি। রাগে, ক্ষোভে, প্রত্যাখ্যানের অপমানে সারা রাত ঘুমাতে পারে নি ম্যারি। যদিও জানে কোনো ফল হবে না, তবু ছোট্ট ক্যাম্পাস টাউনের আনাচেকানাচে দিনভর ক্যাভিনের খোঁজ করেন ম্যারি। না, তার কোনো খোঁজ নেই। তার গতিবিধির সন্ধানও কেউ জানে না। যদি মন চায়, হয়ত ক্যাভিন নিজেই জানাবে তার হদিস। শত চেষ্টা করেও ম্যারি আর তার কোনো খোঁজ পাবে না। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোও জানাতে পারবে না। ক্যাখিনের খোঁজে ব্যর্থ হয়ে ম্যারি দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে চরম হতাশায়। এসেই মনে হয়, পুরো বাড়িটা বড্ড হাহাকার করছে। ঘরগুলো খুবই ফাঁকা আর দমবন্ধ মনে হয় তার। টমাসকে কোলে নিয়ে তিনি চলে আসেন বাড়ির লনে। সাজানো বাগানের মধ্যে একটা লম্বা পাইন ম্যারির খুব প্রিয়। ক্যাভিনকে নিয়ে রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি নিঃসঙ্গ পাইনের কাছে। বিচ্ছেদ বেদনা নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পাইনের নিচে বসে থাকেন।

রাতের আকাশে রংধনু থাকার কথা নয়। তবু মাঝরাতের দিকে ম্যারির মনে হয় তিনি যেন আবছা আলোয় একটি অস্পষ্ট রংধুন দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি রঙিন আলোর জগতকে ছুঁতে পারছেন না। যন্ত্রণার বুক-চাপা কষ্টে আস্ত একটি রাত নির্ঘুম কেটে যায় তার জীবন থেকে। তিনি অনুভব করেন, প্রিয় মানুষের অভাবে এমন অনেক ঘুমহীন রাত তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করবে। তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে নিঃসঙ্গ ও একেলা। ঠিক যেন বাগানের সঙ্গীবিহীন পাইন গাছের মতো।   

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস



মো. তাহমিদ হাসান
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস

  • Font increase
  • Font Decrease

 

 বইয়ের নাম: রাইফেল, রোটি, আওরাত

লেখক: আনোয়ার পাশা

প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ

ধরণ: মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস

পৃষ্ঠা: ১৮০ পেজ

পারসোনাল রেটিং কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে কখনো দেই না। কলমের কালি যেমন পবিত্র তেমনি বইয়ের অক্ষরও আমার কাছে পবিত্র৷ বইটি পড়ে কারো একঘেয়েমি লাগবে এইটুকু নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। কিন্তু ইতিহাস-অন্বেষী সিরিয়াস পাঠক অবশ্যই প্রীত হবেন।

শহীদ অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ১৯২৮ সালের ১৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি ও কথাসাহিত্যিক। লেখক একাত্তরের কালোরাত্রি ২৫শে মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রক্তাক্ত ছোবল থেকে বেঁচে বের হতে পারলেও একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আল বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রথম উপন্যাস রাইফেল, রোটি, আওরাত। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে যখন পাকিস্তানের বাহিনী বাংলার ঘুমন্ত মানুষের উপর গুলিবর্ষণ করে, সেই সময়ের জীবন্ত চিত্র লেখক তাঁর বইয়ে তুলে ধরছেন।

সেই কালো রাতের ভয়ানক বর্ণনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহীনের চরিত্রে লেখক নিজকে তুলে ধরছে। "বাংলাদেশে নামল ভোর"- এই উক্তি দিয়ে লেখক উপন্যাসটি শুরু করে। ভয়ানক কালোরাত পেরিয়ে যখন ভোর নামল তখন জানালায় বাইরের অগণিত লাশ দেখে নিজের বেঁচে থাকার অস্তিত্ব দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে যান। আর পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের স্বাধীন ও লড়াকু আত্মপ্রকাশকে প্রত্যক্ষ করেন অরুণালোকিত ভোরের প্রতীকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে নরযজ্ঞ হত্যার বর্ণনা তুলে ধরছেন তিনি মর্মস্পর্শী ভাষায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালিয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডা. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুর, ডা. ফজলুর রহমান, ডা. মুকতাদিরসহ অসংখ্য শিক্ষকে সেই কালোরাত্রে হত্যার ঘটনাও লেখক তুলে ধরেন।

নরহত্যার পাশাপাশি দোকান, ঘরবাড়ি লুটপাট সহ ঘুমন্ত মানুষের বসতবাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনাও সেই কালোরাত্রির চিত্রে ফুটে উঠে লেখকের কুশলী কলমে। এক স্থানের মানুষ অন্য জায়গাকে নিরাপদ মনে করে অন্যত্র চলে যেতো, কিন্তু পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের উপরই পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ বহমান ছিল। সেই সময়ে কোনো স্থানেই নিরাপদ ছিল না।

ফিরোজ চরিত্রের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তাৎকালীন ভূমিকাগুলো উল্লেখ করছেন তিনি। পঁচিশে মার্চ হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর বাংলার সমগ্র মানুষ নিজের চিন্তার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বেঁচে থাকা নিয়েও শঙ্কায় ছিলেন। লেখক এই উপন্যাসে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তার হওয়ার কারণটিও সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে ধরছেন।

পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি জামায়তে ইসলামী এই বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়েছে। তারা বাঙ্গালী নামক জাতিসত্তার অস্তিত্বকে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য যে ছোবল হেনেছিল, তার আখ্যানও উপন্যাসে লেখক সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বের ইতিহাস যদি আজকের প্রজন্ম না জানে তাহলে একসময় নতুন প্রজন্মের কাছে রক্ত দিয়ে কেনা এই দেশ মূল্যহীন হয়ে যাবে৷ ইতিহাসের পাঠক আমাদের নতুন প্রজন্মে অনেকটাই কম, তাই উপন্যাস বা গল্পের মাধ্যমে যখন ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়, তখন সেটি পাঠক খুব স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে পাঠ ও আত্মস্থ করে। লেখক আনোয়ার পাশা নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কাহিনীগুলোই সুদীপ্ত শাহীন চরিত্র তথা রাইফেল, রোটি, আওরাত বইয়ে তুলে ধরছেন, যা মহান মুক্তিযুদ্ধের এক দীপ্তিময় দলিল।

[ মো. তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ]

;

গ্রন্থ সমালোচনা: ‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’



প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুকে নিয়ে যতগুলো গ্রন্থ বের হয়েছে, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হচ্ছে: ‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’। সুসম্পাদিত এ গ্রন্থখানি সম্পাদনা করেছেন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। গ্রন্থটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুটো ভাষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের ৫১টি প্রবন্ধ রয়েছে। ছড়া-কবিতা রয়েছে দশটি ও গান রয়েছে দুটি। একটি প্রামাণ্য ঘটনাপ্রবাহ রয়েছে। পাশাপাশি চারটি সাক্ষাৎকার রয়েছে এবং অ্যালবামে বেশকিছু দুর্লভ চিত্র রয়েছে।

গ্রন্থখানি ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে পাঠকদের কাছে হৃদয়গ্রাহী হয়ে ধরা দেয়। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাঙালি জাতির সৃজনশীল ও ধীশক্তিসম্পন্ন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অসামান্য নেত্রী। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি পদ্মা সেতু নির্মাণের কারিগর ও স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি বলেছেন যে, ‘বাঙালি জাতি বীরের জাতি। বাঙালি ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে রঞ্জিত হয়েছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনেক রক্তধারায়’ (পৃ: ২৮)।

একটি কথা না বললেই নয়, বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানের সংস্কার প্রয়োজন। যেমন- অভিধান অনুসারে আজকাল উপলক্ষকে লেখা হয় উপলক্ষ্য। জোর দাবি জানাব, বাংলা একাডেমি বাংলা অভিধানের সংস্কার সাধন করা হোক। এ জন্য নতুন করে সংশোধনী কমিটি তৈরি করা উচিত।

এস এ মালেকের প্রবন্ধ ‘ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতু’ অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে লিখেছেন যে, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র পরাভূত হয়’ (পৃ: ৪৪)। প্রফেসর আব্দুল খালেকের সময়োপযোগী উচ্চারণ, ‘আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাঙালির গর্বের আরেকটা নতুন সংযোজন পদ্মা সেতু’ (পৃ: ৫৪)।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মন্তব্য করেছেন যে, ‘বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ এবং বাংলার মানুষের মর্যাদা উত্তরোত্তর আরও সমুন্নত হোক’ (পৃ: ৬৮)। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উল্লেখ করেছেন যে, ‘এ দেশ নিজের অর্থায়নে এত বিশাল সেতু নির্মাণ করতে পারলে ধীরে ধীরে আরও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিজ অর্থেই সম্পন্ন করতে পারবে’ (পৃ: ৯২)।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন যথার্থ অর্থে মন্তব্য করেছেন যে, ‘শেখ হাসিনা পুরো বিশ্বকে প্রমাণিত করে দিয়েছেন যে, আমরা জাতি হিসেবে কতটা শক্তিশালী’ (পৃ: ৯৯)। সৈয়দ আবুল হোসেন তার কর্মকাণ্ড এবং তার প্রতি অন্যায় ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে তা ৯ বছর পিছিয়ে গেল’ (পৃ: ১২৮-১২৯)।

ড. শরীফ এনামুল যথার্থ অর্থে উচ্চারণ করেছেন যে, ‘কাজেই এটা প্রমাণিত, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় শেখ হাসিনার বিকল্প নেতৃত্ব মেলা ভার’ (পৃ: ১৭২)। মোশারফ হোসেন ভুইয়ার প্রতি মিথ্যা অভিযোগের কারণে যে হেনস্তা হয়েছে সেটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ষড়যন্ত্রকারীরা কখনো থেমে থাকে না। তাই তো দেখা যায় যে, সুভাষ সিংহ রায় তার প্রবন্ধে যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, ‘দেশের মানুষ দেখেছে, পদ্মা সেতু নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হয়েছে, বাধা এসেছে; শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়েছে’ (পৃ: ২৬৪)।

নিজের প্রবন্ধটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্যে যাচ্ছি না। কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার কবিতাখানি হৃদয় ছুঁয়েছে- যার থেকে চারটি পঙক্তি পাঠকের উদ্দেশে তুলে ধরি। সোনার দেশে সোনার মানুষ উড়াল সেতু ধরি/ আসা যাওয়ার পথে কুড়ায় সোনার কড়ি/ আলোর দেশে আলোর সেতু হাসছে আঁধার চিরে/ও নদী রে, পদ্মা নদী রে/ (পৃ:৩৪৯)।

সৈয়দ আবুল হোসেনের সাক্ষাৎকারখানি তথ্যবহুল। অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার থাকলে ভালো হতো। অ্যালবামের চিত্রগুলো অত্যন্ত চমৎকার। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমানের লেখাটিও সুন্দর হয়েছে। জাতি গ্রন্থের সুসম্পাদনার জন্য এ কে আব্দুল মোমেনের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। এ গ্রন্থটির একটি ইংরেজি অনুবাদসহ বিভিন্ন ভাষায় হওয়া উচিত।

পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানের সংস্কার সাধন করা উচিত। কেবল ব্যাকরণনির্ভর অভিধান নয়। নতুন বাংলার নীতিমালা অনেক ক্ষেত্রেই বেমানান। এ বানান বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে গলার ফাঁস হচ্ছে। অথচ বাংলা একাডেমির বোধোদয় হচ্ছে না।

অভিনন্দন জানাচ্ছি এ পর্যন্ত প্রকাশিত পদ্মা সেতু নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ এ কে আব্দুল মোমেন কর্তৃক রচনা করার জন্য। সাথে সাথে সহযোগী সম্পাদকদ্বয় দেবাশীষ দেব ও ইমদাদুল হককে ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি সময়োপযোগী গ্রন্থ প্রকাশনার জন্য চন্দ্রাবতী একডেমীকে ধন্যবাদ এবং প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষকে ধন্যবাদ।

আলোচনায় দুটো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা স্মরণ করছি: ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স থেকে ‍উদ্যোক্তা অর্থনীতির ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষিকাদের নিয়ে গত বছরে ফিল্ড ট্রিপে যাই। সেখানে আমরা দেখেছি চমৎকারভাবে পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রয়াসের একটি গবেষণাপত্র তৈরি করা হয় এবং ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স হাইব্রিড পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়।

আবার চলতি বছরের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে শরীয়তপুরে প্রোগ্রাম থাকায় যেতে গেলে সাড়ে তেরো ঘণ্টা মাওয়া ঘাটে কতিপয় ফেরিঘাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত লোকদের কারণে আটকে থাকি। এমনকি রাত একটার দিকে ফেরিতে যাওয়ার সিগন্যাল দিলে পার্শ্ববর্তী গাড়িতে এসে ঠিক সন্ত্রাসীর মতো একটি কাভার্ডে এক লোক ঝাঁপিয়ে আমার ভাড়া করা গাড়িতেও থাপ্পড় মারে। আজ পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ায় সেই দুর্নীতিবাজরা তাদের ক্ষমতা দেখাতে পারবে না- যা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইতে হুঁশিয়ার করেছেন। সম্প্রতি আমার প্রিয় নেত্রীও সরকারি চাকুরেদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন।

অথচ ১৭ মার্চ ২০২২-এর সকালটি কী অপূর্ব কেটেছিল। এটিএন বাংলায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে আমার লেখা গানটি প্রচারিত হয়েছিল এবং গ্লোবাল নিউজের প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে যখন জানালাম হার্টের অসুখের কথা- ভাবলেশহীন হলো, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একই উক্তি। ধরণী দ্বিধা হও।

আসলে আমাদের উন্নয়নের রূপরেখার মালিক হচ্ছেন শেখ হাসিনা- যিনি সূর্যের আলোর মতো আলোকিত করে চলেছেন। ধন্যবাদ গ্রন্থের সম্পাদক এ কে আব্দুল মোমেনকে। গ্রন্থটি এতই চমৎকার হয়েছে যে, বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত। বাংলা একাডেমি কি পারবে এ ধরনের অনুবাদের কাজ করতে? ভুল ও সাধারণ মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধান। জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উচিত দেশের মৌখিক ভাষাকে অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।

একটি সুন্দর গ্রন্থ সম্পাদনা আমাদের মুগ্ধ করেছে। পাঠক হিসাবে হৃদয়কে সমৃদ্ধ করেছে। অভিনন্দন গ্রন্থের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। এটি একটি জাতীয় ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত হবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু শেখ হাসিনা।

‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। প্রকাশক: চন্দ্রাবতী একাডেমী, প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ, প্রকাশকাল: জুলাই, ২০২২, মূল্য: ২০০০ টাকা, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪০০।

লেখক: সমালোচক: প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী, অর্থনীতিবিদ, কথাশিল্পী, ছড়াকার ও আইটি বিশেষজ্ঞ।

;