ক্ষমা করুন, ম্যাডাম, আপনার ছেলেকে আমরা খুন করেছি

হেনরী চুকুউয়েমেকা ওনিয়েমা
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

【 অনুবাদ ফজল হাসান

আপনি পাঁচ ছেলের জননী এবং ছেলেদের বয়স ১৮ থেকে ৩২ বছর। আপনার পরিবার স্বচ্ছল নয়, তবে কোনোভাবেই আপনাদের গরিবের কাতারে ফেলা যাবে না। আপনার সব ছেলেই শিক্ষিত। বড় দুজন ডিগ্রিধারী এবং তৃতীয় ছেলের প্রযুক্তির ওপর হাতে-কলমে শিক্ষা আছে। ছোট দুজন মাধ্যমিক স্কুলের পড়াশোনা সমাপ্ত করেছে। একসময় আপনার বড় ছেলে এক মাসের গর্ভবতী তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করার আনজাম করছে। আপনার কাছে খুবই বেদনাদায়ক যে, বড় ছেলের পুরুষ হওয়ার সময় স্বামী থাকবে না।

আপনার কাছে আরো বেদনাদায়ক বিষয় হলো, বর্তমানে দেশের যে অংশে আপনারা বসবাস করছেন, যা এখন স্বঘোষিত স্বাধীন প্রজাতন্ত্র, তার সঙ্গে আপনাদের প্রাক্তন মাতৃভূমির বাকি জায়গার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এত কিছুর পরিবর্তন সত্ত্বেও আপনি হৃদয়ের গভীরে বিগত দিনগুলোতে একসঙ্গে বসবাস করার স্মৃতি ধারণ করে আছেন। যাহোক, পুলের নিচ দিয়ে রক্তের নহর বয়ে গেছে এবং সব কিছু আলাদা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর দিনগুলোতে মনে হয়েছিল সবই যেন অলীক, কিন্তু অন্যসব গৃহযুদ্ধের মতো কয়েক দিনের মধ্যে দেখা গেছে রক্তের স্রোত। আহতদের সংখ্যা বেড়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আপনি চেনেন এবং ভালোবাসেন।

আপনার ছেলেরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রতি ছিল প্রবল বিশ্বাসী এবং অটল। সুতরাং আপনি দুঃখ পেলেও আশ্চর্য্যান্বিত হননি যখন দেখেছেন যে, আপনার বড় ছেলে তার বান্ধবীর সঙ্গে প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডার পরেও সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছে। ছয়মাস পরে যখন তার মৃতদেহ বাড়ি নিয়ে আসা হয় এবং বীরের মর্যাদায় (সে তার প্লাটুনকে অ্যামবুশের হাত থেকে রক্ষা করেছে) অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করা হয়। তার দ্বিতীয় ভাই, যে কিনা মেয়েদের সঙ্গে আমোদ-ফুর্তি করে সময় কাটাত এবং দেশের অস্থির সময় ও রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাত না, আপনার অশ্রুভেজা চোখ অবজ্ঞা করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দুদিন পরে গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আপনি তার মৃতদেহ দেখতে পাননি। তার এক বন্ধুর কাছ থেকে শুধু মৃত্যু-সংবাদ পেয়েছেন। আপনাদের শহর যখন শত্রুরা তছনছ করেছে, তখন আপনি প্রাণের ভয়ে অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছেন। সেখানে আপনার সঙ্গে ছেলের সেই বন্ধু দেখা করেছিল।

শত্রুর বোমারু বিমানের আঘাতে আপনাদের প্রিয় শহর ধ্বংস হয়েছে এবং নিরীহ মানুষদের হত্যার কারণে ক্রুদ্ধ হয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ ছেলে যুদ্ধে যোগদান করেছে। তারা যমজ এবং তাদের দুই দেহে এক হৃদয়। শীঘ্রই তারা অবরুদ্ধ ভূমির সাহসী যোদ্ধার তকমা পরে রূপকথার নায়ক হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। সাহসী কমান্ডোরা যেসব গোলযোগপূর্ণ জায়গায় যায় যেখানে শয়তানও পা ফেলতে ভয় পায়, তাদের আত্মঘাতী বীরত্বের জন্য আচিলস্ এবং হেক্টর রীতিমতো লজ্জিত। এই দুঃসাহসী যমজ যখন এক সঙ্গে বিজয়ী কমান্ডো আক্রমণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গোপন অস্ত্রভাণ্ডার দখল করেছিল, তখন সারা দেশ কেঁপে উঠেছিল।

আপনি কাঁদেন, বিলাপ করেন এবং হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করেন। আপনি ঈশ্বরের কাছে ফরিয়াদ জানান এবং বলেন : ‘বিজয় ঘোষণা করার দয়িত্ব কি আপনার নয়? তাহলে আপনি কেন এসব জীবন উৎসর্গ করাচ্ছেন, যা কোনো শহীদের করার কথা নয়। এবং তারপর....’

‘মা, আমি সৈনিক দলে যোগদান করব,’ আপনার সন্তান এসে বলল। সে শান্তশিষ্ট, ভদ্র এবং কনিষ্ঠ ছেলে, যে বাইবেল কলেজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। অথচ যুদ্ধ তার জীবন সংক্ষিপ্ত করেছে। তার অশ্রুসিক্ত দু চোখ সবার দৃষ্টিগোচর হবে এবং আপনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবেন না। সব শেষ হয়ে গেছে এবং আপনি সমাপ্তি টানেন....

যখন বিউগলের করুণ সুর বেজে ওঠে, যখন আপনার ছেলের সৈন্যদলের সহকর্মীরা শেষবারের মতো একুশবার তোপধ্বনি করে, যখন তার কফিন উজ্জ্বল জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়, যখন সেনাপ্রধান আবেগী কন্নাকে দমন করার জন্য দাঁত দিয়ে নখ কাটেন, যখন সহমর্মিতার নরম বাহু দিয়ে রাষ্ট্রপতির স্ত্রী কান্নাজড়িত চোখে আপনাকে জড়িয়ে ধরেন, নেতিবাচক ভঙ্গিতে দুপাশে মাথা দোলান এবং তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটা চিঠি আপনার হাতে তুলে দেন, তখন আপনি বোকার মতো কুর্নিশ করেন। সেই সময় উচ্চরিত শব্দের জন্য তামাম দুনিয়া বরফ হয়ে গেছে।

রাতে একাকিত্বের সময় আপনি চিঠি নিয়ে বসেন। সাধারণ কাগজে লেখা চিঠি এবং সাদামাটা খাম। খামের ওপর কেরানির হাতে রাষ্ট্রপতির নাম ও ঠিকানা স্পষ্ট করে লেখা। আপনি খাম খোলেন এবং চিঠি পড়া শুরু করেন :
‘.... মা, আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আমি কী বলতে পারি? জানি, কেউ আপনার পাঁচ ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। আপনার সারা জীবনের শান্তির উৎস হিসাবে ঈশ্বর ওদের এই নশ্বর পৃথিবীতে পয়দা করেছিলেন। যারা আমাদের স্বাধীনতা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তা, আমাদের জন্য এক টুকরো ভূখণ্ডের জন্য মনে-প্রাণে ছিল উৎসর্গিত, আমি যদি তাদেরকে বীর হিসাবে আখ্যায়িত করি, যদিও কথাটা সত্য যে, তাতে আপনি যৎসামান্য সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন। আমি যখন আপনার ত্যাগের কথা শুনেছি, তখন নিজেকে নানান প্রশ্ন করেছি, যা নিভৃতে আমার চোখের পানি ঝরিয়েছে। যুদ্ধ করার জন্য আমরা কি খুব তাড়াহুড়া করেছিলাম? আমরা কি নিজেদের দুর্দশার কারণগুলো সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে পারতাম না? নাকি দুদিকে খুব বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল? উভয় পক্ষেরই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি ছিল। আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি যে, আমরা ওদের কথায় কর্ণপাত করিনি। ফায়ারিং স্কোয়াডে কয়েকজন চুপ করে ছিল। আমাদের তরুণ সমাজ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেছিল উভয় দলের উদ্দেশ্য এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু যারা অন্যায়ভাবে মারা গেছে, তাদেরকে বলা হয়নি যে শান্তির মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টি তাদের জন্য অপমানের বিষয় ছিল না। অনুগ্রহ করুণ, ম্যাডাম, আমি আপনার এবং অন্যসব মায়েদের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমাদের মাফ করে দিন। আমরা আপনাদের ছেলেমেয়েদের খুন করেছি। নিহতদের ক্ষতির কারণে আমার বিপরীত পক্ষ এবং আমি রীতিমতো অন্ধ ছিলাম এবং যারা জীবিত আছে, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। ঈশ্বর আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করুন।’

রাষ্ট্রপতির চিঠির কথাগুলো সত্য এবং যে কোনো মানুষের ব্যথিত হৃদয় থেকে জগদ্দল পাথর সরিয়ে ভারমুক্ত করবে। আপনি যেই আপনার হাস্যোজ্জ্বল ছেলের ছবির দিকে তাকাবেন, তখন কান্না আপনার মনের ব্যথাকে হালকা করবে। যাহোক, আপনার মস্তিষ্কের ভেতর নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। কিন্তু কেন? কিসের জন্য? কোন কারণে এসব নিষ্পাপ ছেলেগুলোর প্রাণ অকালে ঝরে গেল?

দুদিন পরে রাষ্ট্রপতি শত্রুর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন এবং সেই অনুষ্ঠান গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।

হেনরী চুকুউয়েমেকা ওনিয়েমা নাইজেরিয়ার সমকালীন কথাসাহিত্যে একটি পরিচিত নাম। তাঁর জন্ম ১৯৭৫ সালে। রাত্তিরে লেখালেখি ও দিনে শিক্ষকতা করা ছাড়াও তিনি মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত এবং নেদারল্যান্ডের ‘দ্য আফ্রিকান বুলেটিন’ সংবাদপত্রের কলাম লেখক। তাঁর লেখা স্বদেশে এবং আফ্রিকার একাধিক দেশের বিভিন্ন ছাপা এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি লাগোস শহরে বসবাস করেন।

ক্ষমা করুণ, ম্যাডাম, আপনার ছেলেকে আমরা খুন করেছি’ গল্পটি হেনরী চুকুউয়েমেকা ওনিয়েমার ‘ফরগিভ আস, ম্যাডাম, উই কিল্ড ইয়োর সান’ গল্পের অনুবাদ। ইংরেজিতে গল্পটি ‘ব্রিটল পেপার’ ম্যাগাজিনে ১৬ মার্চ ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকেই গল্পটি নেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :