একদা এক ভীষণ নির্বোধ ব্যক্তি

লিডিয়া ডেভিস
ছবি নিউইয়র্কার থেকে। গ্রাফিক বার্তা২৪

ছবি নিউইয়র্কার থেকে। গ্রাফিক বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

অনুবাদ মেহেদী হাসান

লিডিয়া ডেভিস ১৯৪৭ সালের ১৫ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নরদাম্পটনে জন্মগ্রহণ করেন। অনুগল্প (Flash fiction) কথিত অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের সাহিত্য আঙ্গিকের জন্য তিনি অধিক পরিচিত। পাশাপাশি তিনি একজন ছোট গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। তিনি মার্সেল প্রুস্তের সোয়ান’স ওয়ে এবং গুস্তাব ফ্লবেয়ারের মাদাম বোভারিসহ ফরাসি ও অন্যান্য ভাষার বেশ কিছু চিরায়ত সাহিত্য ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।

লিডিয়া ডেভিসের বাবা রবার্ট গরহ্যাম ডেভিস (Robert Gorham Davis) ছিলেন একজন সাহিত্য সমালোচক ও ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং মা হোপ হেল ভেভিস (Hope Hale Davis) ছিলেন একজন ছোটগল্পকার, স্কুল শিক্ষিকা এবং স্মৃতিকথা লেখক। গোড়ার দিকে তিনি সঙ্গীতের ওপর শিক্ষা গ্রহণ করেন—প্রথমে পিয়ানো, তারপর ভায়োলিন। সঙ্গীত ছিল তার প্রথম প্রেম। লেখক হওয়ার বিষয়ে লিডিয়া ডেভিস জানান, “আমি সম্ভবত সবসময় লেখক হওয়ার পথেই এগিয়ে গিয়েছি, এমনকি যদিও এটা আমার প্রথম প্রেম নয়।” 

লিডিয়া ডেভিস দ্য থারটিন উম্যান এন্ড আদার স্টোরিজ (১৯৭৬) এবং ব্রেক ইট ডাউন (১৯৮৬) সহ মোট ছয়টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেন। ব্রেক ইট ডাউন গল্প গ্রন্থটি পেন/ হেমিংওয়ে অ্যাওয়ার্ড-এর (PEN/Hemingway Award) চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এবং তার সাম্প্রতিক প্রকাশিত ভ্যারাইটিজ অব ডিস্টারবেন্স (২০০৭) গল্পগ্রন্থটি স্থান লাভ করে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড (National Book Award) চূড়ান্ত তালিকায়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত লেখা তার সকল গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত হয়েছে দ্য কালেক্টডে স্টরিজ অব লিডিয়া ডেভিস (২০০৯)।

অনেকে তাকে অনেকাংশে তার নির্মিত সাহিত্য আঙ্গিকের গুরু হিসেবে অভিহিত করেন। তার অনেক অনুগল্প (Flash fiction) মাত্র একটি বা দুটি বাক্যেই সম্পূর্ণ। ডেভিস এইসব গল্পকে আকাশচুম্বী ভবনের সাথে তুলনা করেন এই অর্থে যে তারা আরোপিত শূন্যতা দ্বারা পরিব্যাপ্ত।

লিডিয়া ডেভিস ৬৫ বছর বয়সে ২০১৩ ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ডেভিসকে পুরস্কার দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ম্যান বুকার প্রাইজ ওয়েবসাইটে তার সাহিত্য কর্মকে কাব্যের পরিমিতিবোধ এবং যথাযথতা সম্বলিত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/01/1561953332191.jpg
তরুণ বয়সে লিডিয়া ডেভিস / প্যারিস ১৯৭৩

 

একদা এক ভীষণ নির্বোধ ব্যক্তি 

মেয়েটি ক্লান্ত ও হালকা অসুস্থ এবং খুব পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারছে না। পোশাক পরার সময় মেয়েটি লোকটিকে জিজ্ঞেস করতে থাকে তার কাপড়-চোপড় সব কোথায় এবং লোকটি খুব ধৈর্য সহকারে মেয়েটির কাপড়-চোপড়ের অবস্থান জানায়—প্রথমে তার প্যান্ট, তারপর তার শার্ট, তারপর তার মোজা, তারপর তার চশমা। লোকটি মেয়েটিকে চশমা পরতে বলে এবং মেয়েটি চশমা পরে, তবে এতে তেমন কোনো লাভ হয় বলে মনে হয় না। রুমে খুব একটা আলো ঢুকছে না। এই খোঁজাখুঁজি এবং পোশাক পরার চেষ্টার সময় মেয়েটি প্রায় সকল পোশাক পরা অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকে। বিড়ালটাকে খাওয়াতে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার এবং খাবারের টিন খোলার পর লোকটি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। খাবারের টিন খোলার সময় এমন শব্দ হয় যা মেয়েটিকে হতবিহ্বল করে তোলে কারণ শব্দটি গাভীর বান থেকে স্টিলের বালতিতে দুধ পড়ার মতো শোনায়। প্রায় সকল পোশাক পরা অবস্থায় মেয়েটি লোকটির পাশে শুয়ে থাকার সময় লোকটি বিভিন্ন বিষয়ে একনাগাড়ে মেয়েটিকে বলে যায়। মেয়েটি লোকটির কথা শোনার সময় বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে, প্রথমে বিরক্তি, তারপর ব্যাপক উৎসাহ, এরপর আহ্লাদ, তারপর চিত্ত বিক্ষেপ, তারপর আবার বিরক্তি, এরপর আবার আহ্লাদ। লোকটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে তার বাচালতায় সে কিছু মনে করছে কিনা এবং সে কথা বলা বন্ধ করবে নাকি চালিয়ে যাবে। এখন তার প্রস্তুত হওয়ার সময়—এই বলে মেয়েটি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে।

মেয়েটি আবার তার পোশাক খুঁজতে শুরু করে এবং লোকটি এবারও তাকে পোশাক খুঁজতে সাহায্য করে। মেয়েটি জানতে চায় তার আংটি কোথায়, জুতা কোথায়, জ্যাকেট কোথায় এবং পার্স কোথায়। লোকটি মেয়েটির জিনিসপত্রের অবস্থান জানিয়ে দেয়। এরপর লোকটি বিছানা ছাড়ে এবং মেয়েটি জানতে চাওয়ার আগেই কিছু জিনিস এগিয়ে দেয়। মেয়েটি যখন সকল পোশাক পরে বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত, তখন মেয়েটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে যে তার পরিস্থিতি অনেকটা সেই হাসিডিক গল্পের মতো যা সে আগের দিন সাবওয়েতে পড়েছে। বইটি এখনো তার পার্সের মধ্যে আছে। মেয়েটি লোকটিকে জিজ্ঞেস করে মেয়েটি তাকে একটি গল্প পড়ে শোনাতে পারে কিনা, লোকটি ইতস্তত করে। মেয়েটি ভাবে লোকটি সম্ভবত চায় না সে তাকে গল্প পড়ে শোনাক, এমনকি যদিও লোকটি মেয়েটিকে পড়ে শোনাতে পছন্দ করে। মেয়েটি বলে একটি মাত্র অনুচ্ছেদ তাকে পড়ে শোনাবে, লোকটি রাজি হয় এবং তারা রান্নাঘরের টেবিলের সামনে বসে। ইতোমধ্যে লোকটিও পোশাক পরে নিয়েছে—একটি সাদা টি-শার্ট এবং একটি প্যান্ট যাতে তাকে খুব সুন্দর মানিয়েছে। পাতলা বাদামী রঙের বইটি থেকে মেয়েটি তাকে নিম্নোক্ত গল্পটি পড়ে শোনায়।

“একদা এক লোক ছিল—লোকটি ছিল ভীষণ নির্বোধ। সকাল বেলায় বিছানা ছাড়ার সময় পোশাক খুঁজে পাওয়া তার জন্য এতই দুষ্কর হয়ে উঠত যে, এই ঝামেলার কথা ভেবে সে রাতে বিছানায় যেতে ইতস্তত বোধ করত। একরাতে সে হাতে কাগজ ও পেন্সিল তুলে নেয় এবং তার পরনের পোশাক খুলে কোথায় রাখছে তা যথাযথভাবে লিখে রাখে। পরের দিন সকালে সে তার কাগজটি হাতে নিয়ে খুশি মনে পড়তে শুরু করে: টুপি—এখানে ছিল, তখন সে এটা মাথায় পরে; প্যান্ট—এখানে পড়ে আছে, সে প্যান্ট পরে নেয়; এবং সকল পোশাক পরা পর্যন্ত এভাবে চলে। এখন তার আতঙ্ক দূর হয় এবং সে নিজেকে বলে: ‘আমি আমার পোশাক খুঁজে পেয়েছি এবং গায়ে চাপিয়েছি, তবে আমি নিজে এখন কোথায় আছি? এই পৃথিবীর কোথায় আমি? সে চারদিকে খুঁজতে থাকে, তবে এতে কোনো লাভ হয় না; সে নিজেকে খুঁজে পায় না। ইহুদি যাজকটি বলে, আমাদের ব্যাপার-স্যাপারই এরকম।”

মেয়েটি পড়া থামায়। লোকটি গল্পটি পছন্দ করে, তবে শুরুর দিকটা, লোকটির সমস্যা এবং সমাধান, যেমন পছন্দ করে শেষের অংশটুকু—‘আমি কোথায়?’—তেমনটা পছন্দ করে বলে মনে হয় না।

মেয়েটি ভাবে সে ওই ভীষণ নির্বোধ ব্যক্তিটির মতো, শুধু এই কারণে নয় যে, সে তার পোশাক খুঁজে পায় না, একারণেও নয় যে মাঝে মাঝে পোশাক পরা বাদেও অন্যান্য সাধারণ জিনিসপত্র তার নাগালের বাইরে চলে যায়। তবে বেশিরভাগ এই কারণে যে, সে প্রায়ই বুঝতে পারে না সে কোথায় এবং বিশেষ করে এই লোকটির প্রেক্ষিত থেকে মেয়েটি জানে না মেয়েটি কোথায়। মেয়েটি ভাবে এই লোকটির জীবনে সম্ভবত তার কোনো জায়গা নেই, লোকটি অবশ্য শুধু তার নিজের বাড়িতেই নেই, ঠিক তেমনিভাবে মেয়েটিও তার নিজের বাড়িতে নেই যখন সে লোকটির সাথে দেখা করতে যায় এবং সে আসলে জানে না কোথায় তার বাড়ি তবে ঠিকই সে রাস্তায় হোঁচট খেতে খেতে এবং পড়ে যেতে যেতে সেখানে পৌঁছায় যেন বাস্তবে নয় স্বপ্নে, তবে লোকটি মোটেই লোকটির নিজের জীবনে আর নেই এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করে,‘আমি কোথায়?’

মেয়েটি আসলে নিজেকে একজন ভীষণ নির্বোধ ব্যক্তি মনে করতে চায়। মেয়েটি কি বলতে পারে না, এই মেয়েটি একজন ভীষণ নির্বোধ ব্যক্তি, ঠিক যেমনভাবে কয়েক সপ্তাহ আগে সে ভেবেছিল সে নিজেকে একজন দাঁড়িওয়ালা লোক মনে করেছে? কারণ এই গল্পের ভীষণ নির্বোধ ব্যক্তি যে আচরণ করে মেয়েটি ঠিক তেমন আচরণই করত অথবা ঠিক এই মুহূর্তে তেমন আচরণ করছে, সে কি নিজেকে ভীষণ নির্বোধ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না, ঠিক যেমনভাবে কয়েক সপ্তাহ আগে সে ভেবেছিল একটি ক্যাফেতে পাশের টেবিলে বসে লিখতে থাকা কেউ দাড়িওয়ালা লোক হিসেবে পরিগণিত হবে? মেয়েটি একটি ক্যাফেতে বসেছিল এবং একজন দাড়িওয়ালা লোক তার থেকে দুই টেবিল পরে বসে লিখছিল এবং উচ্চস্বরে কথা বলতে থাকা দুইজন মহিলা লাঞ্চ করতে আসে এবং দাড়িওয়ালা লোকটিকে বিরক্ত করে এবং মেয়েটি তার নোটবুকে লিখে রাখে যে তারা পাশের টেবিলে বসে লিখতে থাকা দাড়িওয়ালা লোকটিকে বিরক্ত করেছে এবং এরপর দেখে যদিও সে নিজে, যখন সে এটা লিখছিল, পাশের টেবিলে বসে লিখছে, সে সম্ভবত নিজেকে একজন দাড়িওয়ালা লোক মনে করে। ব্যাপারটা এরকম নয় যে সে কোনোভাবে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে, তবে দাড়িওয়ালা লোক এই শব্দটি এখন তার ওপর প্রয়োগ করা যায়। অথবা সম্ভবত সে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

মেয়েটি উচ্চস্বরে লোকটিকে গল্পটি পড়ে শোনায় কারণ এটা ঠিক তেমনই যেমনটা তার ক্ষেত্রে ঘটেছে, তবে এরপর সে ভাবে বিপরীতটাও তো হতে পারে এবং গল্পটি আগের দিন তার মনের ভেতরে কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে এবং তার সকল পোশাক কোথায় আছে তা ভুলে যাওয়া এবং পোশাক পরার সময়কার এসব ঝামেলা সম্ভব করে তুলতে পারে। সেইদিন সকালে, অথবা সম্ভবত অন্য এক সকালে, লোকটিকে ছেড়ে আসার সময় একই ধরনের নির্বুদ্ধিতা অনুভব করা, যে তার নিজের জীবনে আর নেই, যখন মেয়েটি আবার নিজেকে লোকটির জীবনে খোঁজ করে এবং নিজেকে কোথাও খুঁজে পায় না, তখন আরো বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মেয়েটি কাঁদে এবং সম্ভবত কাঁদে শুধুমাত্র এই কারণে যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে এবং সে জানালার শার্শিতে পড়তে থাকা বৃষ্টির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে এবং এরপর সে ভাবে সে বেশি বেশি কাঁদে কারণ বৃষ্টি হচ্ছে অথবা এই বৃষ্টি প্রথমেই তার জন্য কান্না সম্ভব করে তোলে, যেহেতু সে ঘন ঘন কাঁদে না, এবং অবশেষে ভাবে এই দুইটি, বৃষ্টি এবং অশ্রু, আসলে একই। এরপর রাস্তায় একটা বিশাল হঠাৎ হট্টগোল বিভিন্ন জায়গা থেকে একই সময় আসতে থাকে—কিছু গাড়ি হর্ন বাজাচ্ছে, একটি ট্রাকের ইঞ্জিন ঘরঘর শব্দ করছে, অন্য একটি লক্করঝক্কর ট্রাক একটি ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে ঝনঝন করে চলছে, একটি রোড মেন্ডার রাস্তা পিটাচ্ছে—এবং হট্টগোলটি মনে হচ্ছে যেন তার ঠিক ভেতরে ঘটছে যেন তার ক্রোধ এবং দ্বিধা তাকে শূন্য করে দিয়ে গেছে এবং তার বুকের ঠিক মাঝখানে একটি জায়গা তৈরি করেছে এই উচ্চ ধাতব সংঘর্ষ তৈরি হওয়ার জন্য, অথবা যেন সে নিজে এই শরীর ত্যাগ করেছে এবং এই হট্টগোলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছে, এবং এরপর সে ভাবে, আসলেই কি শব্দটি আমার ভেতরে ঢুকছে, অথবা আমার ভেতরের কিছু রাস্তায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এরকম একটা বিশাল হট্টগোল তৈরি করার জন্য।

 

আপনার মতামত লিখুন :