Barta24

শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

English

নগরে দেবদূত

নগরে দেবদূত
প্রচ্ছেদ/তাসকিন আল আনাস
রেহানা বীথি


  • Font increase
  • Font Decrease

নিস্তব্ধ নির্জন রাত। আমার পতনের শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেলো রাতের বুকে। বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে উঁচু বেদিতে চালকসহ একটা ঘোড়ার গাড়ি। নিশ্চল। বুঝলাম, ওটা আসল নয়, চালকসহ ঘোড়ার গাড়ির কাঠামো। পথবাতির আলো পড়ে চকচক করছে। কে বানিয়েছে এটা? একেবারে নিখুঁত তো! তিনদিক থেকে তিনটে প্রশস্ত পথ এসে মিলেছে এখানটায়। প্রতিটি পথের মাঝেই বিভাজন রেখায় হাঁটুসমান ঘন সবুজ গাছ। নিয়ন বাতির আলোয় যেগুলো কালচে দেখাচ্ছ। কালচে দেখাচ্ছে গাছের বিপুল কৃষ্ণচূড়াগুলোকেও। এখন কি কৃষ্ণচূড়া ফোটার সময়? বিশাল পৃথিবীর মাঝারি এই নগরে এখন কোন ঋতু? কিছু দূরে কাঠগোলাপও ফুটে আছে দেখছি! একটা মিষ্টি মৃদু ঘ্রাণ প্রবেশ করলো আমার নাকে। সেখান থেকে ছড়িয়ে গেলো মস্তিষ্কের কোষে কোষে। আমি আবেশিত হলাম। ইচ্ছে করছে গান গাইতে। না না, তারচাইতেও বেশি ইচ্ছে করছে ঘুমিয়ে যেতে। আমার বাঁ হাতের ওপর ময়ূরকণ্ঠী নীল প্রজাপতিটিও বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। ওটার উড়ু উড়ু করে বসে থাকার ভাবটি নেই এখন। আমিও ক্লান্ত ভীষণ। এই তো..... ঘুমে জড়িয়ে আসছে দু'চোখ।

ভোরের আলো আসি আসি করেও আসছে না। গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি ঝরছে আকাশ থেকে। সেকারণেই যেন কুয়াশাময় চারপাশ।তবুও একটু একটু করে জেগে উঠতে চাইছে শহর। এই সামান্য বৃষ্টিতে থেমে যাবে না কিছুই। সবই চলবে আপন গতিতে। আব্দুল ওয়াহাব, একজন স্কুল শিক্ষক, সে-ও থেমে নেই। ফজরের আজানের আগেই বিছানা ছেড়েছে সে।ছোট্ট মুরগির পাতলা ঝোল আর একেবারে নরম করে একটু খিঁচুড়ি রান্না করেছে। আর করেছে পাঁচটা সেদ্ধ আটার রুটি, একটা ডিমও ভেজেছে। তারপর গোসল করে, পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে ছাতা মাথায়। তিনরাস্তার মোড়ের ওই বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে যখন সে পৌঁছালো, তখনও হালকা অন্ধকার, কুয়াশার মতো বৃষ্টি তো আছেই। তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে তাকে, না জানি মা ছেলে কী করছে! হয়তো ছেলের খিদে পেয়েছে। বলছে, মা, জলদি আমাকে কিছু খেতে দাও, অনেকদিন পর আমার খুব খুব খিদে পেয়েছে! ছেলেকে একটু নরম খিঁচুড়ি আর মুরগির ঝোল খাইয়ে ওরা মিয়াবিবিতে রুটি আর ডিমভাজি খাবে খুশিমনে। যাই তাড়াতাড়ি, আর একটু পা চালাই। একথা ভেবেই তার চোখ গেলো ঘোড়ার গাড়ির ওই বেদিটার দিকে। দেখলো, গাড়োয়ানের ঠিক পেছনেই, গাড়ির মধ্যভাগে কে যেন একজন হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। আশ্চর্য হলো আব্দুল ওয়াহাব। ওখানে তো কাউকে কখনও ঘুমাতে দেখেনি সে! আর দেখবেই বা কেন, ওটা কি ঘুমানোর জায়গা? তারওপর আকাশ থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি ঝরছে! যাক গে! ভেবেও আবার কি মনে করে এগিয়ে গেলো একটু। নজরে এলো, একটি লোক, গায়ে পাতলা ফিনফিনে নীল রঙের একটা জামা আর নিম্নাংশ আবৃত একখণ্ড সাদা কাপড়ে। লুঙির মতো। তার দু'পা ঝুলে আছে গাড়ির বাইরে। ডানহাতটাও। বাঁহাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। এবং......এবং সেই হাতে ওপর অদ্ভুত সুন্দর একটা প্রজাপতি। ময়ূরকণ্ঠী নীল তার রঙ। সেটিকে ঘিরে রেখেছে এক আশ্চর্য নীলাভ আলো। আব্দুল ওয়াহাব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না। সে একেবারে হতবাক হয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লোকটির দিকে। কে সে? নাকি স্বপ্ন দেখছে আব্দুল ওয়াহাব? স্বপ্নই হবে.... স্বপ্নই হবে! হাতের টিফিনবাটিটা নামিয়ে রেখে দু'হাতে রগড়ে নিলো চোখ। নাহ্, একই অবস্থা। সেই একইভাবে ঘুমিয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ির ওপর লোকটা। ডাকবে নাকি? কিন্তু.......! নড়ে উঠলো যেন একটু! মনে হচ্ছে জেগে উঠছে সে। হ্যাঁ, আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে যাচ্ছে বটে!

এহ্ হে, বেশ ভিজে গেছি দেখছি! ওহ্, বৃষ্টি? আর আমি কি না টেরই পাইনি! বেশ ঘুমিয়ে নিলাম একচোট! কিন্তু আমার পায়ের কাছে ওটা কে দাঁড়িয়ে ছাতা মাথায়? এই কুয়াশাময় হালকা অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে তার চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়। সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত বছর চল্লিশ- এর এক লোক, কেমন যেন জুবুথুবু। একটু যেন ভয়ে ভয়েও আছে সে। সে থাক, চারপাশের প্রকৃতিকে একটু দেখি তো আগে দু'চোখ ভরে। তারপর না হয় তার সাথে কথা বলা যাবে। বাহ্, ঝকঝকে শহর তো! রাতে বোঝা যায়নি ঠিকমতো। উঁচু উঁচু ভবন, গাছপালাও আছে কিছু। গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি যেন কেমন রহস্যময় করে তুলেছে সবকিছু। এই যাহ্, লোকটা দেখছি চলে যেতে উদ্যত!

-- এই যে শুনছেন? চললেন কোথায়? একটু দাঁড়ান, কথা বলি আপনার সাথে!

-- আমার সাথে? কেন?

-- ইচ্ছে করছে যে! বলবেন না কথা আমার সাথে?

-- আমার একটা জরুরি কাজ আছে, দেরি হয়ে যাবে। পরে বলবো কোনো এক সময়।

আব্দুল ওয়াহাব হাঁটা দিলো জোরে জোরে। অন্যকিছুর ভয় নেই তার তেমন, কিন্তু পাগলকে তার খুব ভয়। এ লোকটা যে পাগল নয়, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? 

-- কিন্তু আর যদি আপনার সাথে দেখা না হয়? কী এমন জরুরি কাজ আপনার?

গলা উঁচিয়ে বললো লোকটা।

-- হাসপাতালে যেতে হবে।

কী ভেবে জবাব দিয়েই ফেললো আব্দুল ওয়াহাব।

-- হাসপাতালে, কেন? কেউ অসুস্থ বুঝি?

-- হ্যাঁ, আমার ছেলে।

-- আপনার ছেলে! কী হয়েছে তার? আহা রে!

-- কঠিন অসুখ। একদম শুকিয়ে গেছে। খেতে চায় না কিছুই।

-- বয়স কত তার?

-- দশ বছর।

-- ইশ্, এ বয়সী একটা ছেলে হাসপাতালে? কতদিন ধরে আছে?

-- একমাস।

-- একমাস? বলেন কী! কিছু যদি মনে না করেন, আমি কি যেতে পারি আপনার সাথে?

আচ্ছা মুশকিল তো! মনে মনে ভেবেও রাজি হয়ে গেলো আব্দুল ওয়াহাব।

বৃষ্টি ঝরছে এখনো। আব্দুল ওয়াহাব হাঁটছে, তার পাশে পাশে চলেছে অদ্ভুত লোকটা। ওর হাতের প্রজাপতিটি চঞ্চল। ভেজা ভেজা পথঘাট জেগে উঠছে একটু একটু করে। পথের ধারের দোকানপাট খুলে যাচ্ছে একে একে। ফাঁকা রিক্সাগুলো হুড তুলে চলেছে টুংটাং। হাসপাতালে পৌঁছে গেলো ওরা। এ জায়গা কখনোই পুরোপুরি ঘুমিয়ে যায় না। নিশুতি রাতেও এখানে ব্যস্ততা দিনের মতো। নতুন রোগী আসে, পুরোনোদের হতাশ চলাফেরা, হঠাৎ হৃদয়বিদারক কান্নায় ভাবি হয় বাতাস, কারও মুখ আবার নতুন প্রাণের আগমনে উদ্ভাসিত, সবমিলে কর্মচঞ্চল সবসময়।

আব্দুল ওয়াহাব লোকটাকে নিয়ে প্রবেশ করলো সেই কর্মচঞ্চলতায়। লোকটা কেমন যেন অবাক হয়ে দেখছে সব। লম্বা করিডোরের শেষ মাথায় উপরে ওঠার সিঁড়ি। পাশে কিছু ফুল গাছে নানা রঙের ফুল। ওরা সিঁড়িভেঙে চলে গেলো সোজা তিনতলায়, ছেলের ওয়ার্ডে। ছেলেকে বিছানায় হাসিমুখে বসে থাকতে দেখে মনটা ভরে গেলো আব্দুল ওয়াহাবের। সাথের লোকটিও মিটি মিটি হাসছে দেখছি! ছেলে বউও তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে লোকটার দিকে। লোকটির বাঁহাতের ওপর খেলতে থাকা প্রজাপতিটি অবাক হয়ে দেখছে ওরা।

-- তোমার পছন্দ এটা?

-- খুউব! কিন্তু ওটা তোমার হাতের ওপর কেন?

-- হা হা... কারণ ওটা যে আমার প্রজাপতি! সবসময় ওটা আমার সাথে থাকে।

-- সত্যি? কিন্তু তা কী করে হয়? প্রজাপতি আবার কখনও কারও নিজের হয় নাকি? আমার তো নিজের কোনো প্রজাপতি নেই! আমাদের কারোরই নেই, আমার বন্ধুদেরও না।

-- এটা তুমি ঠিক বললে না। তুমি হয়তো জানো না, তোমারও একটা প্রজাপতি আছে। তোমারা যারা ছোট, তাদের সবারই একটা করে প্রজাপতি থাকে।

-- তাহলে দেখতে পাই না কেন? ওগুলোর রঙও কি এটার মতোই? এত সুন্দর!

-- ঠিক এটার মতো নয়, তবে ওগুলোও খুব সুন্দর।

-- তাই! আমি দেখবো!

-- অবশ্যই দেখবে। তার আগে লক্ষী ছেলের মতো খেয়ে নাও তো! তোমার বাবা কত কষ্ট করে তোমার জন্য খিঁচুড়ি আর মুরগির ঝোল রান্না করে এনেছে, দেখো!

-- হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি খাবো! মা, তাড়াতাড়ি আমাকে খেতে দাও, খুব খিদে পেয়েছে.... খুব!

খুশিতে ঝলমল করে উঠলো আব্দুল ওয়াহাব আর তার বউয়ের মুখ। কতদিন পর নিজে থেকে খেতে চাইছে ছেলে! টিফিন বাটি খুলে ছেলেকে খাবার দিচ্ছে বউ। কিন্তু আব্দুল ওয়াহাবের মনটা হঠাৎ খচ খচ করে উঠলো, সে কি কি রান্না করে এনেছে, লোকটা জানলো কেমন করে? কে লোকটা? অন্তর্যামী! বউটাও জানি কেমন, অচেনা এক লোককে সাথে করে এনেছে সে, একবারও কোনো প্রশ্ন করলো না? মা ছেলের ভাব দেখে তো মনে হচ্ছে, কতকালের চেনা! লোকটাও এমন ভাব জমিয়ে ফেলেছে এই অল্প সময়ের মধ্যে! তবুও লোকটার কারণেই এতদিন পর খেতে চেয়েছে ছেলে, সেটা তো অস্বীকার করা যায় না!

একমাত্র সেজন্যেই লোকটার ওপর পুরোপুরি রেগে যেতে পারছে না সে। কেমন যেন খুব সূক্ষ্ম একটা প্রশ্রয়বোধ কাজ করছে। কিন্তু তা বোধহয় আর বেশিক্ষণ থাকবে না। এবার বোধহয় রেগেই যাবে আব্দুল ওয়াহাব। লোকটা তার ছেলেকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যেতে চাইছে, কী আশ্চর্য! ছেলে তো হাসপাতাল থেকে ছাড়াই পায়নি! যত্তসব পাগল ছাগল!

পৃথিবীতে পতনের পর পরই এমন একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবো ভাবিনি আমি। একটা এত ছোট্ট, এত মিষ্টি ছেলে এতদিন ধরে হাসপাতালে! অথচ মনে হচ্ছে, ছেলেটির কোনো অসুখই নেই। যেটা আছে সেটা হলো অসুবিধা। কিন্তু কি সেই অসুবিধা? জানতে হবে......গভীরভাবে জানতে হবে! যে করেই হোক আজই হাসপাতাল থেকে ছুটি পেতে হবে ছেলেটিকে। তারপর ওকে নিয়ে নগরীর কোনো সুন্দর জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে জেনে নিতে হবে ওর সমস্যা। এত সুন্দর একটা ছেলের জীবনে কোনো আনন্দ থাকবে না, তা কী করে হয়? আমার হাতের প্রজাপতিটি দেখে ওর চোখে যে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠেছে, তা হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না কোনোমতেই। ওর মনের মধ্যে যে একটা অপূর্ব রঙের প্রজাপতি আছে সেটার সন্ধান ওকে জানাতেই হবে।

-- আজ কেমন আছো বাবু? দেখি জিভটা। হুমম....!

-- জানো ডাক্তার, আমি না ভালো হয়ে গেছি! আমাকে ছেড়ে দাও, বাড়ি যাবো। আর এই যে লোকটাকে দেখছো, যার কাছে একটা প্রজাপতি আছে, ও আমার বন্ধু। ও বলেছে, আমারও একটা প্রজাপতি আছে। ওকে সাথে নিয়ে খুঁজে বের করবো সেটাকে। দেবে না ছুটি আজ?

ডাক্তার বেচারা আশেপাশে তাকিয়ে কোনো প্রজাপতিওয়ালাকে দেখতে পেলো না। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আব্দুল ওয়াহাব আর তার বউয়ের দিকে তাকাতেই ওরা বললো, সত্যিই ও ভালো হয়ে গেছে ডাক্তার সাহেব! অ-নে-ক দিন পর ও আজ নিজে থেকে খাবার খেয়েছে। ভালোমতোই খেয়েছে। ছুটি দিয়ে দিন, বাড়ি যেতে চাইছে, হয়তো বাড়ি গেলে আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হবে।

চিন্তার রেখা ডাক্তারের কপালে। হাসপাতালে থেকেও তো বিশেষ লাভ নেই, ভাবলো ডাক্তার। কিন্তু প্রজাপতিওয়ালার কথাটা তো ঠিক বোধগম্য হলো না! ছেলেটির বাবা মা-ও তো কোনো দ্বিমত করছে না ছেলের কথায়! হয়তো ছেলের হঠাৎ কিছুটা সুস্থতায় তাদের এই প্রশ্রয়। যাইহোক, ছুটি দিলে মন্দ হয় না। দেখা যাক! আগামী সপ্তাহে একবার দেখা করে যেতে বললেই হলো।

ঘাসে ছাওয়া নদীর ধার। একটা ছোট্ট ডিঙি বাঁধা আছে ঘাটে। অব্যবহৃত বোধহয় বহুদিন। আব্দুল ওয়াহাব তার বউকে নিয়ে বসে আছে ঘাসের ওপর। ওদের চোখেমুখে উপচে পড়ছে খুশি। ছেলে তাদের ছাড়া পেয়েছে হাসপাতাল থেকে। আমার বাঁহাতের প্রজাপতিটিও অকারণে ফুরফুর করছে। ছেলেটি ছুঁয়ে দেখছে সেটিকে একটু পর পর। বলছে, এত সুন্দর..... এত সুন্দর! আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে বার বার। আশ্চর্য, আমার চোখে জল!

-- তোমার স্কুলটা কোথায়? নিয়ে যাবে আমাকে?

-- তুমি যাবে ওখানে? কিন্তু আমার স্কুল তোমার ভালো লাগবে না যে!

-- কেন?

-- ভীষণ উঁচু একটা ভবন। লিফ্ট এ ওঠানামা, আমার ভালো লাগে না।

-- কেন? স্কুলের মাঠে খেলো না বন্ধুদের সাথে? 

-- নাহ্, মাঠই তো নেই! আর যা লেখাপড়ার চাপ! খেলার সময় কোথায়? খেললে পিছিয়ে যাবো না? যে খেলবে সেই পিছিয়ে যাবে। আমরা তো খালি পড়ি। জানো, আমার কয়টা বই?

-- কয়টা?

-- অ-নে-ক! আর প্রতিটা বইয়ের জন্য আলাদা আলাদা খাতা। প্রাইভেট, স্কুল, কোচিং সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা খাতা। সেসবে ব্যাগ এত ভারি হয়, কী বলবো তোমায়! আমার সব বন্ধুদের পিঠে ব্যথা, চোখেও চশমা অনেকের। লেখাপড়া এমন কেন? এত পড়তে হয় কেন? আচ্ছা, তুমিও কি এমন করেই লেখাপড়া করেছো? আমার বাবা করেনি জানো? বাবা যখন ছোট ছিলো, তখন নাকি তাদের স্কুলে বিশাল একটা মাঠ ছিলো। ক্লাসের ফাঁকে তারা বন্ধুরা ওই মাঠে খেলা করতো। গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা আরও কত কী! আমরাও তো ছোট, আমাদের মাঠ নেই কেন? দেখো, পুরো শহরজুড়ে শুধু উঁচু বিল্ডিং। আমার ভালো লাগে না একদম। আমার বন্ধুরা মোবাইলে, কম্পিউটারে গেম খেলে। আমার ভালো লাগে না ওসব।

-- তোমার কী ভালো লাগে বলো?

-- বললে তুমি দিতে পারবে তা?

-- হ্যাঁ পারবো।

-- সত্যিই?

-- একদম সত্যি। বলেই দেখো না!

-- আমি চাই খোলা মাঠ। অনেক গাছ, অনেক প্রজাপতি উড়ে বেড়াবে ফুলে ফুলে। আমি বন্ধুদের সাথে ঘুরবো, খেলবো, মাঝে মাঝে লেখাপড়াও করবো। স্কুলের ব্যাগটা হবে অনেক বেশি হালকা। পারবে করতে এসব? আর আমার প্রজাপতি? ওটা কোথায়? তুমি যে দেবে বলেছিলে আমাকে!

-- দেবো দেবো। সব দেবো তোমাকে। এখন বাড়ি চলো, সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে। ওই দেখো, তোমার বাবা মা ডাকছেন আমাদের।

-- কিন্তু কখন দেবে? আমার যে আর দেরি সহ্য হচ্ছে না! ওগুলো পেলেই আমি একদম সুস্থ হয়ে যাবো। আর কোনোদিনও হাসপাতালে যেতে হবে না আমাকে।

-- দেবো, অতি শীঘ্রই! চলো, এবার বাড়ি যাই, অন্ধকার হয়ে গেলো।

-- চলো।

-- ও হ্যাঁ, তোমার নামটাই তো বলোনি আমাকে!

-- উচ্ছাস।

-- বাহ্, উচ্ছাস!

-- আর তোমার নাম?

-- পরে বলবো।

একটা ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরের আড়ালে অসুস্থ শিশু? অসুস্থ ভবিষ্যত! হাজার হাজার শিশুর মনে হাজার হাজার প্রজাপতি বন্দী হয়ে আছে এভাবে? ওরা ওড়ার জায়গা পাচ্ছে না। এই সুন্দর শহর এই অসুস্থ সন্তানদের দিয়ে কী ভবিষ্যত গড়বে? ভেবেই পাচ্ছি না আমি। সুন্দর পৃথিবীটা দু'চোখ ভরে দেখবো বলে এসেছিলাম। কিন্তু কোথায় সৌন্দর্য? শুধু প্রশস্ত পথঘাট আর ঝকঝকে উঁচু বিল্ডিংই কী সৌন্দর্য? ছোট, নিষ্পাপ বাচ্চাদের শৈশব হরণ করে এ কেমন সৌন্দর্য? বেদনার পাহাড় যেন বুকে চেপে বসেছে আমার। আমি যেখান থেকে নেমে এসেছি, সেখানে বসে এসব বাচ্চাদের কষ্ট অনুভব করা সম্ভবই নয়। ওদের কষ্ট অনুভব করতে হবে ওদের পাশে থেকে। হঠাৎ পৃথিবীতে আসার সিদ্ধান্তটা ভুল নয় তাহলে! আর এসেই যখন পড়েছি, এইসব কচিমুখগুলোর কষ্ট কিছুটা লাঘব করি। আমার অনন্ত জীবন, আমার অপার্থিব ক্ষমতা যদি কিছুটা কাজে লাগে ওদের, ধন্য হবো আমি।

ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝখানে ছেলে, দু'পাশে বাবা-মা । ছেলের বুকের ওপর দু'জনের হাত রাখা। আহা, কী নিশ্চিন্তি! কী পরম নির্ভরতা! ওই যে স্বর্গ, যেখানে আমার বাস, আব্দুল ওয়াহাবের ঘরটায় আজ রাতে সেই স্বর্গই নেমে এসেছে যেন। ভোর হওয়ার আগেই সেরে ফেলতে হবে আমার কাজ। মাঝারি এই নগরে প্রতিটা বাড়ির সামনে এক চিলতে উঠোন, উঠোনে ফুল গাছ, ফুলগাছে হাজার হাজার প্রজাপতি ওড়াতে হবে রাতের মধ্যেই! স্কুলের সামনে থাকবে বিশাল খোলা মাঠ। ভোরে সব শিশু কলকল করে উঠবে। অসংখ্য প্রজাপতির ভিড়ে খুঁজে নেবে নিজের প্রজাপতি। ওরা বেড়ে উঠবে সুস্থ সুন্দর মন নিয়ে। গড়ে তুলবে এক স্বপ্নের আগামী। আমি চলে যাবো নিঃশব্দে।

আচ্ছা, উচ্ছাস কে কি বলে যাবো, আমার পরিচয়? 

না থাক, ওরা তো ভুলে যাবে বেদনাময় অতীত। শুধু থাকবে বর্তমান, আর সুন্দর ভবিষ্যত!

সুখে থাকুক ওরা। উচ্ছাস থাকুক আমার মনে, আর আমি নাহয় থাকি উচ্ছাসের মায়াবী ঘোর হয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ

বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তারুণ্যের জাগরণ
প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো

বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অনুবাদ সাহিত্য অনেক আগেই তৈরি করে নিয়েছে শক্তিশালী এক অবস্থান। গত এক দশকজুড়ে এই মাধ্যমটা হয়েছে আরো শক্তিশালী। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর বড় ভরসা অনুবাদ সাহিত্যগুলো। তেমনি অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম খ্যাতিমান প্রকাশনীগুলোও অনুবাদ বই বের করতে বিনিয়োগ করছে এই আশায় যে, তাদের টাকাটা অন্তত কিছু লাভসহ উঠে আসবে। আর এই অনুবাদ সাহিত্যের জগতে, উল্লেখ্য এই সময়টাতে, ভালো অনুবাদক হিসেবে পাঠকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক। প্রকাশক ও পাঠক—উভয়েই ভরসা করতে পারছেন দক্ষ এসব তরুণ অনুবাদকদের ওপর।

এই তরুণ অনুবাদকদের বয়স ২০ থেকে ৪০-এর মধ্যে। তাদের অনেকেই এখনো ছাত্র। কিন্তু, এরই মধ্যে তাদের অনেকের অনুবাদ করা বই অর্জন করেছে দারুণ পাঠকপ্রিয়তা। একই সাথে অনুবাদক হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছেন তারাও। বিশ্বের বিখ্যাত ও বড় বড় লেখকদের বই তারা অনুবাদ করে হাজির করছেন বিশ্বসাহিত্যে আগ্রহী দেশের পাঠককূলের কাছে। তাদের কারণেই অনেক বিখ্যাত ও মাস্টারপিস সাহিত্যকর্ম আস্বাদন করতে পারছেন দেশের বিপুল সংখ্যক পাঠক। কেননা, ভাষার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় সেসব বই পড়া সম্ভব হয় না দেশের বেশিরভাগ পাঠকের। তাই, তাদের ভরসা অনুবাদ। আর একাজে আসলেই অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছেন দেশের তরুণ অনুবাদকেরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনীর অনুবাদকদের বেশিরভাগই আসলে এই বয়সী তরুণরাই।

বাংলাদেশে তরুণ অনুবাদকদের এই কর্মস্পৃহাকে স্বাগত জানান অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক ও সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন। তিনি বলেন, “তরুণ অনুবাদকদের অনেকেই ভালো করছে। আমাদের অন্বেষা প্রকাশনীতে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, সান্তা রিকি, আদনান আহমেদ রিজনের মতো তরুণ অনুবাদকেরা যথেষ্ট ভালো মানের অনুবাদ বই উপহার দিচ্ছেন, এবং সাড়াও পাচ্ছেন পাঠকদের কাছ থেকে। আর দেশে তরুণ অনুবাদক যারা আছেন, তারা যদি অনুবাদকে আরো অর্থবহ করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেন, তাহলে তা অনুবাদ ও প্রকাশনা শিল্প—দুটোর জন্যই ভালো। বেশ কিছু তরুণ অনুবাদক এখন দুর্দান্ত কাজ করছেন। নিকট ভবিষ্যতে দেশের অনুবাদসাহিত্যকে আরো ভালো জায়গায় তারা নিয়ে যাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

এসময়ের একজন জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ। ২০১৫ থেকে এপর্যন্ত তার অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে ৪০টির মতো। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একসময় দেশে ভালো মানের অনুবাদ বই বের হতো বেশ কম। এইক্ষেত্রে তরুণরা যে এগিয়ে এসেছে এবং দারুণ কাজ দেখাচ্ছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আর্থিক ব্যাপারের থেকে এক্ষেত্রে তাদের কাজ করার প্যাশনটাই অনেক বড়। এই পরিবর্তনটা আসলেই দরকার ছিল।”

স্বাধীনতার পরপর বাংলা অনুবাদ সাহিত্য প্রসার লাভ করে কবির চৌধুরী, কাজী আনোয়ার হোসেন, শেখ আব্দুল হাকিম, রকিব হাসান প্রমুখের হাত ধরে। বিদেশি সাহিত্যকে সহজ ভাষায় দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে বড় ভূমিকা ছিল সেবা প্রকাশনীর। তবে, তাদের বইগুলো ছিল নিউজপ্রিন্ট কাগজের। এরপর ৯০ দশকের শেষার্ধ্ব ও ২০০০-এর প্রথম দশকে বোর্ড বাঁধাই ও হোয়াইট প্রিন্ট কাগজে অনুবাদ বইয়ের প্রকাশ ঘটতে থাকে ব্যাপকভাবে। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে সন্দেশ, অন্যধারা, রোদেলা, বাতিঘর, অন্বেষা, ঐতিহ্য ইত্যাদি প্রকাশনী।

বাতিঘর প্রকাশনীর যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনের হাত ধরে। তার অনূদিত ও বাতিঘর থেকেই প্রকাশিত ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’ বইটি বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। জনপ্রিয়তা ও বিক্রয় সংখ্যা—দুই দিক থেকেই। ২০০৫-এ এই বইটি অনুবাদ করার সময় নাজিমউদ্দিনও নিজেই ছিলেন একজন তরুণ অনুবাদকই। এর ঠিক আগের সময়টাতে অনুবাদক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়তা পান অনীশ দাশ অপু। বলাই বাহুল্য, তিনিও অনুবাদ করতে ও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন তরুণ বয়স থেকেই।

তাদেরই পথ ধরে গত কয়েক বছরে অনুবাদ সাহিত্যে খুব ভালো কাজ দেখিয়েছেন অনেক তরুণ অনুবাদক। এদের মধ্যে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন সায়েম সোলায়মান, মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ, শাহেদ জামান, সালমান হক, কিশোর পাশা ইমন, আদনান আহমেদ রিজন, সাইম শামস, অসীম পিয়াস, কৌশিক জামান, সান্তা রিকি মাকসুদুজ্জামান খান, ডিউক জন প্রমুখ। অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে সায়েম সোলায়মানের ‘কুইন অব দ্য ডন’, ‘কালো কফি’, ‘দ্য ওয়ান্ডারার্স নেকলেস’ (সেবা প্রকাশনী) ইত্যাদি থ্রিলার ঘরানার বই, সালমান হকের বাতিঘর প্রকাশনী থেকে বের হওয়া ‘থ্রিএএম’ সিরিজের বই ও ‘দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রাইপড পাজামা’ বইটি, শাহেদ জামানের ‘দ্য পিলগ্রিম’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য ফর্টি রুলস অব লাভ’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘দ্য ফরবিডেন উইশ (নালন্দা প্রকাশনী), মো. ফুয়াদ আল ফিদাহর ‘সিরিয়াল কিলার’, ‘গেম ওভার’ (সেবা প্রকাশনী) ও ‘সাইকো ২’ (আদি প্রকাশনী), কিশোর পাশা ইমনের ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ (বাতিঘর প্রকাশনী), ‘দ্য পাওয়ার অব হ্যাবিট’ (নালন্দা প্রকাশনী), আদনান আহমেদ রিজনের ‘দ্য প্রেসিডেন্ট ইজ মিসিং’ ও ‘দ্য গার্ল ইন রুম ওয়ান জিরো ফাইভ’ (আদি প্রকাশনী), মাকসুদুজ্জামান খানের ‘দ্য আলকেমিস্ট’ (রোদেলা প্রকাশনী) ও ‘অ্যাঞ্জেল অ্যান্ড ডেমনস’ (অন্বেষা প্রকাশনী), ডিউক জনের ‘সুলতান সুলেমান’ ও ‘বিউলফ’ (সেবা প্রকাশনী), কৌশিক জামানের ‘নরওয়েজিয়ান উড’ (বাতিঘর প্রকাশনী), সান্তা রিকির ‘দ্য সার্জন’ (বাতিঘর প্রকাশনী)।

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, কিছুদিন আগেও যেখানে বাংলা অনুবাদে আক্ষরিক অনুবাদের আধিক্য ছিল, সেখানে বর্তমানের তরুণ অনুবাদকেরা বইয়ের ভাবানুবাদটাই বেশি করেন। একারণে তাদের অনুবাদ হচ্ছে বেশি পরিমাণে সহজ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আর, পাঠকদের বেশিরভাগই যেহেতু তরুণ, এক্ষেত্রে অনুবাদক-পাঠকের চিন্তাধারাও মিলে যাচ্ছে একই সমান্তরালে।

এই তরুণ অনুবাদকদের অন্য যে বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হচ্ছে এদের অনেকেই বই অনুবাদের কাজ শেষ করেন অত্যন্ত দ্রুত। এদের কারো কারো উদাহরণ রয়েছে ২ বছরে ১২টা অথবা দেড় বছরে ৯টি অনুবাদ বই বের করার। কিন্তু মানের দিক থেকে খারাপ হচ্ছে না বা হয়নি তাদের বইগুলো, এমনটাই মনে করছেন পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীরা। অত্যন্ত দ্রুত এবং মান ঠিক রেখে অনুবাদ করার ক্ষেত্রে পাঠক, প্রকাশক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন ফুয়াদ আল ফিদা, শাহেদ জামান, সালমান হক, আদনান আহমেদ রিজনেরা। অনেকেই তাদের মতো দ্রুতগতির অনুবাদকদের ভালোবেসে ‘মেশিন ম্যান’ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু অনেকের কাছে এই ব্যাপারটাই আবার রহস্য। নেতিবাচক-ইতিবাচক দুরকম মতামতই রয়েছে এ ব্যাপারে। সাহিত্যাঙ্গন নিয়ে কাজ করছেন এবং এক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে আছেন, এরকম অনেকেই বিষয়টাকে ইতিবাচক চোখে দেখেন না। তাদের মতামত হচ্ছে, “বর্তমানে অনেক তরুণ অনুবাদকই দেখা যায় একমাসে একটা বই অনুবাদ করছেন। এতে অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে যাচ্ছে অনেক।” এক্ষেত্রে তারা জি এইচ হাবীবের মতো স্বনামধন্য অনুবাদকের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিনি তো সোফির জগত বইটি অনুবাদ করেছিলেন ৩-৪ বছর সময় নিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394777242.jpg
 প্রকাশক, লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিনের হাত দিয়ে গত কয়েক বছরে উঠে এসেছে বেশকিছু ভালোমানের তরুণ অনুবাদক ◢


এই ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন প্রকাশনা শিল্পের কর্ণধাররা? যোগাযোগ করা হলে বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন বলেন, “আমি মনে করি না দ্রুত অনুবাদের কাজ শেষ করলেই তার মান খারাপ হয়। আমি নিজেও খুব দ্রুত কিছু বইয়ের অনুবাদের কাজ করেছি। বর্তমানে আমরা অনুবাদের কাজে প্রযুক্তির সহায়তা অনেক পরিমাণে পাচ্ছি। আগে হাতে লিখে তারপরে হয়তো কম্পোজ করা হতো। তবে, বর্তমানে পার্সোনাল গেজেটেই আমরা করি সেই অনুবাদের কাজটা। আগে হয়তো ডিকশনারিতে খুঁজে খুঁজে ইংরেজি শব্দের অর্থ বের করতাম আমরা। কিন্তু এখন ই-ডিকশনারি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থটা বের করতে পারি আমরা। এডিট করতেও সময় লাগছে আগের তুলনায় অনেক কম। কাজেই দ্রুত কাজ করেও অনুবাদের মান ভালো রাখা যায় বলেই মনে করি।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394941196.jpg
◤ গত কয়েক বছরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক সালমান হকের ‘থ্রিএএম সিরিজ’-এর অনুবাদসহ অন্যান্য অনুবাদ বই ◢


একই মতামত জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক সালমান হকের। তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই, রকিব হাসান, শেখ আবদুল হাকিমেরাও কিন্তু অনেক দ্রুত কাজ করেন। আমি মনে করি এটা কোনো সমস্যা নয়। আর যারা দ্রুত অনুবাদ করছে, তাদের কারো কারো অনুবাদের মান খারাপ হতেই পারে। তবে, আমি মনে করি এই ধারায় ভালোর পরিমাণই বেশি। কারণ, জোয়ারের সময় অন্যান্য আজেবাজে জিনিসের সাথে কিন্তু পলিমাটিও এসে জমা হয়। আর সম্পাদনার কাজটা যদি ভালো করে বেশ কয়েকবার করা যায়, তাহলে অনুবাদ বইটি অবশ্যই ভালো হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566394866820.jpg
◤ গত কয়েক বছরে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজনের বেশ কিছু অনুবাদ বই ◢


তবে, তরুণদের অনূদিত সব বই যে মানসম্মত হচ্ছে, তেমনটাও নয়। এই ফাঁকে নিশ্চিতভাবে কিছু সাব-স্ট্যান্ডার্ড অনুবাদ বই বের হচ্ছে বলে মনে করেন অনুবাদ সাহিত্য-সংশ্লিষ্টরা। জনপ্রিয় তরুণ অনুবাদক আদনান আহমেদ রিজন বলেন, “তরুণরা যে অনুবাদ সাহিত্যে এত বেশি পরিমাণে এগিয়ে আসছে, এতে নিম্নমানের কাজের চেয়ে ভালো মানের কাজই বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে। অনুবাদে আসতে হলে সাহিত্যকে ভালোবাসতে হবে। আর যাদের অনুবাদ ভালো হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে বলতে হবে অনুবাদ ভালো করে করার যোগ্যতাটাই হয়তো তাদের নেই। সেজন্য অনুবাদে আসতে হলে নিজেদেরকে ভালো করে যোগ্য করে তারপরে আসতে হবে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/21/1566395064592.jpg

◤ একজন অনুবাদকের নিজেকে ঠিকভাবে অ্যাসেসমেন্টের ক্ষমতা থাকতে হবে বলে মনে করেন তরুণ অনুবাদক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ ◢


তা কিভাবে তরুণ অনুবাদকেরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে? হতে পারে একজন ভালো অনুবাদক? এই প্রসঙ্গে মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ বলেন, “বই অনুবাদে আসার আগে আমি নিয়মিত লিখতাম রহস্যপত্রিকায়। লেখা ছাপা হওয়ার পর দেখতাম সম্পাদনামণ্ডলী ওখানে কী কী চেঞ্জ এনেছে। এভাবে একজন অনুবাদকের নিজেকে অ্যাসেসমেন্টের যোগ্যতা থাকতে হবে। আর ভালো অনুবাদ যারা করছে, তাদের কাউকে মানদণ্ড ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফলাফলটা ভালোই হবে।”

ইতোমধ্যেই তরুণ অনুবাদকেরা অত্যন্ত ভালো ও স্মার্ট কাজ দেখিয়ে অর্জন করেছেন পাঠক ও প্রকাশকের আস্থা। আর তরুণেরা যদি নিজেদেরকে আরো প্রস্তুত করে অনুবাদ জগতে আসেন এবং নিজেদের কাজের মানোন্নয়নে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে অনুবাদ সাহিত্যে তরুণ অনুবাদকদের অবদান নিঃসন্দেহে পৌঁছে যাবে নতুন উচ্চতায়।

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি

জহির রায়হান : দেশপ্রেমিক ও সমাজ-সচেতন এক শিল্পী-প্রতিকৃতি
অসাধারণ চলচ্চিত্র ও শৈল্পিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা হিসেবে আজও স্মরণীয় জহির রায়হান

মাত্র ৩৬ বছর বয়সের জীবনেই জহির রায়হান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একজন কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র-পরিচালক হিসেবে। প্রচণ্ড বক্তব্যধর্মী ও জীবনমুখী তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিকতা ও কৌশলগত মানের দিক থেকে এখনো স্মরণীয় হয়ে টিকে আছে। অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকারদের। তেমনি মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন। ‘হাজার বছর ধরে’ দেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর পথ চলার কথা থাকলেও, ১৯৭২ সালে নিরুদ্দেশের ‘বরফ গলা নদীতে’ হারিয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসেননি আর। আজ এই বহুপ্রজ বিরল প্রতিভার ৮৪তম জন্মদিন।

জহির রায়হানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম। এ নামেই তিনি সুপরিচিত। তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় এমএ করেন জহির। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর ভেতরে আরো শক্তভাবে গেঁড়ে দেয় লেখক হওয়ার বুনিয়াদ।

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু, তিনি যে ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর মনের ভেতরে গভীর ভালোবাসা। তাই, চলে আসলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। সহকারী হিসেবে আরো কাজ করেন সালাউদ্দীনের ছবি—‘যে নদী মরুপথে’-তেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’-এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; এ ছবির নামসংগীত রচনা জহির রায়হানের হাতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207266898.jpg

◤ ‘বেহুলা’ সিনেমার সেটে নির্দেশনা দিচ্ছেন জহির ◢


সহকারী পরিচালক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি রুপালি জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। এটি অবশ্য ছিল উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। পরের বছর মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এরপর ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’, ১৯৬৭-তে ‘আনোয়ারা’, ১৯৭০-এ ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। 

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি, সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কলম সচল ছিল মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। অনেক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘তৃষ্ণা’, ‘সূর্যগ্রহণ’ ইত্যাদি। সংগ্রামমুখর নাগরিক জীবন, আবহমান বাংলার জনজীবন, মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা-বেদনা প্রভৃতি তাঁর রচনায় শিল্পরূপ পেয়েছে। সাহিত্যকৃতীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207304659.jpg
◤ প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর সাথে জহির রায়হান ◢


ব্যক্তিজীবনে দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

সুমিতা দেবীর সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৬৮ সালে আরেক জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লা কায়সার। তিনি লেখক ও রাজনীতিক পান্না কায়সারের স্বামী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207352881.jpg

◤ জহির রায়হানের আলোচিত, নন্দিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র পোস্টার ◢


শুধুমাত্র কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হানকে দেখলে সবটুকু যেন বলা হয় না তাঁর ব্যাপারে। একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী ছিলেন তিনি। নিজেও স্বশরীরে অংশ নিয়েছেন দেশ মাতৃকার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন জহির রায়হান। উপস্থিত ছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে। এসময় তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরে দেয়। এই জেলে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’–তে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকাররা। সে সময়ে তিনি চরম আর্থিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207399680.jpg
◤ প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে রাখে দারুণ ভূমিকা ◢


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেন জহির রায়হান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশা, হানাদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল প্রভৃতি এই তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছিল। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রটিকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। নিখোঁজ ভাইকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন জহির। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায়, মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/19/1566207448145.jpg

◤ ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ তবে দেশ ও সমাজ-সচেতন শিল্পীদের এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই ◢


এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা মুশকিল। তাঁর মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হওয়া যায়নি কিভাবে মারা গিয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্বাধীনতার ঠিক পরপর, সেই ৭২ সালেই জহির রায়হান চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেও তাঁর অসাধারণ, শৈল্পিক ও নান্দনিক সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রের জন্য জাতি ঠিকই তাকে স্বরণে রেখেছে। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে প্রদান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর)। ১৯৯২ সালে প্রদান করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রগুলো টিকে আছে অমূল্য সম্পদ হয়ে। ১৯৭২-এর পর ‘আরেক ফাল্গুন’ হয়তো ‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের জীবনে; তবে দেশ ও সমাজ সচেতন শিল্পীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা তিনিই। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিনে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র